আরব্য রজনী পার্ট ২০ ( Part 20 )

গল্পের পরবর্তী ঃ 
বেড়াতে বেরিয়েছিল। নদীর ধার দিয়ে বেড়িয়ে ফেরার সময় পথে এক কুঁজোর সঙ্গে দেখা হল। লােকটি কুঁজো তাে বটেই, বরং অষ্টাবক্র, মানে হাড়গােড় একেবারে ভাঙাচোরা। একেবারেই বিচিত্র তার চেহারা।

দর্জি আর তার স্ত্রীকে দেখেই কুঁজোটি হঠাৎ সরবে হাসতে শুরু করে দিল। অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে অকারণে কুঁজোকে হাসতে দেখে দর্জি ও তার স্ত্রী উভয়ের কাছেই ব্যাপারটি কৌতূহলের উদ্রেক করল।

কুঁজোর কাছে ব্যাপারটি ভাল ঠেকল না। সে দু’পা এগিয়ে গিয়ে একটু বেশ রাগত স্বরেই বলল—“কি ব্যাপার, তােমরা হঠাৎ এমন দাঁত বের করে হাসছ যে বড়?

–‘হাসি পেলে হাসব না?কথাটি বলেই আবার হাে হাে রবে হাসতে লাগল।

হাসি থামিয়ে এক সময় দর্জিটি বলল—আমাদের বাড়ি যাবে? রাত্রে এক সঙ্গে বসে খানাপিনা করবে, গল্প করবে আর রাত্রিটি আমাদের বাড়িতেই হাসি-আনন্দের মধ্যে দিয়ে কাটাবে, রাজি ?

দর্জির প্রস্তাবে কুঁজো এক কথাতেই রাজি হয়ে গেল। দর্জি কুঁজোটিকে সঙ্গে করে দোকানে এল।

রাত্রে তারা তিনজনে এক সঙ্গে খানাপিনা করতে বসল। খেতে খেতে দর্জি একটু তামাশা করার জন্য এক টুকরাে মছলি নিয়ে কুঁজোর মুখে গুজে দিল। ছােট্ট একটি মানুষ সে। অতবড় টুকরােটি কোনরকমে মুখে ধরলেও চিবােতে পারবে কেন? কিন্তু উগরে ফেলারও উপায় নেই। এদিকে আবার দর্জি কুঁজোটির হাত ধরে বলতে লাগল—“ভাইয়া, খুব ভাল মছলি, ফেলাে না। খেয়ে নাও। নইলে আমি খুব গােসসা করব কিন্তু। দুঃখও কম পাব না।  বহু চেষ্টা চরিত্র করে মছলির টুকরােটি কোনরকমে গিলতে পারলেও বিপদ এড়াতে পারল না। একটি বেশ শক্ত কাটা তার গলায় আটকে গেল। -

গলায় কাটা নিয়ে কুঁজোটি মাটিতে পড়ে কাৎরাতে শুরু করল। অসহ্য যন্ত্রণায় সারারাত্রি কষ্ট পেল। সকাল হবার কিছু পরেই লােকটি মারা গেল।

বেগম শাহরাজাদ দেখলেন, ভাের হয়ে আসছে। পাশের বাগিচার ডালে ডালে পাখীদের পাখার ঝটপটানি শুরু হয়ে গেছে।। শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।

                           পঁচিশতম রজনী 

মধ্যরাত্রির কিছু আগে বাদশাহ শারিয়ার ব্যক্ত-পায়ে অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর ঘরে এলেন।।


শাহরাজাদ তার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন —“জাহাপনা, দর্জির মেহমান সে কুঁজোটি তাে গলায়-মাছের কাটা ফুটে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু দর্জি আর তার বৌ সে ব্যাপার দেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল, দর্জি অসহায় দৃষ্টি মেলে বিবির মুখের দিকে তাকাল-  দর্জির বিবি বলল—“পথের বিপদ ঘরে আনাই কাল হয়েছে। কি আর করবে, আপদটিকে কাধে তােল।


দর্জি কুঁজোর লাসটিকে কাধে তােলার চেষ্টা করল। তার বিবি বলল-“ছেড়ে দাও, আমিই যা বিহিত করার করছি। একটি ছেড়া চাদর জড়িয়ে দর্জির বিবি কুঁজোর লাসটিকে কাঁধে তুলে নিল। এবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সােজা হাঁটতে শুরু করল। দর্জি তাকে অনুসরণ করতে লাগল। দর্জির বিবি নানারকম সুর করে কাঁদতে কাদতে পথ পাড়ি দিচ্ছে। দর্জিও থেকে থেকে গলা ছেড়ে কেঁদে উঠছে। পথে লােকজন কাউকে দেখলে তাদের যৌথ কান্নার স্বর দ্বিগুণ বেড়ে যাচ্ছে। দর্জির বিবি থেকে থেকে বিলাপ করতে লাগল। আমার কী সর্বনাশ হয়ে গেল গাে! আমার বেটা বুঝি আর বাঁচবে না গাে। আমি কাকে নিয়ে থাকবাে গাে ! অকালে আমার বেটার বসন্ত হ’ল কেন গাে? এ কী কাল বসন্ত হ’ল। সারা গায়ে গুটি, ধগধগে ঘা। আমার বেটা বুঝি আর বাঁচবে না গাে! পথচারীরা ভাবল, দর্জির লেড়কার বসন্ত রােগ হয়েছে। অবস্থা খুবই সঙ্গীন। হয় তাে হেকিমের কাছে যাচ্ছে। শেষ চেষ্টা করে দেখবে যদি বাঁচিয়ে তােলা যায়। ফলে পথচারীরা কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের আর বিরক্ত করল না। দর্জির বিবি ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে এক বুড়াে ইহুদী হেকিমের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল।  এক ইয়া মােটা ও কুচকুচে কালাে মাঝবয়সী নফরাণী দরজা খুলে দিল। দর্জির বৌ তাকে একটি সিকি দিয়ে বলল—এটা তােমার বকশিস। আমার বেটার বহুত বিমার। হেকিম সাহেবকে তাড়াতাড়ি ডেকে দাও।

নফরাণীটি সিকিটি কামিজের জেবে ঢুকিয়ে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে থপ থপ করে ওপর তলায় উঠে গেল।।

দর্জির বিবি দর্জিকে বলল—এই সুযোেগ, চল লাশটি সিঁড়িতে রেখে আমরা চম্পট দেই। যে কথা সেই কাজ। চাদর-জড়ান কুঁজোর লাসটিকে সিঁড়িতে ফেলে রেখে দর্জি আর তার বিবি তিন লাফে হেকিমের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। বুড়াে হেকিমের কাছে গিয়ে বলল—এক রােগী এসেছে। অবস্থা খুব খারাপ। জলদি চলুন। নিচে, সিঁড়ির কাছে অপেক্ষা করছে।

বুড়াে হেকিম ব্যস্ততার জন্য চিরাগ নেওয়ার কথা ভুলে গেল। পরিচিত সিড়ি। কোনরকমে হাতড়ে হাতড়ে বুড়াে হেকিম নিচে নামতে লাগল। নিস্তেজ চোখের মণি। আবছা অন্ধকারে ঠিক ঠাহর করতে পারল না। ফলে আচমকা কি যেন একটি বড়সড় বস্তু পায়ে লাগল। হঠাৎ হোঁচট খেয়ে টাল সামলাতে না পেরে বুড়াে হেকিম সিঁড়ি থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। বরাত ভাল যে, কুঁজোর লাসটি সিঁড়ির শেষ ধাপে রাখা ছিল। ফলে হেকিমকে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়তে হ’ল না। হেকিমের পড়ে যাওয়ার শব্দ ও বিকট আর্তনাদে নফরাণী ও হেকিমের বিবি চিরাগ বাতি নিয়ে ছুটে এল। তাকে টানাটানি করে তুলল। চোট তেমন লাগে নি। চিরাগ বাতির আলােয় হেকিম ও তার স্ত্রী দেখল সিড়ির গায়ে একটি চাদর-জড়ানাে কুঁজোমত লােক মরে পড়ে রয়েছে। হেকিমের তো শিরে বজ্রাঘাত হবার জোগার। কী সর্বনেশে কাণ্ড রে বাবা! লােকটি তবে মরেই গেছে!

হেকিম ভাবল, রােগীর লােকজনরা তাকে সিঁড়িতে চাদর গায়ে দিয়ে বসিয়ে রেখে হয়ত ধারে কাছেই কোথাও রয়েছে। আর দুর্বল শরীর সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার ধকল সইতে না পেরে জানটা বেরিয়ে গেছে। হেকিম নিঃসন্দেহ হ’ল, সে-ই কুঁজোটির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে। তাকে দিয়ে চিকিৎসা করাতে এসে তার হাতেই হতভাগাটিকে জান দিতে হ’ল। সর্বনাশ লােক জানাজানি হয়ে গেলে কেলেঙ্কারীর চুড়ান্ত হয়ে যাবে। শূলে চড়ানােও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়।

হেকিমের মাথায় সঙ্গে সঙ্গে একটি ফন্দি এসে গেল। সে আর তার বিবি চাদর দিয়ে লাসটি ভাল করে মুড়িয়ে নিল। ধরাধরি করে ভেঙে নিয়ে গেল ছাদে। তার বাড়ির লাগােয়া সুলতানের আর কোন চিন্তা ভাবনা নয়। লাসটিকে তারা ছুঁড়ে দিল। সুলতানের বাড়ির ছাদ লক্ষ্য করে। বরাত মন্দ। লাসটি সুলতানের ছাদে না পড়ে পড়ল রসুইকরের রসুইখানার গায়ে। একটু বেশী রাত্রে সুলতানের প্রাসাদের কাজ সারতে রসইকরের বেশ দেরী হয়। তার মহলের দিকে যেতে গিয়ে হঠাৎ চােখ একটি লােক মরে পড়ে রয়েছে। একেবারে বাঁকাচোরা হয়ে পড়েছে। হয়ত লােকটি খাবার চুরি করে খেতে এসে হঠাৎ মারা গেছে। কিন্তু যে কারণেই মরুক না কেন, দোষ অবশ্যই তার ঘাড়েই পড়বে। সবাই ধরেই নেবে লােকটি চুরি করে খাবার খেতে এসেছিল। ধরা পড়ে বেদম প্রহার সহ্য করতে না পেরে জান বেরিয়ে গেছে। এখন উপায়? লাসটির কি গতি হবে?

উপায়ান্তর না দেখে রসুইকর লাসটিকে নিয়ে হাটের কাছে এক দোকানের বন্ধ দরজার সামনে বসিয়ে দিয়ে চম্পট দিল।

রাত্রির তৃতীয় প্রহরে এক খ্রীস্টান গলা পর্যন্ত সরাব ঢুকিয়ে টলতে টলতে কোনরকমে পথ পাড়ি দিচ্ছে আর জড়ানাে গলায় বলছে ব্যস, আর দেরী নেই, যীশু এলেন বলে। তখন দেখব, চাদুরা কোথায় পালাও। আমাকে নিয়ে রঙ্গ-তামাশা! আমার মাথায় মদ ঢেলে দিয়ে ইয়ার্কি করার মজা তখন টের পাইয়ে দেবেন। এতবড় বুকের পাটা তােদের। যীশু এসেই তােদের এক-একটি ধরে কচুকাটা করবেন। দেরী নেই, যীশু এক্ষুণি এসে পড়বেন। আঁকা বাঁকা পায়ে আরও কয়েক পা গিয়ে সে এক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে লাগল। লাসটি তখন তার ঠিক পিছনেই দোকানের বন্ধ-দরজার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। হতচ্ছাড়া মাতালটি ভাবল, তার পিছনে কে যেন ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিপদ মাথার ওপরে অনুমান করে সে ঝট করে ঘুরেই সজোরে এক ঘুসি বসিয়ে দিল লাসটির মুখে। চেঁচিয়ে উঠল—‘হারামি কাহাকার! আমার ওপরে ঝাপিয়ে পড়ার ধান্দায় ছিলি, তাই না? এবার বােঝ কত ধানে কত চাল। মাটিতে পড়ে থাকা লাসটির চুল মুঠোকরে ধরে মাতালটি এবার গর্জে উঠল—‘ওঠ—ওঠ হারামি কাহাকার! তােকে একেবারে খুনই করে ফেলব!'  মাতালটির চেঁচামেচিতে হাটের ক’জন দোকানির ঘুম ভেঙে গেল। ছুটোছুটি করে এসে দেখে, মাতালটি কুঁজো লাসটির চুলের মুঠি ধরে এলাপাথাড়ি ঘুষি চালিয়ে যাচ্ছে। | দোকানিরা বলল—‘সাহেব বাবা, এবার লােকটিকে মারা ছাড়ান দাও। চুরি করতে এসে শিক্ষা যথেষ্টই পেয়েছে। খ্রীস্টান মাতালটি এবার কুঁজোর লাসটির চুলের মুঠি ছেড়ে দিয়ে বলল—“যা হারামি, এবারের মত ছেড়েই দিলাম।

লাসটি এবার ধপাস করে আছাড় খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। দোকানিরা লাসটি ধরে ডাকাডাকি ধাক্কাধাক্কি করে নিঃসন্দেহ হল, হতভাগাটি মরেই গেছে। তারা গলা ছেড়ে চিৎকার করতে লাগল—কে, কোথায় আছ, এসাে। দেখে যাও কী সর্বনেশে কাণ্ড! এক খ্রীস্টান এক মুসলমানকে খুন করেছে। চিৎকার শুনে প্রহরায় নিযুক্ত দু’জন লোেকও অন্যান্যদের সঙ্গে ছুটে এল। পাহারাদাররা মাতাল খ্রীস্টানটির কোমরে দড়ি পরিয়ে কোতােয়ালের বাড়ি নিয়ে গেল। ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি করে তার ঘুম ভাঙাল। কোতােয়াল ঘটনার বিবরণ শুনে মাতাল খ্রীস্টানের ফাঁসির হুকুম দিল। কোমরে দড়ি বেঁধে নগরের পথে পথে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ানাে হবে প্রথমে। তারপর হাজার হাজার লােকের চোখের সামনে ফাঁসি দেওয়া হবে। মাতাল খ্রীস্টানটির গলায় যখন ফাঁসির দড়ি পরানাে হচ্ছে ঠিক তখনই সুলতানের রসুইকর ছুটে এসে বল – এ-নিরপরাধ | খ্রীস্টানটিকে কেন মিছে হত্যা করছ। কুঁজো লােকটিকে মেরেছি তাে আমি। কোতােয়াল বলল—বললেই তাে হবে না, প্রমাণ কি ?’ 

—“গতকাল রাত্রে সুলতানের রসুইখানার পাশে অন্ধকারে দাঁড়িয়েছিল। আমি একটি চ্যালা কাঠ দিয়ে এক ঘা দিতেই এলিয়ে পড়ল। ব্যস, একেবারে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল! আমি চুপি সাড়ে লাসটিকে হাটে রেখে চম্পট দেই।

কোতােয়ালের নির্দেশে জল্লাদ রসুইকরের গলায় দড়ি পরাল। ঠিক তখনই সে-ইহুদী হেকিম হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—এ কী জবরদস্তি কাজ করছেন? লােকটিকে খুন করলাম আমি আর ফাঁসিতে ঝােলাচ্ছেন এ-নিরীহ রসুইকরটিকে। একে ছেড়ে আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিন।

অগত্যা কোতােয়াল বুড়াে হেকিম’কে ফাঁসিতে ঝােলানাের আদেশ দিল। জল্লাদ বুড়াে হাকিমকে নিয়ে বধ্যভূমিতে দাঁড় করাল। ফাঁসির দড়ি তার গলায় পরাতে যাবে তখনি ভিড়ের মধ্য থেকে চিৎকার শােনা গেল—“আরে, করছ কী! করছ কী! কাল সন্ধ্যার কিছু আগে আমি আর আমার বিবি বেড়িয়ে ফেরার পথে দেখলাম, এক রাস্তার মােড়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক করে কুঁজোটি হাসছে। খুব রাগ হ’ল। লােকটি খুবই রসিক ছিল। আমার বিবির লােকটির চেহারার অস্বাভাবিকতাটুকু দেখে খুবই মায়া হ’ল। তাকে বাড়ি নিয়ে এলাম। রাত্রে খেতে বসে মাছের কাটা গলায় বিঁধে লােকটি হঠাৎ মারা গেল। চাদরে মুড়িয়ে লাসটিকে এ-বুড়াে হেকিমের বাড়ির সিঁড়িতে রেখে দিয়ে চম্পট দিয়েছিলাম। কাটা সমেত মাছের টুকরােটি আমিই জোর করে তার মুখে খুঁজে দিয়েছিলাম। অতএব আমিই তাে ওর মৃত্যুর কারণ। বুড়াে হেকিম ব্যস্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে লাসটির সঙ্গে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। অতএব আমাকেই ফাঁসির দড়ি অবশ্যই গলায় পরতে হয়। জল্লাদ দর্জির গলায় ফাঁসির দড়ি পরাবার উদ্যোগ নিল। ব্যাপারটি এরই মধ্যে সুলতানের কানে পৌঁছে গেছে। কুঁজো অষ্টাবক্ৰটি তার খুবই স্নেহের পাত্র ছিল। সে মদের ঘােরে টলতে টলতে দর্জির ও তার বিবির সামনে এলে তারা তাকে নিজেদের বাড়ি নিয়ে এসেছিল। তারপর কিভাবে তার মৃত্যু হয়, সে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে কোতােয়াল, ইহুদি হেকিম, সুলতানের রসুইকর প্রভৃতি। তারপর দর্জিকে ফাঁসি কাঠে ঝােলাবার আয়ােজন করা হয়। সুলতান দর্জির ফাঁসি রদ করার জন্য ফরমান জারি করে এক ঘােড়সওয়ারকে পাঠালেন। কোতােয়াল ছুটে এলেন সুলতানের কাছে। ঘটনাটি তাঁর কাছে ব্যক্ত করলেন। সুলতান সব শুনে যারপর নাই বিস্মিত হলেন।

এবার সে-খ্রীস্টানটি দরবারে উপস্থিত হ'ল। যথােচিত অভিবাদন করে বলল—জাঁহাপনা, এর চেয়ে অনেক, অনেক বেশী বিস্ময়কর কিসস আমার জনা আছে। আপনি যদি তা শুনতে উৎসাহী হন তবে আমি শুরু করতে পারি। সুলতান অত্যুগ্র আগ্রহান্বিত হয়ে বলেন—“আমি আগ্রহী, শুরু কর তােমার কিসসা।

                                                   খ্রীস্টান যুবকের কিসসা 

খ্রীস্টানটি তার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বলল-জাঁহাপনা, আপনি দীন দুনিয়ার মালিক। আমি এক বিদেশী, খ্রীস্টান। আমার জন্মভূমি কায়রাে। বিভিন্ন দেশ ঢুঁড়ে শেষ পর্যন্ত আপনার সুলতানিয়তে এসে থিতু হলাম। শুরু করলাম কারবার। দালালীর কারবার। আমার আব্বাজীও একারবারই করতেন। বলতে পারেন এটি আমাদের বংশগত কারবার। আব্বাজী বেহেস্তে গেলে আমিই কারবারের সর্বেসর্বা হলাম।।

এক সকালে গাধার পিঠে চেপে এক যুবক আমার কাছে এল। সুদর্শন যুবক, তার চোখে-মুখে বুদ্ধিমত্তার ছাপ।

আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে আগন্তুক যুবকটির দিকে তাকালাম। সে কামিজের জেব থেকে এক মুঠো ক্ষীরার বীজ বের করে আমার সামনে ধরে বল—এখন দর কত যাচ্ছে, বলুন তাে?।

‘একশ দিরহাম।

—“ঠিক আছে, আপনি তবে খান-অল-জয়ালী বিজয় দরওয়াজের কাছে চলুন। আমি অপেক্ষা করব।

ক্ষীরার বীজগুলি আমার সামনে রেখে সে বিদায় নিল। আমি ক্ষীরার বীজগুলাে নিয়ে এক মহাজনের কাছে গেলাম। সে একশ দশ দিরহাম দর দিয়ে কিনতে রাজি হল, আমার দশ দিরহাম করে লাভ হবে।

আমি খ্রীস্টানটির কাছ থেকে পঞ্চাশ মন বীজ কিনে ফেললাম। যুবকটি বলল, আপনি তবে প্রতিমনে দশ দিরহাম করে দালালি পেয়ে যাচ্ছেন। মাল নিয়ে যান। আপনার দালালির পাঁচ শ’ দিরহাম কেটে বাকি সাড়ে চার হাজার আপনার কাছেই জমা রাখবেন। আমি সুবিধামত সময়ে গিয়ে বাকি সেগুলাে নিয়ে আসব।

সেদিন আমার মােট এক হাজার দিরহাম রােজগার। পাঁচশ’ পাই বীজের মালিক যুবকটির কাছ থেকে আর পাঁচশ’ পাই মহাজনের কাছ থেকে। প্রায় এক মাস পরে যুবকটি এলে তার প্রাপ্য সাড়ে চার হাজার দিরহাম তাকে দিতে চাইলাম। সে আরও কিছুদিন পরে নেবে বলল। তার কাছে নাকি রাখার একটু অসুবিধা। প্রায় এক মাস পরে যুবকটি এল। আমি দিরহামগুলাে নিতে বললে সে আরও কিছু দিন আমার কাছেই জমা রাখতে বলল। আরও মাস খানেক পরে একদিন আমার বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। আমাকে দেখেই চিৎকার করে বলল—এখন আর নামব। জরুরী কাজে যাচ্ছি। সন্ধ্যার দিকে এ পথেই যাব। তখন দিরহামগুলাে নিয়ে যাব।

আমি সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসার পর থেকেই দিরহামগুলাে নিয়ে তার অপেক্ষায় বসে রইলাম। কিন্তু সে ফিরল না।প্রায় এক মাস পরে হঠাৎ একদিন সে উদয় হল। আমি থলেটি এনে তার সামনে রাখলাম। এবারও সে নিল না।

আবারও বেশ কিছুদিন কেটে গেল। এক বিকেলে টাটুর পিঠে চেপে যুবকটি হাজির হল। চকমকে পােশাক পরিহিত। আমি দিরহামগুলাে এনে তাকে দিতে চাইলাম। বললাম—পরের গচ্ছিত ধন-দৌলত যে কী দুশ্চিন্তার ব্যাপার তা ভুক্তভােগী ছাড়া জানে । এগুলাে নিয়ে আমাকে চিন্তামুক্ত কর।

–“কিছু মনে করবেন না, আর কদিন দয়া করে ধৈর্য ধরুন। অনন্যোপায় হয়ে তার অনুরােধ রক্ষা করতে সম্মত হলাম। | সেদিন যুবকটিকে খানাপিনা করতে অনুরােধ জানালাম। রাজি হ'ল। সাধ্যমত আয়ােজন করলাম। সে পরিতৃপ্তি সহকারে সবকিছু খেল। একটি জিনিস দেখে অকস্মাৎ আমার মনটি মােচড় দিয়ে উঠল। সে গােড়া থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁ-হাত দিয়ে খেলাে। ভাবলাম কোনভাবে হয়ত তার ডান হাতটি জখম হয়ে গিয়েছিল।

ব্যাপারটি আমার মনে আরও বেশী কৌতুহল সঞ্চার করল যখন দেখলাম ডানহাতের সাহায্য না নিয়েই সে তার বাঁ-হাতটি দিব্যি ধুয়ে ফেল্ল। আমি জিজ্ঞাসা করলে সে ম্লান হেসে গায়ের চাদরটি সরিয়ে দেখাল, তার ডানহাতটি কব্জির কাছ থেকে কাটা।

আমার কৌতুহল নিবৃত্ত করতে গিয়ে যুবকটি বলল —হুজুর, আমি একবার কায়রাে নগরে গিয়েছিলাম। এক সরাইখানায় আমাকে থাকতে হয়েছিল। বিক্রি করার জন্য বিভিন্নরকম পােশাক নিয়ে গিয়েছিলাম। উটের পিঠ থেকে নফর সমানপত্র নামাল। খাবার আনার জন্য তাকে একটি দিনার দিয়েছিলাম। পথশ্রমে ক্লান্ত। অবসন্ন শরীর বিছানার আশ্রয় পেতেই এলিয়ে পড়লাম। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। সকালে ঘুম থেকে উঠে সমানপত্র উটের পিঠে চাপিয়ে ব্যবসা করার ধান্দায় নফরটিকে নিয়ে শহরের বাজারে গেলাম। বরাত মন্দ। একের পর এক বহু মহাজনের দরজায় ঘুরেও একটি জামা কাপড়ও কাউকে গছাতে পারলাম না। আর যে দাম দিতে চাইল তা আমার ক্রয়মূল্যের চেয়েও কম।

সবশেষে এক দালাল বলল-হুজুর অন্যান্য ব্যবসায়ীরা এখানে যা কিছু করে আপনাকেও তাই করতে হবে। সমানপত্র যা আছে সব ধারে বেচে দিন। মাল দেয়ার সময় হুণ্ডি করিয়ে দেব। একমাস পর প্রতি সােম আর বৃহস্পতিবার তারা কিস্তি দেয়। দু সপ্তাহে মাত্র দু'দিন আসে পাওনাগণ্ডা বুঝে নিয়ে যাবার জন্য। প্রস্তাবটি আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয় মনে হ’ল। ব্যস, দালাল মারফৎ সবকিছু বিক্রি হয়ে গেল। নগদ অর্থকড়ি কিছুই পেলাম না। ক্রেতারা হুণ্ডির কাগজ তৈরী করে দিল। সন্ধ্যায় গ্রাম্য মেয়েদের নাচাগানা দেখে মেজাজ একটু চাঙা করে সরাইখানায় ফিরলাম। একমাস ধরে বহুত মজা লুটলাম। দালালটি খুবই কর্মতৎপর। ঘুরে ঘুরে বেশ কিস্তির টাকা আদায় করে এনে দেয়।

একদিন এক রেশম কাপড়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। গল্পটল্প করে মেজাজ একুট শেরিফ করে নেওয়ার ইচ্ছা। দোকানি আমার প্রায় সমবয়সী। খুবই মিশুকে ও আড্ডাবাজ। একথা-সেকথার ফাকে সে আমাকে বলল, আমার চেহারাছবি নাকি লেড়কিদের খুব পছন্দ। এরকম বহু কথা শুনে আমার কালিজাটি একেবারে চনমনিয়ে উঠল।..এরই মধ্যে বােরখায় আপাদমস্তক ঢেকে এক জেনানা এসে আমার সামনে বসল। কাপড় কিনতে আগ্রহী। তার গা থেকে ভুরভুর করে দামী আতরের খুসবু বেরিয়ে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ছে। বােরখার নাকাবটি এতই পাতলা যে তার মধ্য দিয়ে কাঁচা হলুদের মত তার গায়ের রঙ যেন ঠিকরে বেরােচ্ছে। ছুঁচলাে নাক। হরিণীর মত ডাগর ডাগর চোখ। কপালের ওপর দু-চারগাছ কোকড়ানাে চুল তার মুখের সৌন্দর্যকে অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। একটু আগেই দোকানির কথা আমার কলিজায় আদি রসের সঞ্চার ঘটিয়েছে। তার পরমুহুর্তেই বেহেস্তের পরীটি মুখােমুখি এসে বসল। এক লহমায় তার দিকে তাকাতেই আমি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম। কলিজাটি উথালি পাথালি শুরু করে দিল। একটু পরেই নিঃসন্দেহ হলাম, সে-ও আমার দিকে কম ঝুঁকে পড়েনি। বােরখার নাকাবটি সামান্য সরিয়ে আচমকা আঁখি-বাণ আমার দিকে ছুঁড়ে দিল। আমার কলিজাটি অকস্মাৎ যেন ডিগবাজী খেয়ে ধীরে ধীরে আবার সােজা হ’ল।।

এক সময় অভাবনীয় মিষ্টি-মধুর স্বরে সে দোকানিকে বল্ল, –‘সােনার জরির কাজকরা ভাল মসলিন দেখাতে পারেন? দোকানি একের পর এক শাড়ী তার সামনে রাখতে লাগল । একটি হাতে তুলে নিয়ে দাম জিজ্ঞাসা করল। দাম শুনে বল্ল—“কিন্তু আমার সঙ্গে তাে এত দিনার নেই। আমি বরং এটি নিয়ে যাচ্ছি। বাকি দিনার পরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

—“কিছু মনে করবেন না। এতগুলাে দিনার দাম, ধারে দেওয়া যাবে না। মহাজন সামনেই বসে। দুঃখিত, দাম নিয়ে এসে পরেই হয়—

—“ছিঃ! এরকম আচরণ করছেন! এতদিন ধরে হাজার হাজার দিনার লেনদেন হয়েছে। কোনদিন বাকি ফেলে রেখেছি, বলুন? শাড়ীটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এবার বল্ল—“আসলে আপনারা শুধু সমানপত্র কেনাবেচাই করেন। আসল নকল খদ্দের চিনতে পারেন না । তার যৌবনভরা দেহপল্লবটিকে এক ঝটকায় টুল থেকে তুলে নিয়ে ক্রোধমত্তা সিংহীর মত গটুমটু করে চলে গেল।

ব্যাপারটি আমার কাছে মােটেই সৌজন্যের পরিচায়ক বলে মনে হল না। মেয়েটি খুবই অপমানিত হয়েছে। লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে গিয়ে আমি তার পথ আগলে দাঁড়ালাম। মুখ কাচুমাচু করে বললাম- দেখুন, যা ঘটার তা তাে ঘটেই গেছে। আপনি চলুন, শাড়ীটি নিয়ে যান।

–“দেখুন, দোকানির আচরণ বাস্তবিকই শিষ্টতা বহির্ভূত। এবার নাকাবের ফাঁক দিয়ে দু’চোখের বাণ ছুঁড়ে বল্ল‘কেবলমাত্র আপনার দিকে তাকিয়েই যেতে পারি।'

আমি অপরিচিতা হরিণীটিকে দোকানে নিয়ে গিয়ে এগার শ দিরহাম মূল্যের শাড়ীটি দোকানির কাছ থেকে নিয়ে হাতে তুলে দিলাম। বিনিময়ে দোকানিকে একটি রসিদ লিখে দিলাম। এবার মুচকি হেসে মেয়েটিকে বল্লাম—‘প্রতি বৃহস্পতিবার আমি এ তল্লাটে আসি। মন চাইলে শাড়ীটির দাম দিতেও পারেন নইলে আমার তরফের উপহার এ মনে করতে পারেন। মুক্তোর মত ঝকঝকে দাঁত ক’টি মেলে ধরে অপূর্ব সুন্দর ভঙ্গিমায় হেসে লেড়কিটি বলল—এত সুন্দর আপনার ব্যবহার যে, আর বলার নয়। এমন মহানুভব মানুষ আজকাল সচরাচর চোখেই পড়ে না। খােদাতাল্লার দোয়ায় আপনার হয়ত অনেক ধনদৌলত আছে। তবুও যে আমাকে একবার মাত্র দেখেই আমার চরিত্র সম্বন্ধে ধারণা করতে পেরেছেন সে আপনার অপরিমিত অভিজ্ঞতার জন্যই হয়ত সম্ভব হয়েছে। যদি মেহেরবানী করে.........চলতে থাকবে ।

Post a Comment

0 Comments