আরব্য রজনী পার্ট ২৪ ( Part 24 )

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
আমি শিশুর মত হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম। ডুকরে ডুকরে কেঁদে বললাম—আপনি আমাকে শাস্তি দিন আর না-ই দিন আমি সব কিছু আপনাকে খুলে বলবই। অন্ততঃ নিজের স্বার্থের তাগিদে আপনাকে সব বলতে চাই। আমি চাই সব কিছু বলে নিজের বুক থেকে পাথরের বোেঝাটি হাল্কা করতে।

আমি তিন বছর আগেকার সে ঘটনাটি বলতে শুরু করলাম। সবার আগে বললাম প্রথম লেড়কিটির কথা। আমার সঙ্গে তিন রাত্রি বাস করে সে যা কিছু করেছিল, কিছুই গােপন করলাম না। তার পর কবে এবং কেন দ্বিতীয় লেড়কিটিকে এনেছিল তা-ও বললাম। আমাদের পালঙ্কে শুতে দিয়ে নিজে ঘরের মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়েছিল তা-ও বাদ দিলাম না। আমরা ঘুমিয়ে পড়লে গভীর রাত্রে ছােট লেড়কিটিকে হত্যা করে সে বাড়ি থেকে চম্পট দিয়েছিল তাও বললাম ।

সুবেদারের দু’আঁখির কোল বেয়ে পানির ধারা নেমে এল। তিনি রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললেন—‘বড় লেড়কিটিও আমারই লেড়কি। কৈশােরে পা দিয়েই সে দ্রুত খারাপ হয়ে যেতে থাকে। উচ্ছৃঙ্খলতার চূড়ান্ত বলতে পার। ঘরে কাউকে না বলে বাইরে রাত্রি কাটাতে শুরু করে। মানা করলে পাত্তা দিত না। বহু শাসন করে, কঠোর শাস্তি দিয়েও কিছুতেই তাকে বশে রাখা যায় নি। যত চরিত্রবান ছেলেই হােক না কেন তাকে সে পাঁকে টেনে নামাতােই। ভাবলাম, শাদী-নিকা দিলে বুঝি তার চারিত্রিক দোষগুলি কেটে যাবে। কোন ফলই হ’ল না। বরং বছর দুই যেতে না যেতেই তার স্বামীটি সামান্য রােগভােগে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। কামজ্বালা নির্বাপিত করার অপূর্ব সুযােগ এল তার হাতে। মিশরের মেয়েদের যা কিছু খারাপ স্বভাব সবই সে রপ্ত করে নিয়েছিল। এবার আমি নিঃসন্দেহ হলাম। মিশর থেকে ফিরে এসে তােমার কাঁধেই ভর করেছিল। সে পর পর তিন রাত্রি তােমার ঘরে, তােমার সঙ্গে সহবাস করেছে।।

আমি ক্ষুব্ধ হলাম যখন দেখলাম সে তার মেজো বহিনকেও তার পথে নামিয়েছে। আমি সর্বদা মেজো মেয়েটিকে সতর্কতার সঙ্গে পাহারা দিতে লাগলাম। আসলে মিশরের লেড়কিদের মত উচ্ছঙ্খল লেড়কি তামাম দুনিয়া চক্কর মেরে এলেও অন্য কোন দেশে দেখা পাওয়া যাবে না। নিজের কামতৃষ্ণা নিবৃত্ত করতে প্রয়ােজনে সে নিজের লেড়কাকেও খুন করতে পারে।  আমার মেজো লেড়কির বয়স ছিল খুবই কম। উঠতি বয়স। কামপ্রবৃত্তি কি সবে সে বুঝতে শিখেছে। এ বয়সে মেয়েদের, বিশেষ করে তাদের অভিভাবককে একটু চোখ-কান খুলে রাখতেই হয়। কিন্তু আমার পক্ষে তাে অন্দরমহলে পড়ে থেকে লেড়কিদের সামলানাে সম্ভব নয়। তার ওপর বড় লেড়কির কায়দা-কৌশলের সঙ্গে আমি সত্যি পেরে উঠছিলাম না। তাই মেজো লেডকিটিকে নিয়ে সে মাঝে-মধ্যেই অন্যত্র রাত্রিবাস করত।

একদিন কাজ সেরে বাড়ি ফিরতেই দেখি বড লেডকিটি হাউমাউ করে মরাকান্না জুড়ে দিয়েছে। আমি কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে ডুকরে ডুকরে কেঁদে বল্ল-“আমি তাকে নিয়ে সন্ধে বেলায়  বাজারে কিছু কেনাকাটা করতে গিয়েছিলাম। ভিড়ের মধ্যে কোথায় যে সে হারিয়ে গেল কিছুতেই হদিস করতে পারলাম না।' আজ তােমার কথায় বুঝতে পারছি, সে তােমার সঙ্গেই সে-রাত্রি কাটিয়েছিল।  আজ আমি পরিস্কার বুঝতে পারছি, আমার মেজো লেড়কিটিকে খুন করার জন্যই বড় লেড়কিটি তাকে তােমার ওখানে নিয়ে গিয়েছিল। আদতে তার রূপ-সৌন্দর্য তার বহিনজী সহ্য করতে পারছিল না। জ্বলন্ত ঈর্ষার বশেই সে এ-কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিল।

সুবেদার সাহেব এবার চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-বেটা, এখন বুঝতে পারছি, বিনা অপরাধেই তােমাকে ডান হাতটি খােয়াতে হয়েছে। আমি তার জন্য অনুতপ্ত। যা ঘটেছে তা তাে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। তুমি নতুন করে জীবন শুরু কর।  ‘আপনার অনুতাপ জ্বালার কথা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু এ রকম একটি কাটা হাত নিয়েও তাে আমার পক্ষে নিজের মুলুকে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। আমার কথা লােকে বিশ্বাস করবে কেন?”

—“আমারও ইচ্ছে নয় তুমি এ-জায়গা ছেড়ে অন্যত্র যাও। বেটা, আমার তিন লেড়কি, একটিও লেড়কা নেই। আমার ছােট লেড়কিকে শাদী করে এখানেই সংসার-জীবন যাপন কর, আমার ইচ্ছা। সে সুন্দরী। সচরাচর এমন রূপ দেখা যায় না।

—“আপনার মর্জি অনুযায়ীই আমি চলব। তবে মুলুকে আমার আব্বাজী নাকি বেহেস্তে গেছেন। আমার প্রাপ্য বিষয়-সম্পত্তির একটি বিহিত করতে চাই।'

–‘চমৎকার। আজই আমি একজন উচ্চপদস্থ কর্মীকে সেখানে পাঠাচ্ছি। তােমার যা কিছু প্রাপ্য বুঝে নিয়ে আসবে। ও নিয়ে তুমি ভেবাে না বেটা।

আমি এবার সুবেদারের ছােট লেড়কিকে শাদী করে সংসারজীবন শুরু করলাম। বিবি আমার মনের মতই হয়েছে। আমাকে নিজের কলিজার মতই মনে করে। ইহুদী হেকিম বলতে লাগল—‘জাহাপনা, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত সে-যুবকের মুখের কিসসা শুনতে লাগলাম। একমাত্র সুবেদারের উদার, বুদ্ধিমত্তা ও ন্যায় বিচারের ফলেই সে বার আমি নিশ্চিত যমের দুয়ার থেকে ফিরে আসতে পেরেছিলাম।

সুবেদার তার জামাতার রােগ নিরাময়ের পর প্রচুর দিনার আমাকে উপহার দিলেন। প্রচুর অর্থের মালিক হয়ে গেলাম আমি। তা দিয়ে দেশ দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। নানা মুলুক ঢুঁড়ে আমি আপনার মুলুকে হাজির হলাম। তারপর শাদী করে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করি।”

জাঁহাপনা, কে বা কারা যে আমার বাড়ির সিডিতে কুঁজোটিকে ফেলে রেখে গিয়েছিল তার হদিস পাওয়া যায় নি। 

চীনের সুলতান এবার মুচকি হেসে বললেন- তােমার কিসসা মন্দ জমাও নি হেকিম। তবে কুঁজোটির মৃত্যুর ঘটনার কাছে তোমার কিসসা কোণঠাসা হয়ে পড়তে বাধ্য। আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তোমাদের কাউকেই ছেড়ে দেওয়া চলে না। মৃত্যু তোমাদের অপরিহার্য । 

আর হেকিমের কিসসা শেষ হলে সে-দর্জি এগিয়ে এল। সুলতানকে  লক্ষ্য করে বল্ল-জাহাপনা, সবার কিসসাই তাে শুনলেন । আমার কথা কিছু শুনলে আনন্দিত হই।

“ঠিক আছে, শুনছি, তবে তােমার কিসসা যদি আমার মনে ধরে তবে তুমি মুক্তি পাবে।” 

দর্জি তার কিসসা শুরু করল—“জাঁহাপনা, অদৃষ্টবিড়ম্বিত এ কুঁজোর মৃত্যুর আগে আমি এক বাড়িতে প্রীতিভােজের আসরে যােগদান করতে গিয়েছিলাম। সেখানে নবাবের বহু সম্মানিত ব্যক্তির সমাগম হয়েছিল। নিমন্ত্রিতরা সবাই এসে এক এক করে জড়াে হয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, গৃহকর্তাকেই দেখা যাচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ বাদে এক সুদর্শন যুবককে নিয়ে তিনি নিমন্ত্রিতদের কাছে এলেন। যুবকটি কেবল সুদর্শনই নয় মূল্যবান পােশাকে সজ্জিতও বটে। পােশাকের মধ্য দিয়ে পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে, সে বাগদাদের অধিবাসী। যুবকটির দিকে চোখ পড়তেই আমার মনটা হঠাৎ বিষিয়ে উঠল। দেখলাম, যুবকটির একটি পা খোঁড়া। হাসিখুশী মুখ নিয়ে সে আমাদের কাছে এল বটে। কিন্তু আসরে সবার সঙ্গে বসার পরই তার মুখে কেমন এক অব্যক্ত যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠল। গৃহকর্তা প্রবােধের স্বরে বললেন—“ধৈর্য ধরে বস বেটা। কেন, এভাবে চলে যাবে, আমি কি এমন কসুর করলাম, বলবে কি? না বললে, বুঝবাে কি করে। আমাকে বল, হয়েছে কি ?

‘এখানে নিমন্ত্রিত মেহমানদের মধ্যে এমন একজন রয়েছেন। যাকে আমি নিদারুণ ঘৃণা করি। খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, একসারিতে বসে খানাপিনা করা তাে দূরের কথা তার সঙ্গে বসবাে না পর্যন্ত। তাই আমি এ জায়গা ছেড়ে যেতে ইচ্ছুক। আমি তার নাম প্রকাশ করে আপনার আমন্ত্রিতদের কাউকে দুঃখ দিতে চাই না জাঁহাপনা।

-“কিন্তু বেটা, তুমিও তাে আমার নিমন্ত্রিত মেহমান। তােমাকেও তাে আমি চলে যেতে দিতে পারি না। তােমার গোসসার কারণ কি? কি জন্যই বা তােমাকে এরকম একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে?

অনন্যোপায় হয়ে নিমন্ত্রিত যুবকটি নিমন্ত্রিত নাপিতের প্রতি তর্জনী নির্দেশ করে বলল—“হুজুর, এর জন্যই আমাকে পা-টি খােয়াতে হয়েছে। আর এরই জন্য আমাকে স্বদেশ চীন ত্যাগ করতে হয়েছে। সে আমার জীবনে সাক্ষাৎ রাহুরূপে কাজ করছে। কসম খেয়েছি, জীবনে এর মুখ দেখব না কোনদিন। খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়েছি কি, জীবনে কোনদিন এর সঙ্গে এক সারিতে বসব না ।

এক সারিতে বসে পানাহার করব না, কোন উৎসব-অনুষ্ঠানেও এর সঙ্গে যােগদান করব না। দেশান্তরি হয়েও একে এড়াতে পারছিনে জোঁকের মত যেন আমার সঙ্গে এ সেঁটে রয়েছে। 

কথাটি শুনে নাপিত প্রতিবাদে মুখর হওয়া তাে দূরের কথা, মুখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারল না।

আমাদের বিশেষ অনুরােধে সে-যুবক আমাদের তার কিসসা শােনাতে গিয়ে বলল—‘আমার আব্বাজী বাগদাদের এক লব্ধপ্রতিষ্ঠ সওদাগর ছিলেন। তিনি ছিলেন যথার্থই একজন অর্থের কুমীর। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন খুবই মিশুকে সদালাপী, ভদ্র ও বিনয়ী। বিদ্যা-শিক্ষাতেও তিনি পিছিয়ে ছিলেন না। আমি পাঠাভ্যাস সাঙ্গ করার পর পরই আমার আব্বাজী দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে বেহেস্তে চলে গেলেন। আমি তার যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা লাভ করলাম। অগাধ পৈত্রিক সম্পত্তি হাতে আসায় আমি আড়ম্বর-প্রিয় হয়ে উঠলাম। খানাপিনা সাজসজ্জার বহর আমার বেড়ে গেল মাত্রাতিরিক্ত। মােদ্দা কথা, বিলাস বহুল জীবনের মধ্যে আমি তলিয়ে থাকলাম। তবে হ্যা, কোন লেড়কির প্রতি আমার আকর্ষণ তাে ছিলই না , এমন কি তাদের ধারে কাছেও ঘেঁষতাম না।

একদিন আমি পথের ধারের বাড়ির রােয়াকে বসেছিলাম। তখন বিকেল। সন্ধ্যের আগে আগে হঠাৎ আমার সামনের বাড়ির জানালায় এক রূপসী তন্বী যুবতীকে দেখতে পেলাম। রূপ আর যৌবনের এমন অভাবনীয় মিলন সচরাচর দেখা যায় না। এক মুহুর্তে আমার মন থেকে লেড়কিদের প্রতি বিতৃষ্ণা ভাবটি নিশ্চিহ্ন হয়ে উবে গেল। তাকে দেখামাত্রই মহব্বতের ফাদে জড়িয়ে পড়লাম। আমার মনময়ুরীটি কিন্তু আমার দিকে এক লহমার জন্য তাকিয়েই অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রইল। একটু বাদেই জানালাটি বন্ধ করে চলে গেল। আমার মনে তখন মহব্বতের নেশা চেপেছে। জানালাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই আমি রােয়াকে ঠায় বসে রইলাম। কিন্তু জানালাটি আর খুললই না। অনন্যোপায় হয়ে আমি চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বাড়ির রােয়াক থেকে উঠে নিজের বাড়ি ফিরে এলাম।  কিন্তু হায়! সে রূপসীর কাছে আমার মন বাঁধা পড়ে গেল। স্বস্তি হারিয়ে ফেললাম। তাকে যতই মন থেকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করি। মন ততই তার দিকেই ধেয়ে যায়। এ-ত মহামুশকিলে পড়া গেল। পরিস্থিতি এক সময় এমন ভয়াবহ রূপ নিল যে, তাকে না পেলে যেন আমার জীন্দেগীই বরবাদ হয়ে যাবে। আমার কাম কাজ সব শিকেয় উঠল।

তারপর থেকে প্রায়ই সে-রােয়াকে গিয়ে জানালাটির দিকে তাকিয়ে তীর্থের কাকের মত বসে থাকি। মনে মনে হাপিত্যেশ করি তাকে একবারটি চোখে দেখার জন্য।

একদিন দেখলাম, নােকর-নফরসহ সুলতানের কাজী এক খচ্চরের পিঠে চেপে সে বাড়িটির দরজায় এলেন। দরজাটি খুলে গেল। তারা সবাই বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। বুঝতে পারলাম এটি কাজীর বাড়ি। আবার দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়লাম। বুকভরা হাহাকার আর হাহুতাশ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

রূপসী যুবতীটির চিন্তায় চিন্তায় জামার তবিয়ত খারাপ হয়ে গেল। বিছানা আশ্রয় করলাম। নােকররা হেকিম ডাকতে চাইল। বাধা দিলাম। মহব্বতের বিমারি। হেকিম তার ইলাজ করতে পারবে কেন!

আমার বিমারির কথা শুনে আত্মীয়-বন্ধু ও প্রতিবেশীরা এসে আমাকে দেখে যায়। নানারকম উপদেশ দিতেও কসুর করে না।

একদিন এক অপরিচিতা বুড়ি আমার ঘরে এল। আমরা দু'জন ছাড়া তৃতীয় কোন আদমি সে-ঘরে ছিল না। বুড়ি প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল —“বেটা, তােমার কি হয়েছে আমাকে বল তাে শুনি। যদি তােমার জন্য কিছু করতে পারি, কোশিসের কসুর করব না।'

আমি কোনরকম দ্বিধা না করে বুড়িকে সবকিছু খুলে বললাম। তাকে না পেলে আমার জিন্দেগী বরবাদ হয়ে যাবে এমন কথাও বলতে কসুর করলাম না।সবকিছু শুনে বুড়ি চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বল্ল-বেটা, সব তো বুঝলাম। কিন্তু সে সুলতানের কাজীর লেড়কি। কাজী সাহেব খুবই বদমেজাজের লােক।' মুহূর্তকাল ভেবে বুড়িটি এবার বলল —“তবে ভরসা হচ্ছে, কাজী আর তার বেটি একই বাড়িতে বাস করলেও তাদের উভয়ের মহল ভিন্ন। এক তলায় কাজী নিজে থাকেন। আর তার লেড়কি থাকে দোতলায়। নােকর নকরানী কড়া পাহারায় তাকে রাখে। শোচ মাৎ বেটা, আমি একটি না একটি ফিকির বের করতে পারবই।

আমি বুড়ির কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে একটু চাঙ্গা হয়ে উঠলাম।

পরদিন বুড়ি আবার আমার বাড়ি এল। ভাবলাম, নিশ্চয়ই সে কোন সুখবর নিয়ে এসেছে। কিন্তু আমাকে হতাশ করে দিয়ে বুড়ি বলল —“বেটা, আমি হেরে গেলাম। পারলাম না। লেড়কিটির কাছে প্রস্তাব দিতেই আমাকে গালাগালি দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিল। আমি নাকি তাকে কুপথে নামার জন্য উৎসাহিত করছি। এমন কি শাস্তির ভয়-ডরও আমাকে কম দেখায় নি।‘বেটা, আমি আশাহত হয়ে হাল ছাড়ার পাত্রী নই। যে করেই হােক তাকে আমি পথে ভেড়াবােই।

বুড়ির কথায় আমি বাণবিদ্ধ চিড়িয়ার মত ছটফট করতে লাগলাম। আবার বিছানায় আশ্রয় নিলাম। খানাপিনা পর্যন্ত ছেড়ে দিলাম।

কয়েকদিন পর আবার আমার হিতকারিণী বুড়ির দেখা পেলাম। তার মুখে হাসি। বুকে আনন্দের জোয়ার। ঠোটের কোণে হাসির রেখাটুকু অব্যাহত রেখেই বল—“বেটা, কাজ অনেকখানিই এগিয়েছে। মিঠাই খাওয়াতে হবে কিন্তু।

—“মিঠাই খাবে এ আর বড় কথা কি গাে। কিন্তু কিভাবে, কতখানিই বা কাজ হাসিল করলে, শুনি?

–‘লেড়কিটিকে বল্লাম—তােমার জন্য একটি তাজা লেড়কা আজ মরতে বসেছে। সে হয়ত আর বাঁচবেও না বেশীদিন।

আমার কথায় লেড়কিটি তাে মূচ্ছা যাওয়ার জোগাড়। কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে মুখ কাচুমাচু করে বলল--সে কী কথা! আমার জন্য একজনের জান যেতে বসেছে। আমি তার কোন্ পাকা ধানে মই দিয়েছি বলতে পার?'

—“তুমি অবশ্য জেনেশুনে কিছু কর নি। তােমার দিল পাগলকরা রূপ-যৌবন তার কলিজাটিকে টুকরাে টুকরাে করে দিচ্ছে। আর তার সে বিমারি সরানাের ক্ষমতা হেকিমের দাওয়াইয়ের নেই। একমাত্র তুমিই তার স্বস্তি ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে পার বেটি।

আমার দাওয়াইয়ে কাজ হয়েছে দেখলাম। সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল—তােমার সে লেড়কাটি কে ? কোথায় থাকে ? আমি কি কোনদিন দেখেছি তাকে ?

–‘বেটি, সে আমার পেটের লেড়কা না হলেও তার চেয়েও বড় কিছু। এই তাে ক'দিন আগেই সে তােমাকে সামনের ওই বাড়ির বােয়াক থেকে দেখেছে। ব্যস, তােমার মহব্বতে মজে গেছে।। তারপর থেকেই সে তােমার খুবসুরৎ রূপ দেখে পাগল হয়ে গেছে। শয্যা নিয়েছে। এখন তার জান নিয়ে টানাটানি। তােমার পিয়ারমহব্বত-সােহাগই একমাত্র তার জান রক্ষা করতে পারে। ফ্যাকাসে-বিবর্ণ মুখে লেড়কিটি বলল—সে কী, আমার জন্য আজ সে জান কবুল করেছে!

‘সবই তাে বাম বেটি। এখন তুমি যা ভাল মনে কর তাই করবে। তােমার মতামত নিয়ে গিয়ে তার কাছে পেশ করব।

—“তুমি যত শীঘ্র পার গিয়ে তাকে জানাও আমি তার জন্য মর্মবেদনা ভােগ করছি। কাল নামাজের পর তার পথ চেয়ে আমি বসে থাকব। তাকে বলবে, আমার সঙ্গে মােলাকাৎ করতে। তবে এও বলল, আব্বাজান নামাজ পড়ে আসার আগেই তাকে বিদায় নিতে হবে।'

বুড়ির কর্মতৎপরতা ও সাফল্যের কথা শুনে মােহরের থলি থেকে কয়েকটি দিনার তার হাতে গুজে দিলাম।

আমার দিলটি তখন খুশীতে টগবগ করতে থাকে। ক'দিন নাওয়া-খাওয়া নেই। চোখে-মুখে কালির ছােপ, মুখ ভর্তি দাড়ি। এক নােকরকে বলাম, একটি নাপিত ডেকে আনতে। সে রাস্তার মােড় থেকে এক নাপিতকে ধরে নিয়ে এল। এ-ই সে নাপিত জাঁহাপনা। আমার জীবনের সাক্ষাৎ অভিশাপ। আমার রাহু, দুষ্টগ্রহ। প্রথম দেখা হওয়া মাত্রই সে কুর্ণিশ করে বল্ল-খােদাতাল্লার দোয়ায় আপনার সব দুঃখ-যন্ত্রণা কেটে যাবে। আসবে নিরবচ্ছিন্ন সুখ। আবার খুশীতে আপনার দিল ডগমগিয়ে উঠবে। এমন এক দাওয়াই আমার জানা আছে যাতে আপনি হৃত শান্তি-সুখ ফিরে পাবেন।

আমি মুচকি হেসে বলাম—‘জলদি আমার চুল ছেটে দাও। তােমার দাওয়াইয়ের কথা পরে না হয় এক সময় শুনব। এবার সে ব্যস্ততার লক্ষণ প্রকাশ করল। তার যন্ত্রপাতির কাঠের বাক্সের ভেতর থেকে লাল শালুতে মােড়া একটি পােটলা বের করল। আমি ধরেই নিলাম ক্ষুর, কাঁচি প্রভৃতি বের করছে। কিন্তু আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। পােটলার ভেতর থেকে সে বের করল একটি জ্যোতিষী কিতাব। আর একটি আর্শি, সাত মুখওয়ালা আর্শি। বিচিত্র তার গড়ন, সে রৌদ্রে গেল। আয়নাটি থেকে সূর্যরশ্মি কিতাবটির পাতার গায়ে প্রতিফলিত করে ক্ষুদে ক্ষুদে অক্ষরগুলাে পড়তে লেগে গেল। এক সময় আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বল—‘হুজুর, আজ হিজরী সাত শ’ তেষটি সন আর দশই শকর শুক্রবার। খােদাতাল্লাহর কাছে আজ যে, যা চাইবে তা-ই পাবে। আজ বৃহস্পতি আর মঙ্গল একই ঘরে অবস্থান করছে। এখন ঘড়িতে সাতটা ছয় মিনিট। এ-সময়ে ক্ষৌরকর্মের পক্ষে-প্রকৃষ্ট সময় হুজুর। আর এরই ফলে মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হতে পারে। শােনলাম, আজ আপনি মেহবুবার সঙ্গে মােলাকাত করতে যাচ্ছেন। আপনাকে জানিয়ে দেওয়া আমার কর্তব্য বলেই জ্ঞান করছি। আপনার এ-প্রয়াসের ফল খুবই ভাল হতে পারে, আবার মন্দ হওয়াও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়। আপনার মেহবুবার সঙ্গে মােলাকাতের পরিণাম কি হবে তা আমি এ-কিতাব দেখে, গণনার মাধ্যমে নখদর্পণে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমার ওস্তাদের নির্দেশ, যেন কিছু না বলি। এতে আমার লব্ধ বিদ্যার দাম্ভিকতাই প্রকাশ পাবে। তাই আমি জানলেও আপনাকে কিছুই বলতে আগ্রহী নই।'

আমি বিরক্তি প্রকাশ করলাম—‘খুব হয়েছে! তােমার বকবকানি থামাও বাপু। আমার খুবই তাড়া রয়েছে। যদি পার খুব তাড়াতাড়ি চুল ছেঁটে আমাকে অব্যাহতি দাও!’ 

—“ঠিক আছে। হুজুর যা বলবেন আমি তা-ই করব। চুল ছাঁটাই আমার পেশা। এ ছাড়া হেকিমি বিদ্যাও আমার ভালই জানা আছে। বহুত আদমির দুরারােগ্য বিমারি আমি সারিয়ে দিয়েছি। আবার আপনাকে আমি এমন কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করে দেব যার ফল হাতে নাতে পেয়ে যাবেন। আমি অর্থ চাই না। কোন বদমতলবও আমার নেই। আপনার হিত সাধিত হােক এটাই আমার আন্তরিক ইচ্ছা। আপনি চাইলে আমি আপনার কাছে সারা বছর রােজ এসে আপনার কর্তব্য সম্বন্ধে বিধান দিয়ে যেতে রাজি আছি। এর জন্য আমাকে পারিশ্রমিক কিছুই দিতে হবে না। আবার ক্ষৌরকর্ম করে দিতেও রাজি আছি। এর জন্যও আমি কোন অর্থ প্রত্যাশা করি না। এবার বসুন, যার জন্য আজ ডেকেছেন। ক্ষৌরকর্ম করে দিচ্ছি।

আমি উন্মাদের মত চেঁচিয়ে উঠলাম—“তুমি দেখছি আমাকে পাগল না করে ছাড়বে না হে! তােমার মতলবখানা কি, সত্যি করে বল তাে? আমার মন চাইছে, ওই ক্ষুরটি দিয়ে তোমার ধড় থেকে মুণ্ডটি নামিয়ে দেই।' কিস্সার এ পর্যন্ত ব'লে বেগম শাহরাজাদ চুপ করলে।। পূর্বআকাশে রক্তিম ছােপ উঁকি দিতে লাগল।।



                  ঊনত্রিশতম রজনী 



বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে এলেন। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, যুবক ছেড়াটি নাপিতের ঘ্যান ঘ্যানানিতে অধৈর্য হয়ে বলল —ক্ষুর দিয়ে নাপিতটির গলটি নামিয়ে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল তখন নাপিতটি মুচকি হেসে বলল- হুজুর আপনি ঠিকই বলেছেন। আপনার বিশ্বাস আমি মিছেই বকবক করি, আদতে কিন্তু আদৌ তা নয়। আমার ছ'টি ছােট ভাইয়া আছে। তাদের সবার কীর্তির কথা বলছি। আমার বড় ভাইয়ার নাম অল বাকবুক। এর অর্থ পূর্ণ কলসি থেকে জল ঢালার সময় যে অদ্ভুত এক শব্দের উদ্ভব হয়।  আমার দ্বিতীয় ভাইয়ার নাম অল-হাদ্দার। এর অর্থ উটের শব্দ—কণ্ঠস্বর।

আর তৃতীয়জনের নাম অল-বাক। এর অর্থ মােরগের ডাক। চতুর্থ ভাইয়ার নাম অল-কুজ-খুসবান। এর অর্থ কলসী ঠুকলে  যে আওয়াজের উদ্ভব হয়। আর পঞ্চম ভাইয়ার নাম অল-আসার। এর অর্থ উট পড়ে গেলে যে আওয়াজের উদ্ভব হয়। ষষ্ঠজনের নাম শাক্কাশিক। এর অর্থ গুগলি ফাটালে যে আওয়াজের উদ্ভব হয়। আর সপ্তম জন আমি নিজে। আমার নাম সামিত। এর অর্থ হল মৌনব্রতী। কম কথা বলার লােক।

আমি যত চুপ করতে বলি নাপিতের বকবকানি ততই বৃদ্ধি পেতে থাকে। কান একেবারে ঝালাপালা করে দিল! অনন্যোপায় হয়ে এক নােকরকে ডেকে বললাম-“আমার চুল ছাঁটার সাধ মিটে গেছে। ভিক্ষে চাইনে কুত্তা ঠেকা। হতচ্ছাড়া নাপিতটিকে সিকি দিনার দিয়ে ঘাড় ধরে বের করে দে।  আমার কথায় নাপিতটি গােসসা না করে বরং মুচকি হেসেই বলল-“হুজুর, আপনি হয়ত ভাবছেন, যে এত অবান্তর কথার ফুলঝুরি ছােটায় তার নামের অর্থ আবার মৌনব্রতী ? কিন্তু আসলে আমি নিজে যেমন বাজে কথার ধার কাছ দিয়েও যাই না তেমনি কেউ বললে বরদাস্ত করতে পারি না। মুহূর্তকাল নীরবে ভেবে নাপিত আবার মুখ খুলল —'আপনার কাজ হাসিল করে দেওয়ার জন্যই আমার এখানে আসা। একটি কানাকড়ির প্রত্যাশাও আমার নেই। তা ছাড়া পরিশ্রম বিনা পারিশ্রমিক নেয়াও তাে অর্থহীনই বটে। খােদাতাল্লার কাছে এর জন্য কি কৈফিয়ৎ দেব ? তবে আমি এ জন্যই দুঃখিত যে, আমার দাম আপনি বুঝতেই পারলেন না। একমাত্র আপনার আব্বাজীই আমার গুণের কদর বুঝতে পেরেছিলেন। | একদিনের কথা বলছি হুজুর—আমি তাঁর সামনে উপস্থিত হওয়া মাত্র পাশে বসালেন। নিজের বাঁ-হাতটির দিকে আমার দৃষ্টি অকর্ষণ করে বললেন—“আমার এখানটিতে একটি ফোড়া ফোঁড়া হয়েছে। সামান্য খুনও বেরিয়েছে তা থেকে। জ্যোতিষ, বিচার করে দেখ তাে এতে আমার কোন অমঙ্গল হবে কিনা?

তার অনুরােধে আমি এ জ্যোতিষ-গ্রন্থটি বের করে পাতা উল্টে এক জায়গায় থামলাম। দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। সূর্যের উচ্চতা পরিমাপ করে দেখলাম। গণনা করে বল্লাম, সেদিন, সে ক্ষণে খুন ঝরার জন্য বিপদের আশঙ্কা । বেশ বড় রকমের কোন বিপদই আপনার সামনে রয়েছে। আমি গ্রহকে বশীভূত করার ব্যবস্থা করছি, ভাববেন না । আজ বারােটা বত্রিশ মিনিট একুশ সেকেণ্ডে আপনার ফোড়াটি কাটার সবচেয়ে ভাল সময়।ব্যস। সময় বিচার করে ফোঁড়াটির গায়ে ছুরির আচড় মারলাম। দাওয়াই দিলাম। আপনার আব্বাজী খুশী হয়ে আমাকে স্বর্ণমুদ্রা ইনাম দিলেন। আমি খেকিয়ে ওঠলাম—”এতক্ষণ ভেবেছিলাম তােমার মাথায় ছিটটিট আছে। এখন দেখছি, মাথার মগজ বলে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। বদ্ধ পাগল। নাপিত বল্ল- ‘হুজুর, আপনি এখন কামােন্মাদ।” 

Post a Comment

0 Comments