গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
ব্যথিত মর্মাহত সুলতান বহু দেশের দরবারে দূত পাঠিয়ে নূর-অল-দীন-এর খবরাখবর নিতে লাগলেন। বৃথা চেষ্টা। দূতরা এক এক করে খালি হাতে ফিরে এল। দূতদের কেউ-ই কিন্তু বসরাহ রাজ্যে যায় নি। কেন যে তারা একটিমাত্র রাজ্য বাদ দিল এ নিয়ে কারাে মনেই কোন সন্দেহের উদ্রেক হয় নি।ছােট ভাইয়ার খোঁজ না পেয়ে সামস-অল-দীন বুক চাপড়ে কাদতে লাগল। একমাত্র নিজের দোষেই সে তার প্রাণপ্রতীম ভাইকে হারিয়েছেন। তার শােক ক্রমে মন থেকে মুছে যেতে যেতে এক সময় একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। স্বাভাবিকতা ফিরে পেল । সামস-অল-দীন বিয়ে শাদী করে ঘর বাঁধল। তার জীবনে আবার হাসি আনন্দের জোয়ার নেমে এল। আল্লাহর মর্জি মানুষের বুঝা ভার। তা নইলে ছােট ভাইয়া নূর-অল-দীন-এর শাদীর রাতেই বড় ভাইয়া সামস-অল-দীন-এর বিয়ে কি করে সম্ভব হল? আরও আছে—নুর-অল-দীন-এর বিবি যে-রাত্রে অন্তঃসত্ত্বা হ’ল সে-রাত্রেই সামস-অল-দীন-এর বিবিও গর্ভে সন্তান ধারণ করল! আশ্চর্য ব্যাপার নয় কি! একমাত্র আল্লাহর খেয়ালের ফলেই এমনটি সম্ভব হতে পারে।
নূর-অল-দীন-এর শাদীর ব্যাপার স্যাপার মিটে গেলে বৃদ্ধ উজির তাকে নিয়ে সুলতানের দরবারে হাজির হলেন। সুদর্শন নূর অল-দীন’কে প্রথম দর্শনেই সুলতানের মধ্যে স্নেহের উদ্রেক ঘটল। বৃদ্ধ উজির প্রস্তাব দেওয়ামাত্রই তিনি তাকে উজিরের পদে বহাল করতে সম্মত হলেন।
সুলতানের নির্দেশে বৃদ্ধ উজির তার জামাতা নূর-অল-দীনকে উজিরের কাজকর্ম সব বুঝিয়ে দিলেন। | নুর-অল-দীন উজিরের পদলাভ করলেন। সেই সঙ্গে সুন্দর বাসস্থল, আসবাবপত্র, নফর, খচ্চর ও ঘােড়া প্রভৃতি প্রয়ােজনীয় যা কিছু দরকার সবই পেল।
যথাসময়ে নূর-অল-দীন-এর এক লেড়কা জন্মগ্রহণ করল। আবার ঠিক সেদিনই তার দেশের বাড়িতে তার বড় ভাইয়ার একটি লেড়কী জন্মায়। নূর-অল-দীন তার লেড়কার নাম রাখল হাসানবদর-অল-দীন।।
এদিকে সুলতানের দরবারে নূর-অল-দীন-এর খুবই সুখ্যাতি। সে যেমন কাজকর্মের দিক থেকে বিচক্ষণ তেমনি ব্যবহারও খুবই মধুর। সবার সঙ্গেই হেসে হেসে কথা বলে। সুলতান তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তার বেতন বাড়িয়ে দিলেন বেশ কিছু দিনার। হবে নাই বা কেন? রাজস্বও যে বৃদ্ধি পেতে থাকে। উজির যখন মারা গেলেন তখন হাসান-বদর-অল-দীন-এর ওমর মাত্র চার সাল। উজিরের মৃত্যুতে সে পদে আসীন হয় নূরঅল-দীন। উজিরের কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় সর্বদাই কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে হয় তাকে। তা সত্ত্বেও বেটার শিক্ষা দীক্ষার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলত। ধর্ম, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পকলা বিষয়ে অত্যল্পকালের মধ্যেই প্রভূত জ্ঞানলাভ করল। তার ওমর যখন বারাে সাল হ’ল তখন মৌলভী নূর-অল-দীন-'কে বলল-“তােমার বেটাকে আমার আর কিছু দেবার নেই। আমার বিদ্যা সবই ওকে উজাড় করে ঢেলে দিয়েছি।' _ নুর-অল-দীন তার বেটা হাসানকে নিয়ে সুলতানের দরবারে হাজির হ’ল। তাকে দেখে সুলতান চমকৃত হলেন। তার রূপগুণে তিনি যারপর নাই মুগ্ধ হলেন। তিনি উজির নূরকে ডেকে বললেন- “আমার হুকুম, তুমি রােজ দরবারে আসার সময় তােমার বেটা হাসানকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে।
উজির নুর সােল্লাসে বলল—“জী হুজুর। অবশ্যই নিয়ে আসব, আপনার হুকুম তামিল করব, কথা দিচ্ছি।
তারপর থেকে উজির নূর রােজ তার বেটা হাসানকে সঙ্গে করে দরবারে নিয়ে যায়। সুলতান তাকে পাশে বসিয়ে খুব আদর যত্ন করেন। উজির নুর-অল-দীন-এর সংসার হাসি-আনন্দের মধ্যেই কাটতে লাগল।
এমন সময়ে হঠাৎ একদিন নূর-অল-দীন বিমারে পড়ল। বিমার ক্রমেই বেড়ে চলল। অভিজ্ঞ হেকিম ডাকা হ’ল। কোন ফল হ’ল না হেকিম জবাব দিয়ে গেল। নূর-অল-দীন বুঝল, দিন ঘনিয়ে এসেছে। বেটা হাসানকে ডেকে বলল-বেটা, আল্লাহর কাছ থেকে আমার ডাক এসেছে। আমাকে চলে যেতেই হবে। এ-সংসার তাে সরাইখানারই নামান্তর মাত্র। দু'চারদিনের জন্য আসা। মায়া মোহে জড়িয়ে থাকা বৈ তাে নয়। এবার মায়া কটিয়ে বিদায় নেব। আবার বেহেস্তে ফিরে যাব। সেখানে কেবল সুখ-আনন্দ। আনন্দের ছড়াছড়ি।
বেটা, আমার যা কিছু কর্তব্য সবই খতম করেছি। মাত্র একটি কাজই করার বাকি রয়ে গেছে। তােমাকে সে-কাজের ভার দিয়ে যাচ্ছি। কায়রােতে আমার এক বড়ভাই আছে। তার নাম সামসঅল-দীন। সুলতানের উজিরের পদে বহাল রয়েছে। আমিও সেখানকার উজির ছিলাম এক সময়। সামান্য একটি কারণে বড় ভাইয়ের সঙ্গে আমার মতবিরােধ ঘটে, আর তারই ফলে আমি স্বদেশ ত্যাগ করে বহুদেশ ঘুরে এখানে হাজির হই। এবার হাসানএর দিকে চোখ রেখে বলল-“কাগজ-কলম নিয়ে আমার সামনে বােসাে। হাসান তাড়াতাড়ি এক টুকরাে তুলােট কাগজ আর কলম নিয়ে বাপের সামনে বসল। নূর বলল-“বেটা, আমি যা যা বলছি লিখে নাও।
নূর কবে কায়রাে ত্যাগ করেছিল, কবে ও কিভাবে বসরাহ নগরে হাজির হয়েছিল, কবে সুলতানের সঙ্গে পরিচয় হয়, কবে উজিরের লেড়কিকে শাদী করে, কবে তার বিবি অন্তঃসত্ত্বা হয়, কবে হাসান-এর জন্ম হয় প্রভৃতি বিবরণ দিল আর হাসান সবকিছু লিখে নিল। তারপর নুর বলল- “বেটা, কাগজটি যত্ন করে রেখাে। সময় মত বের করবে, অশেষ উপকারে আসবে, আর আমার মৃত্যুর পর একবারটি তুমি স্বদেশ থেকে ঘুরে এসাে, আমার বড় ভাইয়াকে বােলাে, তার সঙ্গে দেখা করে যেতে পারলাম না বলে আমি বড়ই মর্মবেদনা নিয়ে যাচ্ছি।
সে ঘটনার মাত্র একদিন পরেই নূর-অল-দীন-এর মৃত্যু হ’ল। পুত্র হাসান বদর-অল-দীন চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে তার আব্বার গাের দিল। শোকে খুবই ভেঙে পড়েছে, কোন কাজেই মন নেই 'সর্বদা মনমরা হয়ে বসে থাকে। সুলতান তাকে উজিরের পদে বহাল করবেন বলে দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য বারবার তলব পাঠান। কিন্তু হাসান-এর কিছুমাত্রও ভ্রুক্ষেপ নেই। হাসান একটি মাত্র কাজকেই এ-মুহূর্তে অবশ্য করণীয় জ্ঞান করছে। তাকে কায়রােতে যেতে হবে। তার বাবার শেষ বাঞ্ছা তাকে পূরণ করতেই হবে। | এদিকে হাসান-এর আচরণে সুলতান যারপর নাই অপমানবােধ করলেন। ক্রোধােন্মত্ত সুলতান তার কয়েকজন সিপাহীকে আদেশ দিলেন—হাসান যেখানে, যে-অবস্থাতেই থাক না কেন, হাতে শিকল পরিয়ে আমার সামনে হাজির কর।।সুলতানের হুকুমে সৈন্যরা হাসানকে শিকল পরিয়ে দরবারে হাজির করার জন্য ছুটল। সময়মত হাসান-এর এক বিশ্বস্ত অনুচর তাকে সতর্ক করে দিল। তাড়াতাড়ি এ সুলতানিয়ৎ ছেড়ে যাবার জন্য অনুরােধ করল।
অনুচরটির কথা শুনে হাসান প্রমাদ গুণল। সে অনুচরটির কাছ থেকে কিছু দিনার ধারস্বরূপ নিয়ে দীন ভিখারীর সাজে নিজেকে সাজিয়ে নিয়ে পথে নামল। ভাবল, তার আব্বার গােরস্থানে গিয়ে রাত্রিটুকু কাটিয়ে নেবে। তারপর রাত্রির চতুর্থ প্রহরে সে যখন তার বাবার গােরস্থানে বসে চোখের পানি ফেলছে তখন হঠাৎ এক জু অভাবনীয়ভাবে সেখানে হাজির হ’ল। বসরাহর ধনকুবের বণিক। সরবে হেসে বলল—‘হুজুর, আপনি হঠাৎ এখানে কেন ?
—“আরে, আর বােলাে না! আজ দুপুরে এক খােয়াব দেখেছি, আমার বাবা যেন বলছেন, আমার কবরের ধারে একবারটি যাস্। একটি জরুরী কথা তােকে বলব। তারপর আশায় বুক বেঁধে এখানে এসে বসে আছি। চাপা দীর্ঘশ্বাসের মত আওয়াজ করে জু বলল—“আপনার বাবার মত ভাল মানুষ দ্বিতীয় আর একজন দেখিনি। আহারে! কী স্নেহই না করতেন আমাকে একটি কথা আপনাকে বলার জন্য ছটফট করছি। বলার সুযােগ আর হয় নি। আপনার আব্বার যে জাহাজের ব্যবসা ছিল আশাকরি আপনার অজানা নয়। তার সঙ্গে আমার কথা একরকম পাকাপাকিই হয়ে গিয়েছিল, আমি তার জাহাজ কিনে নেব। কিন্তু জাহাজটি হস্তান্তর হওয়ার আগেই তিনি বেহেস্তে চলে গেলেন। আপনি চাইলে আমি একটি জাহাজ নগদ এক হাজার দিনারের বিনিময়ে কিনে নিতে ইচ্ছুক।
হাসান বণিকটির কথায় আপত্তি করতে না পেরে এক হাজার দিনারের বিনিময়ে একটি জাহাজ তার কাছে বেচে দিল। আর একটি রসিদও লিখে দিল—“আমি হাসান-বদর-অল-দীন,পরলোকগত উজির নূর-অল-দীন-এর একমাত্র ছেলে—আপনার কাছ থেকে নগদ এক হাজার দিনার বুঝে পেয়ে (পিতার) সম্প্রতি আমার একটি সওদাগরী জাহাজ বিক্রি করলাম। আর এ-ও কথা থাকছে, আমার যে জাহাজটি বন্দরে প্রথম ভিড়বে সেটিই আপনার হাতে তুলে দেব।” হাসান দলিলটিতে নিজের নাম স্বাক্ষর করে জু এর হাতে তুলে দিল। সে বহুভাবে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বিদায় নিল। হাসান রাত্রির অন্ধকারে আবার একা বসে রইল।
তৃতীয় প্রহরে আব্বাজীর সমাধি সৌধের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। নিঃঝুম নিস্তব্ধ গােরস্থানে গভীর রাত্রে প্রেতাত্মাদের আগমন ঘটে। আর আসে জীন ও পরীরা। তখন এক জিনিয়াহ সেখানে হাজির। খুবসুরৎ হাসানকে দেখে তার মনে পুলকের সঞ্চার ঘটে। সে নিজেও খুবসুরৎ দেখতে। হাসানকে দেখামাত্রই সে ভালবেসে ফেলে। কিন্তু তখন তার ঘুম ভাঙাল না। ভাবল, একটু ঘুরে এসে একে জাগিয়ে গল্পগুজব করবে। আবার পাখা মেলল।।
আকাশ পথে ঘুরতে গিয়ে অন্য এক জিনিয়াহর সঙ্গে তার দেখা হয়। সে কায়রাে নগর থেকে আসছে। কুশলবার্তাদি আদানপ্রদানের পর জিনিয়াহ তাকে নিয়ে গােরস্থানে এল একটি জিনিস দেখাবার লােভ দেখিয়ে। হাসান-এর যৌবনভরা দেহের রূপ সৌন্দর্য দেখে জিনিয়াহও মুগ্ধ হয়ে গেল। জিনি বলল—“উজির নূর-অল-দীন-এর বেটা হাসান নাকি তামাম দুনিয়ার যুবকদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর। কিন্তু এ-যুবকও তাে খুবসুরত-ই বটে। কমতি কিসে? আর কায়রাের উজির সামস-অল-দীন-এর বেটিকেও দেখেছি। কী সুরৎ! হুরী পরীর-মত দেখতে। এর শাদী যদি কোন দিন হয় তবে একমাত্র সে-লেড়কিকেই এর পাশে মানাবে।
—“আমি সে-লেড়কিকে কোনদিন চোখে দেখি নি। তার কথা শুনিও নি কোনদিন।
—“তবে বলছি শােন, এমন রূপ-যৌবনের আকর লেড়কিটি খুবই হতভাগিনী। উজিরের খুবসুরৎ লেড়কি দেখে সুলতানের মাথা বিগড়ে যাওয়ার জোগাড়। উজিরকে একদিন বললেন—“শােন, তােমার বেটিকে আমি শাদী করতে চাই। তুমি রাজি হয়ে যাও। | চমকে উঠে উজির বলল,—“জাঁহাপনা, আমার গােস্তাকী মাফ করবেন। আপনার তাে আর অজানা নয় আমার ছােট ভাইয়া নূরঅল-দীন বিবাগী হয়ে ভিনদেশে পাড়ি দিয়েছে। আমাদের মধ্যে। একদিন কথা হয়েছিল, আমার বেটির সঙ্গে তার বেটার শাদী দেব। আমি জেনেছি, তার বেটা বসরাহতে আছে। জোয়ান মরদ হয়েছে। আমার ভাই কিছু দিন আগে বেহেস্তে গিয়েছে। আমি যদি কথার খিলাফ করি তবে আমার গুনাহ হবে, ঠিক কিনা? ছোট ভাইয়া বেহেস্তে গিয়েও স্বস্তি পাবে না। জাঁহাপনা আমাকে সত্যরক্ষা থেকে বঞ্চিত করবেন না। আপনি সুলতান, আপনি মন করলে তামাম দুনিয়ার খুবসুরৎ লেড়কির হাট বসিয়ে দিতে পারেন প্রাসাদের সামনে। উজিরের কথায় সুলতান রেগে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন। তাকে প্রত্যাখ্যান করে উজির রীতিমত অপমান করেছে। কোথায় সানন্দে বেটিকে সুলতানের হাতে তুলে দিয়ে বাপ-বেটির জীবন ধন্য করবে, তা না করে মুখের ওপরে প্রত্যাখ্যান! ক্রোধােন্মত্ত সুলতান রাগে গরগর করতে করতে তার এক হতকুৎসিত সহিসের সাহায্যকারীকে তলব দিলেন। একেবারে অষ্টাবক্র চেহারা। সােজা হয়ে কোনদিনই সে দাঁড়াতে পারে নি। ভাঙাচোরা কিছু হাড়গােড় জোড়া দিয়ে যেন তার চেহারাটিকে গড়ে তােলা হয়েছে। | সুলতানের তলব পেয়ে অষ্টাবক্র লােকটি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে কুর্নিশ সেরে দুরু দুরু বুকে দাঁড়াল। ভেবেছে, নির্ঘাৎ কোন অমার্জনীয় কসুর করে ফেলেছে। নইলে খােদ সুলতানের দরবারে তার ডাক পড়বে কেন? | তাকে দেখেই সুলতান বললেন—“আজ রাত্রেই তােমার শাদী হবে, তৈরী থেকো।
শাদীর কথা শুনে অষ্টাবক্র লােকটি মূৰ্ছা যাবার উপক্রম হ’ল তার বুকের ভেতরে কলিজাটি বার বার মোচড় খেতে লাগল। কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে, বারকয়েক ঢােক গিলে বলল—জাহাপনা, আমার রূপ নিয়ে সবাই মস্করা করে। নসীবের ফের ভেবে মুখবুজে হজম করি সব অপমান নির্যাতন। আজ আপনিও……
সুলতান ধমকের সুরে বললেন—'বাজে কথা রাখ। আমি পরিচারক-পরিচারিকাদের বলে দিচ্ছি তােমাকে গােসল করিয়ে শাদীর পােশাকে সাজিয়ে দিতে। ঝটপট তৈরী হয়ে নাও, আজ রাত্রেই শাদী হবে।
সুলতানের প্রাসাদে হাসি-আনন্দের তুফান বয়ে চলল। অষ্টাবক্র লােকটির শাদী হবে, আনন্দের ব্যাপারই বটে। মেয়েরা তাকে বরবেশে সাজাতে গিয়ে কত রকমেরই যে মস্করায় মেতে উঠল বলে শেষ করা যাবেনা।
কিসসার এ-পর্যন্ত বলে বেগম শাহরাজাদ থামলেন। ভােরের পূর্বাভাস লক্ষিত হ’ল। বাদশাহ শারিয়ার প্রফুল্ল চিত্তে বিবির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অন্দরমহল ত্যাগ করলেন।
বাদশাহ শারিয়ার যথা সময়ে অন্দরমহলে বেগমের কাছে এলেন। বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, তারপর সে-জিনিয়াহ কি বলল শুনুন—সে-যুবতীর তুল্য রূপসৌন্দর্য দুনিয়ার কারােরই নেই, কথাটি কিন্তু বাড়িয়েই বলছ তুমি। আমি তাে বিশ্বাসই করতে পারছি নে, তােমার সে সিৎ-অল-হুসন এর চেয়ে এ-যুবতী বেশী সুন্দরী। না, কিছুতেই তা সম্ভব নয়।
‘আমার কথা বিশ্বাস কর। এক তিলও বাড়িয়ে বলি নি, তার তুল্যা সুন্দরী তামাম দুনিয়া ঢুঁড়ে এলেও দ্বিতীয় কাউকেই পাবে না। আমি তার উপযুক্ত একটি পাত্রের খোঁজেই ঢুড়ে বেড়াচ্ছি। তােমার এ-যুবকের সঙ্গে কিন্তু চমৎকার মানাবে। শােন আমার সাফ কথা। হতচ্ছাড়া ওই অষ্টাবক্র লােকটি ওর জীবন বরবাদ করে দিক এটি আমি কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারব না। তুমি যদি রাজি থাক তবে সুন্দর এ-যুবকটিকে নিয়ে আমরা কায়রাের পথে উড়ে যাই।গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হাসান’কে বয়ে নিয়ে জিনিয়াহ আর আফ্রিদি কায়রাের পথে উড়ে চলল। বাতাসের মত তীব্র গতিতে তারা আকাশ পথে অগ্রসর হতে লাগল।
কায়রাে নগরে উজিরের প্রাসাদে শাদীর তােড়জোড় চলেছে। শানাই বাজছে। খানাপিনা চলছে হৈ হুল্লোড়ের মধ্যে মৌলভী শাদীর ব্যবস্থাদিতে ব্যস্ত। নচ্ছার অষ্টাবক্র লােকটি দামী পােষাক গায়ে চাপিয়ে গম্ভীর মুখে বসে। দামী আতরের খুসবু বেরােচ্ছে তার গা থেকে। জিনিয়াহ রাস্তার ধারের একটি আবছা অন্ধকার বেদীর ওপর ঘুমন্ত হাসানকে শুইয়ে দিল। এক সময় তার ঘম ভাঙল। চোখ মেলে তাকাল। জায়গাটি কেমন অপরিচিত মনে হল, সে গােরস্থান তাে এটি নয়। তবে? কোন জায়গা ? ধীরে ধীরে উঠে বসতেই সামনে দৈত্যাকৃতি দাড়ি-গোঁফহীন একটি লােককে দেখে চমকে উঠল। আতঙ্কে জড়ােসড়াে হয়ে চিৎকার করার জন্য। সে সবে মুখ খুলতে যাবে অমনি দৈত্যাকৃতি লােকটি মুখের কাছে আঙুল নিয়ে ইশারায় তাকে থামতে বলল। দৈত্যাকৃতি লােকটি এবার হাসান-এর হাতে একটি জলন্ত মােমবাতি ধরিয়ে দিয়ে তাকে নিয়ে এল সুলতানের প্রাসাদে। অনুচ্চ কণ্ঠে বলল-“নিমন্ত্রিত মেহমানদের ভিড়ে মিশে যাও। আমাকে ভয় কোরাে না। আমি এক জীন। তােমার মঙ্গলের জন্যই এখানে তােমাকে নিয়ে এসেছি। এটা কায়রাে নগরের সুলতানের মহল। এক শয়তান কুঁজো, অষ্টাবক্র লোকের সঙ্গে উজির সামস-অলদীন-এর লেড়কির শাদী হবার কথা। তারই রােশনাই চলেছে। গিয়ে দেখ, ফুলের মত ফুটফুটে লেড়কিটি কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। তুমি মেহমানদের ভিড়ে মিশে যাও। হতচ্ছাড়া কুঁজো অষ্টাবক্রটি যখন খচ্চরের পিঠে চাপবে তখন তুমি মােমবাতি হাতে তার কাছাকাছি থাকবে। তােমাকে সবাই বরাত ভাববে। বরের ঘনিষ্ঠ লােক ভেবে মান্য করবে তােমাকে। এক সময় দেখবে জনানারা ওড়না পেতে ধরবে তােমার সামনে। তুমি কামিজের পকেটে হাত চালিয়ে দেবে। দেখবে হাতে এক মুঠো সােনার মােহর উঠে আসবে। মায়া করবে না। মােহরগুলাে তাদের ওড়নায় ছুঁড়ে দেবে। এমন ভাব দেখাবে যেন একটি মােহর তােমার কাছে খুবই তুচ্ছ বস্তু। যতবার পকেটে হাত ঢােকাবে ততবারই মুঠো ভরে মােহর উঠে আসবে। পকেট কখনই খালি হবে না। হামাম থেকে প্রাসাদের দরজা পর্যন্ত খইয়ের মত মােহর ছিটোতে থাকবে। এবার হতচ্ছাড়া ওই অষ্টাবক্রটিকে নিয়ে যাবে সুসজ্জিত একটি ঘরে। একমাত্র বর ছাড়া দ্বিতীয় কোন পুরুষ মানুষের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। কিন্তু তােমাকে সে-ঘরে যেতেই হবে। একটু উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়ােগ করবে। তবেই সহজে কাজ হাসিল করতে পারবে। কিছু সােনার মােহর ছড়িয়ে দিলেই তােমার উদ্দেশ্য সিদ্ধি হবে। কথা কটি বলেই জিনিয়াহ অদৃশ্য হয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বরবেশে অষ্টাবক্র লােকটি খচ্চরের পিঠে চাপল। তাকে ঘিরে নাচতে নাচতে চলল একদল নাচনেওয়ালি। গলায় মুক্তোর মালাটি দেখে মনে হচ্ছে যেন বানরের গলায় মুক্তোর মালা পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাসান মােমবাতি হাতে এগিয়ে গিয়ে খচ্চরটির লাগাম দখল করে ফেলল। হাসানের যৌবনভরা রূপ-সৌন্দর্য দেখে সবাই তাে একেবারে থ বনে গেল। প্রাসাদের দরজায় যেতেই একদল জনানা ওড়না পেতে ধরল হাসান-এর সামনে। জিনিয়াহর পরামর্শ মত সে বার বার পকেটে হাত ঢুকিয়ে মুঠো মুঠো সােনার মােহর বের করে তাচ্ছিল্যের ভাব দেখিয়ে ছিটোতে লাগল। যেন একটি মােহর তার কাছে খুবই তুচ্ছাতি তুচ্ছ ব্যাপার।
প্রাসাদের অন্দরমহলে যেতেই হাসান অষ্টাবক্র লােকটির হাত ধরে টানতে টানতে সুসজ্জিত একটি ঘরে ঢুকে পড়ল। মুঠো মুঠো মােহর ছিটোতে পারলে কোন কাজই অসাধ্য নয়। একদল লেড়কি অষ্টাবক্র লােকটিকে নিয়ে ফুলমালায় সুসজ্জিত একটি মঞ্চের ওপর বসাল। বরবেশে বসে থাকা তার দিকে কারােই নজর নেই। নয় থেকে নব্বই সব বিবিরা লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে রূপযৌবনের জোয়ারলাগা হাসানকে বার বার দেখতে লাগল। চোখ সরাতে চায় না কেউ। একটি মুহূর্তও নষ্ট করতে সবাই নারাজ। যেন বিরাট লােকসান হয়ে যাবে। সবার মুখেই এক কথা—এমন সুন্দর একটি জোয়ান হাতের কাছে রয়েছে অথচ এমন কদাকার অষ্টাবক্রটির হাতে ফুলের মত সুন্দর তরতাজা মেয়েটাকে তুলে দিচ্ছে! এর চেয়ে গলায় কলসী বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়া ঢের ভাল ছিল!'
এমন সময় সে-ঘরে বৃদ্ধ মৌলভী আর শাদীর পাত্রী সিৎ-অলহুসন প্রবেশ করলেন। একটি সুসজ্জিত আসনে রূপ-সৌন্দর্যের আকর উদ্ভিন্ন যৌবনা পাত্রী হুসনকে বসানাে হল। তার রূপের আভা চোখ ঝলসে দেয়। যেন সারা বিশ্বের সৌন্দর্য রাশি কুড়িয়ে এনে জড়াে করা হয়েছে। এর দেহপল্লবটিতে। এর রূপের জৌলুষের কাছে বেহেস্তের হুরী পরীদের সৌন্দর্যও বুঝি হার মানবে। তার উন্নত বক্ষের ওপর আলতােভাবে দোল খাচ্ছে মখমলের ওড়নাটি। মনে হবে মুকুলিত যৌবনচিহ্ন দুটো ওডনার আড়াল থেকে যেন বার বার উঁকি দিচ্ছে। জানাচ্ছে নিজেদের সজীব উপস্থিতি। সেদিকে আচমকা চোখ পড়ায় হাসান-এর বুকের ভেতরের কলিজাটি আছাড়ি পাছাড়ি করতে থাকে। অসংখ্য হিরে জহরৎ খচিত মাথার টিকলিটি যেন বাতাসের চাপে মৃদু মৃদু দোল খাচ্ছে। তার রূপের আভায় ব্যবহৃত অলঙ্কারাদির সৌন্দর্য ম্লান হয়ে গেছে। মন-পাগল করা এমন রূপ হাসান আগে কোনদিন দেখেনি।
হাসান মঞ্চের পাশে একটি কুরশি পেতে বসে। হুসন নিজের কুরশি ছেড়ে উঠে ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এল। কোন পুরুষের মধ্যে যে এমন রূপের ঝিলিক থাকতে পারে তা এর আগে কোনদিন প্রত্যক্ষ করা তাে দূরের কথা কারাে মুখে শােনেও নি কোনদিন। সে তার বাবার মুখে শুনেছিল, তার চাচার বেটা নাকি এরকম চাদের মত সুন্দর দেখতে। কিন্তু এ কোন যুবক। এ-ই তার চাচার বেটা নয় তাে? হুসন-এর হাত দুটো নিসপিস করতে লাগল।। এক অভাবনীয় অস্থিরতা তাকে পেয়ে বসল। অস্থির হয়ে অকস্মাৎ যুবক হাসান-এর কাধে নিজের নিটোল হাত দুটো রেখে মিষ্টি-মধুর স্বরে বলে উঠল—‘আমার মেহবুব! এ-ই আমার স্বামী, আমার কলিজা।তার চোখ দুটো ছলছল করতে লাগল। এবার অপেক্ষাকৃত ভারি গলায় উচ্চারণ করল—“হায় আল্লা! মনের মত এমন সুন্দর পাত্র হাতের মুঠোয় থাকতে তুমি কিনা আমাকে ওই বাঁদর মুখাে হতাছাড়া অষ্টাবক্রটির হাতে সঁপে দিচ্ছ। আমার ওপর মেহেরবানি কর, মুখ তুলে তাকাও।
এদিকে অষ্টাবক্র লােকটির লম্ফঝম্ফ দেখে কে! সে রাগে গস গস্ করতে করতে হাত-পা ছুঁড়তে লাগল। তার কাণ্ড দেখে লেড়কি-বিবিরা তাে হেসে গড়াগড়ি যাবার উপক্রম। প্রথা অনুযায়ী পাত্রী এবার প্রদক্ষিণ-পর্ব শুরু করল। সাতবার প্রদক্ষিণ করতে হবে সুপ্রশস্ত ঘরটিকে। হুসন প্রতিবারে ঝলমলে পােশাক পাল্টে এসে ঘরটিকে প্রদক্ষিণ করতে লাগল। উপস্থিত যুবতীরা হুসন’কে প্রয়ােজন অনুযায়ী প্রদক্ষিণের কাজে সাহায্য সহযােগিতা করতে লাগল। প্রতিবার প্রদক্ষিণ সেরে হাসান-এর মুখােমুখি করে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়াল। নাচনেওয়ালিরা বিচিত্র অঙ্গ ভঙ্গি করে নাচতে লাগল। বর-কনের মধ্যে কাম প্রবণতা জাগিয়ে তােলাই তাদের নাচের একমাত্র উদ্দেশ্য। কামভাব জাগিয়ে তুলে তাদের উত্তেজিত করার প্রয়াস।
শাদীর মঞ্চে এবার দু'জন বসে। একজন বরবেশধারী কদাকার সে-অষ্টাবক্রটি আর দ্বিতীয় জন হাসান। একটু বাদে শাদীর মঞ্চে হাসানকে নিয়ে যাওয়া হ’ল। আর অষ্টাবক্রটি বিষমুখে সে ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। এবার শাদীর মঞ্চে বসে থাকা হাসান-এর কাছে বিবির বেশে সুসজ্জিতা হুসন ধীরপায়ে এগিয়ে এল। স্বামীর গলা জড়িয়ে সােহাগ কামনা করল। আবেগ-মধুর স্বরে বলল-মেহবুব আমার আমাকে সােহাগে সােহাগে ভরিয়ে তােল। তােমার কোলে তলে নাও আমাকে। আমার সতের বছরের যৌবনভরা দেহপল্লবটি তােমার হাতে সঁপে দিলাম। তুমি একে ভােগ কর, আমাকে দাও সম্ভোগসুখ। যুবক হাসান-এর শিরা-উপশিরার রক্তের গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে উঠল। কেবলমাত্র একখানা চাদরে ঢাকা ছিল হুসনএর যৌবনের জোয়ারলাগা দেহটি। হেঁচকাটানে সেটিকে শরীর থেকে খুলে ফেলে ছুঁড়ে ফেলে দিল ঘরের মেঝেতে। ব্যস্ত হাতে নিজের পাতলুনটিকেও খুলে দূরে ফেলে দিল। একটি সাদা ও সাধারণ টুপি মাথায় পরে নিল, হুসন উবু হয়ে বসে তার ইজেরের রশিটি ধরে আচমকা একটি হেঁচকা টান মারল। চোখের পলকে সেটি ছিড়ে গেল। কিন্তু হুসন-এর পক্ষে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব। হ’ল না। চিৎ হয়ে মখমলের চাদরের ওপর পড়ে গেল। হাসান সরবে হেসে তাকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরল। সে সাঁড়াশির বাঁধনে আটকা পড়ল হুসন। সে-ও দু'হাতে জাপটে ধরল তার বহু আকাঙিক্ষত পুরুষটির পেশীবহুল নগ্ন দেহটিকে। হাসির তুফানে হুসনও যােগ দিল। সে তুফানে তলিয়ে গেল উত্তাল-উদ্দাম দুই নারী-পুরুষ। পুরুষের বাহুর সকাম আকর্ষণ যে এত মধুর হুসন আগে কখনও বােঝে নি। নিজের কুসুম কোমল মাংসপিণ্ডদ্বয়কে তার বুকের সঙ্গে মিশিয়ে দিল। ক্রমে তার দেহ-মন অসাড় হয়ে পড়তে লাগল। অতিশয় আনন্দানুভূতি যে মানুষের মনে এমন করে রােমাঞ্চের সঞ্চার করতে পারে তা সে এই প্রথম বুঝল। ব্যস, তারপরই তারা উভয়েই যেন কোন আনন্দ-সাগরের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর তারা ক্লান্ত অবসন্ন অথচ প্রসন্নচিত্তে পুরু মখমলের চাদরটির ওপর গা এলিয়ে দিল। উভয়ের শ্বাসক্রিয়া ঘন ঘন চলতে লাগল। কারাে মুখে কোন কথা নেই। নীরবে সদ্য লব্ধ সুখটুকু উপলব্ধি করতে লাগল। অখণ্ড নীরবতা ভঙ্গ করে হাসান নিশ্চল-নিথর পাথরের মূর্তির মত হুসন-এর সরু কটি দেশে আলতাে করে একটি হাত রেখে বল্ল—“আমি নিঃসন্দেহ, তােমার জীবনে আমিই প্রথম পুরুষ।'
হুসন জীবনের প্রথম পুলকানন্দের মাধ্যমেই অন্তঃসত্ত্বা হ'ল। সে মধুযামিনীতে তারা পনেরবার সঙ্গম-সুখ ভােগ করল। তারপরই তাদের চোখগুলাে ক্রমে বিশ্বাসঘাতকতা করতে শুরু করল। ঘুমে বারবার জড়িয়ে আসতে লাগল চোখের পাতা। আর নয়। আর সম্ভব নয়। মানুষের শরীর তাে বটে। এত ধকল সইবে কেন? তারা ঘুমে ঢলে পড়ল। গভীর ঘুমে এক সময় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। জিনি এগিয়ে এল। জিনিয়াহর সঙ্গে দেখা। তাদের সুখনিদ্রা দেখছে। জিনি অনুচ্চকণ্ঠে বলল—“আর দেরী নয়, একটু বাদেই ভােরের আলাে ফুটে উঠবে। যুবকটিকে গােরস্থানের যে-জায়গা থেকে তুলে এনেছিলাম সেখানেই আবার রেখে আসতে হবে। জিনিয়াহ ঘুমন্ত হাসানকে নিজের পিঠে তুলে নিয়ে শূন্যে উঠে গেল। পাখার ঝাপটায় বাতাস কেটে এগিয়ে চলল বাঞ্ছিত সে গােরস্থানের দিকে। জিনি উড়তে থাকে পাশাপাশি কাছাকাছি। হঠাৎ জিনির মধ্যে কামভাব জাগ্রত হয়। জিনিয়াহর ওপর বলাৎকার করার জন্য উদ্যত হয়। পিঠে তার ঘুমন্ত যুবক হাসান। তাকে তাে আর ফেলে দিয়ে সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া সম্ভব নয়। অন্য সময় হলে সে তার বাঞ্ছা পূরণে বাধা দিত না। কিন্তু জিনির কামপ্রবৃত্তি একবার জাগ্রত হলে আর রক্ষা নাই। প্রলয় কাণ্ড বাঁধিয়ে দেয়। ভয়াল-ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। কিন্তু আল্লাহ তাে আর অন্ধ নন। তিনিই পরিস্থিতি সঙ্গীন দেখে প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। হঠাৎ দেখা গেল জিনির দেহটি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। তারপরই অতিকায় জ্বলন্ত দেহটি মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল। দাউ দাউ হাউ হাউ করে জ্বলতে লাগল সিরিয়ার অন্তর্গত দামাস্কাস নগরীর এক পথের ধারে। জিনিয়াহও নামল সেখানে। পিঠের ঘুমন্ত যুবকাটকে পথের ধারে শুইয়ে দিল। ব্যস, একেবারে উধাও হয়ে গেল সে। একেই বলে বরাত। হাসান একা পড়ে রইল।
সকাল হলে নগরের দ্বার খুলে দেওয়া হ'ল। শুরু হ’ল মানুষের যাতায়াত। সবাই বিস্ময়ভরা চোখে অনিন্দ্য সুন্দর যুবক হাসান-এর দেহকান্তি দেখে যারপর নাই মুগ্ধ হ’ল। গায়ে কেবল রাত্রের পােশাক। আর মাথায় অতিসাধারণ একটি টুপি। এক সময় হাসান-এর ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে তাকাল।......চলতে থাকবে ।

0 Comments