আরব্য রজনী পার্ট ২২ ( Part 22 )

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
জাঁহাপনা গতকাল আমার এক জিগরি দোস্তের বাড়ি শাদীর ভােজ খেতে গিয়েছিলাম। বহু লেখাপড়া জানা এবং গুণীজন সেখানে জড়াে হয়েছিলেন। খানা সাজানাে হ’ল। কত রকম যে পাকসাক হয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। তাদের মধ্যে জিরবাজা নামে রসুন ও মশলাপাতি সহযােগে পাক করা একটি বিশেষ খাবারও ছিল। একজন ছাড়া আমরা সবাই রসুনের জিরবাজা চেটেপুটে খেতে লাগলাম।

আমরা তাকে খাওয়াবার জন্য বার বার কোসিস করতে লাগলাম। বললাম ‘সামান্য একটুখানি চেখেই দেখুন না।'

-না, খাব না। এ-জিরবাজা খাওয়ার জন্য আমাকে একবার খুবই খেসারত দিতে হয়েছিল।

ব্যস, এ পর্যন্তই। আমরা তাকে জিরবাজা খাওয়ার জন্য বেশী জুলুম করলাম না। কিন্তু ঘটনাটি কি? কেন এবং কিভাবে তাকে খেসারত দিতে হয়েছিল তা বলার জন্য বার বার পীড়াপীড়ি শুরু করে দিলাম আমরা।

এবার সে বল্ল – যদিও কোনদিন জিরবাজা খাই তবে খাওয়ার আগে আমি কম করেও চল্লিশবার সাবান, চল্লিশবার সােডা এবং পটাশ দিয়ে ভাল করে হাত ধুয়ে নিয়ে তবেই খাব।'

বাড়ির মালিক তার হাত ধােওয়ার জন্য প্রয়ােজনীয় সামগ্রীগুলাে এবং এক বদনা পানি আনিয়ে দিলেন।

আমরা তার দুটো জিনিস গােড়া থেকেই লক্ষ্য করছিলাম ‘প্রথমতঃ খুবই আস্তে আস্তে সে খাচ্ছিল, আর দ্বিতীয়তঃ তার দু’হাতেরই বুড়াে আঙুল নেই, কাটা আমরা খানাপিনা বন্ধ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। একজন তাে কৌতূহল নিবৃত্ত করতে না পেরে জিজ্ঞেসই করে বসল–বলুন তাে, আপনার হাত - পায়ের আঙুলগুলাে খােয়ালেন কি করে?

-আমার আব্বাজী একজন বণিক ছিলেন। বাগদাদের খলিল হারুণ-অল-রসিদ-এর সময় তার ব্যবসা খুবই রমরমা ছিল। সরাবের দিকে তার ছিল খুবই ঝোঁক। বিভিন্ন দেশ থেকে সেরা সরাব এনে ইয়ার দোস্তদের নিয়ে পান করতেন। আর দেশ বিদেশের নামকরা বাইজীদেরও তিনি জোগাড় করে এনে গানের মজলিস বসাতেন। পরিণামে যা হবার তা-ই হ'ল। মৃত্যুর পর তার বিশাল দেনার বােঝা চাপল আমারই ঘাড়ে। আমি অবশ্য অল্প অল্প করে সবার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিলাম। ব্যবসায় নেমে পড়লাম। একদিন চকমকে পােশাক পরিহিতা এক যুবতী খচ্চরের পিঠে চেপে আমার দোকানে এল। বােরখার নাকাবের ফাক দিয়ে তার মুখের যে অংশটুকু উকি মারছিল তাতেই আমার কলিজাটি চঞ্চল হয়ে পড়েছিল। হায় আল্লা! মানুষের মুখ এত সুন্দরও হয়! তার পিছনে ও সামনে একজন করে খােজা যুবক, পাহারাদার। সুন্দরী খচ্চরের পিঠ থেকে নেমে ধীর-মন্থর পায়ে বাজারের দিকে এগােতে চেষ্টা করল। খােজাদের একজন পথরােধ করে দাঁড়াল ‘ওদিকে যাবেন না মালকিন! ও পথটি মােটেই ভাল নয়। সে তার কথায় পাত্তা না দিয়ে সে-পথেই হাঁটা জুড়ল। আমার দোকানটি খুব সুন্দর করে সাজানাে বলে ভেতরে ঢুকে এল। মিষ্টিমধুর-সুরেলা কণ্ঠে বলল ‘একটি ভাল শাড়ী কিনতে চাই। আছে কি? থাকলে দেখাতে পারেন।

আমি ব্যস্ত হাতে দোকানে যত ভাল ভাল শাড়ী ছিল দেখাতে লাগলাম। তার পছন্দ হ’ল না। আমি অন্য কয়েকটি দোকান থেকে কয়েকটি শাড়ি আনিয়ে দেখালাম। সে কোথাও গেল না। আমার দোকানে বসেই সব দেখল।

এক সময় সে মুচকি হেসে বলল- সে কী, মেয়েদের পােশাকের দোকান খুলে বসেছেন, আর তাদের কি এবং কেমন চাহিদা খোঁজ রাখেন না?  আমি হাত কচলে বলাম ‘মাফ করবেন, একে আমি নতুন ব্যবসা শুরু করেছি, অভিজ্ঞতাও নেই বললেই চলে।

‘অভিজ্ঞতা নেই? কেন? শাদী-নিকা করেননি?' —সে সুযােগ আর হ’ল কই ? আমার কথা শেষ হতে না হতেই সে আচমকা আমাকে লক্ষ্য করে চোখের বাণ ছুঁড়ে দিল।

সে কিছু কাপড় চোপড় বাছল। দাম পাঁচ হাজার দিরহাম। তার কথা মত আমি সেগুলাে বেঁধে ছেঁদে দিলাম।

খােজা প্রহরীদের একজন কাপড়গুলাে হাতে নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। আর রূপসী যুবতীটি দোকান থেকে বেরিয়ে খচ্চরের পিঠে গিয়ে বসল।

আমি বােকার মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম দামের কথা মুখ দিয়েই বেরলাে না। দাম তাে দিলই না এমন কি কবে দেবে তা পর্যন্ত বলল না। কাপড়গুলাে অন্য দোকান থেকে জোগাড় করে এনেছিলাম। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তাদের দাম শােধ দিয়ে দেব। একী মহা দায়রে বাবা।

এক সপ্তাহ চলে গেল। সেরূপসীর আসা তাে দুরের কথা দাম পর্যন্ত পাঠাল না। ঠিকানাও জানি না যে, তাগাদা দিতে যাব। আচ্ছা যাঁতাকলে  পড়া গেল। পাওনাদারদের কাছ থেকে আরও এক সপ্তাহের সময় চেয়ে নিলাম। নসীবের জোর আছে আমার। দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষ দিন খচ্চরের পিঠে চেপে সেরূপসী আমার দোকানে এল, একটি সােনার হার আমাকে দিয়ে বল- ‘এটি বিক্রি করে যা দাম হয় তা নিয়ে আপনার পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে নিন।

আরও কয়েকটি কাপড় চাইল।

পাশের দোকান থেকে কিছু ভাল ভাল কাপড় দেখালাম। পছন্দ করল। দশ হাজার দিরহাম দাম হ’ল। আগের দিনের মতই খােজা প্রহরী কাপড়ের গাড়ি নিয়ে পথে নামল।।

আর রূপসী যুবতীটি নিজে গিয়ে বসল খচ্চরের পিঠে। আমি এবারও নীরবে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। দাম চাওয়া দুরের কথা টু-শব্দটিও করতে পারলাম না।

আগের বারে ছিল পাঁচ হাজার, এবারে দশ হাজার দিরহামের দায় ঘাড়ে চাপল। কী ঝকমারিতেই না পড়া গেল! ঠগবাজ মেয়েদের কথা আগে বহুবার শুনেছি। আজ একেবারে নিজেই আমি তার খপ্পরে পড়লাম। আসলে তার রূপের জালে জড়িয়েই আমার এ-সর্বনাশ ঘটল। | শেষ পর্যন্ত দোকানপাট বেচে দেনা শােধ করব মনস্থ করেছি। ঠিক তখনই একদিন আমার রূপসী সশরীরে হাজির হ’ল। আমার সামনে একটি থলি রাখল। ওজন করে দেখি, আমার প্রাপ্যের চেয়ে বেশীই আছে। সে বলল, “আপনার কাছেই সব রেখে দিন।

রূপসী আচমকা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল— শাদীটাদী করবেন না?

—‘বিয়ে শাদী আর নসীবে আছে?”

—এমন সুঠাম সুশ্রী আপনি, যে কোন লেড়কির তাে আপনাকে দেখেই উতলা হয়ে পড়ার কথা।

-একমাত্র আপনি ছাড়া আর কোন মেয়েই এরকম প্রসঙ্গ ভুলেও আমার সঙ্গে পাড়ে না। সে নীরবে এমন ভঙ্গীতে আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল যা দেখে আমার বুকের ভেতরে কলিজাটি রীতিমত উথালি পাথালি শুরু করে দিল।

একটি চমৎকার ফন্দি মাথায় এল। দোকান থেকে বেরিয়ে রূপসীর সঙ্গী খােজাটির হাতে একমুঠো দিনার দিয়ে বল্লাম‘শােন, তােমার মালকিনের মহব্বতে আটকা পড়ে গেছি। তুমি আমার হয়ে তাকে মহব্বত জানাবে। এখন এগুলাে রাখ, পরে আরও পাবে।

‘আমাকে আর আপনার হয়ে ওকালতি করতে হবে না হুজুর। অনেক আগে থেকেই আমার মালকিন মহব্বতের শায়রে হাবুডুবু খাচ্ছেন। বুঝছেন না, কেন ঘুরে ফিরে তিনি এখানে আসেন?

আমি দোকানে ফিরে এলাম। সে ঠোট টিপে হেসে বল্ল“কি ? কি পরামর্শ করে এলেন?

-না, পরামর্শ আবার কিসের ? আপনাদের ঠিকানাটি জিজ্ঞেস করছিলাম।

-কেন বলুন তাে? আমি না এলে আর দেখাশােনা না হলে আপনি মর্মবেদনা অনুভব করবেন বুঝি?' উঠতে উঠতে বলল‘অনেক বেলা হয়ে গেছে। আজ উঠি।

‘একটি কথা বলার সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলােয় নি। আপনার রক্ষীটি আমার হয়ে আপনাকে বলবে।

মুচকি হেসে সে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।

আমি তার অদর্শনে পৌনেমরা হয়ে গেলাম। রােজই পথ চেয়ে থাকি।

একদিন তার খােজা রক্ষীটি বিষমুখে এসে বলল, তার মালকিন অসুস্থ। শয্যা নিয়েছেন।

আমি তার পরিচয় জানতে চাইলাম।

–‘খলিফা হারুন-অল রসিদ-এর বেগম জুবেদার পালিতা কন্যা আমার মালকিন। বেগম একে দত্তক নিয়েছিলেন। সেদিন মায়ের অনুমতি নিয়ে আপনার কাছে মালপত্র কিনতে এসেছিল। মেয়ে পছন্দসই সওদা করে নিয়ে যাওয়ায় তার মা খুবই খুশী হল। একদিন তিনি মায়ের কাছে আপনার কথা পাড়লেন। আপনাকে মনে ধরেছে, আম্মার কাছে তা বললেন। বেগম সাহেবা আপত্তি করলেন না, তবে নিজের চোখে পাত্রকে দেখে তবেই লেড়কির কথায় পুরােপুরি মত দেবেন। নিকা শাদীর ব্যবস্থা করবেন। এখন আপনার ওপরেই সবকিছু নির্ভর করছে। আপনি কি বেগম সাহেবার সঙ্গে মােলাকাৎ করতে রাজি আছেন?

—“আমি তাে একপায়ে খাড়া। কিন্তু কবে, কোথায় তার সঙ্গে মােলাকাৎ হতে পারে, বল।।

—“আজ সন্ধ্যাতেই। টাইগ্রিস নদীর ধারে বেগম জুবেদার যে বড় মসজিদ রয়েছে সেখানে আপনি নামাজ করতে যাবেন। নামাজ সেরে ঘুমিয়ে পড়বেন। তারপরের কর্তব্য আমার।'

আমি খােজা প্রহরীটির পরামর্শমত টাইগ্রিসের ধারের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়লাম। তারপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। কাক ডাকা ভােরে কাঠের বাক্স ও খােজা ক্রীতদাসে ভর্তি একটি নৌকো ঘাটে ভিড়ল। আমার প্রাণ-প্রেয়সী সে-সুন্দরীও সঙ্গে রয়েছে দেখলাম। সে আমাকে আদরে-সােহগে বিহুল করে তুলে বলল- এ বাক্সে তােমাকে পুরে তালাবন্ধ করে নিয়ে যাব। করলও তা-ই।  তালা খুলে আমাকে যখন বাক্স থেকে বের করা হ’ল তখন তাকিয়ে দেখি, আমি প্রাসাদাভ্যন্তরে অবস্থান করছি। দাসী পােশাক পরিয়ে দিল আমাকে। এবার বেগম জুবেদা এসে হাজির হলেন। আমাকে বসতে বলে আমার নাম-ধাম-পেশা প্রভৃতি জিজ্ঞেস করলেন। আমার কথায় তিনি খুবই সন্তুষ্ট হলেন। মুচকি হেসে বলেন -“দিন দশেকের মধ্যেই তােমাদের শাদীর ব্যবস্থা করে ফেলব। আর সে-দশদিন তুমি আমাদের প্রাসাদেই থেকে যাবে। নৌকো থেকে অতিকায় কয়েকটি বাক্স মাঝিমাল্লারা ধরাধরি করে নামাল। তাদের মধ্যে আমার পরিচিত সে-খােজাটিও রয়েছে দেখলাম। আমার মেহবুবা বাদশাহের লেড়কি তার পাশে। আমাকে তার ভবিষ্যৎ ইচ্ছার কথা বলল। আদর-সােহাগ ত করল খুব করে। তারপর আমাকে বাক্সবন্ধী করে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা বল্ল। আমি মুচকি হেসে বাক্সের ভেতরে ঢুকে বসলাম। তালা বন্ধ করা হ’ল। তোলা হ’ল নৌকোয়। বাক্স খুলে বের করার পর চারদিকে কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখি, আমি হারেমে অবস্থান করছি। খােজার নির্দেশে ঘণ্টা বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে কুড়িজন সুদেহী ও সুশ্রী যুবতী পরিচারিকা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল।

বেগম জুবেদা ধীর-মন্থর গতিতে, সুন্দর ভঙ্গিমায় সুপ্রশস্ত নিতম্ব দুলিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমার নাম, সাকিন ও পেশা প্রভৃতি এক এক করে খুটিয়ে খুটিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন—“আমি প্রীত। দশদিনের মধ্যে তােমাদের শাদী-নিকা দেব। এ কদিন প্রাসাদেই তুমি থাকবে।

একদিন খলিফা যৌতুকস্বরূপ দশ হাজার সােনার মােহর পাঠিয়ে দিলেন। বেগম নিজে দিলেন পঞ্চাশ হাজার দিনার। কাজী উপস্থিত হয়ে শাদীর কবুলনামা লিখলেন। সাক্ষীরাও যথা সময়ে এসে গেল। আমাদের শাদীর কাজ মিটে গেল। জোরদার খানাপিনার ব্যবস্থা হ’ল। সরাবের জোয়ার বয়ে গেল। আমি আশ মিটিয়ে ‘জিরবাজা’ খেলাম। লােভ সামলাতে না পেরে মাত্রাতিরিক্তই হয়ে গিয়েছিল। উঠে হাত মুখ ধোয়ার মত ক্ষমতাও যেন ছিল না।

তারপর জনানারা আমাদের নিয়ে কী সব স্ত্রী আচার করল আনন্দ করে। তারপর নিয়ে যাওয়া হ’ল ফুলশয্যার সজ্জিত বাসর ঘরে।

একদল পরিচারিকা আমার সদ্য শাদী করা বিবিকে নিয়ে এল। প্রচলিত প্রথানুযায়ী তাকে একেবারে বিবস্ত্র করা হ’ল। সবার সামনে তার শরীরের যৌবন চিহ্নগুলিকে আমার কাছে তুলে ধরাতে সে যেন শরমে মরে যাচ্ছিল। তার গালদুটো হঠাৎ পাকা আপেলের মত লাল হয়ে উঠল। সে হাত দুটো দিয়ে নিজের শরীরের গােপন জায়গাগুলিকে চাপা দেওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বরাত ভাল যে, পরিচারিকারা তাকে উলঙ্গ অবস্থায় পালঙ্কে শুইয়ে দিয়ে বাসরঘর ছেড়ে গেল। আমি আর আমার মন-ময়ূরী বিবি ছাড়া ঘরে তৃতীয় কোন প্রাণী নেই। আমরা পাশাপাশি গা-ঘেঁষাঘেঁষী করে শুয়ে। আমি এক ঝটকায় তার যৌবনের জোয়ার লাগা বিবস্ত্র দেহটিকে বুকে টেনে নিলাম। ব্যস, শরীরের সর্বশক্তি নিয়ােগ করে অকস্মাৎ সে আমাকে একটা ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল। বিকট আর্তনাদ বেরিয়ে এল - মরে গেলাম। মেরে ফেলল। কী উৎকট গন্ধ। আর পারছিনা - মরে গেলাম। আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম—“কি? কি হ’ল মেহবুবা?”

—“রসুন! জঙ্গলীটি রসুন খেয়ে এসেছে। কী উৎকট গন্ধ গা বমি বমি করছে আমার। আজ-জঙ্গলী বনমানুষকে আমি শাদী করে জীবনসঙ্গী করেছি। আমি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারি নি অসভ্য জঙ্গলীটি এমন করে রসুনের ভক্ত। হতচ্ছাড়াটি ভুলেও আগে বলে নি তার এ কু-অভ্যাসের কথা।

আমি তাকে প্রবােধ দিতে গিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলাম। থামিয়ে দিয়ে সে খেকিয়ে উঠল—‘একটি কথাও বােলাে না। রসুন। যদি খেয়েই থাক তবে কেন তবে কেন গরম পানি দিয়ে ভাল করে হাত মুখ ধোও নি?কথা বলতে কথা বলতে বলতে সে রুমালে মুখ ঢেকে ডুকরে ডুকরে কাদতে লাগল। আমি তাকে হাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করতে চেষ্টা করলাম , এক ঝটকায় আমার কাছ থেকে বেরিয়ে তিন লাফে পাশের ঘরে চলে গেল ।  মুহূর্তের মধ্যেই একটি চামড়ার চাবুক নিয়ে ফিরে এসে আক্রোশে আমার পিঠে সপাং সপাং করে চাবুকের ঘা মারতে লাগল। আমি বিস্ময় ও যন্ত্রণায় বারবার কুঁকড়ে যেতে লাগলাম। আমার দুই জঙ্ঘার মাঝখানে প্রচণ্ড জোরে চাবুকের ঘা পড়ায় আমি পালাবার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেল্লাম।

এবার তার স্বরে কোতােয়ালকে ডাকল। সে এলে হিংস্র পরীর মত গর্জে উঠল - ‘একে নিয়ে যাও। যে-হাত দিয়ে এ রসুন খেয়েছে সে-হাতটি কব্জি থেকে কেটে ফেল।”

চিৎকার চেঁচামেচি শুনে পরিচারিকারা ছুটে এল। তারা আমার হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবারের মত ছেড়ে দিতে সনির্বন্ধ অনুরােধ করতে লাগল। আমার বিবি ক্ষমা করল। কিন্তু বেকসুর খালাস করে দিতে রাজি নয়।]

বাসরঘরে আমাকে একা ফেলে রেখে বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে দিল। জানালা দিয়ে পানি খানা দিত। আমার বিবি দশদিন পর পরিচারিকাদের নিয়ে দরজা খুলে আমার কাছে এল। পরিচারিকাদের লক্ষ্য করে বল্ল –এর গায়ে এমন একটি চিহ্ন এঁকে দেব যাতে জিরবাজা’র কথা এর স্মরণ থাকে। আমার বিবির নির্দেশে পরিচারিকারা আমাকে পিঠমােড়া করে বেঁধে ফেলল। তারপর ধারালাে একটি ছুরি দিয়ে ঘ্যাচ্‌ ঘ্যাচ করে আমার হাত পায়ের সব ক'টি বুড়াে আঙুল একেবারে গােড়া থেকে কেটে ফেলল। কী যন্ত্রণাদায়ক, কী মর্মান্তিক ও অমানবিক কাজ। লঘু অপরাধে এমন গুরুদণ্ডের কথা আপনারা কেউ শুনেছেন কোনদিন?

সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে আমি উন্মাদের মত চিৎকার করে বলতে লাগলাম ‘ভবিষ্যতে আর কোনদিন ভুলেও জিরবাজা খাব না। আর যদি খাইও তবে চল্লিশবার পটাশ, চল্লিশবার সাবান সােডা দিয়ে ভাল করে হাত ধুয়ে তবেই খাব।

-দোস্ত, আমার জিরবাজা না খাওয়ার জন্য আমার গোস্তাকি মাফ করবেন। আমি বিবির কাছে হলফ করেছিলাম। এ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে বটে। কিন্তু কসম তাে খােদার কাছে করেছিলাম।

রসুইকর এবার বলল- ‘জাহাপনা, আমি সে বাগদাদের বনিককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ‘খােদাতাল্লার নামে শপথ

শপথ করে জিরবাজা ছাড়লেন, ভাল কথা। কিন্তু পরিণামে কি হ'ল?‘খােদাতাল্লার নামে শপথ করায় আমার বিবির দিলটি একটু গলে গেল। আমাকে মাফ করে দিল। তারপর আমরা বেশ কিছুদিন অন্য দশজন মিঞা-বিবির মতই এক সঙ্গে ঘর সংসার করেছিলাম।

আমার বিবি পঞ্চাশ হাজার সােনার মােহর দিল একটি বাড়ি কেনার জন্য। সুন্দর একটি বাড়ি কিনলাম। একবছর আমরা সেখানে বাস করেছি। বছর পেরােবার আগেই সে দুনিয়া ছেড়ে বেহেস্তের পথে যাত্রা করল। ব্যস, সব বেচে দিয়ে আমি হারা উদ্দেশ্যে পথে নেমে পড়লাম। বহু দেশের পানি খেয়ে শেষ পর্যন্ত আপনাদের মুলুকে এসে হাজির হলাম।

রসুইকর বলল- ‘জাঁহাপনা, বাগদাদের বণিকের কাহিনী সংক্ষেপে আপনার দরবারে পেশ করলাম।

নিমন্ত্রণ বাড়ি থেকে আমরা বেরিয়ে যে, যার আস্তানার পথে পা বাড়ালাম। রাত্রি তখন দ্বিতীয় প্রহর। তারপর কুঁজোটির লাশ নিয়ে যা কিছু কাণ্ড ঘটেছে সবই তাে এক এক করে শুনলেন।

চীন দেশের বাদশাহ এবার বিতৃষ্ণার সঙ্গে বললেন –“তােমরা যে, যা কিসসা শােনালে তাদের একটিও চমকপ্রদ নয়। ঘটনার বাঁধন তাে নেই-ই। এর চেয়ে বরং হতভাগ্য কুঁজোটির মৃত্যুর কাহিনী অনেক বেশী আকর্ষণীয়। অতএব তােমাদের ফাঁসির দড়ি গলায় পরতে হচ্ছেই।

ইহুদী হেকিমের কিসসা বাদশাহ যখন ক্রোধ প্রকাশ করে কুঁজোটির মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত লােকগুলাের শাস্তির চিন্তা করছেন তখন বৃদ্ধ ইহুদী হেকিম বলল—“জাঁহাপনা, এবার আমাকে কিছু বলার জন্য মেহেরবানী করে সুযােগ দিন। আশা করি আমার কিস্সা আপনাদের মনে দাগ কাটতে পারবেই।

বাদশাহ অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনুমতি দিলেন।

বৃদ্ধ ইহুদী হেকিম তার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বলল‘জাঁহাপনা, কিসসাটি আমি কিশাের বয়সে শুনেছিলাম। আমি তখন দামাস্কাসে বাস করি। হেকিমি বিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা করছি। ওখানকার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঠ শেষ করে আমি এদিকে ঝুঁকি। এক সকালে স্থানীয় সুবেদার পেয়াদা পাঠিয়ে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। বিশাল ইমারতের লম্বা বারান্দা দিয়ে এগিয়ে সুসজ্জিত একটি ঘরে ঢুকলাম। দেখি মেহগনি কাঠের কারুকার্য মণ্ডিত পালঙ্কে এক কিশাের শুয়ে। রােগশয্যায়। আমি সমবেদনার স্বরে জিজ্ঞাসা করলাম- “কি হয়েছে বাছা?'

সে নীরবে, চোখের ইশারায় কি যেন বােঝাতে চেষ্টা করল। আমি হাত দেখতে চাইলে সে বাঁ-হাতটি বাড়িয়ে দিল। এরকম অশিষ্ট আচরণে আমি খুবই ক্ষুব্ধ হলাম। ভাবলাম সম্রান্ত ঘরের যুবক, সাধারণ সৌজন্য বােধটুকুও শেখেনি। বাঁ-হাতের নাড়ি দেখে দাওয়াই দিয়ে এলাম। তারপর দিনও গেলাম। পরদিনও যেতে হ’ল। দশদিন চিকিৎসা করে তার রােগ কিছু নিরাময় করা গেল। সুবেদার ইনাম দিয়ে আমাকে সন্তুষ্ট করলেন। আর দামাস্কাসের প্রধান হাসপাতালে চাকুরী দিয়ে কৃতজ্ঞতার পরিচয় দিলেন। প্রতিদিনই একবার করে আমার রােগীটিকে দেখতে যাই। কিন্তু একটি ব্যাপার আমার মনের কোণে বার বার উকি দিতে লাগল। “সে রােজই কেন বাঁ-হাতটি এগিয়ে দেয় ? সত্যি কি সৌজন্যবােধের অভাবই এর জন্য দায়ী নাকি অন্য কোন গৃঢ় কারণ এর পিছনে রয়েছে? দশদিন পরে গরমজলে গামছা ভিজিয়ে তার গা মুছিয়ে দিতে বললাম। সুবেদার অনুরােধ করলেন এ-কাজটিও যেন আমি উপস্থিত থেকে সম্পন্ন করি। তার পা-জামা কামিজ সব খুলে ফেলতেই আমার আঁখিতে প্রথম ধরা পড়ল— তার ডান-হাতটি কাটা। আর সারা গায়ে চাবকের দাগে ভর্তি।

আমি বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। যুবকটি বল—‘হেকিম সাহেব, খুবই অবাক হচ্ছেন, তাই না? অবাক হবার কথাই বটে। এ কিন্তু আমার জন্মলগ্ন থেকে ছিল না। সে অদ্ভুত কিসসা অবশ্যই বলব। তবে এখন নয়, পরে।

যুবক আমাকে নিয়ে ওপর তলার এক নিরিবিলি ঘরে গেল। রসুইকারকে খবর পাঠাল ভেড়ার কাবাব করে সেখানে পাঠিয়ে দিতে। খেতে খেতে একথা সে কথার পর আমি তাকে বললাম—  ‘আপনার প্রতিশ্রুত সে কাহিনী এখন বলবেন কি?যুবকটি বাঁ-হাতে ভেড়ার কাবাবের থালাটি কাছে টেনে নিয়ে বললেন—“শুনুন তবে আমার কাহিনী বলছি- মসুল নগরে আমার জন্ম হয়েছিল। খানদানি পরিবার। আমার আব্বা আর চাচারা দশ ভাই। আমার আব্বা সবার বড়। আমার দাদামশাই নিজেই দশ লেড়কাকেই শাদী দিয়ে ঘর-সংসার পেতে দিয়ে যান। আমার বাবা ছাড়া আমার চাচাদের কারােরই কোন বাচ্চাটাচ্চা হয় নি। তাই আমি ছিলাম চাচাদের চোখের মণি। আদরের দুলাল। এক জুম্মাবারের ঘটনা। সেদিন আমার আব্বা আর চাচারা মসুলের বৃহত্তম মসজিদে নামাজ পড়তে গেলেন। আমিও তাদের সঙ্গে যাই। নামাজের পর অন্যান্য সবাই মসজিদ ছেড়ে নিজের নিজের ঘরে ফিরল। আমার আব্বা আর চাচারা কেবল রয়ে গেলেন। চাচারা বাণিজ্য করতে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত মিশরে যাওয়াই সাব্যস্ত করলেন। নীলনদের তীরে সে দেশের প্রধান নগর ও বন্দর। দুনিয়ার বহুত দেশ ঢুঁড়ে বেড়িয়ে তারা বুঝেছেন, মিশরের মত মনােরম দেশ তামাম দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি আর নেই। সেখানে গেলে নাকি মনে হয় দুনিয়ার দুঃখকষ্ট ভুলে ভিনমুলুকে অবস্থান করছি।

বেহেস্তের মত সুন্দর এক দেশ চাক্ষুষ করার জন্য আমার দিল ছটফটানি শুরু করে দিল। আব্বাকে আমার ঐকান্তিক ইচ্ছার কথা জানালাম। প্রথমে আমাকে এত দূরে পাঠাতে রাজি হলেন না। শেষ পর্যন্ত আমি আশাহত হ’ব ভেবে দামাস্কাস পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসব, এ শর্তে রাজি হলেন।

আমাদের জাহাজ মসুলি বন্দর থেকে দামাস্কাসের উদ্দেশে যাত্রা করল। আলেপ্পো নগর হয়ে পৌছলাম দামাস্কাস নগরে। জানা-অজানা গাছপালা আর ফুল ফলের বাগিচায় ভরা বেহেস্তের মত সুন্দর দামাস্কাস নগর। তারই পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কল্লোলিনী নীলনদ। আমি এক সরাইখানায় মাথা গোঁজলাম আর চাচারা বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে নগরে ঘােরাফেরা করতে চলে গেলেন। তারা মসুল থেকে আনা সমানপত্র বেচলেন। আবার দামাস্কাস থেকে দুষ্প্রাপ্য বহু কিছু সওদা করে জাহাজ বােঝাই করলেন।

আমার চাচারা কাজ মিটিয়ে যাত্রার উদ্যোগ নিলেন। আমার দামাস্কাস ছেড়ে যেতে মন চাইল না। রয়ে গেলাম। তারা আমার মুনাফার বখরা মিটিয়ে দিয়ে গেলেন।

আমি নীলনদের লাগােয়া সুন্দর একটি বাড়ি ভাড়া করলাম। ভাড়া দু' দিনার। এক বিকালে নদীর দিকে মুখ করে আমি বারান্দায় বসে সরাব পান করছি। দেখলাম, এক রূপসী যুবতী আমার সামনে এসে দাড়াল। অষ্টাদশী বলা যাবে না—যােড়শী।

Post a Comment

0 Comments