গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
যাক ভাববেন না। আমি বিলকুল হেজামত করে দেব। এসব বিদ্যা আমার খুব ভালই রপ্ত রয়েছে। আল্লাহর একটি বাণীর দিকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। শুনুন—অন্যের দোষত্রুটি মার্জনা করে, নিজের ক্রোধকে যে প্রশমিত করে রাখে আল্লাতাল্লা তার ওপর প্রসন্ন ও সহায় হন। হুজুর, প্রতিদিন, প্রতিবার নামাজান্তে এ-বাণী এক শাে আটবার জপ করলে সর্ব বিঘ্ন নাশ হতে পারে। আর আপনার দিব্যজ্ঞান প্রাপ্তিও হবে। আমাকে যে-সব ঝুটাবাত আপনি বলেছেন তার জন্য ক্রটি স্বীকার বা মার্জনা ভিক্ষাও আপনাকে করতে হবে না। কারণ, আমি নিজগুণে সে সব কথা সঙ্গে সঙ্গেই ভুলে গেছি। কিন্তু ভেবে পাচ্ছিনে, আজ আপনি এমন ক্রোধপরায়ণ হয়ে পড়ছেন কেন? আপনার আব্বাজী কিন্তু সর্বদা আমার উপদেশ অনুযায়ী বলতেন—“গুণীজনের উপদেশ পালনে যে উৎসাহী হয় তাকে কোনই বিপদের সম্মুখীন হতে হয় না। খােদাতাল্লার এ উপদেশামৃত প্রতিনিয়ত জপ করবেন। দুনিয়ায় উপদেশ দেওয়ার লােক ভূরি ভূরি পাবেন, কিন্তু যােগ্যতা ক’ জনের আছে, বলবেন কি? আমার তাে মনে হয় তামাম দুনিয়া ঘুরে এলেও আমাকে ছাড়া উপদেশ দেওয়ার যােগ্য আদমি দ্বিতীয় আর একজন পাবেন না, কেউ পায়ও নি। আর কথা বাড়িয়ে আপনার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। আবার হয়ত চেঁচিয়ে উঠবেন, নিকাল যাও হিয়াসে! কিন্তু আমাকে দেখছেন তাে কেমন অটুট ধৈর্য। খােদাতাল্লা আমাকে এটি উজাড় করে ঢেলে দিয়েছেন। সত্যি বলতে কি, একমাত্র আপনার পিতার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মান-বােধের জন্যই তাে আপনাকে উপযাচক হয়ে এতগুলাে উপদেশ দিতে গেলাম। তিনি আজ বেহেস্তে গেছেন বলেই আপনাকে উপদেশগুলি দেওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য মনে করছি। নইলে খােদাতাল্লার কাছে নিজেকে অপরাধী জ্ঞান করব।'
আমি উন্মাদের মত চেঁচিয়ে উঠলাম—“আল্লাহ, একী মহা দায়ে পড়া গেল ! একী অসহনীয় উৎপীড়ন! তােমার কাছে কাতর মিনতি রাখছি পরামানিক ভাইয়া, আমাকে এবার রেহাই দাও। নইলে গলায় গামছা দিয়ে টানতে টানতে সদর-দরজার বাইরে দিয়ে আসব তােমাকে। হায় নসীব আমার! অপমান, ক্ষোভ এবং হম্বিতম্বি কোন কিছুকেই সে পাত্তা দিচ্ছে না! হতচ্ছাড়াটি আবার বলতে শুরু করল—“আমি বুঝছি আপনি ক্ষুব্ধ। আমার প্রতি ঈষৎ উষ্মও প্রকাশ করছেন। আসলে প্রবীণদের তাে নবীনদের তুলনায় সহ্য-ধৈর্য একটু আধটু বেশীই ধরতে হয়। আর আমার আর এখন এসবে উম্মার সঞ্চার হয় না। সত্য বলতে কি, আমি তাে বুঝতেই পারছি, পেয়ার মহব্বতে আপনার মাথা এখন আর ঠিক মত কাজ করছে না। তবে ইলাজ করলে, ঠিকঠাক দাওয়াই দিলে আপনার বিমারি সারতে বাধ্য। ভাববেন না, আমিই দাওয়াই দিয়ে নিরাময় করে তুলব। আজ মনে পড়ছে, আপনি যখন গুড়া বাচ্চা ছিলেন তখন মক্তবে নিয়ে যাওয়া ও নিয়ে আসার সময় কত অত্যাচারই না আপনি আমার ওপর করতেন, সে সব মনে আছে? আমি গুলি খাওয়া শেরের মত গর্জে উঠলাম—‘পরামানিক ভাইয়া, মেহেরবানি করে এবার ছাড়ান দাও। আমার হাতে অনেক কাজ। চুল ছাঁটাই আজকের মত শিকেয় তুলে রাখছি। আর যদি নেহাৎই’ ...কথা বলতে বলতে আমার গায়ের পশমী আলােয়ানটি ফ্যা করে দু টুকরাে করে ফেললাম। নাপিতটি এবার কেমন একটু ভড়কে গেল। মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে ক্ষুর হাতে আমার দিকে এগিয়ে এল। আমার মাথাটিকে তার দু' হাঁটুর ফাঁকে আঁকড়ে ধরে মাথায় ক্ষুর চালাতে লাগল। সামান্য একটু জায়গায় ক্ষুর বুলিয়ে আবার তার বক্তিমে শুরু করল
—আসল কথা কি জানেন? কাঁধে শয়তান না চাপলে অধৈর্যের উদ্ভব হয় না, থাক গে, আর কিছু বলব না। কারণ, আমার প্রতি আপনার মনে তাে কিছুমাত্র আস্থা নেই।
-দোহাই তােমার পরামানিক ভায়া! আমার হাতে সময় খুবই কম।
–হ্যা, এবার বুঝলাম বটে, আপনার সময়ের খুব অভাব। কিন্তু কে বলেছে, আপনার সময়ের খুবই অভাব? হতেই পারে না। কোন্ হতচ্ছাড়া আপনাকে তাড়াহুড়াে করতে বলেছে? দরকার হলে আমিই বলব, কখন তাড়াতাড়ি যেতে হবে, কখন গতি করতে হবে। ধীর-মন্থর। অহেতুক ব্যস্ততার ফলে কিন্তু ক্ষতির বােঝাই বইতে হবে। আমাদের পীর-মহম্মদের বক্তব্য কি জানেন কি ? দুনিয়ায় যা কিছু খুবসুরৎ সবই ধীরে সম্পন্ন হয়েছে। তাই বলছি কি, কোন কাজেই ব্যস্ততা প্রকাশ করা সঙ্গত নয়। আপনার ব্যস্ততার কথা জানতে পারলে মূল্যবান কিছু উপদেশ দিতে পারতাম। আমার কথায় আবার যেন গাল ফুলাবেন না। আপনার সামনে খুবই সুসময়, দিব্য চোখে দেখছি।'
ব্যস, চুলছাটা এ পর্যন্ত রয়ে গেল। সে তার জ্যোতিষীর কিতাবটি খুলে বসল। সূর্যের আলােয় মেলে ধরে কি সব ছাইপাশ দেখতে লাগল নিবিষ্ট চিত্তে।
এক সময় আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল—“কি সব বাজে কথা বলেন যাদের মাথামুণ্ড নেই। কই, আপনার ব্যস্ততার কথা তাে উল্লেখ দেখছি না। আমার গণনায় ভুলচুক হবার জো নেই। দুপুরে নামাজের সময় আপনার কাজ করার পক্ষে উপযুক্ত সময়। তার আগে ব্যস্ত হয়ে কোন ফল পাবেন না। অন্ততঃ তিন ঘণ্টা অনায়াসে শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিতে পারেন।আমি এবারও দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে বলে উঠলাম-বাপু, সত্যি আমি আর পারছি না! এবার রেহাই দাও!
সে এবার আর কোন কথা না বলে আলতাে করে ক্ষুরটি তুলে নিয়ে আমার মাথায় চালাতে লাগল। খুবই সামান্য অংশ কামাল। বুঝলাম, ইচ্ছে করেই ধীর-হাতে ক্ষুর টানছে।
ব্যস, আবার তার কিসসা শুরু করল—“হুজুর, আপনার ব্যস্ততা সত্যি আমাকে বিমর্ষ করে তুলেছে। আপনার আব্বাজী আমার পরামর্শ অনুযায়ী চলতেন তা তাে জানেনই। আপনিই যদি……...
তাকে থামিয়ে দিয়ে বল্লাম—“আজ নামাজের সময় আমাকে আমার মেহবুবার বাড়ি যেতে হবে। নামাজ শেষ হবার আগে পালাতে হবে। নইলে তার বাবার খপ্পরে পড়তে হবে। তারপর এক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে মধ্যাহ্ন ভােজনের নিমন্ত্রণ সারতে হবে। তাই তােমাকে আবারও অনুরােধ করছি, একটু হাত চালিয়ে চুলটা ছেঁটে আমাকে ছেড়ে দাও।
—হায় খােদা! তাই তাে, আমার তাে বাজারই সারা হয় নি!
-তােমাকে আর বাজারে যেতে হবে না। আমার বাড়িতেই–গােস্ত আর সরাব আছে খানাপিনা সেরে যেয়াে। একটু হাত চালিয়ে আমার চুল ছেঁটে দাও বাপু।
‘চমৎকার কথা! কি কি পাকসাক হয়েছে মেহেরবানি করে বলবেন কি হুজুর?’
—“বিরিয়ানি, দো-পিয়াজী, গােস্তের চপ, আর গােস্তের বটি—তােমার যা-যা দরকার নিয়ে যাও।
-একটু চেখে দেখার সুযােগ করে দেবেন হুজুর? রসুইকরকে দিয়ে সব রকম খানা একটু একটু করে তার চেখে দেখার জন্য আনিয়ে দিলাম। সরাবও দিলাম এক বােতল।
সে সব কটি বাটি থেকে একটু একটু করে চেখে দেখে বলল --আপনার মত এমন দরাজ মন আর ক’জনের আছে!’ ‘ঠিক আছে। এবার আমার চুল ছাঁটার ব্যাপারটি শেষ কর। আমার বেরােবার সময় হয়ে এসেছে। এবার ক্ষুরটি সে হাতে তুলে নিল। বার দু'-তিন আমার মাথায় সেটি বুলিয়ে নিয়ে আবার তার পাঁচালি জুড়ে দিল। আজকে আপনার কাছ থেকে যে ঔদার্যের পরিচয় পেলাম তারজন্য ধন্যবাদ জানালে তা আপনার আব্বাজীকেই জানাতে হয়। কারণ, আপনার যা কিছু স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি সবই তাে উত্তরাধিকার সূত্রে আপনার আব্বাজীর কাছ থেকেই পেয়েছেন।
তারপর এক সময় নাপিত বলল—“হুজুর, আমার ঘরে আসুন না একবারটি। খানাপিনা আর নাচগানের আয়ােজন করা যাবে। মেজাজ শরিফ হয়ে যাবে। কাজকর্ম যা কিছু হাতে রয়েছে সেরে একটু রাত্রি করে এলেও চলবে। আমি বলছি, খুব আনন্দ পাবেন।কারণ, বহুত জ্ঞানী-গুণীজনের সমাবেশ ঘটবে। আমি রেগেমেগে বললাম—“তুমি তােমার জ্ঞানী-গুণীদের নিয়ে থাক গে। আমার দরকার নেই। তুমি মেহেরবানি করে আমার চুল ছাঁটার কাজটুকু সেরে দাও, তা হলেই কৃতার্থ হ’ব।'
“ঠিক আছে, তাড়াতাড়িই সেরে দেব। আমি খানা আর সরাব টরাব এক দৌড়ে বাড়িতে রেখে আসি গে।' আমি রীতিমত গর্জে উঠলাম—‘বাজে ধান্দা রাখ! আগে আমার চুল ছেটে দাও। তারপর তুমি জাহান্নামে যাও, দেখতে যাবনা। আগে আমার কাজ
–একা? একা যাবেন? আপনাকে একা ছাড়তে কিছুতেই দিল আমার সরছে না।
আমার কোন কথাই সে পাত্তা দিল না। অধৈর্য প্রকাশ করলাম—কী করছ তুমি! আমি যে তখন থেকে বলছি আমার তাড়া আছে কানেই ঢুকছে না তােমার!’
—ভাল কথা তাে। তাড়া যখন আছে তখন তাড়াতাড়িই তাে যেতে হবে। কিন্তু আমি বলছি কি, বাগদাদ নগর তাে আর এই এতটুকু নয় যে, যেখানে খুশী একা একা চলে যাবেন। এখানে পায়ে পায়ে বিপদ জড়িয়ে থাকে।
‘রাখ তাে তােমার প্যানপ্যানানি ! আমার চুল ছেটে দিয়ে মানে মানে বিদায় হও।
সে এবার ব্যস্ত হাতে ক্ষুর চালাতে লাগল। হায় আমার নসীব ! চুল ছাঁটা শেষ হলে দেখি নামাজের সময় পেরিয়ে গেছে, রাগে দুঃখে আমার মাথায় খুন চাপার জোগাড় হ’ল।
নাপিত আমার দেওয়া খাবারদাবার ও সরাবের বােতল নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা জুড়ল।
ব্যস, আর এক মুহূর্তও দেরী নয়। এক দৌড়ে হাজির হলাম কাজীর বাড়ি। দরজা খােলাই রয়েছে দেখলাম। ঘরে ঢুকে দরজাটি দিলাম বন্ধ করে। সে বুড়ি ভেতরেই রয়েছে দেখলাম।
বাড়ির বাইরে কিসের যেন চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেলাম। মনে খটকা লাগল। আমি দৌড়ে আসার সময় কিছু লােক আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকিয়েছিল। হয়ত চোরটোর ভেবে থাকবে। তারাই হয়ত পিছু নিয়েছে। কাজীর বাড়ি চুরি করতে ঢুকেছি অনুমান করেছে।
আমার মেহবুবা জানালার ছিদ্রে চোখ রেখে দেখল, কাজী খচ্চরের পিঠ থেকে নামছেন। তার সঙ্গে রয়েছে হতচ্ছাড়া সে নাপিতটি। আর দশবারজন লােকও সঙ্গে রয়েছে।
শুনে তাে আমার গলা পর্যন্ত শুকিয়ে একেবারে কাঠ। আমাকে অভয় দিতে গিয়ে আমার পিয়ারী, আমার মেহবুবা বল ‘ঘাবড়াচ্ছ কেন? আমার আব্বাজান সচরাচর আমার ঘরে আসেন না ‘ ।
হতচ্ছাড়া নাপিত যখন নিঃসন্দেহ হ’ল আমি ইতিমধ্যেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছি তখন সে গলাছেড়ে বিলাপ জুড়ে দিল—“আমার কী সর্বনাশ হ’ল গাে ! তােমরা কে আছ, আমার মনিবকে বাঁচাও! কাজী সাহেব তাকে খুন করে ফেললেন! খুন! কাজী সাহেব আমার মনিবকে খুন করে ফেললেন! কাদতে কাঁদতে সে দু হাতে নিজের গায়ের জোব্বাটি ছিড়েছুঁড়ে একাকার করে ফেলল। আর নিজের চুল ছেড়ার অভিনয় করতে লাগল। কৌতুহলী পথচারীরা নাপিতের চারদিকে ভিড় করে দাঁড়াল। ব্যাপার কি জিজ্ঞেস করল।
নাপিত তাে কেঁদেকেটে একসার—‘আমার মনিব কাজীর বাড়ি ঢুকে পড়েছেন। কাজী তাকে গরুপেটা করছেন। তােমরা সবাই আমার সঙ্গে বাড়ির ভেতরে চল। কেন তিনি আমার মনিবকে এমন বেধড়ক পিটছেন, জিজ্ঞেস করি গে।
পথচারীরা রেগে কাই হয়ে গেল। কাজী ক্ষমতাবান বলে একটি লােককে অহেতুক মারধাের করবেন তা তাে হতে দেওয়া যায় না। নাপিতের সঙ্গে সবাই হুড়মুড় করে বাড়ির ভেতরে ঢােকার উদ্যোগ নিল। দরজার কড়া নাড়তে শুরু করল। ব্যাপার দেখে কাজী বেচারা তাে হতভম্ব। এক নিগ্রো নফর দরজা খুলে দিল। পথচারীরা বেজায় চিৎকার জুড়ে দিল। কিন্তু কি যে বক্তব্য বোেঝা গেল না।
নাপিত এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল–কাজী সাহেব, আপনি আমার মনিবকে মারধাের করছেন কেন? তার অপরাধ কি ?
ব্যাপার কি, কিছুই তাে আমি বুঝছি না! কে তােমার মনিব? কাকেই বা আমি মারধাের করলাম? খােলসা করে বল তাে, কি হয়েছে?
—হবে আবার কি, নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমােলে কি আর সব কিছু টের পাওয়া যায় ? সব খােয়া গেল আপনার।
কাজী গর্জে উঠলেন—‘বাজে কথা রেখে সত্যি করে বল, ব্যাপার কি? বাছা, তােমার মনিবটি কে? আমার বাড়িতেই বা তার কি দরকার?
–‘হাসালেন কাজী সাহেব! তামাম দুনিয়ার লােক জানে আমার মনিবের সঙ্গে আপনার লেড়কির ইয়ে, মানে পিয়ার মহব্বত রয়েছে। আর আপনি জানেন না, বিশ্বাস করতে হবে আমাকে! রােজ, আপনার বাড়ি তিনি তাে রােজই আসেন।
—সে কী কথা! আমার লেড়কির নামে এরকম বদনাম! আমি কিছুতেই বরদাস্ত করব না।
–এখন আর বরদাস্ত না করে উপায় কি, বলুন? গােড়ায় দিলেন আস্কারা। আর এখন লাগাম টেনে ধরলে চলবে কেন? সব জেনে শুনে না জানার ভান করলে কি আর ব্যাপার থেমে থাকবে ? আগেই নিজের লেড়কিকে সতর্ক করা উচিত ছিল। শুধু আমি কেন, এই যে এত লােক এখানে জড়াে হয়েছে, জিজ্ঞেস করুন, একই কথা সবাই বলবে।
কাজী সাহেব তার লেড়কির চরিত্র নিয়ে এরকম জঘন্য সব কথাবার্তা শুনে রীতিমত স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। পথচারীদের কোলাহল নতুন করে শুরু হল। তারা চেঁচিয়ে বলতে লাগল—“আমরা মকানটি তল্লাসী করে দেখতে চাই। এর মনিবের কি দশা করা হয়েছে।আমি প্রমাদ গণলাম। এবার সবাই যদি হুড়মুড় করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে আর খানাতল্লাসী শুরু করে তবেই কম্ম ফতে।
আমার মেহবুবা একটি কাঠের বাক্সের মধ্যে আমাকে ঢুকিয়ে বন্ধ করে দিল। আমি লােকচক্ষুর আড়ালে চলে গেলাম।
দরজা খুলে দিতেই সবাই হুড়ােহুড়ি করে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। সব ঘর, বারান্দা, গলি প্রভৃতি আতিপাতি করে খুঁজল। কোথাও কাউকে না পেয়ে আমার মেহবুবার ঘরে এল। তা-ও আমাকে পেল না। সবাই হতাশ হয়ে ফিরে গেল। ধূর্ত নাপিত হাল ছাড়ল না। কাঠের বাক্সটির কাছে এসে দাঁড়াল। বাক্সের ডালাটি ফাক করল। আমার চোখে চোখ পড়তেই দম করে ডালাটি বন্ধ করে দিল। আমি বুঝলাম, নাপিত এবার আমাকে সমেত বাক্সটি মাথায় তুলে নিল। রাস্তায় এসে বাক্সটিকে দম করে ফেলে দিল। বাক্সের ডালাটি গেল খুলে। আমি রাস্তায় চিৎ হয়ে পড়লাম। তখনই আচমকা চোট লেগে আমি পা-টি হারাই। খোঁড়া হয়ে যাই। সেখান থেকে উঠে তাড়াতাড়ি একটি গলির মধ্যে ঢুকে পড়ি। আমাকে আর ধরে কে ।
বেগম শাহরাজাদ দেখলেন, ভাের হয়ে এল বলে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন। বাদশাহ শারিয়ার নিজের কাজে চলে গেলেন।
ত্রিশতম রজনী
রাত্রি গভীর হলে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন।
কোনরকম ভূমিকা না করেই বেগম শাহরাজাদ তাঁর কিসসা শুরু করতে গিয়ে বলেন—জাহাপনা, সেই দর্জিটি তার কিসসা বলে চলল—খোঁড়াটি ভােজের আসরে তার জীবনের করুণতম অধ্যায়ের কথা বলছে। উপস্থিত সবাই অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে শুনতে লাগল।
আমি তাে গলির মধ্যে ঢুকে কোনরকমে জানটি বাঁচালাম। তবু আমি দৌড় বন্ধ করলাম না। নাপিত আমার পিছনে আঠার মত লেগে রইল। দৌড়াতে দৌড়াতে সে চিৎকার করে বলতে লাগল—“হুজুর, একটু থামুন। আমার কথা শুনুন। এখন স্বীকার করছেন তাে আমি না থাকলে আপনি জানে বাঁচতেন না। আপনাকে তাে আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলাম, আমাকে সঙ্গে না নিয়ে মােটেই পা-বাড়াবেন না। তবু অনুমানের ওপর নির্ভর করে এসে না পড়লে কী কেলেঙ্কারী হয়ে যেত, ভেবে দেখেছেন? এখন আর দৌড়ােবার দরকার নেই। দাঁড়ান।
নাপিত আমার কাছাকাছি চলে এলে হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম—ভাই, আমাকে এবার অন্ততঃ রেহাই দাও। আমার পিছু ছাড়। দোহাই তােমার, আমাকে একটু দম ফেলে বাঁচতে দাও। তুমি কি আমার জান খতম না হওয়া পর্যন্ত আমার পিছন ছাড়ছ না?' আমি আবার দৌড়ে এক দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
দোকানিকে বললাম, আমাকে আপনার দোকানের ভেতরে একটি লুকিয়ে থাকার সুযােগ দিন। আমার খুবই বিপদ। পরে সব খুলে বলছি আপনাকে।
দোকানি কি বুঝল, কে জানে? তার আলমারির পিছনে আমাকে লুকিয়ে থাকার সুযােগ দিল।
সব শুনে দোকানি আমাকে বলল—'তােমার পা সারা পর্যন্ত এখানেই থেকে যাও। আমার দোকানে নাপিতের মত কোন বদমায়েস লােকই ঢুকতে পারবে না।'
এবার থেকে নাপিতের ওপর বিরক্তির পরিবর্তে আমার মনে ভীতি মিশ্রিত ঘৃণার সঞ্চার হ'ল। মনস্থির করে ফেললাম মুলুক ছেড়েই চলে যাব। এরকম বদমায়েশ লােক যখন পিছনে লেগেছে তখন আর এ মুলুকেও থাকছি না। খােদাতাল্লার কাছে প্রার্থনা করছি, নচ্ছার নাপিতের বংশ নিপাত যাক।
আমার ব্যবসাপত্র যা ছিল সব সস্তা দামে ঝেড়ে দিলাম। সামান্য। জমিজমা যা ছিল তা আমার এক অভিন্ন হৃদয় বন্ধুকে তদারকির ভার দিয়ে দিলাম। ব্যস, হারা উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। সাগর মহাসাগর, পাহাড়, মরু পেরিয়ে বহু মুলুক ঘুরে হাজির হলাম আপনার দেশে। মুলুক চীনদেশে। ভাবলাম, আর কিছু না হােক অন্ততঃ আমার শনি সে-নাপিতের পাল্লায় আর পড়তে হচ্ছে না। কিন্তু নসীবের ফের, এখানে এসেও সাক্ষাৎ সে-যমটির খপ্পরে পড়তে হ'ল। আবার পালিয়ে যাওয়ার ফিকির খুঁজতেই হ’ল। কথাটি বলেই সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। নাপিত তখন নিতান্ত অপরাধীর মত বিমর্ষ মুখে বসে রইল। আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলাম—এমন একটি নিরীহ-নিরপরাধ যুবকের জিন্দেগী বরবাদ করার ধান্দা করছ কেন হে?'
–‘আপনারা কিন্তু আমার প্রতি অবিচারই করছেন। আমি তার ভাল ছাড়া মন্দ করার চিন্তা করি নি। আমার পরামর্শ অনুযায়ী চললে তাকে এরকম প্রতিকূল পরিস্থিতির মােকাবেলা করতে হ'ত না। আর তার পায়ের কথা যদি বলেন আমি বলব একটি পা গেছে কিন্তু জান রক্ষা পেয়েছে। সেদিন আমি কৌশল প্রয়ােগ না করলে অবশ্যই তাকে জান খােয়াতে হত। কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে সে কিন্তু আমাকে অভিশাপই দিয়ে গেল। যাক গে, খােদাতাল্লা এর বিচার করবেন। আপনারা তাে আমাকে দেখছেন। আমি কি অনাবশ্যক কথা | বলি, নাকি বিবেকহীনের মত কোন কাজ করেছি? তবে আমার ছয় ভাই ক্ষমতা রাখে বটে! আপনারা একটু লক্ষ্য করলেই বুঝবেন, আমার জ্ঞান কত গভীর।
আপনারা তাে জানেন, বাগদাদ আমার স্বদেশ। আমি দেশ ছেড়ে আসার সময় সে-দেশের সুলতান ছিলেন অল-মাসতানাসির বিল্লাহ। ধার্মিক প্রবর বলে তার যথেষ্ট খ্যাতি। তার সুলতানিয়তে জ্ঞানীগুণীদের খুবই কদর ছিল।
খলিফার কাছে একবার খবর গেল, নগরের প্রান্তে দশজন সমাজ-বিরােধীর এক আখড়া রয়েছে। সুখবরটি শােনামাত্র সুলতান সিপাহীদের কড়া নির্দেশ দিলেন তাদের বন্দী করে কয়েদখানায় পুরে দিতে।
আমি এক বিকেলে টাইগ্রিস নদীর ধার দিয়ে সান্ধ্য-ভ্রমণ সারছিলাম। এমন সময় দেখি, নৌকায় দশজন লােক বসে। নােঙর তােলার উদ্যোগ নিচ্ছে। ভাবলাম এরা নদীপথে সান্ধ্য-ভ্রমণে বেরােচ্ছে। আমি দৌড়ে গিয়ে তাদের নৌকোয় উঠে পড়লাম। আমি তাে বলেছিই , আমি মিতভাষী। নিতান্ত দরকার ছাড়া মুখ খুলি
তাই তাদের অনুমতি না নিয়েই নৌকোয় উঠে গেলাম। সবে নােঙর তুলেছে। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে একদল সাদা পােশাক পরিহিত সিপাহী অতর্কিতে নৌকাটিকে ঘিরে ফেল্ল। আমাকে সহ সবাইকে হাতকড়া পরিয়ে দেওয়া হল। হাজির করল সুলতানের দরবারে।
খলিফা সবকিছু শুনে বাজখাই গলায় গর্জে উঠলেন—“যাও, এদের বধ্যভূমিতে নিয়ে যাও। দশজনকে একের পর এক কোতল কর। আমি তাে মিতভাষী, একটি কথাও বলাম না। জল্লাদ তার সুতীক্ষ অস্ত্র দিয়ে এক এক করে দশজনের গর্দান নিল। বধ্যভূমি খুনে মাখামাখি, আমি এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। শেষবারের মত আল্লাতাল্লাকে স্মরণ করতে লাগলাম। জল্লাদ এবার হাতের অস্ত্রটি পাশে নামিয়ে রাখল। সুলতান সবিস্ময়ে বললেন-“এ কী রকম কাজ হে? একজন যে বাকি রয়ে গেল। জল্লাদ কুর্নিশ করে জবাব দিল—‘হুজুর, আপনার আদেশ মতই কাজ হয়েছে। গােস্তাকী মাফ করবেন, আপনি দশজনকে কোতল করতে বলেছেন। আপনি গুণে দেখুন, দশটি লাশ আর দশটি শির এখানে আছে কিনা।
সুলতানের মনে আছে, দশজনকে কোতল করতে হুকুম দেওয়া হয়েছিল। সে হুকুম যথাযথভাবে পালিত হয়েছে। আমাকে নিয়ে সুলতানের মুখােমুখি দাঁড় করানাে হ’ল। তিনি সবিস্ময়ে বললেন—কে তুমি? মকান কোথায়? এ সমাজবিরােধীদের দলে তুমি ভিড়লে কি করে ? আমি তাে কথা কম বলি। কিন্তু এবার মুখ খুলতেই হল। বললাম—জাঁহাপনা, আমি কথা খুব কম বলি ব’লে সবার কাছে আমি ‘সীমিত' বলে পরিচিত। আমি কথা কম বলি বলে আপনি জল্লাদকে ভুল হুকুম করেছেন বুঝেও মৌন হয়েই ছিলাম। কারণ,প্রয়ােজন ছাড়া কথা বলা আমার স্বভাব বিরুদ্ধ। তাছাড়া অন্যের ব্যাপারে অহেতুক মাথা না ঘামানােও আমার একটি বড় গুণ। আমার পুরুষানু ক্রমিক ব্যবসা ক্ষৌর-কাজ। আমাকে নিয়ে সাত ভাই আমরা। আর আপনি জানতে চেয়েছেন, সমাজ বিরােধীদের দলে আমি কি করে ভিড়লাম! ট্রাইগ্রিস নদীর তীর ধরে বেড়াবার সময় দেখলাম, এ-দশজন লােক নৌকো নিয়ে নদীতে বেড়াতে যাচ্ছে । নিঃশব্দে নৌকোয় উঠে পড়লাম। আপনার সিপাহীরা তখন নৌকো ঘেরাও করে আমাকে সহ সবাইকে বন্দী করে হাজির করে আপনার দরবারে। তখনই আমি বুঝেছিলাম, লােকগুলাে মৌনব্রতী। আমিও তাে কথা কম বলি, তাই মৌন হয়েই ছিলাম।
আপনি জল্লাদকে হুকুম করলেন কোতল করতে। আমি অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিলাম। টু-শব্দটিও করলাম না। আমি তাে নিঃসন্দেহ যে, খােদাতাল্লা নিশ্চয়ই আমাকে রক্ষা করবেন।
আমার আচরণে, বিশেষ করে কথাবার্তায় সুলতান আমার ওপর খুবই প্রসন্ন হলেন। হবে নাই বা কেন? আমার মত মিতভাষী, বিদ্যান, বিচক্ষণ, অভিজ্ঞ ও সাহসী ব্যক্তি তাে সচরাচর দেখাই যায় না ।
নাপিত এবার বলল—“আপনারা তাে একটু আগেই নিজ কানে শুনলেন খোঁডাটি আমার নামে কি সব মিথ্যা, বদনাম দিয়ে গেল। আমার জন্যই নাকি তাকে পা-টি হারাতে হয়েছে।'
( চলবে )

0 Comments