গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
খােদাতাল্লার দোয়ায় আপনার হয়ত অনেক ধনদৌলত আছে। তবুও যে আমাকে একবার মাত্র দেখেই আমার চরিত্র সম্বন্ধে ধারণা করতে পেরেছেন সে আপনার অপরিমিত অভিজ্ঞতার জন্যই হয়ত সম্ভব হয়েছে। যদি মেহেরবানী করে গরীবের কুটীরে একবারটি পায়ের ধূলাে দেন তবে ধন্য হব । আমার ভেতরে কামস্পৃহা ত চড়াক করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সাহসে ভর করে বলেই ফেল্লাম—সুন্দরী, আমাকে বাড়িতে আমন্ত্রণই যখন জানাতে পারলেন তখন আর বিভেদ প্রাচীরটুকু অক্ষুন্ন রেখে আমার কলিজাটিকে কেন মিছে কষ্ট দিচ্ছেন? ওড়নার নাকাবটি সরিয়ে ফেলে ওই কমলবদন দেখে মনপ্রাণ শান্ত করার সুযােগ দিলে জীবন সার্থক জ্ঞান করব।'
মেয়েটি নাকাব তুলে নিয়ে ঠোঁট টিপে টিপে হাসতে লাগল। হঠাৎ চার চোখের মিলন ঘটে যাওয়ায় শরমে তার মুখাবয়বটি সিঁদুরে মেঘের মত রক্তাভ হয়ে উঠল। আকস্মিক শরমে চোখ নামিয়ে নিল কিন্তু আড়চোখে আমাকে দেখার লােভ সামলাতে পারল না। ঠোটের কোণের দুষ্টুমিভরা হাসির রেখাটুকু মুহূর্তের জন্যও মিলিয়ে যায়নি।
আমার বুকের মধ্যে কেমন যেন এক অনাস্বাদিত ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। হৃদস্পন্দন দ্রুততর হ’ল। রক্তের গতি বৃদ্ধি পেয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। লেড়কিটি আবার মুখ খুলল-“আমার ঠিকানা দোকানির কাছেই পেয়ে যাবেন। আশা করি অবশ্যই আমার বাড়ি আসছেন, কি বলেন?
আমি কিছু বলার আগেই সে শাড়ীটি হাতে নিয়ে দোকান ছেড়ে রাস্তায় নেমে গেল। আমি তার ফেলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেল্লাম।
সারাটি দিন সে-অপরূপার ডাগর ডাগর চোখের মন-পাগল করা চাহনি, বিচিত্র ভঙ্গিতে ভ্রু নাচান, ঠোটের কোণের কামােদ্দীপক হাসি—আমার মনকে পীড়া দিতে লাগল। সরাইখানায় পেীছে রাত্রে খানাপিনা করতে আর মন চাইল না। শুয়ে পড়লাম। ঘুম এল না। মন-প্রাণ যদি সুস্থির না-ই থাকে তবে ঘম তাে আসতে পারে না। মাঝ-রাত্রি পর্যন্ত নিদারুণ অস্থিরতার মধ্যে বিছানায় পড়ে ছটফট করলাম। বাকি রাত্রিটুকু কাটালাম | অস্থিরভাবে পায়চারি করে কাকডাকা ভােরে গােসল সেরে ঝকমকে দামী পােশাক পরে নিলাম। হাঁটতে হাঁটতে বদর-অল-দীন-এর দোকানে গেলাম। আমার পােশাককে কেন্দ্র করে বদর রঙ্গ-তামাশায় মেতে উঠল।
আমার আকাঙ্ক্ষিতা সে অপরূপা গুটিগুটি পায়ে দোকানে ঢুকল। সে কিন্তু ভুলেও দোকানির দিকে চোখ ফেরাল না। সর্বক্ষণ আমার মুখের দিকে দৃষ্টি বদ্ধ রাখল। কুশল বার্তাদি আদান-প্রদান হ’ল আমার মধ্যে। তারপর উঠতে উঠতে বলল—“আপনার কোন লােক আছেন, একবারটি আমার সঙ্গে বাড়ি যেত? আপনার প্রাপ্য দিনার ক’টি তার হাতে দিয়ে দিতাম। ‘আপনি কেন সে শাড়ীটির জন্য এমন উতলা হচ্ছেন, বুঝছি না। এত ব্যস্ততা কিসের ? পরে যা হয় দেখা যাবে। সামান্য ক'টা দিনারের অজুহাতে হয়ত দেখবেন কোনদিন আপনার ঘরে গিয়ে হাজির হয়েছি।' ফিক করে হেসে উঠল লেড়কিটি। দাঁত দিয়ে ঠোট কামড়ে ধরল বিচিত্র ভঙ্গিতে। থলি খুলে এগারশ দিরহাম আমার হাতে গুজে দিয়ে বলল- ‘অজুহাতের দরকার হবে না। যখন দিল চায় চলে যাবেন। চলি।
দোকান থেকে বেরিয়ে সােজা হাঁটা জুড়ল। একটি ব্যাপার কিন্তু আমার কাছে সুস্পষ্ট হ’ল। দিরহামগুলাে আমার হাতে দেওয়ার সময় তার হাতের আঙুলগুলাে প্রয়ােজনের তুলনায় একটু বেশী সময়ই আমার হাতের তালু স্পর্শ করেছিল। তার কি হ'ল কতটুকু কি পেল আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে মুহূর্তের স্পর্শেই আমার শরীরের শিরা উপশিরাগুলাে ঝনঝনিয়ে উঠেছিল।
বুকের স্পন্দন দ্রুততর হয়ে পড়েছিল। কোন নারীর সামান্য স্পর্শে এত সুখ-উৎপাদন করতে পারে তা আমার অন্ততঃ জানা ছিল না। আমার বুঝতে বাকি রইল না মনময়ুরী জালে আটকা পড়েছে। আপন মনে হাসলাম। আমিও দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। তার পিছু নিলাম। কিন্তু কস্মাৎ সে ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল। মনটি অস্বাভাবিক বিষিয়ে উঠল। এমন সময় তেরাে-চোদ্দ বছরের একটি মেয়ে। আমার সামনে এসে মুচকি হেসে বলল-“মেহেরবানি করে আমার মালকিনের ঘরে একবারটি পায়ের ধুলাে দেবেন? তিনি আপনার সঙ্গে জরুরী কিছু কথা বলতে আগ্রহী “।
-“বহুত আচ্ছা। চল, এখনই যাওয়া যাক।একটি দোকানের পাশে তাঁর সঙ্গে দেখা। চোখে ইশারা করে জানালাে পাশের এক নিরিবিলি জায়গায় আমাকে যেতে হবে।
আমি তার নির্দেশিত প্রাচীরের ধারে চলে গেলাম। পরমুহূর্তেই সেও সেখানে হাজির হ’ল। সে বােরখার নাকাব সরিয়ে মিনতির দৃষ্টিতে তাকাল। বলল—“আঃ তােমাকে দেখামাত্র আমার বুকের ভেতরে কেমন যেন এক অভাবনীয় রােমাঞ্চ অনুভব করছি। শিরায় শিরায় জেগেছে মাতন। আমার রাত্রের ঘুম তুমি কেড়ে নিয়েছ পরদেশী। কেন এমন হল? তুমি কি যাদুবিদ্যা জান ? তােমার যৌবন আমাকে মাতাল করে দিয়েছে। মেহবুব, আমার মধ্যে কেন তুমি এমন কামাগ্নি জাগিয়ে তুলেছ?
–“আমার অবস্থাও ঠিক একই রকম হয়ে দাঁড়িয়েছে মেহবুবা। তােমার আঁখি-বাণ আমার কলিজাটিকে একেবারে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। কেন? কেন আমি এমন-
আমাকে মুখের কথা শেষ করতে না দিয়েই সে বলে উঠল ‘মেহবুব। তুমি যাবে আমার ঘরে ? তােমাকে বুকের মধ্যে না পাওয়া পর্যন্ত আমার কলিজা ঠাণ্ডা হবে না। আজ নয়। কাল বিকেলে একটি খচ্চরের পিঠে চেপে আমার ঘরে এসাে। জিজ্ঞেস করবে সিনডিক রবাক-এর ঘরের ঠিকানা। আমি ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললাম—‘মেহবুবা, অবশ্যই যাব। নইলে যে আমার কলিজাও শান্তি বারি পাবে না। পরদিন দুপুর পােরােতে না পেরােতেই আমি একটি রুমালে পঞ্চাশটি সােনার মােহর বেঁধে আমার মনমযুরীর খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। লাল রঙের একটি বাড়ির সামনে আমি খচ্চরের পিঠ থেকে নামলাম।
আমি দু’পা এগিয়ে দরজার কড়া নাড়লাম। দুটো খুবসুরৎ লেড়কি এসে দরজা খুলে আমার সামনে দাঁড়াল। এক নজরে দেখেই মনে হ’ল তারা যেন বেহেস্ত থেকে সবে দুনিয়ায় নেমে এসেছে। নতুবা পরীদেরই কেউ হবে হয়ত।
ঠোটের কোণে হাসির রেখা টেনে রূপসীদের একজন বলল‘আসুন হুজুর। আমাদের মালকিন আপনার পথ চেয়ে সকাল থেকে বসে। রাতভর আপনার সুরতের চিন্তায় কাটিয়েছেন। আপনি তার খুশী উৎপাদন করুন হুজুর। আমি অপরূপাদের পিছন পিছন সুন্দর বাড়িটির ভেতরে ঢুকে গেলাম। সদর-দরজা থেকে শুরু করে উঠোন, বারান্দা, ঘরের মেঝে সবই বহুমূল্য শ্বেতপাথরের তৈরী। তারা আমাকে নিয়ে সুসজ্জিত একটি ঘরে মেহগনি কাঠের একটি কুর্শিতে বসাল।
কিসসার এ পর্যন্ত বলা হলে বেগম শাহরাজাদ দেখলেন প্রাসাদের বাইরে ভােরের আলাে দেখা দিতে শুরু করেছে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
সন্ধ্যার কিছু পরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন। উপস্থিত হলেন বেগমের কামরায়। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন— জাহাপনা, কায়রাের সে-খ্রীস্টান দালাল তার কিসসা বলে চললেন। অধীর আগ্রহে, একাগ্রচিত্তে সুলতান তার কাহিনীর পরবর্তী অংশ শুনতে লাগলেন। খ্রীস্টান দালালটি এবার বলল- জাহাপনা, সেই যুবকটি বলতে লাগল আমার জান, আমার কলিজা সেরূপসী মণি-মুক্তার গহনায় নিজেকে সাজিয়ে তুলে ধীর-পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এল। পরণে তার অতিমিহি ঢাকাই মসলিম। তবু মনে হ’ল সে যেন একেবারেই নগ্না। তার নিটোল স্তন দুটো খুবই স্বচ্ছ। আর নিতম্ব, উরু, জঙ্ঘা সবই পরিষ্কার আমার আঁখি দু’টির সামনে ধরা দিচ্ছে। নগ্ন এক নারীর মুখােমুখি যেন আমি দাঁড়িয়ে।
ঠোটের কোণে অত্যাশ্চর্য এক হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে আমার মেহবুবা, আমার পেয়ারের বেগম আমার পাশে, একেবারে গা-ঘেঁষে এসে দাঁড়াল। তার আঠারাে বছরের যৌবনভরা দেহের উষ্ণ উপস্থিতি ঢাকাই মসলিনে ঢেকে রাখতে পারল না।
আমি নীরব চাহনি মেলে তার যৌবনকে চাক্ষুষ করতে লাগলাম। কি করব, কি বলব সহসা গুছিয়ে উঠতে পারলাম না। সেই অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করল। আচমকা আমার মুখটিকে তার উষ্ণ-নিটোল বুকে চেপে ধরল। আমি যেন মুহুর্তে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। এতদিন শুধু ভেবেই এসেছি, কি এমন অমৃতভাণ্ড নারীর উন্নত স্তন দুটো যার ক্ষণিক স্পর্শের লােভে পুরুষরা ছোঁক ছোঁক করে বেড়ায় ? আজ বুঝলাম, কেবল অমৃতই নয়। তাতে রয়েছে আকর্ষণীয় মাদকতা গুণ। পর মুহুর্তেই সে তার পদ্মের পাপড়ির মত সুন্দর ঠোট দুটোকে নামিয়ে এনে আমার ঠোটে রাখল। আহারে! কী সে সুখ, কী যে স্বস্তি তার বিচার করার ভাষা আমার জানা নেই। আমার ঠোট—ওর ঠোট—মধু বিনিময় তৃপ্তি। আমি কি করব, কিসে যে বেশী সঙ্গসুখ অনুভব করতে পারব সে বােধশক্তি হারিয়ে ফেললাম।
সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। উন্মাদিনীর মত তার বুকের সঙ্গে আমার প্রশস্ত বুকটিকে চেপে ধরল। আমি তার কাঁধের ওপর দিয়ে হাত দুটোকে চালিয়ে দিয়ে শরীরের সর্বশক্তি প্রয়ােগ করে তাকে চেপে ধরলাম। আমার একেবারে বুকের সঙ্গে সে লেপ্টে রয়েছে। তবু মনে হ’ল, আরও, আরও কাছে তাকে পাওয়ার জন্য মন প্রাণ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। সে আবেশে জড়িত, কামাতুর চোখ দুটো মেলে আমার দিকে তাকিয়ে আবেগ-মধুর স্বরে বলল ‘মেহবুব আমার আজকের এ-সন্ধ্যা আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। ওগাে পরদেশী, তুমি আজকে কি সুখ, কী অবর্ণনীয় তৃপ্তি আমাকে দিলে তা আমি তােমাকে বােঝাতে পারব না!'
আমি তার আপেলরাঙা কপােলে আলতাে করে একটি চুম্বন দিয়ে বললাম—‘সুন্দরী, আমার অবস্থাও তােমারই মত। আজ এই প্রথম মহব্বতের স্বাদ পেলাম। মহব্বত যে কী মধুর বস্তু তা আজই প্রথম উপলব্ধি করলাম। ওগাে সুখদায়িনী, আমার কলিজা আজ অমৃতের স্বাদ পেয়ে ধন্য হল।
সে আমার পৌরুষের চিহ্ন সম্বলিত লােমশ বুকে মাথা গুঁজে আবার মধুর স্বরে বলল—“আমি এর আগে কোনদিন কোন পুরুষের কাছ থেকে মহব্বত পাইনি। আমার শাদী হয়েছিল। এক বুড়া আমার জীবনে এসেছিল। অগাধ ধন-দৌলতের মালিক। কিন্তু নারীকে প্রকৃত সুখ আস্বাদন করানাের মত বলতে, কিছুই ছিল না। আমার কাছে সে ছিল অভিশাপ মাত্র। আজ তুমি আমাকে পেয়ার মহব্বতে ভরিয়ে দাও, আকুল প্রাণকে শান্ত-স্নিগ্ধ কর, তৃপ্ত কর আঠার বছরের অতৃপ্ত মনকে। আমিও আমার সযত্নে রক্ষিত সম্পদ তােমাকে উজাড় করে দেব। আমার এ-দেহ আর এ মন সবই তােমার মেহেবুব। রাত্রে পানাহার করলাম পাশাপাশি বসে। তারপর আমরা জানালার ধারে গিয়ে বসলাম। পাশের বাগিচা থেকে ফুরফুরে বাতাস এসে আমাদের কামােন্মাদ দেহ দুটোকে স্নান করিয়ে দিতে লাগল। শীতল বায়ুর স্নান। এক সময় আমরা কখন যে আরও কাছাকাছি হতে শুরু করেছিলাম তা বলতে পারব না। কখন যে আমি তাকে কোলে তুলে নিয়েছিলাম তা-ও যেন নিজেরই অজান্তে ঘটেছিল। উভয়ে এবার নতুন খেলায় মশগুল হয়ে পড়লাম।
আমরা ক্রমে একে অন্যের কাছে হারিয়ে যেতে লাগলাম। তার দেহ পল্লবটি ছাড়া পৃথিবীর অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমার কিছুমাত্রও হুঁশ রইল না । কখন যে মােমবাটি গলতে গলতে একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে বুঝতেই পারি নি। আর কতক্ষণ যে আমরা পরম প্রিয় অন্ধকারের মধ্যে কাটিয়েছিলাম তা ও সঠিক নিশ্চিত করে বলতে পারব না। কতক্ষণ যে সে আমার বাহুলগ্না হয়ে ছিল তার হিসাবই আমাদের কারো ছিল না। আমার জীবনে এমন মধুঝরা রাত্রি এর আগে কোনদিনই আসে নি।
এক সময় রাত্রি পােহাল। ভােরের আলো জানালা দিয়ে ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে। বিছানা ছেড়ে নেমে এলাম। আমি আমার পরম সুখদাবিনী মেহবুবার কাছ থেকে বিদায় নেবার উদ্যোগ নিলাম। আমাকে দু'বার বন্ধনীতে জড়িয়ে ধরে আবেগভরা কণ্ঠে বলল-'মেহবুব, আবার কবে তােমাকে আমার বুকের মাঝে ফিরে পাব? কবে তােমার যৌবন আমার যৌবনভরা দেহটিকে সুখদান করবে?'
‘আজই । আজ রাত্রেই আবার আমরা মিলিত হ'ব।' সরাইখানায় গিয়ে ভাল করে গােসল করলাম । আমার শরীরের অংশ বিশেষের প্যাচপ্যাচানি দূর হ'ল। সামান্য কিছু নাস্তা করে বাজারে তাগাদায় বেরােলাম। সন্ধ্যার কিছু আগে পঞ্চাশটি স্বর্ণমুদ্রা কামিজের জেবে ঢুকিয়ে উঠলাম আমার পক্ষীরাজ খচ্চরটির পিঠে। আমি মেহবুবাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বারবার চুম্বনের মধ্য দিয়ে বিহ্বল করে তুললাম। নেশা। সুরার নেশার চেয়েও শক্তিশালী। নেশার ঘােরে সারাটি রাত্রি কি করে যে কেটে গেল বুঝতেও পারি নি।
সকালে অবার সরাইখানায় ফিরে এলাম। পঞ্চাশটি সােনার মােহর তার বালিশের তলায় রেখে এসেছি।
সারারাত্রি শরীর ও মনের ওপর খুবই ধকল গেছে। অত্যাচার। গােসল সেরে বিছানায় আশ্রয় করতেই ঘুমের কোলে ঢলে পড়লাম।
সন্ধ্যার কিছু পরে আবার পঞ্চাশটি সােনার মােহর জেবের মধ্যে ঢুকিয়ে উঠলাম আমার প্রিয়সঙ্গী খচ্চরটির পিঠে।
এভাবে একের পর এক রাত্রি আমরা পরস্পরের বাহুডােরে আবদ্ধ হয়ে কাটিয়ে দিতে লাগলাম। একদিন আমি ঠাহর করলাম। আমি নিঃস্ব রিক্ত হয়ে পড়েছি। সঙ্গে অর্থ যা ছিল কমতে কমতে একেবারে চরম দুরবস্থায় এসে পৌচেছে। অর্থ চাই। মােহর। সােনার মােহর। রােজ পঞ্চাশটি করে সােনার মােহর যে আমার চাই-ই চাই। কিন্তু কোথায় পাব কাছে কিছু পাওনা নাই। হারা উদ্দেশ্যে রাস্তায় ঘুরতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি, এক সিপাহীর পিছনে কিছু লেড়কা ভিড় করে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে। আমি ভিড় ঠেলে তার গা-ঘেঁষে গিয়ে দাড়ালাম। হঠাৎ তার জেবে আমার গা ঠেকল। বুঝলাম, মােহরের থলে। আলতাে করে তুলে নিলাম। পারলাম না। সামলাতে পারলাম না। সিপাহীটি চেঁচিয়ে উঠল—“আমার মােহরের থলে গেল কোথায় ? আচমকা আমার মুখে একটি ঘুষি লাগল। বিকট আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। ঠিক তখনই সে-পথে কোতােয়ালকে দেখা গেল। আমাকে তল্লাসী করা হ’ল। জেব থেকে সিপাহীর মােহরের থলিটি পাওয়া গেল।
বামালসহ হাতেনাতে ধরা পড়ে গিয়েছি। অস্বীকার করার উপায় নেই। কোতায়ালের নির্দেশে আমার হাত দুটো কেটে ফেলার ব্যবস্থা করা হ’ল। ডান হাতটি কাটার পরে পথচারীরা অনুরােধ করল যাতে অন্য হাতটি, আমার এ বাঁ হাতটি কাটা না হয়।
কোতােয়াল অনুরােধ রক্ষা করল।
আমাকে নিয়ে পাশের দাওয়াখানায় গেল। দাওয়াই দিয়ে প্রয়ােজনীয় ইলাজ করল বুড়াে হেকিম। এবার আমি বেঁ-হুসের মত হাঁটতে হাঁটতে আমার মেহবুবার বাড়ির দরজায় কখন যে হাজির হয়েছি, বুঝতেই পারিনি।
রাত্রের মেহবুব সকালেই হাজির হয়েছি দেখে সে খুবই অবাক হ’ল। আমার কাটা-ডানহাতটি রুমালে ঢাকা। সে কিছু বুঝতে পারে নি। কিন্তু খেতে বসে বাঁ-হাত দিয়ে খেতে দেখে সে অবাক হ'ল।
আমি তাকে শঙ্কামুক্ত করতে গিয়ে বললাম “হাতে একটি ফোড়া উঠেছে। বেঁধে রেখেছি। আমার হাতের ব্যথা কমাবার জন্য সে আমাকে সরাৰ এনে দিল। পর পর দু’গ্লাস গলায় ঢেলে দিলাম।
শরীর এলিয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম ভাঙলে দেখলাম, আমার হাতের বাঁধনটির কিছুটা হেরফের হয়েছে। বুঝলাম, ঘুমন্ত অবস্থায় হাতের বাঁধন খুলে সে দেখেছে। তারপরে আবার বেঁধেছেদে রেখেছে। খুব লজ্জা হ’ল । সে কিন্তু কিছু বলল না, একটিও প্রশ্ন করল না। আমার ঘুম ভাঙতেই সে নীরবে এক পেয়ালা সরাৰ এনে আমার মুখের সামনে ধরল। আমিও নিতান্ত বাধ্য ছেলের মত এক চুমুকে সবটুকু সরাব গলায় ঢেলে দিলাম।।
আমি বেরােতে চাইলাম। সে রুখে দাঁড়াল। বলল-“আগে তােমার হাতের ইলাজ করাতে হবে। এখান থেকে এক পা-ও কোথাও যেতে পারবে না।
আমি আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলাম না। তার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে কৃত-অপরাধের জন্য ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। আর বারবার বলতে লাগলাম—“আমি চোর। চুরি করতে গিয়েছিলাম। ধরা পড়ে আমার এ-শাস্তি হয়েছে।
‘কেঁদো না সােনা মাণিক। কেন ও কাজ করতে গেলে বল তাে?' লেডকিটি নিজেকেই দোষী সব্যস্ত করেছে। ফুর্তি করার জন্য পঞ্চাশটি করে সােনার মােহর তাে আমায় দিয়ে গেছে। এভাবেই তাে সে আজ আমির থেকে ফকির হয়ে গেছে। আমার গায়ে - মাথায় হাত বােলাতে বােলাতে সে বলল—‘মেহবুব আমার, কোথাও যেতে হবে না তােমাকে। আমার জন্যই তাে তােমার এরকম হয়েছে। আমাকেই তার প্রায়শিচত্ত করতে দাও।
–‘আমি তাে আর গুঁড়া লেড়কা নই যে, তুমি আমার এদশার জন্য দায়ী হবে। আমি তাে স্বেচ্ছায়ই এগিয়ে এসেছি। কেন মিছে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ, অপরাধী বােধ করছ?’ কথা বলতে বলতে তাকে বুকে টেনে নিলাম। বাঁ-হাতটি তার পিঠে আলতাে ভাবে বুলাতে লাগলাম। বল্লাম-কেন তুমি মিছে নিজেকে অপরাধী মনে করে কষ্ট পাচ্ছ ? নিজের দোষেই তাে আমি ডান-হাতটি খুইয়েছি। আমার নির্বুদ্ধিতাই এর জন্য দায়ী। –‘সে যা-ই হােক, আমি তােমাকে এখান থেকে যেতে দিচ্ছিনে। তােমাকে আমি শাদী করে জীবনসঙ্গী করে নেব। আমার যা কিছু সম্পত্তি আছে সবই তােমার হাতে তুলে দেব। ব্যবসা করবে। তাতেই আমাদের সুখে-দুঃখে কোনরকমে দিন গুজরাণ হয়ে যাবে।'
তার কথা শুনে আমি তাে একেবারে থ বনে গেলাম। অন্তর থেকে পেয়ার করতে না পারলে তাে এমন কথা বলা সম্ভব নয়। সে আমাকে নিয়ে গেল তার লােহার সিন্দুকের কাছে। নগদ অর্থ, সােনাদানা, হিরে-জহরৎ যা কিছু তার ছিল সবই দেখাল। আর দেখলাম আমার দেওয়া মােহরগুলাে তেমনি ভাগে ভাগে সাজানােই রয়েছে। সবই আমার হাতে তুলে দিয়ে সে বলল-“নাও, এগুলাে দিয়ে নতুন করে ব্যবসা শুরু করে দাও। আমাদের বাঁচতে হবে। আর তার জন্য তােমাকে মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে, মনে রেখাে। আমি নতুন করে আশার আলাে দেখতে পেলাম। নতুন জীবনের খােয়াব আমার মধ্যে ভর করল।
একটি ব্যাপার আমার চোখে পড়ল। আমার মেহবুবার মধ্যে সর্বক্ষণ কেমন যেন এক অকথিত ব্যথা যন্ত্রণা কাজ করে চলছিল। ঘুমের ঘােরেও প্রায় বলতাে‘আমি, হ্যা আমিই ওর এ-হালতের জন্য দায়ী। আমার জন্যই তাে তাকে ডান হাতটি খােয়াতে হ’ল। এ-দুঃখ আমি কোথায় রাখব! আমার মত হতভাগিনীর মরণ হওয়া এর চেয়ে ঢের ভাল। আমি তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে বলতাম--মেহবুবা, কেন সব ভুল বকছ বল তাে? আমার একটি হাত ছাড়া তাে আর কিছুই যায় নি। তারজন্য এত মর্মবেদনা ভােগ করছ কেন? একটি হাত তাে রয়েই গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, যার জন্য এতসব সেই তুমি তাে আমার পাশেই রয়েছ। হায় খােদা, আমরা কিন্তু সারাজীবন একসঙ্গে কাটাতে পারলাম না ।
কী বিমারী যে তার ওপর ভর করল, আমি বুঝতেই পারিনি। দূরদূরান্ত থেকে হেকিম নিয়ে এসে ইলাজ করালাম। কিন্তু তার বিমারী সারল না। দিন দিন শুধুই শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেতে লাগল। বুঝতে দেরী হ’ল না, আমার কাটা-হাতটির চিন্তাতেই তার ওপর এমন বিচিত্র বিমারী ভর করেছে। না, কোন চেষ্টাতেই ফল পাওয়া গেল না। কোন হেকিমের দাওয়াই-ই ধরল না। একদিন আমাকে ফেলে সত্যিই সে বেহেস্তে চলে গেল। সে মারা যাওয়ায় তার যাবতীয় ধনদৌলতের মালিক আমি হলাম। মনে মনে বললাম—হায় আল্লা, একী হ’ল। এত ধনদৌলত আমার কোন কাজে লাগবে? অর্ধেক বিক্রি করে দিলাম। এ পঞ্চাশ মন ক্ষীরার বীজ ছিল, যা আপনার কাছে বিক্রি করেছি। বিষয় সম্পত্তি যা আছে বেচে দেওয়ার ধান্দায় ঘুরছিলাম বলে। আপনার কাছে এসে ক্ষীরার বীজের দাম নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি। এখন আর নেওয়ার ইচ্ছাও নেই। আমি চাই, তা দিয়ে আপনি ব্যবসা করে প্রতিষ্ঠিত হােন। আপনার উন্নতি আমাকে আনন্দিত করবে, মনে রাখবেন।যুবকটি বলল –‘এ-ই আমার জীবন কথা। তাই তাে আজ আপনার ঘরে বাঁ-হাত দিয়ে খানা খেলাম, সরাব পান করলাম।
জাঁহাপনা, আমি যুবকটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে বললাম,-“তােমার করুণার কথা জীবনে এক মুহুর্তের জন্যও ভুলতে পারব না।”
—“দেখুন, আজ আপনার সে-চার হাজার দিরহাম আমার কাছে খুবই তুচ্ছ ব্যাপার। ধন-দৌলতের পাহাড় গড়ে ফেলেছি আমি। বাগদাদ নগরে সম্প্রতি আমি এক কারবার আরম্ভ করেছি। আপনি আমার সঙ্গে কারবার করতে আগ্রহী হলে খুশীই হ’ব।
আমি এক কথাতে রাজি হয়ে গেলাম। আলেকজান্দ্রা আর কায়রাে থেকে সমানপত্র এনে চড়া দামে বিক্রি করে কিছুদিনের মধ্যেই একেবারে দিনারের কুমীর হয়ে গেলাম। কাল রাত্রে সরাব একটু বেশীই গিলে ফেলেছিলাম হুজুর। তারপরই কুঁজো ওই অষ্টাবক্রটির লাস নিয়ে ফাঁসাদে পড়ে যাই।
বেগম শাহরাজাদ দেখলেন ভাের হয়ে এল বলে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
সাতাশতম রজনী।
বাদশাহ শারিয়ার রাত্রে অন্দরমহলে বেগমের ঘরে এলেন।
বেগম শাহরাজাদ কোনরকম ভূমিকার অবতারনা না করেই কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন- জাহাপনা, সে খ্রীস্টান দালাল তার জীবনকথা শেষ করে সুলতানকে বলল—“হুজুর, কুঁজো অষ্টাবক্র সে-লােকটির মৃত্যুর জন্য যদি কাউকে দায়ী করতে হয় তবে বলব তার নসীবই একমাত্র দায়ী।
সুলতান কিন্তু এত সহজে দমবার পাত্র নন। তিনি পূর্ব স্বর অনুসরণ করে বললেন—“তােমাদের কারাে রেহাই নেই। এক এক করে আমি সব ক’টিকে কোতল করব। আমার দরবারের এক হাস্য রসিককে তােমরা খুন করেছ। আর আমি তােমাদের ছেড়ে দেব ভেবেছ?’
এবার সুলতানের রসুইকর বল ‘জাহাপনা যদি অনুমতি করেন তবে আমি আমার কাহিনী শুরু করি।
—“ঠিক আছে। তােমার বক্তব্যও তবে শােনাই যাক।
– শুনুন জাঁহাপনা। আমার কিসসা শুনে যদি আপনার মেজাজ শরিফ হয়, আমার কথা সত্য বলে মনে করেন তবে যারা আপনার চোখে অপরাধী মনে হচ্ছে আশা করি সবাইকে মাফ করে দেবেন।
সুলতান মুখের গাম্ভীর্যটুকু অব্যহিত রেখেই বললেন—“আচ্ছা, পরের কথা পরেই না হয় ভাবা যাবে। কিসসা শুরু কর। সত্যি যদি মজার ব্যাপার কিছু থাকে তখন বিচার-বিবেচনা করে দেখব।' ।
—“জাহাপনা, গতকাল আমার এক জিগরি দোস্তের বাড়ি............চলতে থাকবে ।

0 Comments