আরব্য রজনী পার্ট ১৮ ( Part 18 )

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
এক সময় হাসান-এর ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে তাকাল। সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা এক দেশের পথের ধারে সে শুয়ে। আর তাকে ঘিরে রয়েছে একদল কৌতুহলী নগরবাসী। সে চিৎকার করে বলে উঠল—“আমি কোথায়? এ কোন দেশ? আমি এখন কোথায় আছি? তােমরাই বা কারা ?

পথচারীদের একজন বলল—“তােমাকে আমরা এখানে, এভাবেই পড়ে থাকতে দেখেছি। এ নগরের নাম দামাস্কাস। তুমি  এখানে এলেই বা কি করে? কে তুমি? থাক কোথায় ?

—“আমিও তাে একই কথা ভাবছি। কাল রাত্রে আমি তাে কায়রাে নগরে ছিলাম। আর এখন দামাস্কাসে?  হাসান-এর কথায় পথচারীরা হাে হাে করে হেসে উঠল। হাসবার মত কথাই বটে। কায়রাে আর দামাস্কাসের মধ্যেকার ফারাকটুকুর কথা ভেবেই তাদের হাসির উদ্রেক হয়েছে। কেউ কেউ তাকে বদ্ধ পাগল ভেবে রসিকতা শুরু করে দিল।


এক প্রবীণ এগিয়ে এসে বলল -বাপু সত্যি করে বল তাে ব্যাপারটি কি? তােমার কথাবার্তা আমাদের মনে কেমন বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে।


—“গত সন্ধ্যায় আমি বসরাহতে ছিলাম। মাঝরাত্রে ছিলাম কায়রাে নগরে। আর এখন দেখছি, দামাস্কাসের রাস্তার ধারে পড়ে রয়েছি।হাসান কথা বলতে বলতে উঠে হাঁটতে লাগল। তার পিছন পিছন চলল একদল ছেলে বিভিন্ন কৌশলে রঙ্গ-তামাশা করতে করতে। এদিকে কায়রাে নগরের প্রাসাদে সদ্য বিবাহিতা রূপসী-যুবতী সিৎ-অল-হুসনর ঘুম ভেঙে চেয়ে দেখে তার স্বামী হাসান অনুপস্থিত। উদভ্রান্তের মত ঘরের চার দিকে সে তাকাতে লাগল। , সে ছাড়া ঘরে দ্বিতীয় কোন প্রাণীর অস্তিত্ব নেই। তার দু’চোখ বেয়ে পানির ধারা নেমে এল। সামস-অল-দীন এসব ব্যাপার কিছুই জানে না। সে সারারাত্রি নিজের প্রাসাদের ছােট্ট একটি ঘরে কেঁদে কেঁদে কাটিয়েছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, সুলতান ক্রোধের বশবর্তী হয়ে সে হতচ্ছাড়া অষ্টাবক্র লােকটার সঙ্গেই তার একমাত্র পরমা-সুন্দরী, আদরের দুলালী হুসন-এর বিয়ে দিয়ে গায়ের ঝাল মিটিয়েছেন। তাই সে বেটির কথা বিশ্বাসই করতে চায় না। বিশ্বাস করার মত কথাও নয় যে, এমন একটি গাঁজাখুরি গল্পকে সত্যি বলে মেনে নেবে। মনে ধন্ধ জমাট বাঁধল।


সম-অল-দীন অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—কী সব বাজে বকছিস বেটি! তা-ই যদি হয় তবে তাের সে খুবসুরৎ বরটি গেল কোথায়? এমন সময় প্রাসাদের বাইরের বাগিচায় পাখির কলধ্বনি শােনা


গেল। ভােরের পূর্বাভাস। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।


                                              বাইশতম রজনী 

 বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে এলেন। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার পরের অংশটুকু শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, বৃদ্ধ উজির তার কিসসা বলে চলেছেন আর খলিফা হারুণ-অল রসিদ মন্ত্রমুগ্ধের মত একাগ্রচিত্তে শুনছেন। সদ্য বিবাহিতা হসন তার স্বামীর খোঁজে ছােট-ঘরের দিকে এগােতেই হতচ্ছাড়া অষ্টাবক্রের মুখােমুখি হ’ল। অষ্টাবজের চোখে মুখে ভীতির ছাপ ফুটে উঠল। সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কাপতে লাগল। তার মনে হ’ল হতচ্ছাড়া জিনি বুঝি আসছে। উজিরের সুন্দরী লেড়কিকে তাে পেলই না। তার ওপর সারা রাত্রি যে অত্যাচার তাকে সইতে হয়েছে তা সারা জীবন মনে থাকবে। এ-জন্মের মত শাদীর সাধ তার মিটে গেছে।

হুসন স্বামীকে না পেয়ে কোন কথা না বলে পিছন ফিরে হাঁটতে লাগল। এমন সময় সেখানে এল উজির সামস-অল-দীন। তাকে দেখেই অষ্টাবক্র কাঁপতে কাঁপতে করজোড়ে বলে উঠল—“জিনি মহাশয়, দোহাই তােমার, আর আমাকে শাস্তি দিও না। কথা দিচ্ছি, আর কোনদিন ভুলেও বিয়ের আসর মুখাে হ’ব না।'

সাম-অল-দীন ধমকের সুরে বল-চুপ কর হারামজাদা! জিনিটিনি কাউকে আমি চিনি না। আমি সুলতানের উজির। অষ্টাবক্র লােকটি এবার উজিরকে চিনতে পেরে তড়পানি শুরু করে দিল—“ও আপনি? আমি আরও ভাবলাম বুঝি সেই জিনি। চলে যান এখান থেকে। আপনি আর সুলতান একজোট হয়ে আমাকে মিছিমিছি এমন হেনস্থা করেছেন। আমার জীবনটিই একেবারে বরবাদ করে দিয়েছেন। বেশ তাে ছিলাম। শাদীর লােভ দেখিয়ে—পালান এখান থেকে। জিনি আফ্রিদি এসে পড়লে মজা কাকে বলে আপনাকেও টের পাইয়ে দেবে!

উজির বলল—‘এসাে, এদিকে এসাে।

–‘ক্ষেপেছেন মশাই। জিনি আফ্রিদির আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত আমি এক পা-ও এখান থেকে নড়ছি না। সারারাত্রি ধরে যে শাস্তি ভােগ করেছি ভাবলে এখনও আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। রােদ ওঠা পর্যন্ত আমি এখানেই থাকব।

এবার উজির তার কাছে জানতে চাইল—‘আফ্রিদি তাকে কিভাবে হেনস্তা করেছে, কি কি বলেছে।

অষ্টাবক্র তাকে সারা রাত্রির ঘটনা এক এক করে সবই খুলে বলল। উজির এবার পূবদিককার একটি জানালা খুলে দিয়ে বলল—শােন, সকাল হয়ে গেছে অনেক আগেই। ওই দেখ, ঝলমলে রােদ। এবার তুমি এখান থেকে পালাও।।

ব্যস, অষ্টাবক্র এবার এক দৌড়ে বাইরে চলে গেল। হাঁপাতে হাপাতে একেবারে সুলতানের সামনে এসে দাঁড়াল। সুলতানকে তার সারারাত্রির দুর্ভোগের কথা সবিস্তারে বলল।  আবার এদিকে উজির সামস্-অল-দীন তার বেটি সিৎ-অল হুসনের কাছে ফিরে এল। বলল—‘বেটি, সব কিছু শুনে আমার মাথা ঝিমঝিম করছে। আমি কি তবে পাগলই হয়ে গেলাম। এমন তাজ্জব ব্যাপার তাে বাপের জন্মে কোনদিন শুনিনি। আসল ব্যাপারটি কি খুলে বল তাে শুনি!'

-আব্বাজান, এ আবার খুলে বলার কি আছে? সে-সুদর্শন যুবকটি গত রাত্রে সবারই মন কেড়ে নিয়েছিল। তার সঙ্গেই আমি গতরাত্রি কাটিয়েছি। তুমি আমার আব্বাজান, বলতে শরম লাগছে, তবু বলছি, গতরাত্রেই আমি অন্তঃসত্ত্বা হয়েছি। এবার প্রমাণস্বরূপ তার স্বামীর বাদশাহী টুপি, পাতলুন আর মােহরের থলি প্রভৃতি দেখিয়ে বলল—“আব্বাজান, সবকিছুই তার। উজির বাদশাহী টুপিটি হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বললেন—“বেটি, এ টুপি তাে বসরাহর আমিররা ব্যবহার করে বলে জানি।'  এবার পাতলুনটি হাতে তুলে নিয়ে ব্যস্ততার সঙ্গে তার কোমরের সেলাইটি খুলে ফেললেন। একটি তুলােট কাগজ বেরিয়ে এল। কাগজটির ভাজ খুলেই উজির সামস্-অল-দীন সােল্লাসে চিৎকার করে উঠলেন—‘বেটি, এই দেখ আমার নূর-অল-দীন-এর স্বাক্ষর যুক্ত দলিল! উজির টাকার থলেটিতে এক হাজার সােনার মােহর দেখতে পেল। সে বণিকের দেওয়া স্বর্ণমুদ্রা এগুলাে। সে জাহাজ ক্রয়ের দলিল এটি, এক হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে হাসান-অল-দীন-এর কাছ থেকে একটি জাহাজ ক্রয় করেছে বণিকটি। সবকিছু প্রমাণ পেয়ে ও দলিলটি পড়ে সামস্-অল-দীন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবার জোগাড় হলেন। কথা বলতে বলতে সে হঠাৎ বুক চাপড়ে কান্না জুড়ে দিল—“ভাইয়া, আমার ওপর অভিমান করে তুমি বিবাগী হয়ে ভিনদেশে পাড়ি দিয়েছিলে। জন্মের মত চলে গেলে। আজ তুমি আমাদের সবার ধরা ছোঁয়ার বাইরে! এবার লেড়কির দিকে ফিরে বললেন—'বেটি হাসান বদর-অল-দীন তােমার চাচাতাে ভাইয়া। ওর সঙ্গেই তােমার শাদী হওয়ার কথা ছিল। সামান্য—খুবই তুচ্ছ একটি ব্যাপার নিয়ে আমাদের মধ্যে মতবিরােধ হয়েছিল। ব্যস তাতেই আমার ভাইয়া দেশ ছেড়ে বিবাগী হয়ে গেল। যাক বেটি, আঠারাে বছর পর আমার বাঞ্ছা পূর্ণ হওয়ার কী যে আনন্দ হচ্ছে ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আমি এক হাজার সােনার মােহর ওর কাছে বিয়ের যৌতুক হিসেবে চেয়েছিলাম, তাই সে রেখে গেছে।

উজির আর বৃথা কালক্ষয় না করে ব্যস্ত পায়ে সুলতানের দরবারে উপস্থিত হ'ল। তুলােট কাগজটি তার হাতে দেয়। সবকিছু বিস্তারে বর্ণনা করে। সবকিছু শুনে সুলতান একে আল্লাহর লীলা বলেই মনে করেন।



উজির আবার তেমনি ব্যস্ততার সঙ্গে লেড়কি হুসন-এর কাছে ফিরে আসে। হাসান এখনও ফেরে নি। বেলা বেড়ে চলে। কিন্তু তবু সে না ফেরায় খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। হুসন সবিনয়ে বল—“আব্বাজী, সে ঘর ছেড়ে কি করে যে বেরলাে তা-ই তাে আমি ভাবছি। আমি ঘুমে অচৈতন্য ছিলাম। দরজা জানলা সবই বন্ধ। অথচ ঘুম থেকে জেগে দেখি, সে ঘরে নেই। আশ্চর্য ব্যাপার তাে! বেগম শাহরাজাদ ভােরের পূর্বাভাস পেয়ে তার কিসসা বন্ধ করলন। খানিক বাদে বাদশাহ শারিয়ার দরবারকক্ষের উদ্দেশে পাবাড়ালেন।


                                                  তেইশতম রজনী 


বাদশাহ সারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কাছে। এসে তিনি আবার কিসসা শুরু করলেন—জাঁহাপনা, আশা করি আপনার অবশ্যই খেয়াল আছে উজির জাফর, খলিফা হারুণ-অলরসিদ’কে গল্প শােনাচ্ছেন। উজির সামস-অল-দীন নিঃসন্দেহ হ'ল যে, তার ভ্রাতুস্পুত্রই তার বেটি হুসনকে শাদী করেছে। শাদীর রাত্রেই তার জামাতা উধাও হয়ে গেছে। আর কবে যে সে ফিরবে তা একমাত্র আল্লাতাল্লাই বলতে পারেন। শাদীর বাসর সজ্জা ভেঙে ফেলার আগে তার খুঁটিনাটি সব বিবরণ উজির একটি কাগজে লিখে রাখল। বলা তাে যায় না, ভবিষ্যতে এটি কোন কাজে হয়ত লেগে গেলেও যেতে পারে। এদিকে উজিরের সদ্য বিবাহিতা লেড়কি যা অনুমান করেছিল তা-ই সত্যি হ’ল। শাদীর প্রথম রাত্রে তারা যে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছিল তাতেই সে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। নয় মাস পরে ফুটফুটে এক লেড়কা প্রসব করল সে। আব্বাজীর মত অপরূপ। এক ঝলক তাকালেই চোখ ঝলসে দেয়। নবজাতকের নামকরণ করা হ’ল—আজীব। আজীব শব্দের অর্থ চমৎকার! সাত বছর বয়সে তাকে কায়রাের এক বিখ্যাত মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেওয়া হল। পাচ বছর বাদে অর্থাৎ বারাে বছর বয়সে সে মাদ্রাসার পাঠাভ্যাস সাঙ্গ করে। এ-মাদ্রাসায় পাঠাভ্যাসকালে একদিন আজীব-এর সঙ্গে তার সহপাঠীদের বচসা হয়। শেষে তা তুমুল ঝগড়ার রূপ নেয়। সবাই জোট বেঁধে মৌলভীর শরণাপন্ন হয়। মৌলভী তাদের একটি ফন্দি শিখিয়ে দেন।মৌলভীর ফন্দিটিকে বাস্তবায়িত করতে গিয়ে আজীব-এর সহপাঠীদের একজন বলে, আজ আমরা ভারি মজার একটি খেলা করতে চাই। তােমরা যদি রাজি থাক তাে বল, খেলাটি শুরু করি। ছাত্রটির কথায় সবাই একবাক্যে সম্মতি জানাল। আজীবও সােল্লাসে সম্মতি দিল। শুরু হ’ল সে-মজার খেলাটি। এক ছাত্র বলল-“তােমরা জানাে আমার নাম নবী। আমার আব্বার নাম ঈজ-অল-দীন আর আমার আম্মার নাম নবীয়াহ।


অন্য আর এক ছাত্র বলল—“আমার নাম নাজীব। আমার আব্বার নাম মুস্তাফা আর আম্মার নাম জামিনাহ।


এবার এল আজীব-এর পালা। সে সগর্বে নিজের নাম বলতে গিয়ে বলল আজীব। আম্মার নাম বলল সিৎ-অল-হুসন। আর আব্বার নাম বলল মিশরের উজির সামস-অল-দীন।


তার কথা শেষ হওয়া মাত্র সহপাঠীরা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল। ‘ধ্যৎ তিনি তাের আব্বা কি করে হবেন রে! যত্তসব তাপ্লিমারা কথা। তিনি তাে তাের আম্মার আব্বাজী। তুই আব্বার নাম জানিস না। তাের সঙ্গে আজ থেকে আমাদের মেলকুদ বন্ধ।


এমন সময় মৌলভী এসে বললেন-বেটা, ওদের কথাই ঠিক বটে। উজির তােমার আব্বা নন। তােমার দাদা মশাই হন। তােমার আব্বা যে কে তা আমাদেরও সঠিক জানা নেই। এক অদ্ভুত দর্শন অষ্টাবক্র লােকের সঙ্গে তােমার আম্মার শাদী হয়েছিল, সবাই জানে। কিন্তু সে নাকি আদৌ তােমার আম্মার সঙ্গে সহবাস করে নি। সে সবার কাছে প্রচার করে বেড়াতে লাগল, এক জীন এসে নাকি তােমার আম্মার গর্ভে সন্তান পয়দা করে গিয়েছিল। অতএব তােমার দোস্তরা যা বলেছে, সবই সত্য। এরকম লেড়কাকে আমরা ‘জারজ’ বলি। তাই তােমাকে আমি একটি মাত্রই উপদেশ দিচ্ছি, তােমার অহঙ্কার একটু কমাও বেটা। স্বভাব-চরিত্র একটু নম্র কর। মাদ্রাসা-ছুটি হলে আজীব সােজা বাড়ি এসে তার আম্মাকে সরাসরি প্রশ্ন করল--আমার আব্বা কে? কি নাম তার ? কোথায় থাকেন তিনি?

 --উজির। তােমার বাবা তাে উজির।

–‘ঝুট! বাজে কথা! উজির সামস-অল-দীন তাে আমার আব্বা নন। তিনি তাে তােমার আব্বা। আমার আব্বার নাম কি? উপায়ান্তর না দেখে সিৎ-অল মুখে কলুপ এঁটে বসে থাকে। কি ই বা জবাব দেবে? আজীব এবার রীতিমত ক্ষেপে গিয়ে বলল—“তাড়াতাড়ি বল, নইলে এক্ষুণি তরবারি দিয়ে আমার গলা কেটে ফেলব, বলে দিচ্ছি। চমকে উঠে সিৎ-অল বলল—“বলছি শােন বেটা, আমার শাদীর রাত্রে তার সঙ্গে আমার প্রথম ও শেষ দেখা। সে অপরূপের রূপের আগুনে আমার দেহ-মন, আমার সব সত্ত্বা ও সঞ্চয় সবই জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তাকে আমার মন-প্রাণ-দেহ সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছি। আমার সবকিছু নিয়ে সে উধাও হয়ে যায়। তারপর অনেক শীত-বসন্ত একে একে পার হয়ে গেছে। তবু সে ফেরেনি। আজও তার পথচেয়ে দিন গুণছি।

কথা বলতে বলতে সিৎ-অল ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। বালক আজীবও তার আম্মার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।

উজিরের কাছে খবর যায়, আজীব তার পিতৃ-পরিচয় জানার  জন্য ব্যাকুল।উজির খবর পেয়ে ব্যস্ত হয়ে লেড়কি হুসনের ঘরে ছুটে আসে। চোখ মুছতে মুছতে সিৎ-অল বলে—‘আব্বাজী, বেটা আমার কাছে তার পিতৃ-পরিচয়, বংশ-পরিচয় জানতে চায়। তার মাদ্রাসার দোস্তরা নাকি এ-নিয়ে অনেক মন্দকথা তাকে বলেছে। তাই হয়ত মনে ব্যথা পেয়েছে, উদ্বেল হয়ে উঠেছে।

উজির এবার একমাত্র নাতিকে কোলে বসিয়ে এক এক করে বলতে লাগল—তার ছােট ভাইয়া নূর-অল-দীন কেন বিবাগী হয়ে দেশত্যাগী হয়েছে। বসরাহ-তে গিয়ে সেখানকার উজিরের লেড়কিকে শাদী করে ঘর সংসার পাতে। তাদের সন্তান হাসান। তারপরই নূর বেহেস্তে চলে যায়। তােমার আম্মার শাদীর রাত্রে তার আকস্মিক ও অলৌকিক আবির্ভাব ঘটে। ভাের হবার আগেই আবার একই অলৌকিক উপায়ে অন্তর্ধান করে। ব্যাপারটি আজও বহস্যের আড়ালেই রয়ে যায়। মুহূর্তকাল নীরবে ভেবে এবার বলল—‘চল আমরা বসরাহ-তে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি। এখানে আমাদের কাছে নিয়ে আসি। আমরা সামনে গিয়ে দাঁড়ালে আর আপত্তি করতে পারবে না।'

উজির দুপুরের কিছু আগে দরবারে সুলতানের সঙ্গে দেখা করল। সব বৃত্তান্ত তার কাছে নিবেদন করল। সুলতান খুশি হয়ে বললেন—উজির তােমাকে বরং কিছুদিনের জন্য ছুটি দিচ্ছি, বসরাহ-তে গিয়ে খোঁজ করে দেখ। আমার বিশ্বাস, বসরাহ বা তার কাছাকাছি কোন না কোন জায়গায় তার দেখা পাবেই। উজির সুলতানের পরামর্শ ও নিজের ঐকান্তিক আগ্রহে আজীব ও কয়েকজন নফরকে নিয়ে বসরাহর পথে পা বাড়াল। পেীছল দামাস্কাস নগরে, দামাস্কাস সুপ্রাচীন ও সুপ্রসিদ্ধ নগর। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ও সুন্দর মসজিদ এখানেই অবস্থিত।

সবাই যখন মসজিদ দেখে বেড়াচ্ছে তখন আজীব উজিরের ভৃত্য সাইদকে নিয়ে নগর দেখতে বেরল। বিপদ হ’ল এখানেই। পথচারীরা ভিড় করে সুদর্শন আজীবকে দেখতে লাগল। রূপসৌন্দর্যের এমন সমাবেশ কোন পুরুষের দেহে সচরাচর দেখা যায় না। ক্রমে মহিলারাও দরজা ও জানালা খুলে তাকে দেখে জীবন ধন্য করতে উৎসাহী হয়ে উঠল। সে এক অদ্ভুত কাণ্ড কৌতুহলী জনতার তাড়নায় অতিষ্ট হয়ে সাইদ উপায়ান্তর না দেখে আজীবকে নিয়ে একটি মিঠাইয়ের দোকানে গিয়ে মাথা গুজল। এ-দোকানেই একদিন হাসান-বদর-অল-দীন পথের বদমায়েশ যুবকদের তাড়া খেয়ে ঢুকে পড়েছিল। আর প্রায় বারো বছর ধরে এ-দোকানেই আশ্রয় নিয়ে সে বাস করছে। তিন বছর আগে দোকানি সংসারের মায়া কাটিয়ে বেহেস্তে চলে গেছে। এখন হাসানই দোকানের মালিক বনে গেছে। বেদানার হালুয়া এ দোকানের মিঠাইয়ের মধ্যে সবথেকে নাম করা খাবার। তামাম দামাস্কাস নগর ঢুঁড়ে এলেও এমন সুন্দর হালুয়া আর কোথাও পাওয়া যাবে না। হাসান এর তৈরীর কৌশল তার মায়ের কাছ থেকে শিখেছিল। _ আজীব অকস্মাৎ দোকানের ভেতর ঢুকে গেলে হাসান অবাক বিস্ময়ে তাকে দেখতে লাগল। চেয়ে রইল অপলক চোখে। প্রথম দর্শনেই কেমন যেন ভালবেসে ফেলল ছেলেটিকে। এক সময় বিস্ময়ের ঘাের কাটিয়ে বলল—‘বেটা, তােমাকে কেমন যেন চেনা 'চেনা ঠেকছে। কোথায় তােমাকে দেখেছি, বল তাে? আমার নিজের হাতে তৈরী একটু মিঠাই তােমাকে খাওয়াতে চাই, আপত্তি নেই তাে?’  আজীব তার সঙ্গী সাইদ-এর দিকে তাকিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল—লােকটিকে খুবই দুঃখী মনে হচ্ছে। কিসের যেন একটি অভাব তার ভেতরটিকে মরুভূমি করে দিয়েছে। একদিন হয়ত আমারই মত তার একটি লেড়কা ছিল। হয়ত সে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। আমি আমার আব্বার খোঁজে ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছি, আর অভাগা লােকটি হয়ত তার লেড়কাকে ফিরে পেতে ব্যাকুল।কথা বলতে বলতে সে মিঠাইয়ের জন্য হাত বাড়াল। সাইদ সঙ্গে সঙ্গে তার হাতটি টেনে নিয়ে বলল—“আরে করছ কি ? উজির সাহেব শুনলে গােসা করবেন যে! আমার গর্দান নিয়ে লড়বেন। তুমি উজিরের বেটা। তােমার কত ইজ্জত। এরকম একটি দোকানে দাড়িয়ে মিঠাই খেলে তােমার ইজ্জত থাকবে কোথায়,শুনি?

হাসান এবার ছল ছল চোখে বলে ওঠে—তােমার মত বিশ্বস্ত ও অনুরক্ত নফর তামাম দুনিয়া ঢুঁড়ে এলেও দ্বিতীয়টি আর মিলবে না । তাই তাে নিজের শিরের মনির তুল্য অন্তরের ধনকে তােমার হাতে তুলে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত হতে পেরেছেন।  দাওয়াইয়ে কাজ হয়েছে। নফর সাইদ-এর তিড়িকি মেজাজ কিছুটা শান্ত হ’ল। সে আজীব’কে নিয়ে দোকানের বাঁশের মাচাটায় বসল।

হাসান প্রফুল্লচিত্তে কিছু গরম বেদানার হালুয়া এনে আজীবএর হাতে দিল। আজীব আর সাইদ পরম তৃপ্তিতে মুখরােচক হালুয়াটুকু আহার করল। এদিকে হাসান খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আজীব’কে দেখতে লাগল। যত দেখছে ততই যেন অজ্ঞাত কুলশীল বালকটির ওপর তার মায়া বেড়ে যাচ্ছে। হাসান আজীব-এর পাশে, একেবারে গা-ঘেঁষে বসল। তার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে সস্নেহে বলল—“বাছা, তােমার কথা শােনার জন্য আমার মন খুবই চঞ্চল হয়ে উঠেছে। যা হােক কিছু বলে আমার কৌতূহল নিবৃত্ত কর।

আজীব চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-“আমার কথা আর কিই বা শুনবে? আমি বড়ই দুঃখী, আমার বাবা আজ কোথায়, কিভাবে আছেন কিছুই জানি না। আমার আম্মা আর দাদু দেশ-দেশান্তরে তার খোঁজে ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছেন। হয়ত খুঁজতে খুঁজতে তামাম দুনিয়া ঢুঁড়ে ফিরতে হবে তাকে। খােদাতাল্লার মর্জি নসীবে কি আছে তিনিই জানেন। কথাটি বলেই বালক আজীব চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

হাসান তার কথায় ব্যথিত-মর্মাহত হ’ল বটে কিন্তু আজীব যে তারই লেড়কা ধারণাও করতে পারল না।

সাইদ এবার হাসান-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আজীব-এর হাত ধরে পথে নামল। কয়েক পা গিয়েই থমকে দাঁড়াল। দেখে, হাসান তাদের পিছন পিছন আসছে। ভাবল, লােকটির মাথায় কোন বদ মতলব নেই তাে? নইলে পিছু নেবে কেন?

হাসান মুচকি হেসে বলল—নগরের বাইরে একটু জরুরী কাজ রয়েছে, তাই ভাবলাম, তােমাদের সঙ্গেই চলে যাই। কথা বলতে বলতে পথ পাড়ি দেওয়া যাবে।  সাইদ এবার একটু বেশ উত্তেজিত কণ্ঠেই বলল—“তুমি কি আমাদের তিষ্ঠোতে দেবে না? একটু হালুয়া খাইয়ে রাজ্যি জয় করে নিয়েছ মনে হচ্ছে। হাসান তার আকস্মিক কথাটিতে ফুটা বেলুনের মত চিপসে গেল। কণ্ঠস্বরে উষ্মা প্রকাশ করে বলল—এমন বাজে কথা বলছ কেন? পথ তাে আর কারাে একার নয়। | আজীব তাকে সমর্থন করে বলল—“ঠিকই তাে, খােদার তৈরী পথে সব মুসলমানেরই সমান অধিকার। আমাদের তাবুর দিকে গেলে না হয় আচ্ছা করে সাজা দিয়ে দেওয়া যেত।

কিছুদুর গিয়ে তারা হাসবার-এর পথ ধরল। হাসবার-এ তাদের তাবু ফেলা হয়েছে। হাসানও মােড় ঘুরল তাদের সঙ্গেই। আজীব এবার ভাবল, লােকটির মতলব নির্ঘাৎ ভাল নয়। কোন ধান্দায় পিছু নিয়েছে। সে একটি পাথরের টুকরাে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারল। সেটি হাসান-এর কপালে আঘাত হানল। খুন বেরিয়ে এল। সাইদ আজীব-এর হাত ধরে এক দৌড়ে তাবুতে হাজির হয়ে গেল। হাসান নিজের বােকামির জন্য অনুতপ্ত হ’ল। দোকান বন্ধ করে তাদের পিছু নেওয়াটাই কাল হয়েছে। ফিরে এসে হতাশা জর্জরিত মনে আবার সে দোকানে বসল। উজির সামস-অল-দীন দু’দিন দামাস্কাস নগরীতে কাটিয়ে তাবু গােটাবার নির্দেশ দিলেন। পথে ছােট-বড় ও অখ্যাত-অবজ্ঞাত বহু নগরী পেরিয়ে তারা এক সময় বসরাহতে হাজির হ'ল।

বসরাহতে সুলতানের দরবারে মেহমান হয়ে উঠল। সুলতানকে কুর্নিশ করে বলল-“জাহাপনা, আমি আপনার প্রাক্তন উজির নুর অল-দীন-এর বড় ভাই, সম্প্রতি মিশরের সুলতানের উজিরের পদে বহাল রয়েছি।

সুলতান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—“আমার নসীব মন্দ তাই নূর-অল-দীন-এর মত একজন সাচ্চা উজিরকে হারাতে হয়েছে, আহা! বড় ভাল লােক ছিল। আর তার বেটা হাসান সে-ও ছিল আমার চোখের মনির মতই আদরণীয়। আল্লাহর বিচিত্র মর্জি। সেও আজ আমাকে ছেড়ে কোথায় যেন চলে গেছে। তবে নূর-অল-দীন এর বিধবা বিবি এখানে, এ বসরাহ নগরেই রয়ে গেছে। বেটা যদি কোনদিন ফিরে আসে সে আশায় আশায় দিন গুণে চলেছে।

সুলতানের মুখে নূর-এর বিবির কথা শুনে সামস-অল-দীন তার সঙ্গে একবারটি মােলাকাৎ করার জন্য ব্যাগ্র হয়ে উঠল, সুলতান তাকে সেখানে পৌছে দেবার ব্যবস্থা করলেন।

সামস-অল-দীন নূর-এর প্রাসাদ তুল্য সুবিশাল ইমারতে উপস্থিত হ’ল। চোখের পানি ফেলতে ফেলতে প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করল। সামনেই একটি ঘরের বন্ধ দরজায় কড়া নাড়ল। এক রূপসী দরজা খুলে, ওড়নায় মুখ ঢেকে দরজার এক ধারে নতমুখে এ দাঁড়িয়ে রইল। হাসান নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে দরজা বন্ধ করে সে শােকজ্বালায় জর্জরিত হচ্ছে। ঘরের কেন্দ্রস্থলে একটি তাজিয়া সাজিয়ে রেখেছে। হাসান আর ইহজগতে নেই এ-বিশ্বাসের বশবর্তিনী হয়েই সে এর আয়ােজন করেছে। তার স্মারক হিসাবেই এটি নির্মাণের উদ্দেশ্য। তাজিয়াটির সামনে বসে সে অহর্নিশি চোখের পানি ফেলে আর বলে—“তাজিয়া, সে কি ইহজগৎ ত্যাগ করে তােমার কোলেই চিরশান্তি লাভ করেছে? তাকে কি আর কোনদিন আমার চামড়ার চোখ দুটো দিয়ে দেখতে পাব না? সে এক নওজোয়ান। শাদীর রাত্রের সাজে সজ্জিত হয়ে সে তাে আশমানের তারার মেলায় তােমার কোলে শুয়েই বিশ্রাম করছে। নুর-এর স্ত্রী, হাসান-এর মায়ের মুখে এরকম বিলাপ শুনে সামস-অল-দীন দরজা থেকে এক পা-ও নড়তে পারল না। স্থবিরের মত ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। এক সময় হাসান-এর মা চোখ মুছতে মুছতে আবার দরজার কাছে এল। আগন্তুক সামস-অল-দীন নিজের পরিচয় দিল, হাসান এর মা তাকে অভ্যর্থনা করে ঘরের ভেতরে নিয়ে কুরশি এগিয়ে দিল বসার জন্য। কুরশিটি টেনে বসে সে সব ঘটনা খুলে বলল—“তার বেটির শাদীর রাত্রে কিভাবে সুকৌশলে ঘরে ঢােকে, কিভাবে বেটির সঙ্গে শাদী হয়, কিভাবে তারা সহবাস করে আর কিভাবেই বা ভাের হওয়ার আগেই বাসর ঘর থেকে সে উধাও হয়ে যায় সবই এক এক করে সবিস্তারে বর্ণনা করে। এবার আজীব’কে সামনে এগিয়ে দিয়ে বলে—তােমার নাতি। তােমার বংশের একমাত্র সন্তান। একে............ চলতে থাকবে। 

Post a Comment

0 Comments