আরব্য রজনী পার্ট ১৯ ( Part 19 )

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
এবার আজীব’কে সামনে এগিয়ে দিয়ে বলে—তােমার নাতি। তােমার বংশের একমাত্র সন্তান। একে বুকে নিয়ে শােক-তাপ লাঘব কর।”  নুর-এর বিবি সামস-অল-দীন-এর মুখে সব ঘটনা শুনে নিঃসন্দেহ হল, তার কলিজার সমান পুত্র হাসান তবে আজও জীবিত, ধারে-কাছেই কোথাও না কোথাও আছে।

এদিকে আজীব এবার দাদীর কোলে মুখ গুজে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল।  সামস-অল-দীন বল্ল এখন বসে কাদার সময় নয় বহিন, কামিজ বদলে নাও। যত শীঘ্র সম্ভব আমরা মিশরের দিকে যাত্রা করব। যে করেই হােক হাসানকে খুঁজে বের করতেই হবে আমাদের।

কয়েকজন নফর-দাসী নিয়ে উজির সামস-অল-দীন -এর সঙ্গে মিশরের পথে যাত্রা করল। তারা এবার বসরাহ নগরের পথে চলতে লাগল।

তারা আবার দামাস্কাস নগরে পৌছল। তাঁবু গাড়ল। আগের সে-জায়গাতেই তারা এবারও বাস করতে লাগল, দু'তিনদিন এখানে থাকার ইচ্ছা।

পরদিন সকালে উজির হাটের দিকে গেল। কিছু কেনাকাটা করা দরকার। আজীব এবার সাইদ’কে নিয়ে সে- হালুইকর লােকটিকে একবারটি দেখে আসার জন্য পা বাড়াল।

নগরের এখানে-ওখানে ঘুরে, কতসব মজার মজার জিনিস দেখতে দেখতে তারা সে-হালুইকরের দোকানে গেল।

আজীব’কে দোকানে ঢুকতে দেখে হালুইকর হাসান অবাক হয়ে গেল। আজীব বলল—“আমার সেদিনের সে কাজের জন্য আমি খুবই দুঃখিত । পরিণামে কি হবে চিন্তা না করেই আমি তােমাকে লক্ষ্য করে পাথরের টুকরােটি ছুঁড়ে দিয়েছিলাম। আজ মাফ চাইতে এসেছি।

–‘আমার কিছু হয় নি। সেরে গেছে। যাক গে, একবারটি ভেতরে আসবে কি বাছা?’

আজীব দোকানের ভেতরে গিয়ে বাঁশের তৈরী বেঞ্চে বসল।

একটি রেকাবিতে কিছু বেদানার হালুয়া এনে তার সামনে ধরে বলল—মেহেরবানী করে এটুকু খেয়ে নাও বাছা। তুমি চলে যাওয়ার পর থেকে প্রতিটি মুহূর্ত আমি কেবল তােমার কথাই ভেবেছি।


আজীব হাসতে হাসতে বলল—“তুমি তাে যে-সে লােক নও হে! সেদিন আদর করে হালুয়াও খাওয়ালে আবার সর্বনাশের ধান্দা করতেও ছাড়লে । চুপি চুপি আমাদের পিছু নিয়েছিলে। আমার কাছে হলফ কর, আর পিছু নেবার ধান্দা করবে না। যদি করই তবে কিন্তু আর কোনদিন তােমার দোকানমুখাে হ’ব না।”

বলল—ঠিক আছে, কথা দিচ্ছি, আর তােমার পিছু নেব না।' আজীব এবার হাসানের হাত ধরে টেনে তার পাশে বসিয়ে বলল, আমাদের সঙ্গে আল্লাতান্নার কাছে প্রার্থনা কর, আমার হারিয়ে যাওয়া আব্বাজীকে যেন খুঁজে বের করতে পারি।

হাসান কিন্তু নির্নিমেষ চোখে আজীব-এর মুখের দিকেই তাকিয়ে রইল। কোনদিকে তার ভ্রূক্ষেপমাত্রও নেই। আহারাদি শেষ হবার পরও তারা প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় ধরে টুকরাে টুকরাে অনেক কথাই আলােচনা করল। রাতে যখন তারা ফিরল তখন দেখল সবাই আজীব-এর জন্য পথ চেয়ে তাবুর বাইরে বসে, মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।

এবার উঠে গিয়ে একটি রেকাবিতে কিছুটা বেদানার হালুয়া এনে আজীবকে খেতে দিল। বসরাহতে থাকাকালীন প্রায়ই এরকম মুখোরােচক খাবার তৈরী করে সবাইকে খাওয়াত। হাসান-এর আম্মী বলল-এর তৈরীর কৌশল আমার নিজস্ব আবিষ্কার। তাের বাবা খুবই পছন্দ করত। নিজেও এরকম হালুয়া তৈরীর কৌশল আমার কাছ থেকে শিখে নিয়েছিল। তামাম দুনিয়াটি ঘুরে এলেও এরকম বেদানার হালুয়া আর কোথাও পাবি না।

–“কি যে বলছ দাদি, নিজেই জান না! একটু আগেই আমি আর সাইদ বাজারের এক দোকানে কী সুন্দর বেদানার হালুয়া খেয়ে এলাম। আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলছি, এর এক বিন্দুও ঝুটা নয়। হালুয়ার কী সুন্দর খুসবু, বলে বােঝাতে পারব না। এমন সময় বেগম শাহরাজাদ দেখল ভাের হয়ে আসছে। তিনি কিসসা থামালেন।

                                    ছাব্বিশতম রজনী 

বাদশাহ শারিয়ার যথা সময়ে অন্দরমহলে বেগমের কামরায় এলেন, বেগম শাহরাজাদ কিসসার অবশিষ্ট অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাঁহাপনা, আজীব-এর কথা শুনে তার দাদি রেগেমেগে একেবারে কাই হয়ে গেল। সাইদ’কে বলল-“হতচ্ছাড়া কোথাকার! বাজারের যে-সে দোকানে নিয়ে গিয়ে একে ঢুকিয়েছিলি, সাহস তাে কম নয়, তাের!

‘আল্লাহর দোহাই! বিশ্বাস করুন, আমরা কোন দোকানে ঢকিনি। এক হালুইকরের দোকানের পাশ দিয়ে গিয়েছিলাম মাত্র । তাই বলে- 

তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই আজীব বলল–সাইদ মিথ্যে কথা বলিস নে। আচ্ছা, তুই বুকে হাত দিয়ে বল তো আমরা  সকালে হালুইকরের দোকানে গিয়ে বেদানার হালুয়া খেয়ে আসি নি?'

আজীব-এর দাদি এবার ব্যস্ত-পায়ে উজিরের কাছে গিয়ে নালিশ জানায়। সাইদ আজীব’কে নিয়ে যেখানে-সেখানে যাওয়া শুরু করেছে। সাইদ উজিরের কাছেও মিথ্যা কথা বলে। আজীব কে নিয়ে যে সে হালুইকরের দোকানে গিয়েছিল, উভয়েই বেদানার হালুয়া খেয়ে এসেছে—পুরাে ব্যাপারটি অস্বীকার করে। কিন্তু আজীব বার বার নিজের কথাই বলতে থাকে। উজিরের বুঝতে বাকি রইল না, সাইদ নিজের কসুর চাপা দিতে গিয়ে পুরাে ব্যাপারটিই অস্বীকার করছে।


আজীব-এর মুখে হালুইকরের তৈরী হালুয়ার ভূয়সী প্রশংসা শুনে তিনি সাইদ’কে বার বার ধমকাতে লাগলেন। আজীব-এর দাদি এবার একটি রেকাবি এনে সাইদ-এর হাতে দিয়ে বলল—“এতে করে আধ দিনার দিয়ে ওই দোকান থেকে বেদানার হালুয়া নিয়ে আয়। আজীব-এর দাদুকে আমার তৈরী হালুয়া এবং দোকানের হালুয়া দুটোই খেতে দেব। তিনি খেয়ে, বিচার করে বলবেন—কোন হালুয়া বেশী সুস্বাদু। দোকানি রেকাবিতে হালুয়া দিয়ে তার ওপরে কিছু গুলাব পানি ছিটিয়ে দিয়ে সাইদ-এর হাতে তুলে দিল। সাইদ তাবুতে ফিরে হালুয়ার রেকাবিটি আজীব-এর দাদির হাতে দিল। সে সঙ্গে সঙ্গে রেকাবিটি থেকে এক টুকরাে হালুয়া তুলে মুখে ফেলতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাওয়ার জোগাড় হ'ল। সে নিঃসন্দেহ হ'ল, এ-হালুয়া নির্ঘাৎ তার বেটা হাসানের হাতের তৈরী। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল। উজির খবর পেয়ে ছুটে এল। জলবাতাস দিয়ে তাকে সুস্থ করে তুলল। সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে হাসান-এর মা আর্তনাদ করে উঠল—হাসান! হ্যা এটি আমার বেটা হাসান-এর হাতের তৈরী হালুয়াই বটে! আমার বেটা হাসান-এর হাতের তৈরী হালুয়া না হয়েই যায় না।

উজির জনা বিশেক নফরকে সঙ্গে দিয়ে সাইদ কে পাঠাল মিঠাইওয়ালাকে ধরে নিয়ে আসার জন্য।এতেও উজির আশ্বস্ত হতে পারল না। নিজে একটি ঘোড়ার পিঠে চেপে মিশরের সুলতানের দেওয়া পরােয়ানাটি নিয়ে হুকুমদারের সঙ্গে দেখা করলেন।

হুকুমদার জিজ্ঞাসা করল—“কাকে কয়েদ করতে চান আপনি বলুন তাে?”

-বাজারের এক হালুইকরকে আমার হাতে তুলে দিন। —“ঠিক আছে, আমি এখুনি সিপাহী পাঠাচ্ছি।” হুকুমদারের হুকুম পেয়ে একদল সশস্ত্র সিপাহী ছুটল হালুইকর হাসান’কে ধরে আনার জন্য।

উজির তাবুতে ফিরল। হুকুমদারের সৈন্য সামন্তরা হৈ হৈ করতে করতে হালুইকর হাসান-এর দোকানে ঢুকল। পিঠমােড়া করে বেঁধে ফেলল।বন্দী হাসান পথে আসতে আসতে ভাবছে—“হায় খােদা। এক রেকাবি হালুয়া শেষ পর্যন্ত এমন পরমাদ ঘটাতে পারে, স্বপ্নেও ভাবিনি।চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বন্দী হাসান উজিরকে বলতে লাগল—“হুজুর মেহেরবান, আপনার কাছে কী এমন গুনাহ করেছি যে, আমাকে কোমরে রশি পরতে হ’ল?’

-সত্যি করে বলবে, বেদানার হালুয়া কি তুমিই বানিয়েছিলে?

–‘জী হুজুর । কাজটি কি বে-আইনী?

‘বে-আইনীর চেয়ে বড় কিছু যদি থাকে তবে তুমি তাই করেছ। আমাদের সঙ্গে তােমাকে কায়রাে নগরে যেতে হবে। উজির হাসান-এর মাকে এসব কিছুই জানাল না। উজির তাঁবু গুটিয়ে সদলবলে কায়রাে নগরের উদ্দেশে যাত্রা করল। পথে আহারের জন্য হাসান-এর হাতের বাঁধন খুলে দেওয়া হল। খানাপিনার পর আবার পিঠমােড়া করে বেঁধে উটের পিঠে চাপিয়ে দেওয়া হল। কেটে গেল বেশ কয়েকটি দিন। উজির এক সকালে নতুন করে যাত্রা করার আগে হাসান’কে আড়ালে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল-“এখনও সময় আছে, সত্যি করে বলবে


বেদানার হালুয়া কি তুমিই নিজে হাতে বানাও? ঝুট বললে জিভ কেটে নেব বলে দিচ্ছি।



-“হুজুর, আমি নিজে হাতেই রােজ বানাই। আবার উটের পিঠে তােলা হল কয়েদী হাসানকে।কায়রাের সীমানায় পৌঁছে উজির ছুতাের মিস্ত্রিকে তলব করল। সে এসে কুর্নিশ করে সামনে দাঁড়াল। উজির বলল—যত শীঘ্র সম্ভব বন্দীর মাপে একটি ক্রশচিহ্ন বানিয়ে আন, তাতে এ কয়েদী হতচ্ছাড়াটিকে রশি দিয়ে আচ্ছা করে বেঁধে মােষের গাড়ীর পিছনে বেঁধে দাও।'



হাসান হাউমাউ করে কেঁদে বলল -“হুজুর মেহেরবান, আমি শাস্তি ভােগ করতে চলেছি, কিন্তু কি যে আমার গুনাহ তা-ই আজ অবধি জানতে পারলাম না। - ‘গুনাহ? গুনাহ অবশ্যই তােমার হয়েছে। ওগুলাে কি হালুয়া বানিয়েছিলে? মরিচের গুড়া পরিমাণ মত ব্যবহার করতে পার নি।



—“হুজুর' এরকম একটি সামান্য ব্যাপারে এমন গুরুদণ্ড একেবারে ফাঁসির হুকুম! এরজন্য আপনি আমাকে রশি দিয়ে পিঠমােড়া করে বেঁধে রেখেছেন। দিন-রাত্রি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে একবার মাত্র খানা দিয়েছেন! এত কষ্ট দিয়েও শান্তি পাননি ? আবার হুকুম দিয়েছেন আমাকে ফাঁসি দিয়ে মারার জন্য। কথা বলতে বলতে হাসান-এর দু’চোখে পানির ধারা নেমে এল। মাথায় হাত দিয়ে পথের মাঝে বসে পড়ল। ভাবতে লাগল নিজের নসীবের কথা। | উজির মুচকি হেসে বলল—“কি হে, অমন করে কি ভাবছ?’ 



—“কি আবার ভাবব! ভাবছি, আপনার মত একটি উর্বর মস্তিষ্কের অধিকারীর ওপর একটি রাজ্যের দায়িত্ব দিয়ে সুলতান কি করে যে নিশ্চিন্ত থাকেন ভেবে অবাক হচ্ছি। বেদানার হালুয়ায় মরিচের গুড়ার পরিমাণ ঠিক হয় নি বলে একটি লােককে ফাসি কাঠে ঝুলিয়ে দেওয়ার হুকুম দেওয়া হয়েছে। চমৎকার ! চমৎকার বিচার! কাজীর বিচারকেও আপনার হুকুমনামা হার মানিয়ে দিচ্ছে।



–‘আমি তােমার মত আহাম্মকের সঙ্গে তর্ক করে সময় নষ্ট করতে চাই না। আমার কাজে ফাকি না দাও এ-ই সবার আগে আমাকে বিচার করে দেখতে হবে। মুখে বিষাদের হাসি ফুটিয়ে তুলে হাসান বলল—“কিন্তু কি করে? আমাকে খুন করার পর আমার কাজের বিচার করবেন নাকি বাঁচিয়ে রেখে, কাজ করিয়ে নিয়ে তবে সত্যি ফাকি দেই কিনা দেখবেন?



‘দেখাদেখি সব সারা। রােজই তাে এরকম হালুয়া তৈরী করে কাজে গলতি করছ। রােজ গুণাহ করে করে পাহাড় বানিয়ে ফেলেছ । সত্যি বলতে কি মৃত্যুদণ্ডের চেয়েও বড় কোন সাজাই দেখছি তােমার জন্য বরাদ্দ করা দরকার ছিল।- ঠিক আছে। আপনার যা দিল চায় করতে পারেন। উন্মাদের সঙ্গে বচসায় ফল তাে কিছু হয়ই না বরং অশান্তি বাড়ে । 



সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসছে। উজির তার নফরদের হুকম দিল হাসানকে কাঠের বাক্সে পুরে তার তাবুতে রেখে দিতে। উজির ঘরে ফিরল। সে প্রথমেই হাসান-এর আম্মা আর সিৎ হুসন-এর সঙ্গে মােলাকাৎ করল। লেড়কিকে ডেকে বলল বেটি তাের দুঃখের দিন হয়ত এতদিনে ঘুচল। যা, খুব ভাল করে সেজেগুজে আয়। তাকে একেবারে সাথে নিয়ে এসেছি। শাদীর রাতের সাজগােছের কথা খেয়াল আছে তাে? ঠিক সেভাবেই পরিপাটি করে সাজবি। ভাল কথা, সিন্দুকের কাগজটিতে তাে সেদিনের সাজের বিবরণ লেখাই আছে। একবারটি না হয় চোখ বুলিয়ে নে।

হুসন-এর অন্তরের অন্তঃস্থলে আনন্দের তুফান বয়ে চলল। তার ঘরটিকে হুবহু সেরকম করে বাসর ঘর সাজিয়ে তুলল শাদীর রাত্রে যেমন করে সাজানাে হয়েছিল। তাজ্জব বনে যাওয়ার মত ব্যাপারই বটে।

উজির এবার সিন্দুক খুলে হাসানের বিয়ের রাত্রের ইজের, পাতলুন, টুপি আর তার মােহরের থলিটি কুর্শির ওপরে রাখল। মােহরের থলিটিতে এক হাজার সােনার মােহর এবং ইহুদী বণিকের লেখা জাহাজের দলিলটি রয়েছে। এবার পাতলুনটির জেবের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল নূর-অল-দীন-এর স্বাক্ষরযুক্ত পত্রটি।

উজির হুসনকে বল্ল-‘বেটি, শাদীর রাত্রে পালঙ্কের ওপর ঠিক যে-কায়দায় তুমি শুয়েছিলে হুবহু সেভাবে শুয়ে পড়। আমি যাচ্ছি, হাসানকে তােমার ঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছি। উজির লেড়কির কাছ থেকে এবার জামাতা হাসান-এর কাছে এল। হাসান ঘুমে বিভাের। উজিরের নির্দেশে দু’জন নফর তার পাতলুন, কামিজ যা কিছু রয়েছে সব খুলে একেবারে বিবস্ত্র করে ফেল্ল। এবার কেবলমাত্র একটি রেশমী চাদর লুঙ্গির মত করে জড়িয়ে দিল তার কোমরে। আর মাথায় একটি টুপি পরিয়ে দিল।

এবার ধরাধরি করে হুসন-র ঘরের গালিচার ওপর শুইয়ে দিয়ে চুপিসারে ঘরছেড়ে বেরিয়ে এল। বেশ কিছুক্ষণ বাদে হাসান-এর ঘুম টুটল। চোখ মেলে তাকাল। চোখের মণি দুটো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চারদিকে তাকাল। বিস্ময়ে অবাক হল। যত দেখছে ততই যেন সে বিস্ময়ের ঘােরে তলিয়ে যাচ্ছে । এবার পালঙ্কটির দিকে চোখ ফেরাল সে-পালঙ্কটিই তাে বটে। আর পালঙ্কের ওপর যে শুয়ে সে-ই তাে তার মনময়ুরী হুসন। এ কী স্বপ্ন, নাকি বাস্তব? সে তাে কত দিন আগেকার কথা। সবকিছু যেন তার কাছে তালগােল পাকিয়ে যেতে লাগল। সে সবিস্ময়ে ভাবল, তাকে তাে পিঠমােড়া করে বেঁধে রাখা হয়েছিল। উজিরের হুকুম ছিল ক্রুশবিদ্ধ করে মারা হবে। কিন্তু তার পরিবর্তে একেবারে স্বপ্নরাজ্যে নিয়ে এসে ফেলা হয়েছে তাকে। হাসান অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তাকাতেই তার বহুপরিচিত ও বহুদিনের সাথী বসরাহর নামযুক্ত চমৎকার টুপিটি চোখে পড়ল। এবার দেখল মােহরের থলিটাকে। ব্যস্ত-হাতে খুলে দেখল এক হাজার সােনার মােহর আর সে-বণিকের স্বাক্ষরযুক্ত জাহাজ বিক্রির দলিলটি। খাটের কোনায় তার পাতলুনটি পরিপাটি করে রাখা, জেবের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনল নূর-অল-দীনএর স্বাক্ষরযুক্ত ঠিকুজী-পত্ৰখানা। এক নজর চোখ বুলিয়ে নিঃসন্দেহ হ’ল, সেটিই বটে। সে আরও বেশী ধন্ধে পড়ে গেল। কোন কিছুকেই অস্বীকার করতে পারছে না। আবার মেনে নিতেও উৎসাহ পাচ্ছে না। এ কী সমস্যা রে বাবা!

এবার হুসন-এর দিকে চোখ ফেরাল। হ্যা, কিছুমাত্রও ভুল হয়নি তার। এ তার সে বহু আকাঙ্ক্ষিতাই বটে। তার সে-মেহবুবা। তার জীবনের প্রথম আনন্দ-সুখ প্রদায়িনী। গুটি গুটি এগিয়ে গেল পালঙ্কের দিকে। কাছে, একেবারে পালঙ্কের গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার যৌবনের জোয়ারকে নতুন করে চাক্ষুষ করতে লাগল ।

হাসান দুরু দুরু বুকে পালঙ্কের ওপর উঠে বসল। মেহবুবার গালের কাছে হাতটি নিয়ে গিয়েও আবার টেনে নিয়ে এল। হুসন ঘুমের ভান করে বিছানায় আগের মতই এলিয়ে পড়ে রইল। দু’চারটে ছােট ছােট কোঁকড়ানাে কুচকুচে কালাে চুল হুসন -এর কপালের ওপর পড়েছে। এগুলাে তার ঘুমের সৌন্দর্যকে আরও অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে।

হাসান বিস্ময় বিস্ফারিত কামাতুর চোখ দুটো মেলে হুসন-এর আধফোটা পদ্মের মত মুখটির দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর দ্বিধাজড়িত হাত দিয়ে আলতাে করে তার কপালের ওপর জড়াে হওয়া চুলগুলােকে সরিয়ে দিল।

হাসান-এর হাতের ছোঁয়া পেয়ে হুসন ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। এমনই কোন এক সুযােগের প্রতীক্ষায় ঘুমের ভান করে পড়েছিল এতক্ষণ। এবার আড়মােড়া ভেঙ্গে উঠে বসল। হাত বাড়িয়ে হাসানকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবেগ-মধুর স্বরে বল্ল-মেহবুব, অমন করে কি দেখছ? কি আছে আমার মুখে? সারারাত ধরে তাে প্রাণ ভরে খেলে। এতেও আশ-মেটেনি তােমার ? আরও মন চাইছে? কিন্তু আর কি করে সম্ভব, বল তাে? ভাের হয়ে এল যে। আমার যা কিছু সম্পদ আঠারাে বছর ধরে কামাতুর মানুষগুলাের কাছ থেকে আগলে আগলে রেখেছিলাম সবই তাে তােমাকে উজাড় করে দিয়েছি। কথা বলতে বলতে কামবিকারে দু'হাতে তাকে বুকের মধ্যে সজোরে চেপে ধরে বল্ল  –“আমার দেহের গােপন সম্পদগুলাে তােমার মনকে কি তুষ্ট করতে পেরেছে বল তাে মেহবুব?’ এবার আচমকা নিজের ঠোট দুটো দিয়ে হাসান-এর ঠোট দুটো আঁকড়ে ধরল। আলতাে একটি কামড় দিয়ে বলল—সারা রাত্রি ধরে আমাকে ময়দা ডলার মত পেশাই করেছ। কামড়ে কামড়ে ঠোট দুটোতে রক্ত জমাট বাঁধিয়ে দিয়েছ। আর যেটুকু বাকি ছিল পূরণ করে দিলাম, এবার পিয়াস মিটেছে তাে?’  সােনা মানিক আমার, এখন আর নয়। ভােরবেলা লােকে দেখে ফেললে লজ্জার ব্যাপার হবে। আমার যা কিছু সম্পদ সবই তাে তােমার কাম-জ্বালায় শান্তিবারি সিঞ্চন করার জন্যই। সবই তাে তােমার। শুধু তােমার, থাকবেও শুধু তােমারই জন্য।  হাসান এবার হুসনের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে বলল—“আমি কি তবে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম? হালুইকর সেজে দোকানদারি করেছিলাম খােয়াবের মধ্যে? সন্ধ্যাবেলা ফুটফুটে একটি লেড়কা আর তার নফর কে আমার নিজের হাতে হালুয়া খাইয়েছিলাম। ব্যস, খানিক বাদে একদল ষণ্ডামার্কা লোক এসে আমার দোকানটি ভেঙেচুরে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল | আমাকে পিঠমােড়া করে বেঁধে উজিরের তাবুতে নিয়ে গেল | উজিরের হুকুমেই নাকি তারা আমার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে। উজিরের অজুহাত হালুয়াতে নাকি মরিচ পরিমাণ মত দেওয়া হয় নি।

হুসন তার একটি হাত টেনে নিয়ে পরীক্ষা করতে করতে  বলল—“হাতদুটো আবার কেটেটেটে যায় নি তাে?  হাসান তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হেসে বল্ল-তােমার মাথাটাথা খারাপ হ’ল নাকি! খােয়াবের মধ্যে হাত বাঁধলে কাটাকাটি হয় নাকি কখনও। সত্যি সত্যি বাঁধলে না হয় সম্ভাবনা থাকত। তারপর আরও আছে। পিঠমােড়া করে বেঁধেও খুশী হতে পারে নি। আবার বলে কিনা ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করবে!

হুসন আঁতকে উঠে বলল—“ওমা, সে কি কথা গাে! আমার সােনা মানিককে মারবে, কার এমন সাধ্য!

-“আরে তুমিও যেমন! বলছি না, সবই খােয়াবের ব্যাপার। -“হ্যা গাে, ঠিকই বলেছ। খােয়াবের মধ্যে অনেক কিছুই হতে পারে বটে।'আচমকা কপালের দিকে হাসান-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে হুসন বলে উঠল-“হ্যা গা, তােমার কপালে কিসের দাগ দেখা যাচ্ছে যেন?  কপালে হাত বুলাতে বুলাতে হাসান বলল—“তাই তাে, তবে তাে খােয়াব টোয়াব মিথ্যে! ছেলেটির পিছন পিছন হাঁটার সময় সে রেগে গিয়ে একটি পাথর ছুঁড়ে মেরেছিল। অব্যর্থ লক্ষ্য। কপালে লেগে কেটে গেল। খুন ঝরল বহুত। দাওয়াই লাগিয়ে ক্ষতটি শুকোতে হয়। মুহূর্তকাল নীরবে ভেবে এবার সে বলল—কী ঝকমারিতেই না পড়া গেল! একবার ভাবি খােয়াব, আবার মনে হয় কিছুতেই খােয়াব হতে পারে না। সবকিছু কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে।

–‘আমার কথা শােন সােনা মানিক, ওসব উদ্ভট ব্যাপার স্যাপার নিয়ে ভেবে মিছে মনটিকে বিষিয়ে তুলাে না। কথা বলতে বলতে হুসন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। মন-প্রাণ উতলা করা হুসন এর আঠার বছরের নিটোল স্তন দুটোর ফাঁকে মুখ গুঁজে পরমতৃপ্তির স্বস্তিতে এলিয়ে পড়ে রইল। না, আর কিছুই ভাবতে পারছে না সে ভাবা সঙ্গতও নয়। অতীতের জের হিসাবে বর্তমানকে কল্পনা করে মন-প্রাণ বিষিয়ে তােলা নিতান্তই বােকামি।।

পরম স্বস্তিতে হাসান-এর চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে। কখন ঘুমের ঘােরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল বুঝতেই পারে নি। ঘুম ভাঙার পর হাসান যখন চোখ মেলে তাকাল তখন সূর্য গুটি গুটি আকাশের গা-বেয়ে অনেকখানি ওপরে উঠে গেছে। চোখ মেলে তাকিয়েই সামনে উজিরকে দেখতে পেল। সচকিত হয়ে তার দিকে সভয়ে তাকাল। উজির সেই অত্যাচারী উজির। উজির সামস-অল-দীন একটি কুর্শিতে বসল। এবার মুচকি হেসে বলল-“বাপজান, তুমি আমার ছােট ভাইয়া নুর-অল-দীন এর বেটা। তােমাকে আমি বহুত দুঃখ দিয়েছি। তুমি যে আমার বেটির স্বামী আর আজীব-এর আব্বা সে সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার জন্যই আমাকে কিছু চাতুরীর আশ্রয় নিতেই হয়েছে। গতকাল রাত্রে তােমার টুকরাে টুকরাে কথাবার্তা শুনে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হতে পেরেছি। আসলে আমার ভাইয়া নূর-এর সঙ্গে আমার সামান্য ভুল বােঝাবুঝির জন্যই এতসব কেলেঙ্কারী হয়েছে। উজির দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পরমুহূর্তেই আজীব ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকল। হুসন হেসে বলল—“বেটা, তাের আব্বাজীর কথা জিজ্ঞেস করছিলি না? এই যে তাের আব্বাজী।

আজীব দেখল, সে হালুইকর। কি ভাবল, কে জানে? তারপরই ছুটে গিয়ে হাসান-এর গলা জড়িয়ে ধরল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসান-এর মা-ও সেখানে উপস্থিত হ’ল। বেটা ! মেরে লাল!’ বলে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল।

এ-পর্যন্ত বলে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

                    কুঁজো,ইহুদী হেকিম, দর্জি ও নাপিতের কিসসা 

পরদিন বাদশাহ শারিয়ার যথাসময়ে অন্দরমহলে বেগম | শাহরাজাদ-এর ঘরে এলেন। বেগম শাহরাজাদ কোনরকম ভুমিকা না করেই কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, এবার বাগদাদের এক দর্জি, কুঁজো, ইহুদী হেকিম, খ্রীস্টান দালাল এবং নাপিতের কিসসা বলছি, ধৈর্য ধরে শুনুন।

চীনদেশের এক ছােট্ট নগরে এক দর্জি বাস করত। লােকটি খুবই আমুদে, দিলদরিয়াও বটে। দোকান নিয়ে সর্বদা পড়ে থাকে। কোন ঝামেলায় নিজেকে জড়ায় না। দর্জিটি গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য যেটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই রােজগার করে। অবশিষ্ট সময়টুকু আনন্দ-ফুর্তির মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে দেয়। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লে হাতের কাজ ফেলে উঠে পড়ে। বিবিকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে যায়। দুজনে মনের সুখে নদীর ধার দিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর দেশ-বিদেশের গল্প বলে। অন্যান্য দিনের মত সেদিনও বিকেলের দিকে দর্জি সস্ত্রীক .......চলতে থাকবে ।

Post a Comment

0 Comments