গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
অল-আসার এক সঙ্গে পাঁচ শ’ সােনার মােহর এর আগে কোনদিন দেখে নি। সে ভাবল, এবার আমি আমীর আদমি বনে গিয়েছি। ব্যস, সবার আগে সুন্দর একটি মকান ভাড়া করে ফেলল সে। এক দুপুরের আগে শুয়ে ভাবছে, কি ধরনের ব্যবসা ফাঁদবে । কতরকম ব্যবসার কথাই না ভাবল। কিন্তু কোন ব্যবসাই মনে ধরছে না। এমন সময় দরজার কড়া নড়ে উঠল। দরজা খুলেই এক বুড়ির মুখােমুখি হ’ল। চেনা জানা তাে দূরের কথা এর আগে কোনদিন সে তাকে দেখেছে বলেও মনে হ’ল না।
বুড়িটি বলল-বাছা, আজ জুম্মাবার। দুপুরের নামাজের সময় হয়ে এসেছে। তােমার এখানে নামাজটি সেরে নিতে চাচ্ছি।”
অল-আসার বুড়িকে ভেতরে নিয়ে গেল।
বুড়ি নামাজ সারল। আমার ভাইয়া ধর্মপ্রাণা বুড়ির ধর্মের প্রতি প্রগাঢ় আসক্তি দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকে দুটো সােনার মােহর দিতে চাইল। বুড়ি আপত্তি জানাল। বলল-বাছা, মােহর দুটো যদি নিতান্তই দিতে চাও তবে যার কাছ থেকে নিয়েছিলে তাকেই না হয় ফেরৎ দিয়ে দাও। আমার এসবের দরকার নেই।' অল-আসার তাে বিস্ময়ে একেবারে হতবাক হয়ে যাওয়ার জোগাড়। ভাবল—সে কী! আমার কথা বুড়িটি জানল কি করে! ‘আচ্ছা বল তাে, সে কি তােমার পরিচিতা? তার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিতে পার? এ কাজটুকু করে দিলে বড়ই খুশী হতাম।
–‘সে-রূপসী তােমাকে সােনার মােহরগুলাে কেন দিয়েছিল, বলতে পার? তােমার উমর দেখে। তােমার যৌবনই তার কাছে একমাত্র কাম্য। আল্লার দোয়ায় ধন দৌলত সে প্রচুরই পেয়েছে। কিন্তু তার স্বামীটি একেবারেই অক্ষম। ধ্বজভঙ্গ। এমন এক ভরাযৌবন যার দেহে তার বরাতের কথা একবার ভেবে দেখ। কাম পিপাসা তাকে কুরেকুরে খাচ্ছে। কিন্তু স্বামী তার কামজ্বালা নিবৃত্ত করতে অক্ষম। আল্লাহর কী নির্মম পরিহাস। তার রূপ-যৌবন সবই ব্যর্থ। তার কাছে তােমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই আমি এসেছি। চল, চট করে বেরিয়ে পড় বাছা।
আমার ভাইয়ার কলিজাটি তিরতির করে নাচতে লেগে গেল। খুশীতে একেবারে ডগমগ হয়ে পড়ল। সেদিন এক পলকে তাকে চোখে দেখার পর থেকে বড়ই মর্মপীড়া বােধ করছিল। আল্লাহ-ই আজ সে সুযােগ করে দিয়েছেন। বুড়িটি তাকে নিয়ে তার খােয়াবের বিবি, তার মধুমিতার বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। সে হাঁটতে হাঁটতে বলল —“আমি বহুতদিন তার ওখানে নােকরি করছি। সে চায় কথা কম, কাজ চায় বেশী। তােমার যৌবনশক্তি যদি তাকে তৃপ্তি দিতে পারে জানবে তােমার নসীব ফিরে গেছে। রূপসীর যৌবনের জোয়ার লাগা শরীরটিই কেবল নয় অগাধ ঐশ্বর্যও তােমার হাতে চলে আসবে।
—অল-আসার-এর কলিজাটি চনমনিয়ে উঠল। সে আপন মনে বলে উঠল—হায় খােদা! আমার যৌবনের এত যে দাম আগে তাে কোনদিন জানতাম না। লেড়কিটিকে তৃপ্তি দিতে পারলে সারা জিন্দেগী পায়ের ওপর পা তুলে কাটানাে যাবে! রূপসীটিকে খুশী করার জন্য আমি কিছুমাত্র কসুর করব না। | বুড়ি একটি বিশালায়তন মকানের সামনে এসে দাঁড়াল। বিশেষ এক কায়দায় দরজার কড়া নাড়ল। সঙ্কেত ধ্বনিও বলা যেতে পারে। এক গ্রীক নােকরানী দরজা খুলে তাদের ভেতরে নিয়ে গেল। ঘরের আসবাবপত্র থেকে শুরু করে দরজার পর্দাটি পর্যন্ত সব কিছুতে ঐশ্বর্যের সুস্পষ্ট চিহ্ন। মখমলের পর্দা ঠেলে এক অষ্টাদশী ঘরে ঢুকল। তার রূপের আভায় পুরাে ঘরটি যেন হঠাৎ ঝলমলিয়ে উঠল। তার রূপের যথাযথ বর্ণনা দেওয়ার মত ভাষা আমার নেই জাঁহাপনা। তার সেই চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ এঁকে চেয়ে রইল। চোখের পাতা পর্যন্ত পড়ছে না।
বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না জাঁহাপনা, লেড়কিটি একেবারেই বে-শরম। লজ্জা শরম কাকে বলে জানা নেই। ঘরে ঢুকেই আমার ভাইয়া অল-আসারকে চোখের বাণ মেরে বসল। নিজে হাতে দরজাটি বন্ধ করে তার পাশে, একেবারে গা-ঘেঁষে বসে পড়ল। জানা নেই চেনা নেই এমন এক পরপুরুষের সঙ্গে এমন আচরণ কেউ করতে পারে, ভাবতেও উৎসাহ পাওয়া যায় না। তার পাশে বসেই রূপসীটি তার গলাটি জড়িয়ে ধরল। নিজের মুখটি তার মুখের কাছে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে আলতাে করে চুম্বন করল। একবার নয়। পরপর তিন বার। আমার ভাইয়া অল-আসার দেহে এক অবর্ণনীয় শিহরণ অনুভব করল। রােমাঞ্চে ভরে উঠল তার প্রাণ-মন। শিরা-উপশিরায় শুরু হ’ল রক্তের মাতন।
রূপসী-যুবতীর চোখে কামতৃষ্ণার সুস্পষ্ট ছাপ ফুটে উঠল। তার সর্বাঙ্গ যেন অবশ হয়ে আসতে লাগল। কোনরকমে মখমলের চাদর বিছানাে পালঙ্কে গিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। তার দেহের যৌবন চিহ্নগুলাে যেন অল-আসারকে ঝাপিয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিতে লাগল। তার পক্ষে আর দূরে থাকা সম্ভব হ’ল না। হিংস্র নেকড়ের মত তার যৌবনভরা দেহটির ওপর অতর্কিতে ঝাপিয়ে পড়ল। তারপরই শুরু হয়ে গেল ধস্তাধস্তি। যুবতীটি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এক সক্ষম নওজোয়ানের কাছে নিজের রূপ-যৌবনকে সঁপে দিতে পেরে কী যে এক অনাস্বাদিত আনন্দের জোয়ারে ভেসে চলল তা মুখের ভাষায় প্রকাশ করা সাধ্যাতীত। ঘণ্টাখানেক ধরে তারা পারস্পরিক চাওয়া-পাওয়া, দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে চরমতম শান্তি-সুখপরিতৃপ্তি লাভ করল। তারপর অল-আসারকে বসিয়ে রেখে যুবতীটি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যাবার আগে বিশেষ করে বলে গেল ‘আবার কোথাও চলে যেয়াে না। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এখানেই থেকো।
রূপসী যুবতীটি ঘর ছেড়ে যেতেই অন্য এক দরওয়াজা দিয়ে ইয়া তাগড়া এক নিগ্রো বীরদর্পে সে-ঘরে ঢুকল। তার একহাতে চাবুক আর অন্য হাতে সুমসৃণ এক ছােরা। কথা নেই বার্তা নেই ঘরে ঢুকেই সে অল-আসারকে অশ্লীল-অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি দিয়ে সপাং সপাং করে চাবুক মারতে লাগল। নিরবচ্ছিন্ন চাবুকের ঘা সে বেশীক্ষণ সহ্য করতে পারল না। সংজ্ঞা হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
নচ্ছার নিগ্রোটি ভাবল, অল-আসার-এর জান খতম হয়ে গেছে। তার মােহরের থলিটি নিয়ে গুটি গুটি কেটে পড়ল।
নিগ্রোটি ঘর ছেড়ে গেলে এক ধুমসাে নিগ্রো যুবতী একটি পাত্র হাতে ঘরে ঢুকল। পাত্রটি লবণ পূর্ণ। চাবুকের আঘাতে অল-আসারএর গায়ের ছড়ে যাওয়া ক্ষতগুলিতে সে লবণ ছিটিয়ে দিতে লাগল।
এমন সময় সে বুড়িটি ছুটে এসে মায়া কান্না জুড়ে দিল। কপাল চাপড়ে আমার ভাইয়ার দুরবস্থার জন্য কেঁদে আকুল হ’ল।
এবার মায়াবিনী বুড়িটি আমার ভাইয়ার নিঃসাড় দেহটিকে টেনে হিচড়ে নিয়ে গিয়ে উঠোনের এক ধারের একটি ছােট্ট কুঠরির মধ্যে রেখে এল। এবাড়িতে রােজ যারা ঢােকে তারা আর জান নিয়ে ফিরে যেতে পারে না। শয়তান নিগ্রোটি চাবুক মেরে কাহিল করার পর বাকি কাজটুকু ছােরাটি দিয়ে মেরে দুনিয়া থেকে তাকে চালান দিয়ে দেয়, তখন বুড়িটি নিয়ে যায় কুঠরিটিতে। নুন ছিটিয়ে দেওয়া হয় বলে সহজে পচে না। দুর্গন্ধও বেরােয় না।
অল-আসার দু' দিন সংজ্ঞাহীন অবস্থায় কুঠরিটির ভেতরে পড়ে থাকার পর সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে চোখ মেলে তাকাল। উঠে বসল। আমার ভাইয়া জানে বেঁচে গেল। | তখন মাঝ-রাত্রি। জ্যোৎস্নার আলাে জানালা দিয়ে খুপরির ভেতর দিয়ে উকি দিচ্ছে। বার কয়েক লাফালাফি করে সে জানালাটি ধরতে পারল। এবার জানালা-পথে বাইরে বেরিয়ে এল।
ব্যস, এবার সােজা বাড়ি ফিরে এল।।
আমি হেকিম ডেকে আনলাম। তিনি রােগীকে দেখে মােক্ষম দাওয়াই দিলেন। তার গায়ের কাটা-ছেড়া ঘা শুকিয়ে গেল।
রােগ নিরাময়ের পর আমার ভাইয়া প্রতিশােধ নেয়ার জন্য প্রতিজ্ঞা করে বসল। কঠিন প্রতিজ্ঞা। বদলা সে নেবেই নেবে। সে নােংরা রূপসী-যুবতী, নচ্ছার বুড়ি, শয়তান নিগ্রো আর তার ধুমসাে স্ত্রী কাউকেই সে রেহাই দেবে না। আমার ভাই অল-আসার এক চমৎকার ফন্দি বের করল মাথা খাটিয়ে দাড়ি-গোঁফ পারসীদের কায়দায় ছাঁটল। গায়ে চাপাল প্রায় পায়ের পাতা পর্যন্ত নেমে আসা কোর্তা। বিশেষ কায়দায় তৈরি পাতলুন, পরল। গালের কাছে জুলফি লাগাল। তার মাথায় চাপাল পারসী-টুপী। কোর্তার পকেটে জল আধ-ফোঁটা গােলাপ, পারসী আতর ছিটিয়ে দিল কোর্তা, পাতলুন ও টুপী—সবকিছুতে। ব্যস, একেবারে কেতাদুরস্ত পারসী সাহেব বনে গেল।
এবার অল-আসার হাজির হ’ল সে-বাড়িটির দরজায়। নচ্ছার বুড়িটিকে দরজায়ই পেয়ে গেল। পারসী কায়দায় সেলাম জানিয়ে বুড়িকে পারসী ভাষায় জিজ্ঞেস করল—‘ধারে কাছে কোন মণিকারের দোকান আছে কি?
বুড়ি ধরেই নিল আগন্তুক যুবক পরদেশী। পারসী। পারসীরা মােটা ধন-দৌলত নিয়ে ভিনদেশে আসে। অতএব এ-ও নির্ঘাৎ ধনকুবের। বুড়ির চোখ দুটো হঠাৎ জ্বল জ্বল করতে থাকে। বলে–বাছা, মণিকারের দোকান খোঁজ করছ কেন?
‘আমি অতি সম্প্রতি একটি দ্রব্য বিক্রি করে নগদ ন’ শ’ সােনার দিনার পেয়েছি। সুযােগ পেলে যাচাই করে দেখতাম দিনারগুলাে কি আসল, নাকি—আর আমাদের পারসী মুদ্রায় এর মূল্য কত তা-ও জানার ইচ্ছা। বুড়ি সােল্লাসে তাকে নিয়ে মণিকারের দোকানের উদ্দেশে পা বাড়াল। অল-আসার পথ চলতে চলতে কোর্তার ওপর থেকেই হাত বুলিয়ে ছােরাটির অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হয়ে নিল। বুড়ি একটি বড়সড় মণিকারের দোকানের সামনে অল আসারকে ছেড়ে দিয়ে নিজে পথের ধারে দাঁড়িয়ে রইল। এতে বরং তার সুবিধেই হ’ল। দোকানির সঙ্গে দু-চারটে অপ্রয়ােজনীয় কথা বলেই বেরিয়ে এল।
বুড়ি এবার তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে এল সেই-যুবতীটির বাড়ি। অল-আসার-এর অবশ্য এরকমই ইচ্ছে।
বুড়ি তাকে নিয়ে আগেকার সেই ঘরটিতে যায়। একটু বাদে রূপসী-যুবতীটি আসে। পূর্বের সেই ভঙ্গিতে তিন-চার বার চুম্বন করে। খাটের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। তারপর এক এক করে পূর্ব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। প্রায় এক ঘণ্টা পরে যুবতীটি দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। যাবার আগে বলে যায় আবার যেন কোথাও চলে যেয়াে না। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এখানেই থেকো।
অল-আসার কোর্তার ওপরে হাত বুলিয়ে দেখে নিল, ছুরিটি জায়গামতই আছে বটে। যুবতীটি বেরিয়ে যেতেই ছুরি ও চাবুক হাতে সে গাট্টাগােট্টা নিগ্রোটি তেমনি হুঙ্কার দিয়ে বীরদর্পে ঘরে ঢুকল। বাজখাই গলায় গর্জে ওঠে—“হারামজাদা, এখানে কেন এসেছিস। কার হুকুমে অন্দর মহলে'
নিগ্রোটির কথা শেষ হবার আগেই অল-আসার বলল-“কেন মিছে তড়পাচ্ছ? কেন এসেছি, ওই সুন্দরীকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবে। এই তাে তােমার পিছনে দাঁড়িয়ে, জিজ্ঞেস কর।” নিগ্রোটি পিছন দিকে ঘাড় ঘােরানাের সঙ্গে সঙ্গে অল-আসার কোর্তার তলা থেকে যন্ত্রচালিতের মত ছােরাটি বের করে তার পিঠে আমূল গেঁথে দিল। পরমুহূর্তে নুনের পাত্র হাতে ধুমসী নিগ্রো মেয়েটি ঘরে ঢুকল। অল-আসার এক কোপে তার ধড় থেকে গলাটা নামিয়ে দিল। এবার বুড়িটি এল আগের মতই নাচতে নাচতে। দরজার আড়াল থেকে এক লাফে বেরিয়ে এসে অল-আসার তার বুকে ছােরাটি গেঁথে দিয়ে বলল—“যেয়ে খদ্দের ধরে নিয়ে আসার শখ তাের চিরদিনের মত মিটিয়ে দিলাম হতচ্ছাড়ি!
অল-আসার এবার এক লাফে ঘর থেকে বেরিয়ে সেরূপসী যুবতীটিকে খুঁজতে লাগল। এমন সময় পাশের ঘরের চৌকির তলায় কিসের যেন খট করে শব্দ হ’ল। দরজায় দাঁড়িয়েই উপুড় হয়ে উঁকি দিল। দেখল, তার বাঞ্ছিতা সে-যুবতীটি হামাগুড়ি দিয়ে থরথরিয়ে কাঁপছে। তাকে দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে বেরিয়ে এল। তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলল—“আমার কোন কসুর নেই।' আমাকে এখানে শয়তানগুলাে জোর করে আটকে রেখে ব্যবসা ফেঁদেছে। আমার রূপ-যৌবনকে কাজে লাগিয়ে লাখ লাখ দীনার কামাচ্ছে। কড়া পাহারা। বেরিয়ে যে চলে যাবাে তার উপায় নেই।
অল-আসার সঙ্গে সঙ্গে হাতের ছােরাটিকে আর ব্যবহার করতে পারল না। কলিজাটির মধ্যে হঠাৎ কেমন মােচড় মেরে উঠল। আর কিছু না হােক, দু-দুটো দিন তার রূপ-যৌবনকে ভােগ করেছে। নিবৃত্ত করেছে কাম-পিপাসা।
আমার ভাইয়া অল-আসার-এর দিল এবার কেমন দুর্বল হয়ে যায়। যুবতীটিকে বলল—“তুমি এখানে এলে কি করে?
—“আমার নসীবের কথা আর বােলাে না। ওই নচ্ছার বুড়িটিই যত নষ্টের মূল। আমার জীবন একেবারে বরবাদ করে দিল। সে তােমাকে যেমন ভুলিয়ে ভালিয়ে এনেছিল ঠিক তেমনি রােজ একজন করে মরদ ধরে নিয়ে আসে নানা কৌশলে। তার সবকিছু কেড়ে নিয়ে জানে মেরে দেয়। আমাদের ঘরে এক সময় নােকরি করত বুড়িটি। এক শাদীর নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে একদিন তার সঙ্গে যাচ্ছিলাম। আমার আব্বা আর আম্মা তাকে খুবই বিশ্বাস করতেন। তাই নির্দ্বিধায় তাঁরা আমাকে তার সঙ্গে ছেড়েছিলেন। বুড়ি আমাকে নিমন্ত্রণ-বাড়িতে না নিয়ে কৌশলে এখানে নিয়ে এল। ব্যস, বন্দী হয়ে গেলাম। নিগ্রো দস্যুটি আমাকে ধর্ষণ করে। হরণ করে আমার সতীত্ব। তারপর ছােরা তুলে ভয় দেখায় আমি তাদের পছন্দ মত লােককে দেহদান না করলে ধড় থেকে গর্দান নামিয়ে দেবে।'
আমার ভাইয়া অল-আসার এবার মুখ খুলল—‘দেহ বিক্রি করে এতদিনে তাে দিনারের পাহাড় বানিয়ে ফেলেছ। সেগুলাে এখন কোথায় বল তাে?'
–‘আছে। সবই মজুত আছে। ওই যে সিন্দুকটি দেখতে পাচ্ছ, সবই ওটার মধ্যে জমিয়ে রাখা হয়েছে।
আমি তাকে নিয়ে সিন্দুকটির কাছে গেলাম। আমি কিছু বলার আগেই সে ব্যস্ত-হাতে সিন্দুকটির ডালা খুলে ফেলল। ভেতরে উঁকি দিতেই আমার চোখ ঝলসে গেল। মূচ্ছা যাওয়ার উপক্রম হল। | যুবতীটি বল্ল-‘মেহবুব, সােনার মােহর আর দিনারগুলাে নিয়ে চল, আমরা এখান থেকে চম্পট দেই। কথা বলতে বলতে সে এক দৌড়ে কয়েকটি বস্তা নিয়ে এল। সােনার মােহর ও দিনারগুলাে বস্তায় বােঝাই করল।
পেল্লাই ভারি হয়ে গেল বস্তাগুলি। আমার ভাইয়া অল-আসার কুলি নিয়ে এল।
কুলি জোগাড় করতে যে সময়টুকু দেরী হয়েছে এরই মধ্যে যুবতীটি সােনার মােহরের বস্তাটি নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে চম্পট দিয়েছে। খাঁচা ভেঙে পাখি পালিয়েছে। | ব্যাপার দেখে অল-আসার আশাহত হ’ল বটে। কিন্তু হাল ছাড়ল না। ঘরের দামী জিনিসপত্র যা কিছু ছিল সব চট করে একটি বস্তায় বােঝাই করে ফেলল । এবার দিনারের বস্তা ও জিনিস বােঝাই বস্তা দুটো ঘরে রেখে সদর দরজায় তালা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ল। ভাবল, পরদিন দুটো খচ্চর এনে এসে বস্তা দুটো বাড়ি নিয়ে যাবে। পরদিন খুব ভােরে দুটো তাগড়াই খচ্চর নিয়ে ফিরে এল। খচ্চর দুটোকে সদর-দরজায় বেঁধে সে বাড়ির ভেতরে ঢুকলাে। বস্তা দুটো টানা হেঁচড়া করে দরজায় আনতেই তার চক্ষুস্থির হয়ে গেল। কলিজাটি মােচড় দিয়ে উঠল। দেখল, সিপাহীরা সারা বাড়িটি ঘিরে ফেলেছে। তারা তাকে হাতকড়া পরিয়ে কোতােয়ালের কাছে নিয়ে গেল।।
কোতােয়ালের কাছে ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা দিল। তারপর দিনার আর মূল্যবান মালপত্রের বস্তা দুটো এবং বাড়িটিতে কিছু মূল্যবান জিনিস ছিল সব সে এবং কোতােয়াল ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়। কোতােয়াল তাতে রাজি তাে হলই না উপরন্তু সিপাহী দিয়ে তাকে রাজ্যের বাইরে বের করে দেয়। জিনিসপত্র আর মােহর বােঝাই বস্তা দুটো কোতােয়াল একাই ভােগ করবে। কাউকে ভাগ দিতে সে মােটেই উৎসাহী নয়। তাই অল আসারকে ভিন দেশে চালান দিয়ে নিশ্চিন্ত হ’ল। আমি লােক মারফৎ খবর পেয়ে গােপনে তাকে আমার কাছে নিয়ে আসি। পাছে কেউ টের পায় এ-আশঙ্কায় ঘর থেকে মােটেই বেরােতে দেই না।।
শাক্কাশিকের কিসসা
নাপিত তার পঞ্চম ভাইয়া অল-আসার-এর কিস্সা শেষ করে এবার বল্ল-জাহাপনা, আমার পাঁচ ভাইয়ার কিসসা তাে শুনলেন। এবার আমার ষষ্ঠ ভাইয়া শাক্কাশিক-এর কিসসা আপনার দরবারে সংক্ষেপে পেশ করছি—আমার ষষ্ঠ ভাইয়া সবার কাছে শাক্কাশিক বলে পরিচিত ছিল। সে কথা বলার সময় মনে হত বুঝি কোন ভাঙা কাসর বাজছে। সে ছিল খুবই গরীব। অন্যের কাছে হাত পেতে সে দিন গুজরান করত। আমাদের আব্বাজী বেহেস্তে যাওয়ার সময় যে অর্থকড়ি রেখে গিয়েছিলেন, তা ভাগ বাটোরা করে আমরা প্রত্যেক ভাইয়া মাথাপিছু একশ' দিরহাম করে লাভ করি। তা-ও তার নসীবে টিকল না। একদল দুবৃত্ত তা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। সত্যি কথা বলতে কি আমার এ-ভাইয়াটি ছিল একেবারেই ন্যালাক্ষ্যাপা। তাই সবাই তাকে নিয়ে রঙ্গ-তামাশা করে মজা লুঠত, তাই অনেক আমীর-ওমরাহরা ডেকে নিয়ে তার তামাশা দেখত, বিনিময়ে তাকে খানাপিনা করাত।
এক দুপুরের দিকে শাক্কাশিক এক আমীরের বাড়ির দরজায় হাজির হ’ল। উদ্দেশ্য একটু-আধটু রঙ্গ-তামাশা দেখিয়ে পেটপুরে খানাপিনার ব্যবস্থা করে নেয়া। সে প্রহরীকে সন্তুষ্ট করে গুটিগুটি বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়। বাড়ির মালিক বারমাকী সাহেব। এক সময় খলিফার বংশানুক্রমে উজিরের চাকুরি করত। সদর-দরজা পেরিয়েই সামনে শ্বেত পাথরের সিঁড়ি দেখতে পেল। নসীব ঠুকে সিড়িবেয়ে ওপরে উঠে গেল। সামনেই বিরাট একটি ঘর পেয়ে সােজা ভেতরে ঢুকে গেল। ঘরের কেন্দ্রস্থলে আরাম কেদারায় শরীর এলিয়ে দিয়ে এক অতি বৃদ্ধ তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় বসে। তার পায়ের শব্দে বৃদ্ধের তন্দ্রা টুটে গেল। জিজ্ঞেস করলেন-কে তুমি বাছা ? কি চাও?
‘সারাদিন পেটে দানাপানি পড়ে নি।
—এ কী কথা শােনালে বাছা! আমি তাে জানতাম, বাগদাদ নগরীতে কেউ-ই ভুখা থাকে না। তােমার কথায় আজ আমার ধারণা পাল্টে গেল। তুমি ক্ষুধার যন্ত্রণা ভােগ করছ আর আমি কিনা সাত ব্যঞ্জন দিয়ে খানাপিনা সেরে আরামে দিন গুজরান করছি! কী অন্যায় কথা বল দেখি!
বৃদ্ধ এবার বলেন—বাছা, হাত-মুখ ধুয়ে নাও। আজ আমরা একসঙ্গে খানাপিনা সারব।' এবার নফরকে ডেকে বললেন ‘টেবিলে দু'জনের খানা সাজিয়ে দাও।
আমার ভাইয়া শাক্কাশিক বৃদ্ধের পাশাপাশি বসে বাদশাহী খানা দিয়ে ভােজ সারল। কিন্তু বৃদ্ধ কিছুই মুখে দিলেন না। থালা-বাটি হাত দিয়ে স্পর্শ করে হাতটি মুখের কাছে নিলেন। অভিনয় করার ভঙ্গিতে শুধু মুখ চিবােতে লাগলেন। আর থেকে থেকে বলেন—বহুৎ আচ্ছা খানা! বহুৎ আচ্ছা!
শাক্কাশিক বৃদ্ধের ব্যাপার স্যাপার কিছুই ঠাহর করতে পারল না। আড়চোখে বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল। সে কিন্তু থালা চেটেপুটে খেল। বৃদ্ধ বাস্তবিকই দিলদরিয়া। শাক্কাশিককে নিজের কাছে রেখে দিলেন। তার ওখানেই থাকা-খাওয়া উভয় ব্যবস্থাই হয়ে গেল। তারপর আরও বিশ সাল বৃদ্ধ জিন্দা ছিলেন। পুরাে বিশটি সাল সে নিশ্চিন্তে বৃদ্ধের ঘাড়ে বসে হাত-পা গুটিয়ে জীবন ধারণ করল।
বৃদ্ধটি কবরে গেলে তার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কোতােয়াল গ্রাস করল। ব্যস, আমার ভাইয়া শাক্কাশিক-এর নসীব পুড়ল। কোতয়াল তাকে অর্ধচন্দ্র দিয়ে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিল। উপায়ান্তর না দেখে সে মক্কার পথে পা বাড়াল। পথে মরু-ডাকাতরা তার সব কিছু ছিনতাই করে নিল। সে এক বস্ত্র সম্বল হয়ে পড়ল। উপরন্তু তাকে ক্রীতদাস করে তারা নিয়ে গেল। ডাকাত-সর্দারের বাড়ি ক্রীতদাস রূপে তার দিন কাটতে লাগল। সেখানে অমানুষিক অত্যাচার সইতে হয়।
ডাকাত সর্দারের বিবি ছিল খুবসুরৎ। বয়সও খুবই কম। দেহে তার উত্তাল-উদ্দাম রূপের জোয়ার। বেহেস্তের হুরীর মত দেখতে। দেহের যৌবনচিহ্নগুলাে যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়।
সর্দার ডাকাতি করতে বেরােলেই তার কচি কাচা বিবিটি আমার ভাইয়ার কাছে চলে আসত। নানা ছলাকলার মাধ্যমে তার যৌবনজ্বালার কথা বুঝাতে চেষ্টা করত। আচমকা গা থেকে কামিজটি খুলে ফেলে বলত—“আরে, আমার দিকে একবারটি চোখ তুলে তাকিয়ে দেখই না গাে ভাল মানুষের পাে। আমার এ-রূপ, দেহের যৌবনের জোয়ারের কদর বুড়া সর্দারের কি আর বুঝার ক্ষমতা আছে নাকি। একা একা যৌবন-জ্বালায় দগ্ধে মরি। তুমি কি আদমি, নাকি পাথরে তৈরি। শরম কিসের? এসাে, আমার বুকে এসাে, আমাকে দলাই মলাই করে একেবারে শেষ করে ফেল। আমি আর জ্বালা সইতে পারছি না! তুমি আমার যা কিছু আছে ভােগ করে আমার জ্বালা নেভাও মেহবুব। কথা বলতে বলতে সে শাক্কাশিকএর হাত দুটোকে নিজের তুলতুলে বুকের ওপর রেখে আচমকা চোখের বাণ মারে।
শাক্কাশিক আচমকা তার হাতটি টেনে নেয়। মুখ বিকৃত করে। বলে—এ আবার কি ! এসব আমি পছন্দ করি না।
—সে কী হে! এমন জোয়ান মরদ, পছন্দ করনা! তুমি কি ইয়ে, মানে খােজা নাকি? তােমার কি ইয়ে টিয়ে নেই ? রােজই এভাবে চলতে থাকে। ডাকাত-সর্দার বেরিয়ে যাওয়া মাত্র তার খুবসুরৎ জোয়ান বিবি শাক্কাশিক-এর কাছে আসে। পােশাক খুলে উলঙ্গ হয়। গা-ঘেঁষে বসে। তার মধ্যে কামতৃষ্ণা জাগিয়ে তােলার জন্য বহুভাবে চেষ্টা করে। কিন্তু আমার ভাইয়া যে অন্য জগতের মানুষ। কিছুতেই তার মধ্যে কামপ্রবৃত্তি ও উত্তেজনা জাগিয়ে তুলতে পারেনি ডাকাতের সে-যুবতী বিবি। যখন কিছুতেই কিছু হয় না তখন প্রলােভন দেখায়—শােন, আমার কথা রাখলে, আমার কামতৃষ্ণা নিবৃত্ত করলে আমি তােমাকে এখান থেকে পালাবার ফন্দি ফিকির করে দেব। এবার বুঝে দেখ, কি করবে। ডাকাত-সর্দারের বিবির কথায় তার মনে আশার সঞ্চার হয়, ভাবে, আমি আমার যৌবনশক্তি দিয়ে তার দেহ-মনকে সুখ দিতে পারলে ভয়ঙ্কর এ-দস্যুর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে যাব, কম কথা! মুক্তির আনন্দ তাকে পেয়ে বসল। সে মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে ডাকাতের অষ্টাদশী বিবির নগ্ন দেহটিকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল। বুকের মধ্যে লেপ্টে নিল। তার মখের কাছে নিজের মুখটিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। চুম্বন করল। চুম্বনে চুম্বনে তাকে উতলা করে তুলল । যুবতীটির নগ্ন দেহটি বিছানার ওপর এলিয়ে পড়ে
( চলবে)

0 Comments