গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
যুবতীটির নগ্ন দেহটি বিছানার ওপর এলিয়ে পড়ে বনহরিণীর মত ডাগর ডাগর চোখ দুটো আবেশে জড়িয়ে আসতে চায় । একটি যুবকের মধ্যে কামােন্মাদনা জাগিয়ে তােলার জন্য যা কিছু করা দরকার কোন প্রায়াসই সে বাদ দিল না। আমার ভাইয়া শাক্কাশিক ক্রমে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত হয়ে উঠল। তার দেহের খুনে মাতন লাগে। ঝাপিয়ে পড়ে যুবতীটির নগ্ন দেহের ওপর। তারপর ? না, তারপর আর কিছু সম্ভব হ’লনা। অতর্কিতে দরজায় এসে দাঁড়ায় ডাকাত সর্দার। ভয়ঙ্কর তার চাহনি। বীভৎস তার মুখের ভাব। গুলি খাওয়া শেরের মত গর্জে ওঠে—‘শয়তান, আমার বিবিকে নিয়ে মজা লুঠছিস! তাের বুকের পাটা তাে কম নয়! আমার কলিজায় হাত দেওয়ার মজা তােকে টের পাইয়ে দিচ্ছি। কথা বলতে বলতে কোমর থেকে ছােরা টেনে নিয়ে শক্কাশিক-এর ঠোট দুটো টেনে ধরে কচ করে কেটে দিল। আবার তর্জন গর্জন শুরু করল—তুই যে লিঙ্গটি দিয়ে আমার বিবিকে ভােগ করেছিস সেটা কেটে এমন অবস্থা করে দেব জিন্দেগীতে যাতে আর কারাে বিবিকে ভােগ করতে না পারিস।' এবার হিংস্র জানােয়ারের মত আমার ভাইয়া শাক্কাশিক-এর ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। শুরু হ’ল ধস্তাধস্তি। এক সময় বাগে পেয়ে সে তার পুরুষাঙ্গটি কেটে ফেল্ল।
আমার ভাইয়া শাক্কাশিক সংজ্ঞা হারিয়ে মেঝেতে এলিয়ে পড়ল। ডাকাত-সর্দার তাকে মৃত ভেবে একটি খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে সেটিকে পাহাড়ের দিকে পাঠিয়ে দেয়। পাহাড়ের গায়ে সে খচ্চরের পিঠ থেকে পিছলে পড়ে গেল।
সে-পথে আমাদের মহল্লার কয়েক জন মক্কায় হজ করতে যাওয়ার সময় আমার ভাইয়া শাক্কাশিককে দেখে চিনতে পারে। তাদের মুখে শুনে আমি উদভ্রান্তের মত ছুটতে ছুটতে সেখানে হাজির হই। বাড়ি গিয়ে আমি হেকিম ডেকে গােপনে ইলাজের ব্যবস্থা করি। হেকিমের দাওয়াইয়ে তার দেহের ক্ষতগুলি শুকিয়ে যায়। তারপর থেকে সে আমার ঘাড়ে চেপেই দুঃখের দিনগুলাে গুজরান করতে থাকে।
নাপিত এবার খলিফা অল-মুসতানসির বিল্লাহকে লক্ষ্য করে বলল —জাঁহাপনা, এবার আপনিই বিচার করে দেখুন, আমি কেমন পরােপকারী, স্বল্পভাষী, জ্ঞানী ও মহাপ্রাণ। খলিফা বললেন—“ঠিক বলেছ হে, তােমার মত এমন এক সর্বগুণ সম্পন্ন ব্যক্তিকে নিজের কাছাকাছি রেখে স্বার্থপরতার পরিচয় দিতে চাই না। তােমার গুণাবলী তামাম দুনিয়ার আদমির মধ্যে সঞ্চারিত হােক। এই বলে তিনি আমাকে বাগদাদ থেকে তাড়িয়ে দিলেন। তারপর এ মুলুক-সেমুলুক ঘুরে আপনার মুলুকে চীন দেশে এসে হাজির হয়েছি। আমি হলফ করেছি, খলিফা অল মুসতানসির বিল্লাহ যতদিন না গােরে যাচ্ছে ততদিন আর বাগদাদ মুখো হচ্ছি না। এবার আপনারাই বিচার করে বলুন তাে, আমি কি সত্যি বেশী বকবক করি, নাকি মিতভাষী? আমার তাে বিশ্বাস, তামাম দুনিয়াটি ঢুঁড়ে এলে আমার মত আর একটি মিতভাষী পাবেন না। আর দূরদর্শিতার বিচার ? সে যুবককে তাে আমি দু’হাতে বারণ করেছিলাম যেন তিনি নতুন কোন কাজে হাত না দেন। তার সময় খুবই খারাপ যাচ্ছে এ কথাও বলতে ভুলি নি। সে আমার কথায় কান দিল না। আমি মােক্ষম সময়ে সেখানে হাজির না হলে লেড়কিটির আব্বা কাজীর হাতে নির্ঘাৎ তার জান খতম হয়ে যেত। আমার চেষ্টাতেই একটি পা খােয়ালেও জান তাে রক্ষা পেল। বেইমান কাহাকার! একবার সুকরিয়া পর্যন্ত জানাল না বেইমানটি। নাপিত তার বকবকানি থামালে উপস্থিত সবাই যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। হায় আল্লাহ! কান একেবারে ঝালাপালা করে দিল ! এ-ই যদি স্বল্পভাষীর নমুনা হয় তবে আর তামাম দুনিয়ায় বকবক করার লােক কেউ-ই নেই। হতচ্ছাড়া শয়তানটির জন্যই ছেলেটির পা গেছে। আজ সে খোঁড়া চুল ছাটতে গিয়ে কথার ফুলঝুরি না ছােটালে সময়মত সে লেড়কিটির কাছ থেকে সরে পড়তে সক্ষম হ'ত। তারপর পৌছতে দেরী করলেও যদি বকবকানি জুড়ে না দিত তবে কিছুতেই কাজীর হাতে সে ধরা পড়ত না। বৃথা চিৎকার। চেঁচামেচি করে লােক জানাজানি করে সর্বনাশ ঘটায়। মনে হল দর্জিটি যেন আমাদের বলছে, নাপিতের বদমাসির জন্যই কেলেঙ্কারীটি ঘটেছিল। সব সর্বনাশের মূল নাপিতকে উচিত শিক্ষা দেবার জন্য ছােট্ট একটি কামরায় আটক করা হ'ল। তারপর আমি খানা খেলাম। দামী সরাব গলা পর্যন্ত গিলাম। বিকেলের দিকে - বিবির জন্য পােটলা বেঁধে খানা নিয়ে ঘরে ফিরলাম।
আমাকে দেখেই আমার সােহাগের বিবি তম্বি জুড়ে দিল— ‘কোন চুলােয় সারাটি দিন কাটিয়ে এলে ? আমাকে বাড়িতে একা ফেলে কোথায় কার রঙে মজেছিলে? আমাকে নিয়ে এখনই যদি ' বেড়াতে না বেরােও তবে আমি কাজীর শরণাপন্ন হব। তােমাকে তালাক দিয়ে গায়ের ঝাল মিটাব।
আমি নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষ। কাজীটাজীর ঝামেলায় না গিয়ে আমার রূপসীকে নিয়ে সান্ধ্য-ভ্রমণে বেরােলাম। বেরিয়ে ঘরে ফেরার পথে কুঁজোটির মুখখামুখি হলাম। সে গলা পর্যন্ত সরাব গিলেছে। বদ্ধ মাতাল। আমরা বলাবলি করলাম উন্মত্ত প্রায় কুঁজোটিকে সঙ্গে করে ঘরে ফিরলে চুটিয়ে মজা করা যাবে তাকে নিয়ে। তাকে বলতেই সে সঙ্গে সঙ্গে রাজিও হ’ল।।
আমার বিবি পরপুরুষের সামনে বেরােয় না। কিন্তু তার মতে, কুঁজোটি তাে আর অন্য দশজন মানুষের মত নয়। তাকে একটি খেলার পুতুল জ্ঞান করত।
আমরা বাড়ি পৌছে গল্পগুজবে মেতে গেলাম। কুঁজোটি তার অদ্ভুত অদ্ভুত খেলা দেখাতে আগ্রহী। আমার বিবি খেতে বসে তার মুখে জবরদস্তি এক টুকরাে মাছ খুঁজে দেয়। গলায় কাঁটা বেঁধে হতচ্ছাড়া কুঁজোটি মারা গেল।
আমার বিবিই উপায় করল। নিজে তার লাশটি কোলে তুলে নিয়ে হেকিমের বাড়ি যায়। সুযােগ বুঝে তার বাড়ির সিঁড়ির মুখে সেটি ফেলে রেখে আমাকে নিয়ে সে বাড়ি ফিরে আসে।
জাঁহাপনা, এর পরে কি কি ঘটনা ঘটেছিল আপনারা তাে সবই শুনেছেন। হেকিম, পাচক, খ্রীস্টান, দালাল প্রভৃতির কথা বলেছি। এবার আপনিই বলুন জাঁহাপনা, আপনার এ কুঁজোর ও তার মৃত্যুর কিসসার চেয়ে সে খোঁড়া যুবক বণিক ও নাপিত আর তার ছয় ভাইয়ার কিসসা থেকে রােমাঞ্চকর নয় কি?'
–‘সত্যি তােমার কিসসা আমাকে অবাক করে দিয়েছে। কিন্তু সে বিচিত্র চরিত্রের নাপিতটিকে আমি একবারটি নিজের চোখে দেখার জন্য কৌতূহল বােধ করছি। তাকে হাজির কর। মৃত্যুর পর তার সমাধি স্থলে আমি স্মৃতিসৌধ গড়ব। যাও, খুঁজে আন।”
—জাঁহাপনা, খুবই সাধারণ কাজ। আমি আপনার হুকুম তামিল করছি।
দর্জি এবার সুলতানের সিপাহীদের নিয়ে নাপিতের খোঁজে বেরােলাে। ঘণ্টা খানেক পরে নাপিতকে নিয়ে তারা প্রাসাদে ফিরল। নব্বইয়ের কাছাকাছি তার উমর। চুল-দাড়ি সবই শনপাটের মত ধবধবে সফেদ ।
নাপিতকে দেখে সুলতান হেসে হেসে বললেন-শােন, তােমার কিসসা শুনে আমি মুগ্ধ হয়েছি।'
—'জাহাপনা, এর চেয়ে কত মজার মজার কিসসা আমার মাথায় হরকত ঘুরপাক খাচ্ছে। কত কি শুনবেন আপনি? সাতদিন সাত রাত্রি ধরে কিসসা বললেও আমার ভাণ্ডার নিঃশেষ হবে না। কিন্তু জাহাপনা, আমাকে আর একটি কথার জবাব দিন। এ-খ্রীস্টান, এ-কুঁজো আর এ ইহুদির লাশ এখানে আসা কি করে সম্ভব হল? আমার বিশ্বাস, পুরাে ব্যাপারটিই ভুলের জন্য খটেছে।'
সুলতান মুখ খুললেন-“ভাল কথা, তবে বলছি। তিনি এবার কুঁজোর আকস্মিক মৃত্যু থেকে শুরু করে খ্রীস্টান দালালের ফাসির আদেশ হওয়া পর্যন্ত সব ঘটনা সবিস্তারে তার সামনে তুলে ধরলেন।
নাপিত এবার বলল -“জাঁহাপনা, মেহেরবানি করে কাউকে বলুন কুঁজোর লাশটির ওপর থেকে কাপড়টি সরাতে।' সুলতানের হুকুমে এক যুবক-কর্মী কুঁজোর ওপর থেকে কাপড়টি সরিয়ে নিল।
নাপিত এবার তার কাছে এগিয়ে গিয়ে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে ভাল করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বল্ল-“জাহাপনা, কুঁজোটির জান যে খতম হয়েছে এতে কিছুমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই। দুনিয়ার কোন হেকিম-বৈদ্যই একে জিন্দা করতে পারবে না। কিন্তু আমি পারব।'
নাপিতের কথায় সভায় উপস্থিত সবাই, এমন কি সুলতান পর্যন্ত সরবে হেসে তার কথাটি উড়িয়ে দিলেন।
নাপিত কিন্তু তাদের উপহাসে এতটুকুও বিচলিত হ'ল না। সে কোমর থেকে একটি সান্না বের করে কুঁজোর মুখের ওপর ঝুঁকল। সান্না দিয়ে তার মুখ থেকে এক টুকরাে শক্ত ভাজামাছ বের করে আনল । ব্যস, নিঃসাড় কুঁজোটি নড়ে চড়ে উঠল। এবার সে চোখ মেলে তাকাল। সবার চোখের সামনে নাপিত যেন ভােজবাজীর খেল দেখাল।
নাপিত এবার নীরবে চোখে-মুখে এমন ভাব ফুটিয়ে তুলল, এ তার কাছে খুবই সাধারণ ব্যাপার। ইচ্ছা করলে সে আরও অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটাতে সক্ষম।
সুলতান বিস্ময়ের ঘাের কাটিয়ে বললেন—নাপিত, জিন্দেগীতে আমি বহুত তাজ্জব ব্যাপার চোখের সামনে দেখেছি বটে। কিন্তু মরা আমিকে জিন্দা করা, এমন অবিশ্বাস্য কাণ্ড কোথাও দেখি নি। এ কুঁজো আমার দরবারের বিদূষক। এর অবর্তমানে কেবল আমার দরবারেই নয়, রাজ্যের সর্বত্র শােকের ছায়া নেমে এসেছিল। তােমাকে প্রথম দর্শনেই আমার যেন মালুম হয়েছিল, তােমার ভেতরে এমন এক সম্পদ রয়েছে সাধারণ আদমি যার হদিস পায় না ।'
সুলতান এবার তার কুঁজোকে তার যথােপযুক্ত পােশাকে সজ্জিত করে দরবারে বসালেন। সুলতান নাপিতকে লক্ষ্য করে সােল্লাসে বলেন—'শােন, আজ থেকে তুমি আমার দরবারের দ্বিতীয় বিদূষকের পদে অভিষিক্ত হলে। আর আমার ব্যক্তিগত ক্ষৌরকারের পদও তােমাকে দান করলাম। তুমি হবে আমার কাছের ও প্রিয় মানুষ। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বলতে বলতে মুহূর্তের জন্য মৌন হলেন। তারপর বললেন—জাঁহাপনা, এ-কিসসাটি এখানেই শেষ হয়েছে। এর চেয়েও অনেক অনেক বেশী চিত্তাকর্ষক কিসসা আমার স্মৃতির ভাণ্ডারে জমা রয়েছে যা শুনলে আপনি তাজ্জব বনতে বাধ্য। অবশ্য আপনি যদি আগ্রহী হন তবে আমি এখনই তা শুরু করতে পারি।'
আলীনূর ও আনিস-অল-জালিসের কিসসা
বাদশাহ শারিয়ার এবার বললেন—‘দর্জি ও নাপিতের কিসসার চেয়েও চিত্তাকর্ষক কিসসা আবার হতে পারে নাকি ? ঠিক আছে, শুনি, তােমার কি সে কিসসা ।
বেগম শাহরাজাদ উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বললেন‘জাহাপনা, এবার আপনাকে আলীনূর ও আনিস-অল-জালিস-এর কিসসা শােনাচ্ছি।
শুনুন জাঁহাপনা, কোন এক সময় রাজত্ব করতেন মহম্মদ ইবন সুলেমান অল—যিনি বসরাহ-র সুলতান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ছিলেন দয়ার অবতার। অসহায় দীন-দুঃখীদের চোখের মণি। সুলতানের দরবারে দু' জন উজির ছিলেন। তাদের একজনের নাম ছিল কাকন-এর পুত্র অল-ফাদল আর দ্বিতীয় জনের নাম সাবীর-এর পুত্র মইন। " উজির অল-ফাদল সদাশয়, মহানুভব এবং প্রেম ও দয়ার পূজারী। আর মইন ছিলেন অল-ফাদল-এর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। রাজ্যের কোন লােককেই তিনি দিল থেকে মেনে নিতে পারতেন না। মেজাজ যেন সব কাজী ছাই । ছােটখাট কোন ভুলচুক বা গলতি করে ফেললে কঠিন শাস্তিদান করে কর্তব্য পালন করতেন। উজির আল ফাদল কে তার আচরণের জন্য সবাই যারপর নাই শ্রদ্ধা করত । কিন্তু মইনকে তার চেয়ে অনেক বেশী অশদ্ধার চোখে দেখত সকলে ।
এক সকালে সুলতানের দরবারে উজির ফাদল এ তলব হ'ল। উজির কুর্নিশ সেরে সুলতানের আদেশের অপেক্ষায় দাড়িয়ে রইলেন।
সুলতান এবার বললেন—'বসৱাহের বাজারে নাকি খুবসুরৎ সব ক্রীতদাসী আমদানি হয়েছে। তুমি যাও, পছন্দ করে একটি ক্রীতদাসী কিনে আনবে। খালি সুরৎই না স্বভাব চরিত্রের দিকেও নজর দেবে।'
উজির অল-ফাদল খচ্চরের পিঠে চেপে চললেন সুলতানের হুকুম তামিল করতে। কোর্তার জেবে দশ হাজার মােহর সঙ্গে নিয়ে গেলেন।
ব্যাপারটি কিন্তু উজির মইন এর চোখে মােটেই সুবিধার মনে হ’ল না। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজের দায়িত্ব অন্যের ওপর অর্পিত হলে কার না গাত্রদাহ হয় ?
বাজারে পৌছে অল-ফাদল ক্রীতদাসীদের দালাল গুলিকে হেঁকে জড়াে করলেন। সুলতানের চাহিদার কথা জানালেন। দালালরা গম্ভীর মুখে বল্ল-'আপনি যেমন সুরৎ ও স্বভাব চরিত্রের কথা বলছেন সেরকম ক্রীতদাসী এ বাজারে পাওয়ার উপায় নেই। এখানে যারা আছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দামের ক্রীতদাসী এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা দিলেই পেয়ে যাবেন। ব্যস, এর বেশী কিছু আশা করা যায় না।'
—ভাল কথা, এখানে যাদের জড়াে করা হয়েছে তাদের মধ্য থেকেই বাছাই করে সবচেয়ে বেশী সুরৎ ও সভ্য ভব্য যে তাকেই আমার সামনে হাজির কর।'
দালালরা ছুটল ক্রীতদাসী বাছাই করতে। হন্যে হয়ে ঘুরে সবচেয়ে বেশী সুরৎ ও আচার আচরণ যার সবচেয়ে ভাল যে ক্রীতদাসী পেল তার দাম এক হাজার দিনারও নয়।
উজির অল-ফাদল-এর চোখে-মুখে বিষাদের ছায়া নেমে এল । অল-ফাদল বললেন—'তবে উপায়?'
–হুজুর এ-মাসের শেষের দিকে কিছু আচ্ছা আচ্ছা ক্রীতদাসী আসার কথা আছে। তখন না হয় খুঁজে পেতে সবচেয়ে সুরৎ যার বেশী মনে হবে তাকেই নিয়ে যাবেন।
উজির অল-ফাদল দরবারে ফিরে গিয়ে সুলতানকে সব কথা বললেন-“ঠিক আছে, তােমাকে আরও কয়েক দিন সময় দিলাম। তবে খেয়াল থাকে যেন দুনিয়ার সেরা ক্রীতদাসী আনতে হবে।'
কয়েকদিন যেতে না যেতেই এক দালাল উজিরের কাছে এসে জানাল, সুলতান যেমন চাইছেন ঠিক সেরকম এক যুবতী ক্রীতদাসীর খোঁজ পাওয়া গেছে। তার স্বভাব চরিত্রও খুবই ভাল।
-“বহুত আচ্ছা। তুমি যত তাড়াতাড়ি পার যুবতী ক্রীতদাসীকে নিয়ে এস।' এক ঘণ্টা যেতে না যেতেই দালালটি এক তন্বী যুবতী ক্রীতদাসীকে তার সামনে হাজির করল। লম্বা ধাঁচের চেহারা। উদ্ভিন্ন যৌবনা। নিতম্ব প্রশস্ত, কোমর সরু। স্তন যুগল খুবই সুগঠিত। যত্ন আত্তির ফলে একেবারেই নিটোল। ষােড়শী বা অষ্টাদশী হবে বড় জোর। হরিণের মত ডাগর ডাগর চোখ দুটি। চপল চাপল তার চাহনি। গায়ের রঙ আপেলের মত। গাল দুটোর বৈশিষ্ট্য এই যে, সে হাসলে দু গালে মনলােভা টোল পড়ে।
উজির অল-ফাদল ভাবলেন—এমন রূপের পসরা সাজিয়ে সুলতানের সামনে যুবতীটিকে হাজির করলে তাঁর কলিজাটি নির্ঘাৎ চনমনিয়ে উঠবে। সুলতান এমন রূপসী-যুবতীকে দেখলে অবশ্যই চিত্ত চাঞ্চল্য বােধ করবেন। উজির এবার তার নাম জিজ্ঞেস করলেন—‘সুন্দরী তােমার নাম কি, বল তাে?
‘আনিস-অল-জালিস।
উজির ক্রীতদাসীটির দাম জানতে চাইলে দালাল বলল দশ হাজার দিনার। এর মালিক এ দামই আমার কাছে দাবী করেছে।।
—“ঠিক আছে, এর মালিককে তলব কর। সে এলে তার হাতেই আমি দাম দেব। ক্রীতদাসীটির মালিক এল। ক্রীতদাসীটির জন্য সে-ও দশ হাজার দিনারই দাবী করল। এর দাম এত বেশী হওয়ার পিছনে কারণ দেখাল—‘হুজুর, লেড়কিটির ইতিহাস, বিজ্ঞান, গণিত, ভূগােল, আইন, দর্শন এবং সমাজবিজ্ঞান সম্বন্ধে খুবই দখল রয়েছে। এমন সর্ব বিষয়ে পারদর্শিনী সচরাচর দেখা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা, আজ পর্যন্ত এর চরিত্রে এতটুকুও কালির ছিটে পড়েনি। আবার হাস্যরস সম্বন্ধেও এর যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। |
-তােমার সব কথাই আমি বিশ্বাস করছি। উজির অল-ফাদল তার হাতে দশ হাজার দিনার তুলে দিলেন । ক্রীতদাসী যুবতীটির মালিক তার প্রাপ্য বুঝে পেয়ে বলল‘আমার একটি অনুরােধ আছে হুজুর। সুলতানের সামনে একে আজই হাজির করবেন না। পথশ্রমে এর রূপ সৌন্দর্য অনেকাংশে ম্লান হয়ে গেছে। আট-দশদিন আপনার কাছে থাকতে দিন। এর মধ্যে এর হৃত-সৌন্দর্য ফিরে আসবে। তারপর সুলতান একে প্রথম দর্শন করলে দেখবেন এর রূপ-সৌন্দর্য কেমন ফুটে বেরােয়।
অল-ফাদল তার পরামর্শানুযায়ী কাজ করলেন। নিজের প্রাসাদের এক কক্ষে তার থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
অল-ফাদল-এর একটি যুবক লেড়কা রয়েছে। যেমন তার অনন্য সাধারণ রূপ ঠিক তেমনই বহুগুণের সমাবেশ ঘটেছে তার মধ্যে। তার নাম আলীনূর। আনিস-এর কথা কিছুই তার জানা নেই। শুধুমাত্র জানে টাকা দিয়ে কেনা এক ক্রীতদাসী। কিন্তু কার জন্য এবং কত টাকার বিনিময়ে এসব কিছুই সে জানে না।
এদিকে উজির আনিস’কে তার থাকার ঘর দেখিয়ে দিয়ে বললেন—“শােন বাছা, দশ - বারােদিন এখানে থেকে পথের ক্লান্তি দূর করে একটু তরতাজা হয়ে নাও। একটি কথা কিন্তু মনে রেখাে, আমার এক যুবক ছেলে রয়েছে। হাড়ে হাড়ে বজ্জাত। তার সুরত কিন্তু খুবই। নিজেকে একটু সামলে টামলে রেখাে। যদি তার হাতে নিজেকে সঁপে দাও তবে কিন্তু সুলতানের কাছে আমি মুখ দেখাতে পারব না। তার চোখ দুটোয় লেড়কি ভােলানাে যাদু আছে। তার চোখের দিকে লেড়কিরা তাকালেই মহব্বতে পড়ে যায়। এতল্লাটের কোন লেড়কি তার হাত থেকে রেহাই পায় নি। তাই বলছি কি, সাবধানে থাকবে। এক খােজা বামন তােমার সব কাজ করে। দেবে। তুমি ভুলেও ঘর থেকে বেরিয়াে না। তার চোখে যদি পড় তবেই সর্বনাশের চূড়ান্ত হয়ে যাবে, খেয়াল রেখাে। মজার কথা হচ্ছে, তাকে তােমার মন পাওয়ার জন্য প্রয়াসী হতে হবে না। তুমিই
সােৎসাহে নিজেকে তার হাতে সঁপে দেয়ার জন্য উন্মাদিনীর মত হয়ে যাবে।'
আনিস ঘাড় কাৎ করে সম্মতি জানাল। নসীব। নসীবের ফের এড়াবার উপায় কি! পরদিন খােজা বামনটি আনিস’কে নিয়ে হামাম থেকে আতর মেশানাে পানিতে গােসল করিয়ে নিয়ে এল। সােনার জরির কাজ করা কামিজ ও সালােয়ার পরিয়ে দিল। গায়ে মাখতে দিল বহুমূল্য প্রসাধন সামগ্রী। উজিরের বিবি তার রূপে মুগ্ধ হয়ে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। পঞ্চমুখে তার প্রসংশা করলেন। আদর - সােহাগও কম করলেন না।
আনিস অদ্ভুত ভঙ্গিতে ঠোটের কোনে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুল্ল।
তাকে নিজের ঘরে বসিয়ে উজিরের বিবি হামামে গেলেন গােসল করতে। দুই খােজা পরিচারককে বলে গেলেন, কাউকে যেন তার কাছে আসতে না দেয়।
উজিরের বিবি ঘর ছেড়ে গেলে আনিস পােশাকের অনাবশ্যক অংশগুলি খুলে রেখে পালঙ্কে গা এলিয়ে দিল। তার ঠিক কিছুক্ষণ বাদেই আম্মার সঙ্গে দেখা করার জন্য নূর সে-ঘরের দিকে আসে। দরওয়াজায় পা দিতেই খােজা বামন দুটো তার পথ আগলে দাঁড়ায়। তারা বলে—“হুজুর, মালকিন তাে নেই, হামামে গেছেন গােসল সারতে। ঘরে ছােট-মালকিন রয়েছেন, পাহারা দিচ্ছি।' কপালের চামড়ায় ভাজ এঁকে নূর বলল—ছােট মালকিন ? সে আবার কে হে? কে, কোত্থেকে এনেছে? ‘সে কী হুজুর, আপনি কিছুই জানেন না? উজির সাহেব সুলতানের জন্য খরিদ করে এনেছেন। নূর - এর কৌতূহল হল। ঘরে ঢুকতে চায়। খােজা বামন দুটো বার বার অনুরােধ করে ঘরে না ঢােকার জন্য। সে জবরদস্তি ঘরে ঢুকলে মালকিন তাদের জান খতম করে দেবেন একথাও বলে।
নূর তাদের শত অনুরােধ ও কাকুতি মিনতির কিছুমাত্র মূল্য না দিয়ে সে ঘরে ঢােকার চেষ্টা করে। আনিস খােজা বামনদের কথায় সচকিত হয়ে পড়ে। দরজায় উজিরের উচ্ছঙ্খল পুত্র নূর -এর আগমন ঘটেছে বুঝতে তার বাকি রইল না। উজির তাে তাকে তার পুত্ররত্নটি সম্বন্ধে সতর্ক করে দিয়েছেন। বারবার বলেছেন, কিছুতেই যেন তার মুখােমুখি না হয়।
আনিস-এর অন্তরের অন্তঃস্থলে নূরকে একটিবার চোখে দেখার জন্য কৌতূহল হয়। জানতে ইচ্ছা করে, কি আছে তার চোখের তারায় যা দেখলে যুবতীরা পিয়ার মহব্বতে একেবারে মজে যায় ? তবে এ-ও প্রতিজ্ঞা করে কিছুতেই নিজেকে তার হাতে সঁপে দেবে না ।
অতীতে বহু সুপুরুষই তাে তার পিছন পিছন ঘুর ঘুর করেছে। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে সবাইকে সে দূরে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু নূর-এরমধ্যে এমন কি আছে যে, নিজেকে বশে রাখতে পারবে না। কৌতূহল নিবৃত্ত করতে গিয়ে সে দরওয়াজার পাল্লাটি সামন্য ফাক করে নুরকে দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার তাে যুবক নুর এর চোখের দিকে তাকানাে মাত্র তার কলিজাটি আচমকা কেমন যেন মােচড় মেরে ওঠে। রক্তে মাতন জাগে। মাথার স্নায়ুগুলাে এক সঙ্গে ঝনঝনিয়ে ওঠে। মুহুর্তে আনিস যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলে। দরওয়াজা বন্ধ করে পালিয়ে যেতে গিয়েও থমকে গেল। পালাতে আর পারল না।।
এদিকে নূর-ও আনিস-এর রূপ-সৌন্দর্য বিস্ময়ভরা চোখে দেখতে লাগল। এমন রূপের জৌলুষ তামাম বসরাহ নগরে দ্বিতীয় কারাে মধ্যে দেখা যাবে না। কত সব রূপসী - যুবতী বিবস্ত্র হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। স্বেচ্ছায় নিজের রূপ - যৌবন তার হাতে তুলে দিয়ে পুলকানন্দে ভেসেছে। কিন্তু এ-যুবতীটি যে একেবারেই অনন্যা।।
আলি নূর আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। অতর্কিতে দরওয়াজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। ভীতা - সন্ত্রস্ত হরিণীর মত আনিস ঝট করে দরওয়াজা থেকে সরে যায়। পালঙ্কের কাছে পিছন ফিরে দাঁড়ায়। তাকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বলতে মন থেকে উৎসাহও পাচ্ছে না। না পারে ফেলতে, না পারে গিলতে। এ কী বিষম দায়রে বাবা! নূর এগিয়ে গিয়ে আনিস-এর মুখােমুখি দাঁড়ায়। তার হাত বাড়িয়ে তার মুখটি তুলে ধরে বলে—‘সুন্দরী, এমন করে নিজেকে সরিয়ে রেখাে না। মুখ তােল। আমার দিকে তাকাও একবারটি। আনিস আবেগ-মধুর স্বরে উচ্চারণ করতে চায়—তা যে হবার নয়। তােমার আব্বা উজির সাহেবকে যে আমি কথা দিয়েছি, তােমার সংশ্রবে যাব না। কিন্তু বার বার চেষ্টা করেও সে এ ধরনের কোন প্রতিবাদ-বাক্য মুখে উচ্চারণ করতে পারল না। আনিস চোখের ভাষায় নূরকে বলল বােসাে। আমার পাশে বােস। নুর তার সম্মতি পেয়ে উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে তার মনময়ূরী রূপ-সৌন্দর্যের আকর আনিস’কে দু'হাতের বন্ধনে আবদ্ধ করে। তার মুখের কাছে নিজের মুখটিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যায়। ঠোটে ঠোট দুটো রেখে উন্মাদের মত ঘষতে থাকে। চুম্বন করে বার বার। চুম্বনে চুম্বনে আনিস-এর বুকে উত্তেজনামিশ্রিত রােমাঞ্চের সঞ্চার ঘটে। সর্বাঙ্গে জাগে এক অনাস্বাদিত শিহরণ।
নূর এবার এগিয়ে এসে দড়াম করে দরওয়াজাটি বন্ধ করে দেয়। খােজা বামন দুটো প্রমাদ গণে। এ কী সর্বনাশা কাণ্ড! মালিক জানতে পারলে যে তাদের জানে মেরে ফেলবেন। নূর যখন কিছুতেই দরজা খুলে আনিস-এর কাছ থেকে বেরিয়ে ( চলবে )

0 Comments