গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
তাদের একজন তাকে সঙ্গে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসতে রাজি হল । তারা যখন এরকম পরিকল্পনা করছে ঠিক তখনই এক চোর সেখানে হাজির হ’ল। সে অন্ধদের পিছু নিল।
অন্ধ বন্ধুটি বাকবককে তার বাড়িতে পৌছে দেবার জন্য ঘরে ঢুকলে চোরটিও বিড়ালের মত পা টিপে টিপে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে গেল। ঘরের পাটাতন থেকে একটি শিকে ঝুলছে দেখে চোরটি সেটি ধরে পাটাতনের ওপরে উঠে গেল। বাকবক ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রাখা টাকার থলি বের করে তা থেকে এক দিরহাম অন্ধ বন্ধুটিকে দিল রুটি-তরকা কিনে আনার জন্য। বাকি দিরহাম গুণে দেখল থলিতে দশ হাজার দিরহাম রয়েছে। এগুলাে তার সারাজীবনে ভিক্ষা করে সঞ্চিত অর্থ।
বাকবক-এর অন্ধ বন্ধুটি রুটি-তরকা নিয়ে এলে ভাগ করে খেতে লাগল। এমন সময় চোরটি পাটাতনের ওপর থেকে সন্তর্পণে নেমে এল। তাদের পাশে বসে রুটিতে ভাগ বসাল। অন্ধ দু’জন তার কারসাজির কথা জানতেও পারল না।
আমার ভাইয়া বাকবক-এর কান খুবই পরিষ্কার। সে চোয়াল নাড়ার শব্দ শুনে বুঝতে পারল তৃতীয় আদমি সংগােপনে রুটিতরকা খেয়ে চলেছে। সে আচমকা চিৎকার করে উঠল—‘চোর —চোর—চোর!'তার সঙ্গে তার অন্ধ-বন্ধুটি গলা মিলিয়ে চিৎকার জুড়ে দিল। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে প্রতিবেশীরা লাঠিসােটা নিয়ে ছুটে এল। বাকবক চিৎকার করতে করতে তার হাত দুটোকে এদিক-ওদিক চালাতে লাগল। চোরের হাতের সঙ্গে তার হাতটি ঠেকে যাওয়া মাত্র সে খপ করে ধরে ফেলল। এবার নিজের পথচলার লাঠি দিয়ে তাকে দমাদম পিটতে লাগল।
চিৎকার চেঁচামেচি শুনে প্রতিবেশীদের আসতে দেখে চোরটি চোখ বন্ধ করে বসে পড়ল। তাদের বলল, আমরা সবাই অন্ধ। এক সঙ্গে ভিক্ষা করি। এতদিন ভিক্ষা করে আমার ভাগের দশ হাজার দিরহাম জমেছে। আমার প্রাপ্য আজ বুঝে নিতে এসেছি। এরা আমাকে দিরহামগুলি তাে দিচ্ছেই না, উপরন্তু চোর চোর বলে চেঁচিয়ে পাড়ার লােক জমা করছে। দোস্ত, তােমরা যখন চলেই এসেছ তখন আমাকে কোতােয়ালের কাছে নিয়ে চল। সেখানেই আমাদের বিচার হবে। চোরের কথা শুনে আমার ভাইয়া বাকবক এর তাে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার উপক্রম।
তারা সবাই কোতােয়ালের শরণাপন্ন হ’ল। দিরহাম-এর থলিটি তার হাতে তুলে দিয়ে ন্যায্য বিচার প্রার্থনা করল।
চোর কোতােয়ালের সামনে নিজের বক্তব্য পেশ করল। সে সঙ্গে দাবী করল তার প্রাপ্য দশ হাজার দিরহাম।
বাকবক প্রতিবাদ করল। সে বল-হুজুর। লােকটি চোর। আমাদের সঙ্গে তার কোনদিন সম্পর্ক ছিল না, আজও নেই। দিরহাম-এর ভাগ সে কি করে প্রত্যাশা করে? কোতােয়াল পড়লেন মহাসমস্যায়। কি ভাবে ঘটনাটির নিষ্পত্তি করবেন পথ খুঁজে পাচ্ছেন না ।
কোতােয়ালের সমস্যার সমাধান করে দিতে গিয়ে চোরটি বলল -হুজুর, আচ্ছা করে ঘা কতক দিন তবেই দেখবেন বাছাধনরা সত্যি কথা বলতে পথ পাবে না।'
পরামর্শটি কোতােয়ালের খুবই মনে ধরল।
কোতােয়ালের নির্দেশে এক সিপাহী চাবুক হাতে পিটুনি শুরু করার জন্য তৈরি হয়ে দাঁড়াল।
চোরটি বলল-“হুজুর, আমাকে দিয়েই চাবুকের ব্যবহার শুরু করুন।'বার কয়েক চাবুকের ঘা-খেয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে হঠাৎ চোখ মেলে তাকিয়ে ফেলল। আসলে সে ভুলেই গিয়েছিল যে, সে অন্ধের অভিনয় করছে।
ব্যাপার দেখে কোতােয়াল তাে বিস্ময়ে হতবাক। চোরটি এবার বলল-“হুজুর, আমারা কেউ অন্ধ নই। ভিক্ষে করার জন্য আমরা এটিকে মূলধন হিসেবে ব্যবহার করি। বাকী তিনজনও আমারই মত। আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই। চাবুক চালালেই সব কিছু ফয়সালা হয়ে যাবে। খালি পয়সা রােজগারই নয় ফাউ হিসেবেও এতে কিছু পাওয়া যায়।
–ফাউ ? সে কী হে, এতে আবার ফাউয়ের ব্যাপার কি থাকতে পারে, বুঝিয়ে বল তাে?
—‘অন্ধরা বাড়ির ভেতরে চলে গেলেও কেউ কিছু মনে করে না । এদের দ্বারা বাড়ির জনানাদের আব্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। অন্দরমহলে ঢুকে আমরা চোখ খুলে দিলে মেয়েরা খুবই অবাক হয়। সারা জীবন যারা পর পুরুষের মুখ দেখতে পায় নি তার সঙ্গলাভে খুশী হয়। আর সুখ ছাড়া ভিক্ষার মাত্রাও যায় বেড়ে।
এবার কোতােয়ালের হুকুমে বাকবক আর তার সঙ্গীর পিঠে সপাং সপাং করে চাবুক পড়তে লাগল। কিন্তু কিছুতেই চোখ মেলে না তারা। কোতােয়াল ভাবলেন—হারামজাদারা বাস্তু ঘুঘু, পয়লা নম্বরের শয়তান। বললেন—‘জোরসে চাবুক চালাও। এবার তারা সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তবু চাবুক চালানাে অব্যাহত রইল। এবার সিপাহীরা তাদের চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে শহরের বাইরে ফেলে দিয়ে এল।
কোতােয়াল এবার থলে থেকে তিন হাজার দিরহাম দিয়ে বললেন—পালাও এখান থেকে। বাকি দিরহাম তাদের দু'জনের জন্য রইল। চোর হাতে স্বর্গ পেল। খুশি হয়ে নাচতে নাচতে বিদায় নিল। কোতােয়াল বাকি দিরহাম নিজের জেবে পুরলেন।
আমি ভাইয়া বাকবক-এর দুরবস্থার কথা জানতে পেরে তাকে খুঁজে বের করি। নিজের কাছে নিয়ে আসি। সেবাযত্নের মধ্য দিয়ে তাকে সুস্থ করে তুলি। এখন আমিই তার খানা-কাপড় দেই। ভিক্ষে করতে দিই না। জাঁহাপনা, আপনি হয়ত এবার আমার মহত্বের কথা আর অস্বীকার করতে পারবেন না।
খলিফা খুশী হয়ে এক শ’ দিনার পুরস্কার দিয়ে আমাকে বিদায় দিতে চাইলেন। আমি সবিনয় নিবেদন রাখলাম—“জাঁহাপনা, এখনও তাে আমার তিন ভাইয়ার জীবনকাহিনী শােনার বাকি আছে। শুনবেন ?
খলিফা অল-মুসতানসির মুচকি হেসে বললেন-“বল। তােমার বাকি ভাইয়াদের কিসসা, আমি শুনব।'
অলকুজের কিস্সা।
খলিফা অল-মুসতানসিরের সম্মতি পেয়ে আমি আমার চতুর্থ ভাইয়া অলকুজ-এর কিসসা শুরু করতে গিয়ে বল্লাম‘জাঁহাপনা, আমার এ-ভাইয়ার পুরাে নাম খুশবান অল-কুজ। তার নামের অর্থ হ’ল কোন কিছু দিয়ে কাঁসার কুঁজো ঠুকলে যে আওয়াজ উত্থিত হয়, ঠিক । সে ছিল এক কষাই। বাগদাদে ছিল তার বেশ বড়সড় কারবার। তার দোকানের মত ভাল গােস্ত তামাম বাগদাদ নগর ছুঁড়ে এলেও কোথাও মিলত না। তাই সহজেই সে দিনারের পাহাড় বানিয়ে ফেলল। কিন্তু জাঁহাপনা, বিত্ত-সম্পদ তাে সবার নসীবে চিরদিন টেকে না।এক সকালে পাকা দাড়ি গোফওয়ালা এক বুড়ো দোকান থেকে কিছু গােস্ত খরিদ করল। ঝকঝকে চকচকে রুপোর দিনারে দাম মিটিয়ে বিদায় নিল। তার সে দিনার গুলোকে সে অন্য একটি থলির মধ্যে আলাদা করে রেখে দিল।
এবার থেকে বুড়ােটি রােজই কিছু করে গোস্ত কিনে আর চকচকে রুপাের দিনারে দাম মিটায়। অল কুজ সেগুলােকে আলাদা থলেটিতে জমা করতে থাকে। ভাবল, আরও কিছু দিনার জমাতে পারলে এক জোড়া লড়াকু ভেড়া খরিদ করবে। ভেড়ার লড়াই দেখিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে।।
এক সকালে দোকানে খােদ্দেরের চাপ একটু সামলে সে বুড়োর দেওয়া দিনারের থলেটা খুলল। ভাবল, গুণে দেখবে, কত জল । থলে হাতে নিতেই তার চক্ষু চড়কগাছ। গলে ফাকা। দিনারের নামগন্ধও নেই। সে আপন মনে বলে উঠল-“হায় আল্লাহ! এ কী ভুতুড়ে কাণ্ড! অন্য কারবারীদের কাছে কপাল চাপড়ে তাজ্জব কাণ্ডটির কথা বলল। কেউ-ই তার কথা বিশ্বাস করল না। আষাঢ়ে গল্প বলে হেসে উড়িয়ে দিল। তারপর দিন বুড়াে যথারীতি গােস্ত খরিদ করতে এল। ব্যস, আর যাবে কোথায় । অলকুজ এক লাফে গদি থেকে নেমে বুড়োকে পিঠ মােড়া করে বেঁধে ফেলল। এবার তার দাড়ি-গোফ কামাতে লেগে গেল। সে সঙ্গে লাথি-কিল-চড় তাে ফাউ। বুড়ো গরুচোরের মত মুখবুজে সব সহ্য করল।
বুড়াে কোনরকম চিৎকার চেঁচামেচি না করে কেবল অনুচ্চকণ্ঠে বলতে লাগল—“আরে করছ কি! আমাকে ছেড়ে দাও।' অলকুজ তাকে উত্তম মধ্যম দেয় আর বলে--এখনই হয়েছে কি, মেরে তােমার মেরুদণ্ড গুঁড়াে করে ছাড়ৰ যাদুকর।'
বুড়াে বলে—কী সব ঝুটমুট কথা বলছ! তুমি আমাকে ভেড়ার গােস্তের নাম করে দিনের পর দিন মানুষের গােস্ত দিয়ে ঠকিয়েছ। আর এখন উল্টে আমার ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছ, আমি যাদুকর,। জুয়াচ্চোর, ঠগ!
সেখানে মজা দেখার জন্য যারা জড়াে হয়েছিল সবাই তাে তাদের বচসা শুনে অবাক। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল—সে কী কথা! এতকাল আমাদের মানুষের গােস্ত খাইয়েছে!
বুড়াে রীতিমত জোর গলায়ই বলে উঠল-হা-হা, মানুষের গােস্ত। ভেড়ার গােস্তের নাম করে মানুষের গােস্ত বিক্রি করে প্রতারণা করে খদ্দেরদের সঙ্গে।
অল-কজ যত চিৎকার করে বলে, ঝুট বাৎ বুড়াে তার চেয়ে জোরে গলা চড়িয়ে বলে-“না, ঝুট নয়, আমার বাৎ-ই সাচ। মানুষের মাংসই শয়তানটা বিক্রি করে।।
বুড়াে সবাইকে নিয়ে জবাইয়ের ঘরে গেল যেখানে ভেড়া জবাই করে, গোস্ত টুকরাে টুকরাে করে ঝুলিয়ে রেখেছে। বুড়াে ঘরের কোণের দিকে তর্জনি নির্দেশ করে বল—“আপনারা কি বলতে চান ওগুলাে ভেড়ার মুণ্ডু? আমি তাে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি ওগুলাে মানুষের মুণ্ডু। সবাই মুণ্ডু তিনটির দিকে তাকিয়ে আঁৎকে উঠে বলল-“হায়। আল্লা! এ কী দেখছি! এ কী পৈশাচিক কাণ্ড!
ব্যস, আর দেরী নয় উপস্থিত সবাই বারুদের স্তুপের মত এক সঙ্গে জ্বলে উঠল। ঝাপিয়ে পড়ল অলকুজ-এর ওপরে। কিল-চড়লাথি সমানে চালাতে লাগল। আমার নিরপরাধ ভাইয়া যতই চিৎকার করে বলে-বুড়াের কথা তােমরা বিশ্বাস কোরাে না। ও যাদুকর। যাদুবলে ভেড়ার মুণ্ডুকে মানুষের মুণ্ডু বানিয়েছে। কিন্তু কে, কার বাৎ শােনে। বরং কিল-চড়ের সংখ্যা আরও বেড়ে গেল।
সবাই মিলে আমার ভাইয়াকে পিটিয়ে আধমরা করে টেনে হিচড়ে নিয়ে গেল কোতােয়ালের কাছে। সব কিছু শুনে কোতােয়াল তাকে তিন শ’ ঘা বেত বরাদ্দ করলেন। তারপর ঘাড় ধরে মুলুক থেকে তাড়িয়ে দিল। তার স্থাবর-অস্থাবর যা কিছু সম্পত্তি ছিল সবই বাজেয়াপ্ত করল। সবই নসীবের ফের। বাজারে লােকগুলাে যখন তাকে মারধাের করছিল তখন তার বাঁ-চোখটি কানা হয়ে যায়। সে অনন্যোপায় হয়ে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে নিজের মুলুক ছেড়ে অন্য মুলুকে চলে গেল। ভিন দেশে গিয়ে সে এবার এক মােড়ের মাথায় জুতাে সেলাই করতে বসে যায়।
একদিন সে আপন মনে জুতাে মেরামত করছে, এমন সময় একদল সিপাহী চিৎকার করতে করতে এগােতে লাগল—সব হট যাও। রাস্তা খালি কর। হট যাও।
অলকুজ ব্যস্ত হয়ে তার জুতাে মেরামত করার সরঞ্জাম সরাতে না সরাতে ঘােড়ায় চেপে দেশের সুলতান সে-পথে এলেন। এক চোখে ঠুলি পরা অল-কুজকে দেখেই সুলতান ঘােড়া দাঁড় করালেন। চিৎকার করে উঠলেন—সব রুখ যাও! কানা লােক অযাত্রা। এমন অশুভ লক্ষণ দেখে তাঁর আর শিকারে যাওয়া হল না।
সুলতান গর্জে উঠলেন—‘অপয়া লােকটি আমার যাত্রায় বাধা দিয়েছে। উচিত শিক্ষা দাও একে।
সুলতানের আদেশ পাওয়া মাত্র তার দেহরক্ষীরা অল-কুজ-এর ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। বেধড়ক মারধাের করে গলা ধাক্কা দিয়ে পথের ধারে ফেলে দিল।
সুলতান শিকারে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে রাগে গসগস করতে করতে প্রাসাদে ফিরে গেলেন।
অল-কুজ যন্ত্রণাকাতর দেহে কোনরকমে তার ডেরায় ফিরে এল। সে তার অপরাধ কিছু ভেবে পেল না। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল সুলতান কানা লােককে একদম বরদাস্ত করতে পারে না। তাই সিপাহীদের ঢালাও হুকুম দেওয়া আছে, এক চোখ খুইয়েছে এরকম কোন লােককে দেখামাত্র কোতল করবে।
অল-কুজ ভাবল কোতল করার আদেশই যদি সুলতান দিয়ে থাকেন তবে সিপাহীরা তাকে রেহাই দিল কেন? নিজেই এর উত্তর বের করে ফেল্ল। মারধাের খেয়ে সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললে সিপাহীরা নির্ঘাৎ ভেবেছিল সে মরেই গেছে। মড়াকে আর তাে ফাঁসি দেওয়া বা শূলে চড়ানাে যায় না। তাই তার জানটি টিকে গেল।
অলকুজ এবার এমন এক মুলুকে হাজির হ’ল যেখানে কোন সুলতানের অস্তিত্ব নেই। ক’ দিন নিরাপদেই কাটল। এক বিকালে অলকুজ পাহাড়ের গা দিয়ে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ দূর থেকে ঘােড়ার খুরের আওয়াজ শুনে সচকিত হয়ে পড়ল। ভাবল, সৈন্য আসছে। ভয়ে তার কলিজা শুকিয়ে গেল। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। পথের ধারে ভাঙাচোরা একটা বাড়ি দেখতে পেল। পােড়াে বাড়ি। আর কথা নেই সােজা বাড়িটির ভেতর ঢুকে গেল। হ্যা, তার ধারণা অভ্রান্তই বটে। বাড়িটিতে কেউ-ই থাকে না। সে একটি থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটি লক্ষ্য করতে থাকে। এমন সময় ঘটে গেল একেবারেই অবিশ্বাস্য এক কাণ্ড। অতির্কিতে দু’জন গাট্টাগােট্টা লােক পিছন দিক থেকে খপ করে তার ঘাড় ধরে ফেলল। তারা সমস্বরে গর্জে উঠল ‘হতচ্ছাড়া শয়তান কোথাকার! তিন-তিনটে দিন আমরা তােমার খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছি! আর তুমি আমাদের নিয়ে লুকোচুরি খেলছ!’ কথা বলতে বলতে তারা তাকে বেধড়ক পিটতে শুরু করল। প্রায় আধমরা করে তাকে নিয়ে গেল কোতােয়ালের দরবারে।
অলকুজ চোখের পানি ফেলতে ফেলতে তার নসীবের কথা, কোতােয়ালের কাছে সবিস্তারে বর্ণনা করল। তিনি তার কথা বিশ্বাস করলেন না। তার কাছে মিথ্যা কথা বলেছে ভেবে সিপাহীদের হুকুম দিলেন ‘উলঙ্গ করে চাবুক মারাে মিথ্যাবাদী কানাটিকে।
তার জোব্বা আর পাতলুন খুলতেই সিপাহীদের চোখের সামনে ভেসে উঠল, সারা গায়ে চাবুকের কালসিটেপড়া দাগ।
কোতােয়াল সবিস্ময়ে বললেন—এসব কি হে! চুরি করে উপহার পেয়েছ বুঝি ? কোথায়? কোথায় ধরা পড়েছিলে, সত্যি করে বল! অলকুজ কেঁদেকেটে বলল—‘হুজুর, চুরি আমি কোনােদিনই করিনি। তবে চাবুক খেয়েছি বহুবার। কেন এবং কার কার কাছ থেকে এসব উপহার পেয়েছি সবই আমার বক্তব্যে উল্লেখ করেছি। আপনি হয়ত খেয়াল করেন নি।
-চুপ কর হারামজাদা মিথ্যাবাদী কাঁহিকার। সারা গায়ে চাবুকের দাগ জ্বল জ্বল করছে! আর বলে কিনা চুরি করে নি। মিথ্যা কথা বলার আর জায়গা পাও নি। চালাও চাবুক। চাবুকের ঘায়ে খুন বের করে তবে ছাড়ান দেবে। সিপাহী এবার শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে গুণে গুণে এক শ’ ঘা চাবুক মারল। কেটে খুন ঝরল কয়েক জায়গায়। এবার উটের পিছনে আচ্ছা করে বেঁধে নগরের পথে পথে ঘােরানাে হ’ল।
আমার ভাইয়া অল-কুজ শয্যা নিল। তার দুর্গতির কথা শুনে আমি ছুটে গেলাম। এক রাত্রে চুপিচুপি তাকে বাগদাদ নগরে নিয়ে এলাম। হেকিম ডেকে দেখালাম। তিনি দাওয়াই দিলেন। দীর্ঘদিন ইলাজের পর সে মােটামুটি সুস্থ হ’ল। তবে সে প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে। একই আম্মার পেটে জন্ম। তাকে তাে আর আমার মত উদার, সদাশয় ও পরদুঃখকাতর আদমির পক্ষে ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই তার যাবতীয় দায় দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিলাম।
অল-আসারের কিস্সা। খলিফা অল-মুসতানসির বিল্লাহ নাপিতের চতুর্থ ভাইয়া অলকুজ-এর কিসসা শুনে বিস্ময়বােধ করলেন।
নাপিত এবার বল—“হুজুর, আপনাকে আর কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরতেই হবে। এবার আপনাকে আমার পঞ্চম ভাইয়া অল-আসারের কিসসা শােনাতে চাই। তবে কথা দিচ্ছি, আমি সাধ্যমত সংক্ষেপে আমার কিসসা শেষ করব।
খলিফা অল-মুসতানসির বিল্লাহ মুচকি হেসে বললেন—‘তুমি যখন অল-আসার-এর কিসসা না শুনিয়ে ছাড়বেই না তবে তাড়াতাড়ি শুরু কর। তবে খেয়াল থাকে যেন সংক্ষেপে তােমার কিসসা শেষ করবে।
—জী হুজুর। অল-আসার-এর শরীরের তুলনায় পেটটি ছিল ইয়া বড়। মনে করতে পারেন ছােটখাটো একটি মাটির জালা তার পেটের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বেশী নড়াচড়া করলে যেন জালাটি খসে পড়ে যাবে এমন ভাব নিয়ে সে ধীর-মন্থর গতিতে পথ চলত। প্রায় সারাদিন চোখ বন্ধ করে চৌকির ওপর পড়ে থাকত। আমাদের আব্বা যে পরিমাণ নগদ অর্থ রেখে গিয়েছিলেন তা ভাগ বাটোয়ারা করে প্রত্যেকে মাথাপিছু একশ’ দিরহাম পাই। অনেক ভেবে অল-আসার কাচের বাসনপত্রের কারবার শুরু করল। গলির মােড়ে পসরা সাজিয়ে বসল। একদিন দোকানে বসে সে ভাবতে লাগল এক শ’ দিরহাম দিয়ে মালগুলি খরিদ করেছি। কম করেও দু’ শ’ দিরহাম তো বিক্রি হবেই। তখন পুঁজি হবে দু'শ’ দিরহাম। বিক্রি করব চার শ’ দিরহামে! এভাবে মূলধন বেড়ে যখন মােটা অঙ্কে দাঁড়াবে তখন কাচের কারবার ছেড়ে দিয়ে আতরের কারবারে নেমে পড়বে। সে এর-ওর মুখে শুনেছে এক দিরহামের আতর নাকি পাঁচ দিরহামে বিক্রি হয়। আর এ-ও ভাবল তখন আর গলির মােড়ে দাঁড়িয়ে বাসনপত্রের দোকানে ষাঁড়ের মত চেঁচাবে না। আতর নেবে গাে.....আতর নেবে গাে। একটি বড়সড় ঘর নিয়ে রীতিমত দোকান খুলে বসবে। তার ভাবনা কিন্তু এখানেই থমকে গেল না। মােটা লাভে কিছুদিন আতর বিক্রি করে মূলধন এক সময় এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে যখন সে অনায়াসে একটি হাতী কিনে ফেলতে পারবে। সে কিনবেও তা-ই। তারপর দেখনাই একটি ইমারত কেনার ইচ্ছা আছে। দারােয়ান, পরিচারক ও পরিচারিকারা সর্বদা তার হুকুম তামিল করার জন্য অবশ্যই সতর্ক থাকবে। পরিচারকদের কেউ থাকবে অন্দরমহলে আবার কেউ বা বাইরের কাজকর্মে লিপ্ত থাকবে। দেশ-বিদেশ থেকে খুবসুরৎ সব বাঈজী এসে নাচবে। বসবে ওস্তাদী গানের আসর। আর শাদী ? ও হাে, উজিরের খুবসুরৎ লেড়কি ছাড়া আমাত্য টামাত্যের লেড়কির তাে প্রশ্নই ওঠে না। কেনই বা রাজি হবে । ধনদৌলতের দিক থেকে সে যেমন আমীর বাদশার তুল্য বিবেচিত হবে তেমনি ঝকঝকে চকচকে পােশাকেও সেজেগুজে থাকবে। এমন কি ঘােড়ার জিনেও হীরে-মুক্তো, মণিমাণিক্য ব্যবহার করবে সে। আর নগরীর সেরা মণিকারকে দিয়ে বানাবে গহনাপত্র যা দেখে কেউ-ই চোখ ফেরাতে পারবে না। মাঝেমধ্যে ক্রীতদাস পরিবেষ্টিত হয়ে বেরােবে নগর পরিক্রমায়। যাতায়াত করবে উজিরের সমতুল্য ব্যক্তিদের প্রাসাদে। তারা ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এসে কুর্ণিশ করে সুসজ্জিত কামরায় নিয়ে বসাবে। সমাদর করবে সাধ্যাতীত।
সে কাকে শাদী করবে, কবে শাদী করে বিবিকে ঘরে আনবে তা সে নিজেই নির্ধারণ করবে। লেড়কির আব্বারা তাকে কন্যাদান করার জন্য ঘুর ঘুর করবে। সে পাত্রীর আব্বাকে সাফ কথা জানিয়ে দেবে, শাদীর যাবতীয় খরচ খরচা সে-ই করবে। ঝলমলে পােশাক আর হীরে-জহরতের সাজে তার বিবি সলজ্জ মুখটিকে মখমলের চেয়েও মূল্যবান ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখবে। রূপসী যুবতীর রূপের আভায় চোখ ঝলসে দেবে। আমার বিবিকে এক নজরে দেখলেই মনে হবে বুঝি বেহেস্ত থেকে কোন হুরী পরী বুঝি জমিনে নেমে এসেছে। শাদীর পর সে সেজেগুজে তার সামনে তার রূপের পসরা নিয়ে দাঁড়াবে। নানা ছলাকলার মাধ্যমে তার মন জয় করার জন্য সাধ্যাতীত প্রয়াস চালাবে। তার দিকে চোখের বাণ মারবে। কাতর অনুরােধ জানাবে। সে নীরব থাকবে। আচার-আচরণে এমন ভাব ফুটিয়ে তুলবে যেন তার মত কত সব রূপসী অতীতে রূপ-যৌবন দান করে জীবন ধন্য করার জন্য উদগ্রীব হয়েছিল। সে পাত্তাও দেয় নি ।
বেগম শাহরাজাদ কিত্সার এ-পর্যন্ত বলার পর ভােরের পূর্বাভাস পেয়ে কিসসা বন্ধ করলেন।
বত্রিশতম রজনী
রাত্রি একটু গভীর হলে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে এলেন। গেহম শাহরাজাদ তার কিসসার পরের অংশ শুরু করলেন— জাঁহাপনা, নাপিত তার পঞ্চম ভাইয়া অল-আসার-এর কিসসা বলে চলল—“আমার ভাইয়া অল-আসার তার কাঁচের বাসনপত্র সাজিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্নে মজে রইল। সে এবার ভাবছে, বাসর ঘরের যাবতীয় স্ত্রী-আচার মিটে গেলে সে নফরকে একটি রেকাবিতে পাঁচ শ’ সােনার মােহর এনে তার সামনে এসে দাঁড়াতে বলবে। সেগুলাে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে সে ঘরময় ছড়িয়ে দেবে। তা কুড়ােবার জন্য বাসর ঘরে উপস্থিত সবাই ছুটোছুটি দাপাদাপি শুরু করে দেবে। পাশের ঘরটি তাদের ফুলশয্যার জন্য সুন্দর করে সাজানাে থাকবে। জনানারা তাকে আর সদ্য শাদীকরা বিবিকে নিয়ে সে-ঘরে যাবে। বিবির সহচরীরা শ্রদ্ধা-ভক্তিতে গদগদ হয়ে তাকে কুর্নিশ করবে। আর সে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাদের অগ্রাহ্য করে ঘরের ভেতরে ঢুকে যাবে। তাদের একজন ব্যস্ত হয়ে গুলাবী সরবৎ এনে তার সামনে ধরবে। তার বিবি তখন তাকে বুকে পাওয়ার জন্য ক্রমেই অধৈর্য হয়ে উঠবে। সে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তার অনুনয় বিনয়কে এড়িয়ে চলবে। নিরাসক্ত ভাব দেখাবার উদ্দেশ্যে থাকবে এই যে, রূপসীদের প্রতি তার কোন মােহই নেই। গােড়াতেই যদি তার বিবি বুঝতে পারে যে, তার রূপ আর যৌবন দেখে সে পাগল তবে তাে সর্বনাশের চুড়ান্ত হয়ে যাবে। যত কষ্টই হােক নিজেকে সে সংযত রাখবেই।
তার অনীহা দেখে তার শাশুড়ি ব্যস্ত হয়ে ছুটে এসে কাতর মিনতি জানাবে। কাঁদো কাঁদো স্বরে বলবে—‘বাছা, আমার লেড়কি নিস্পাপ-নিষ্কলঙ্ক। কোন পাপই তার সতীত্বকে নষ্ট করতে পারে নি। কোন পুরুষকে সঙ্গদান করা তাে দূরের কথা কেউ তার পবিত্র কুমারীত্বের দিকে হাত পর্যন্ত বাড়াতে পারে নি। যাও বাছা, আমার লেড়কিকে বুকে টেনে নাও, শয্যাসঙ্গিনী কর। তার যৌবনসুধা পান করে নিজে তৃপ্ত হও, তাকেও সুখদান কর। তার বিবির দু’ গাল বেয়ে চোখের পানির ধারা নেমে আসবে। চোখের ভাষায় তার মধ্যে কামতৃষ্ণা জাগাবার জন্য তৎপর হয়ে উঠবে। সে বিরক্তি প্রকাশ করবে। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে সে বিবিকে সজোরে এক লাথি মারবে। ব্যস, তন্দ্রা ভাব কেটে গেল। বিবিকে এমন-জোরে এক লাথি মারবে যে সে ছিটকে কয়েক হাত দূরে গিয়ে পড়বে।
লাথি সে মারল বটে। কিন্তু তার লাথি তাে খােয়াবে দেখা, কল্পিত বিবিকে অবশ্যই নয়। আসলে লাথি মারল তার দোকানের কাচের জিনিসপত্রের গায়ে। কাজ যা হবার তা হয়েই গেল। বাসনপত্র ভেঙেচুরে একসার হয়ে গেল। একেবারে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল তার দোকান। পুঁজি গেল বরবাদ হয়ে। সব খতম। এখন পেটে কিল মেরে উপােষ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। স্বপ্ন আর বাস্তবে যার আসমান-জমিন ফারাক তার নসীবে এ রকমটিই ঘটে থাকে। অল আসার মাথায় হাত দিয়ে ভাঙাচোরা বাসনপত্রের দিকে তাকিয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেল্ল।
আমার ভাইয়া অল-আসার যখন সবকিছু খুইয়ে কেঁদে আকুল হচ্ছে তখন এক সম্ভ্রান্ত ঘরের জনানা পরিচারিকা পরিবেষ্টিত হয়ে সে-পথ দিয়ে যাচ্ছেন। তাকে কাঁদতে দেখে তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। পরিচারিকাকে বললেন—একটু এগিয়ে গিয়ে ব্যাপারটি দেখে আসার জন্য। পরিচারিকাটি ফিরে এসে জানাল—যুবকটি গলির মােড়ে দোকান সাজিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় স্বপ্ন দেখছিল। স্বপ্নের ঘােরে লাথি মেরে দোকানের জিনিসপত্র ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। পুঁজি খতম, তাই কেঁদে আকুল হচ্ছে।
সম্রান্ত মহিলাটি পরিচারিকাকে কিছু সােনার মােহর দিয়ে বললেন—এক কাজ কর, এগুলাে তাকে দিয়ে এসাে। আর বােল যেন আবার নতুন করে দোকান সাজিয়ে নেয়।
পরিচারিকাটি আমার ভাইয়া অল-আসারকে পাঁচ শ' সােনার মােহর দিয়ে বলল—এগুলাে রাখ। এ দিয়ে আবার তােমার দোকান সাজিয়ে বােসাে।
অল-আসার এক সঙ্গে পাঁচ শ’ সােনার মােহর এর আগে কোনদিন দেখে নি। সে ভাবল, এবার আমি আমীর আদমি বনে গিয়েছি। ( চলবে )

0 Comments