আরব্য রজনী পার্ট ১৬ ( Part 16 )

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
-“ঠিক আছে, তােমার কথা আমি বিশ্বাস করছি। ভাল কথা, হত্যা তুমিই করেছ স্বীকার করে নিচ্ছি, কিভাবে তুমি হত্যাকাণ্ডটি  ঘটিয়েছিলে, বললে। কিন্তু কেন তুমি এমন নৃশংস একটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছ, তা তােমাকে বলতে হবে।'

—বলব। তা-ও বলব জাহাপনা।
—“আর একটি কথা তােমাকে বলতে হবে, লেড়কিটিকে হত্যা করার পর তুমি লাশটি গায়েব করার উদ্দেশে টাইগ্রিসের পানিতে  লুকিয়ে রেখেছিলে, স্বীকার করলাম। কিন্তু এখন আবার কেন নিজের কসুর প্রমাণ করার জন্য এমন তৎপর হলে?'

—“তা-ও বলব, জাঁহাপনা। আমি এক এক করে সব বলছি, ধৈর্য ধরে শুনুন। যে নারীকে আমি হত্যা করেছি সে ছিল আমার বিবি। মৌলভী সাক্ষী রেখে শাদী করেছিলাম। শাদীর পর অনেক দিন আমরা এক সঙ্গে ঘর করেছিলাম। আমার তিনটি লেড়কাকে সে গর্ভে ধারণ করেছিল। আমাকে সে নিজের জানের চেয়েও বেশী মহব্বত করত। এ মাসের প্রথমের দিকে তার বুখার হয়। একেবারে বিছানায় আশ্রয় নেয়। সবচেয়ে বড় হেকিমকে ডেকে ওর ইলাজের ব্যবস্থা করলাম। প্রচুর পয়সা ঢাললাম। কিন্তু তার বুখার কমা তাে দূরের কথা বরং বেড়েই চলল।

এক সকালে আমাকে কাতর স্বরে বলল-বুখার আমার মুখের স্বাদ কেড়ে নিয়েছে। ভাল একটি আপেল হলে হয়ত দু'চার টুকরাে খাওয়া যেত।

আমি ভাল আপেলের খোঁজে নগরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত ছুঁড়ে বেড়ালাম। প্রকৃত ভাল আপেল বলতে যা বুঝায় তার খোঁজ পেলাম না কোথাও। কিন্তু আমার ব্যর্থতার কথা তার কাছে ফাস করিনি। ভাবলাম, সকালে আপেলের বাগিচায় গিয়ে খোঁজ করে দেখব যদি আপেল জোগাড় করা সম্ভব হয়। [ সক্কালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এক এক করে অনেকগুলি আপেলের বাগিচায় ছুঁড়লাম। গাছ ফাঁকা। একটিও আপেল কোথাও দেখতে পেলাম না। শেষ পর্যন্ত এক বুড়ো মালি বলল—“বাছা একমাত্র বসরাহর বড় বাজারে গেলে ভাল আপেল মিললেও মিলতে পারে। সেখানে দু-চারটে আপেল আমদানি হয় বটে কিন্তু সবই খলিফার প্রাসাদে চলে যায়। যদি তা থেকে বলে কয়ে একটি আপেল জোগাড় করতে পার।

আমি আশান্বিত হয়ে বিবিকে বললাম-“এবার হয়ত তােমাকে আপেল খাওয়াতে পারব।'

—“তুমি আপেলের জন্য কেন এমন হন্যে হয়ে ছুঁড়ে বেড়াচ্ছ? বাজারে যদি না পাওয়া যায় তাতে তাে তােমার কোন কসুর নয়।। কথাটি বলেই আমার বিবি চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

আমার মনটি খুবই বিষিয়ে উঠল। নিজেকে বড়ই অপরাধী মনে হ’ল। বসরাহ পনের দিনের রাস্তা। যত কষ্টই হােক, বিবিটি বুখারে কাহিল হয়ে পড়েছে। যদি একটি অন্তত আপেলের জোগাড় করা সম্ভব হয়।

বসরাহর বাজারে গিয়ে কোনক্রমে তিনটি আপেল জোগাড় করা সম্ভব হ'ল। ব্যস, আর দেরী নয়। সােজা ঘরে ফিরে এলাম। আপেল নিয়ে ফিরে এলাম ঘরে, বিবির কাছে। সােৎসাহে আপেল তিনটি ওর হাতে তুলে দিলাম। সে কিন্তু খুব খুশী হল না। নিস্পৃহ ভাবে আপেল তিনটি নিয়ে বালিশের পাশে রেখে দিল। বিবির রকম সকম আমাকে ভাবিয়ে তুলল। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম আমার অনুপস্থিতিকালে ওর বুখার খুবই বাড়াবাড়ি হয়েছিল। আমি নিজেকে ওর সেবায় সঁপে দিলাম।

এমন সময় একদিন দেখি এক নিগ্রো যুবক একটি আপেল হাতে আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। কৌতূহল হয়। লম্বা লম্বা পায়ে তার কাছে গিয়ে বললাম-“কি হে, এমন অসময়ে আপেল কোথায় পেলে, বল তাে?

-কোথায় আবার পাব? আমার মেহবুবা আমাকে বকশিস দিয়েছে।

-'মেহবুবা ? কে তােমার মেহবুবা? কোথায়ই বা থাকে ?

—“তাতীপাড়ায় যে তলাওটি আছে, তার পশ্চিম দিকের বাড়ির মালিকের বিবি আমার মেহবুবা। ওর মরদটি একেবারে বােকার হদ্দ। বিবিকে নিজের কলিজার চেয়েও বেশী পেয়ার করে। বিবির বিমার হয়েছে। ওর মরদ পনের দিন হাঁটাহাঁটি করে বসরাহর বাজার থেকে তিনটে আপেল এনে বিবির হাতে তুলে দিয়েছে, তারই একটি আমার মেহবুবা আমাকে দিয়েছে।' | কথাটি কানেই যেতেই আমার মনটি যার পর নাই বিষিয়ে উঠল। মাথায় রক্ত ওঠার জোগাড় হ’ল। মাথাটি চক্কর মেরে উঠল। দুনিয়ার সব কিছু মূল্যহীন মনে হ’ল। উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফিরলাম। বিবিকে কিছু বললাম না। সবার আগে গেলাম তার ঘরে। দেখলাম, তার বালিশের ধারে তিনটির মধ্যে দুইটি আপেল রয়েছে। | তারপরই আমার মাথাটা চক্কর মেরে উঠল। কোথা দিয়ে যে কি ঘটে গেল বুঝতেই পারি নি। যখন আমার হুঁস হ’ল তখন দেখি, আমার হাতের ছুরিটি তার বুকে আমূল গেঁথে রয়েছে। হাতলটি তখনও আমার মুঠোর মধ্যে ধরা, আমার কলিজা এক মুহূর্তে শুকিয়ে একেবারে চিপসে গেল। আমি নিজের হাতে বিবিকে হত্যা করেছি। আমাকে শূলে চড়তেই হবে। হঠাৎ মাথায় একটি চমৎকার ফন্দি খেলে গেল। একটি বাক্স নিলাম। বিবির লাশটিকে টুকরাে টুকরাে করে ফেললাম। ভরলাম বাক্সটির মধ্যে। বােরখা আর কার্পেটের গায়ে রক্তের ছােপ লেগে গেছে। সেগুলােও বাক্সের মধ্যে ভরে ফেললাম। এবার সবার ওপরে কিছু তালের পাতা চাপা দিয়ে দিলাম। তালা আটকে দিলাম বাক্সের আঙটাটির গায়ে। তারপর বাক্সটিকে মাথায় করে বয়ে নিয়ে টাইগ্রিসের পানিতে ফেলে দিয়ে তখনকার মত ব্যাপারটিকে সামাল দিলাম।

মুহূর্তকাল নীরবে কাটিয়ে যুবকটি কাতরস্বরে বলল— জাহাপনা, আপনি ন্যায়ের পূজারী। আল্লাহর পয়গম্বর হয়ে দুনিয়ায় অবস্থান করছেন। আমার অপরাধের কথা তাে শুনলেনই, এবার আমার প্রাণদণ্ড দিয়ে আপনার কর্তব্য পালন করুন। আমার বিবির মৃতদেহসমেত বাক্সটি টাইগ্রিসের জলে ডুবিয়ে দিয়ে আমি বাড়ি ফিরে দেখি আমার বড় লেড়কাটি ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। আমি ধমকের সুরে বললাম—হয়েছে কি রে, এমন করে কান্নার কি আছে?

চোখ ডলতে ডলতে সে বলল—“আব্বাজী, আম্মার বালিশের পাশ থেকে একটি আপেল নিয়ে রাস্তার ধারে বসে খেলছিলাম। তিনি জানতেও পারেন নি। তখন গাট্টাগােট্টা একটি নিগ্রো সে পথ দিয়ে যাবার সময় আমার হাত থেকে আপেলটি ছিনিয়ে নিয়ে পালায়।

ছেলের রকম সকম দেখে বুঝলাম, আপেলটি খুইয়ে ভয়ে বাড়ির ভেতরে ঢােকে নি। সেই থেকে দরজায় বসে কেঁদেই চলেছে। আমিও বাক্সটি নিয়ে বেরােবার সময় সে দরজার ধারে কাছে থাকলেও আতঙ্ক ও ব্যস্ততার জন্য লক্ষ্য করিনি। কিন্তু তার মাকে যে আমি বেহেস্তে পাঠিয়ে দিয়েছি বিন্দুবিসর্গও তাে তার জানা নেই। 

রাগে-দুঃখে আমার সর্বাঙ্গ থরথর করে কেঁপে উঠল। আমি আর্তনাদ করে উঠলাম—হতচ্ছাড়া নিগ্রোটি এমন একটি কথা বলে সব কিছু তােলপাড় করে দিয়ে গেল। তবে তাে আমার বিবি একেবারে নিষ্কলঙ্ক নিস্পাপ ছিল। আর আমি কিনা অন্যের কথা শুনে তার কলজেটিকে টুকরাে টুকরাে করে দোজকে যাওয়ার পথ পরিষ্কার করলাম। হত্যার পাপ আমাকে কালনাগিনীর মত দংশন করতে লাগল। সদ্য কন্যাহারা আমার শ্বশুর আর আমি সারা রাত্রি কেঁদে ভাসালাম।

জাহাপনা, পাচদিন আগে আমি এই নিষ্ঠুর হাত দুটো দিয়ে আমার কলিজার চেয়ে বড় বিবিকে হত্যা করেছি। তারপর থেকে ভেতরে ভেতরে জ্বলে-পুড়ে খাক হচ্ছি। আপনার কাছে আমার একটিই মাত্র প্রার্থনা, আমার মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ন্যায় বিচার করুন। আমাকেও কৃত গুনাহের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযােগ দিন।

সব কিছু শুনে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ আর্তনাদ করে উঠলেন—“হারামি কঁাহাকার! হারামি নিগ্রোটিকে ধরে এনে শূলে চড়াবার ব্যবস্থা কর জাফর। ঝুট বলে সে এতবড় সর্বনাশ করেছে। যাও, যেখানে পাও খুঁজে বের কর।

                                                নিগ্রো রাইহানের কাহিনী

                                                    উনিশতম রজনীর দ্বিতীয় প্রহর। 

খণ্ডিত নারী এবং আপেলের কাহিনী প্রায় শেষ করে শাহরাজাদ এবার নিগ্রো যুবক রাইহান-এর কাহিনী শুরু করলেন—জাঁহাপনা, তারপর কি হ’ল বলছি শুনুন—খলিফা হারুণ-অল-রসিদ নিজ বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে নিঃসন্দেহ হলেন হত্যাকারী যুবকটি প্রকৃতপক্ষে দোষী নয়। পথচারী নিগ্রো যুবকটি তাকে মিথ্যা ভাষণের মাধ্যমে উত্তেজিত করার জন্যই সে হঠাৎ মাথা গরম করে এমন একটি নিষ্ঠুরতম কাজ করে ফেলেছে। আর একথা শুনে খলিফা রেগেমেগে একেবারে কাই হয়ে গেলেন।

ক্রোধােন্মত্ত খলিফা উজিরকে ডেকে বললেন—“হতচ্ছাড়া সে নিগ্রো যুবককে দরবারে হাজির করতেই হবে। যেখানে থাক, পাতালে লুকিয়ে থাকলেও আমি তাকে চাই। তাকে শূলে না চড়ানাে পর্যন্ত আমার স্বস্তি নাই। আর যদি তাকে ধরে আমার সামনে হাজির করতে না পার তবে সে-শূলে তােমাকেই চড়তে

হবে, খেয়াল রেখাে।

খলিফার কথায় উজির জাফর-এর চোখে নতুন করে পানি দেখা দিল। তিনি কেঁদে কেটে বলতে লাগলেন—হায় খােদা! তােমার এ কী মর্জি! তুমি কি আমার জান না নিয়ে ছাড়বেই না? এ যাত্রায় যা হােক করে জানটি রেহাই পেল বটে কিন্তু আর হয়তাে এ-জান টিকবে না। এখন তুমিই একমাত্র ভরসা।

উজির জাফর পেীনেমরা হয়ে পরাে তিনটি দিন ঘরের কোণে বসে চোখের পানি ফেললেন। বাড়ির সীমানার বাইরে বেরােলেন না। ভাবলেন ইতিমধ্যে খলিফার ক্রোধ প্রশমিত হলে হতেও পারে।পাল্টে যেতে পারে তার নির্মম নিষ্ঠুর মৃত্যু।

এদিকে খলিফার ক্রোধ এক তিলও প্রশমিত হ’ল না। জাফর লােকমারফৎ খবর নিয়ে জানতে পারলেন, তিনি নির্দিষ্ট দিনের প্রতীক্ষায় নিশ্চিন্তে বসে রয়েছেন। জাফর নির্ঘাৎ নিগ্রো যুবকটিকে তার সামনে হাজির করবেন। আর যদি ব্যর্থ হন তবুও বিকল্প ফরমাস তাে জারি করেই রেখেছেন।

জাফর এক সময় বাধ্য হয়ে খলিফার সামনে হাজির হলেন। তার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির উইল তৈরী করে ফেললেন। এবার শেষ বিদায় নেবার পালা। বিবি ও ছেলেদের কাছ থেকে চোখের পানির বিনিময়ে বিদায় নিলেন। দুয়ারের কাছে তার ছােট্ট মেয়েটি দাঁড়িয়ে। তাকে কোলে তুলে শেষ চুম্বনটি দিতে গিয়ে কোলে তুলে নিলেন। তার কামিজের জেবে ছােট কি যেন একটি রয়েছে বুঝলেন। জিজ্ঞাসা করলেন-‘বেটি, এটা কি ?

—“আপেল। নিগ্রো যুবক রেহান চার-পাঁচদিন আগে এটি আমাকে দিয়েছিল।

‘আপেল’ আর ‘নিগ্রো যুবক’ কথা দুটো কানে যাওয়া মাত্রই | সােল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন—‘বেটি, আপেল! নিগ্রো যুবক!

ব্যস, আর এক মুহুর্তও দেরী নয়। রেহানকে তলব করে আনলেন।'

উজির জাফর-এর তলব পেয়ে রেহান উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এল।

জাফর জিজ্ঞাসা করলেন—‘কোথা থেকে আপেলটি পেয়েছিলি, সত্যি করে বল।

—“হুজুর, পথের ধারে কয়েকটি লেড়কা ও লেড়কি এটি নিয়ে লােফালফি খেলছিল। আমি এক লেড়কাকে ছােট্ট করে একটি চড় মেরে এটা ছিনিয়ে নিয়েছিলাম।

–কেন? এর উদ্দেশ্য কি ছিল?

‘আমার ছােট লেড়কিকে দেব বলেই সেদিন অন্যায়ভাবে লেড়কাটির কাছ থেকে এটি ছিনিয়ে নিয়েছিলাম। সে কেঁদে কেঁদে বলছিল—“এটি নিও না। আমার আম্মার খুব বিমার, আমাকে খুব বকাবকি করবে। আমি তাকে না বলে চুপি-চুপি এটি নিয়ে এসেছি।”আমি তার চোখের পানির কোন দাম না দিয়েই এটি নিয়ে চলে এসেছি।'

জাফর এবার নতুনতর সমস্যার মুখােমুখি হলেন। নিগ্রো যুবক। রেহান তাঁরই নােকর। সে ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত শুনলে নানা জন নানা কথা বলাবলি করবে। রসসিক্ত করে কল্পিত কাহিনীর জাল বুনতেও দ্বিধা করবে না। তবে এখন উপায়?

নসীবে যা আছে তাকে খণ্ডাবে কে ? অনন্যোপায় হয়ে উজির জাফর নিগ্রো যুবক রেহানের হাতে শিকল পরিয়ে নিয়ে এলেন খলিফার দরবারে।  খলিফা রেহানের-এর মুখ থেকে আপেলের বৃত্তান্ত শুনে একেবারে থ বনে গেলেন। অবাক হবার মত কথাই বটে। অতি সামান্য একটি ব্যাপার কেমন জটপাকিয়ে সর্বনাশের চূড়ান্ত ঘটাতে পারে এর আগে কোনদিন শােনা তাে দূরের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি। | জাফর চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—“জাহাপনা, নসীব যখন মন্দ হয়, আল্লাহ যখন মুখ ঘুরিয়ে থাকেন তখন এমন জটিল সমস্যা সৃষ্টি হয়ে আদমীর জান খতম হওয়াও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়। আপেল আর নিগ্রো নােকর রেহান-এর নির্বুদ্ধিতাকে অবলম্বন করে নসীব খেল দেখিয়েছে। জাফর এবার মুহূর্তকাল নীরবে ভেবে বললেন-“জাহাপনা, এর চেয়ে বিস্ময়কর কাহিনী ঘটেছিল উজির নূর-অল-দিন আর তার ভাই সামস-অল-দিন এর জীবনে।

খলিফা কপালের চামড়ায় চিন্তার ভাঁজ একে বললেন-“কি ঘটেছিল দু'ভাইয়ের জীবনে, বল তাে?

–‘জাঁহাপনা, আপনার বাঞ্ছা অবশ্যই পূরণ করব। তার আগে আমার ছােট্ট একটি অনুরােধ—আমার নিগ্রো নােকর রেহান-এর মৃত্যু দণ্ডাদেশ দয়া করে মকুব করে দিন। আসলে এটি এক বােকার হদ্দ। কাণ্ডজ্ঞান বলতে কিছু নেই। জাঁহাপনা, যা ঘটে গেছে তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। অতীতের কথা ভেবে বর্তমানকে উপেক্ষা করা মােটেই সমীচীন নয়।'

–তােমার ইচ্ছাকেই পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে আমি রেহানকে মুক্তি দিলাম। রেহান নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে দড়ি ছেড়া গরুর মত মালিকের বাড়ির দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দিল।

উজির সামস-অল-দিন ও নুর-অল-দিন-এর কিসসা।

উজির জাফর খলিফা হারুণ-অল-রসিদ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে উজির সামস-অল-দিন ও নূর-অল-দিন এর কিসসা শুরু করতে | গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, কোন এক সময় মিশরে মহাধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ এক সুলতান রাজত্ব করতেন। তার বৃদ্ধ উজির ছিলেন একজন যথার্থই জ্ঞানী, বিভিন্ন বিষয়ে তার পারদর্শিতা ছিল অনন্য। উজির সাহেবের দুই যমজ পুত্র ছিল। তাদের একজনের নাম ছিল। সামস-অল-দিন আর দ্বিতীয় জন ছিল নুর-অল-দিন। তাদের রূপ ছিল অসাধারণ। চোখ ফেরানাে দায়। যেন তারা বেহেস্তের দূত। মৰ্তে নেমে এসেছে আদমির সুরত নিয়ে।

এক সময় বৃদ্ধ উজির দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। সুলতান ভাইয়াকে উজিরের পদে বহাল করলেন।

এক সকালে দু ভাইয়া দরবারে যাবার পথে পরস্পরের মধ্যে বাক্যালাপ করছিল। বড় ভাইয়া বলল—আমাদের বয়স হয়েছে এবার শাদী করে বিবি ঘরে আনা দরকার। আর মিছে দেরি করলে গুড়া বাচ্চাদের মানুষ করে যেতে পারব না।বিদ্যা শিক্ষা ,নােকরি আর শাদী দিয়ে ঘর-সংসার পেতে দিয়ে যেতে পারব না।'

-শাদী? তােমার মর্জি মাফিকই কাজ হবে।

শাদীর পর তাে এমনও হতে পারে ভাইয়া, আমার লেড়কি হল আর তােমার হল লেড়কা। তখন তাে আমার লেড়কির সঙ্গে তােমার লেড়কার শাদী দিতে হবে, তখন ?

‘আমার লেড়কাকে তােমার লেড়কির জন্য তবে কত সােনার দিনার দিতে হবে?

‘আমি আগেই ঠিক করে রেখেছি পুরাে তিন হাজার সােনার দিনার আমি তােমার লেড়কার কাছ থেকে নেব। তিনটি বড় গাঁও জায়গীর আর তিনটি খামারও দাবী করব আমি। সাফ কথা শােন, তােমার লেডকা যদি এতে রাজি না হয় তবে আর আমাদের মিছে কথাকাটাকাটি করে লাভ নেই। প্রসঙ্গটি এখানেই চাপা দিয়ে দেওয়া ভাল।

–“ভাইয়া, তুমি মিছেই তিক্ততা সৃষ্টি করতে চাইছ। ও ভাইয়া আর বহিন মিলে ঘর বাঁধবে এতে আবার দিনারের কচকচানি আসে কি করে, বুঝছি না তাে।'

--‘তা হােক গে, আগে দেনা-পাওনার ব্যাপারটিরই ফয়সালা হয়ে যাওয়া উচিত। ঠিক আছে, আমি কসম খাচ্ছি তােমার লেড়কার সঙ্গে আমার লেড়কির শাদী দেব না। কিছুতেই দেব না। আমার লেড়কি টাইগ্রিসের জলে ভেসে আসবে নাকি?’ রাগে গস গস করতে করতে সামস-অল-দিন বলল। বড় ভাইয়ার আচরণে নূর-অল-দিনও রেগে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল। সে-ও রীতিমত উত্তেজিত স্বরেই বড় ভাইয়ার উদ্দেশ্যে কথাটি ছুঁড়ে দিল— আমার ছেলেও রূপেগুণে সবার সেরাই হবে। তখন তােমার মত কত মেয়ের বাপ পিছন পিছন ঘুর ঘুর করবে, দেখে নিও। এখন ব্যাপারটি চাপা দাও। বড় ভাইয়া বলল—তাের দেমাক দেখে অবাক হচ্ছি। ঠিক আছে, কাল সুবহে তাে আমি সুলতানের সঙ্গে বেরােচ্ছি, তখন আমি তাের ঔদ্ধত্য ও কার্পণ্যের কথা সুলতানের কানে তুলবই। দেখা যাক, কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

পরদিন ভােরে নবাব উজির সামস-অল-দিনকে নিয়ে নীল নদের তীরে এলেন। পালকী চেপে ভ্রমণ শুরু করলেন। জিজায় পিরামিড দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা। এদিকে বড় ভাইয়ার আচরণে নূর-অল-দিন খুবই ক্ষুব্ধ হ’ল। মনস্থ করল, এ-সুলতানিয়তেই আর থাকবে না। অন্যত্র গিয়ে নােকরি জোগাড় করে নেবে। সে নােকরকে দিয়ে নিজের ছাই রঙের খচ্চরটি তৈরী করিয়ে নিল।

নােকরটি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল—“হুজুর, আপনার আদেশ আমি এক্ষুণি পালন করছি। কিন্তু কোথায় যাবেন, মেহেরবানি করে এ-অধমটির কাছে বলবেন কি ? |

‘কোথায় যে যাব তা আমিও ঠিক জানি না। তবে সবার আগে কালিব নগরে যাব। সেখানে দু’তিন দিন থাকার পর যেদিকে দু’চোখ যায় খচ্চরটিকে নিয়ে যাত্রা করব। মিছে আমার পাত্তা জানার চেষ্টা করিস নে। এ-স্বার্থপর, হিংসা, দ্বেষ আর রেষারেষির মধ্যে আমার আর এক মুহূর্তও থাকার ইচ্ছে নেই।'

নূর-অল-দিন তার বাহন ছাই রঙের খচ্চরটির পিঠে চেপে অজানা উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। দুপুরের দিকে বুলবেশা নগরে হাজির হ’ল। ইতিমধ্যেই কায়রাে নগর পেরিয়ে এসেছে। একটি সরাইখানার দরজায় খচ্চরটিকে ছেড়ে দিয়ে খাওয়া দাওয়া করার জন্য ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর অত্যাবশ্যকীয় কিছু সামগ্রী কেনাকাটা সেরে আবার খচ্চরের পিঠে চেপে বসল। এবার হাজির হ’ল জেরুজালেম নগরে। নূর-অল-দিন পথশ্রমে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়ল। বিশ্রাম না নিলে আর চলছে না। খচ্চরটির পিঠ থেকে গালিচা আর কম্বল নামিয়ে তাকে চরতে দিল। কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। মিনিট কয়েকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের ঘােরে তার বড় ভাইয়াকে খােয়াবের মধ্যে দেখল। তারা দুজনে গলা ছেড়ে ঝগড়া করছে দেখল। আচমকা তার ঘুম ভেঙে গেল। হুড়মুড় করে উঠে বসল। তার মন-প্রাণ অস্বাভাবিক বিষিয়ে উঠল। সে বড় ভাইয়া আত্মীয় কুটুম্বদের ছেড়ে এসেছে বটে কিন্তু তাদের চিন্তা তার মাথা থেকে কিছুতেই নামছে না দেখে যারপর নাই বিস্মিত হল।

সকাল হ’ল। নূর-অল-দিন আবার গাধার পিঠে চাপল। সন্ধ্যার কিছু আগে আলেপ্পো নগরে গাধা দাঁড় করাল, একটি সরাইখানার

সামনে গাধাটিকে বেঁধে সে ভেতরে ঢুকে গেল। খানাপিনা সেরে  ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে ঘুম থেকে উঠে জায়গাটিকে ঘুরে ঘুরে দেখল। খুবই ভাল জায়গা। মনে ধরে গেল।

দুপুরের কিছু আগে আবার সে যাত্রা শুরু করল। কোথায় যাচ্ছে, কোথায় গিয়ে নামবে একমাত্র আল্লাহ-ই জানেন। সংসারের স্বার্থপরতা দ্বেষ আর হানাহানি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে এসে আজ সে যাযাবর জীবন সম্বল করেছে। পথই আজ তার একমাত্র  অবলম্বন। | এবার সে সুবিখ্যাত নগর ও বন্দর বসরাহতে পৌছল। স্থানীয় ও বহিরাগত বহু সওদাগর প্রতিদিন এখানে জড়াে হয়, দ্রব্যসামগ্রী কেনা বেচা করে।

নূর-অল-দিন একটি ছােট্ট সরাইখানায় ঢুকে খানাপিনা সারল। সরাইখানার মালিক খানসাহেবের এক কর্মচারীকে নিয়ে সে এবার নগর পরিভ্রমণে বেরল। পাহাড়ী পথ। ঘন ঘন চড়াই-উৎরাইতে অনভ্যস্ত পা দুটো সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ল। নগরের কেন্দ্রস্থল অসমতল হলেও খুব বেশী উঁচু-নিচু নয়।

নর-অল-দিন খচ্চরটির পিঠে চড়ে বসরাহ নগর দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল। সরাইখানার বালক কর্মীটি পাশে পাশে পায়ে হেঁটে চলেছে। বসরাহ-র উজির নিজের বাড়ির জানালা দিয়ে শহরের শােভা দেখছেন। অকস্মাৎ সুদর্শন যুবক নূর-অল-দিনকে দেখে তার রূপে মুগ্ধ হলেন। এক নােকরকে বললেন—'এক ছুটে দেখে আয় তাে খচ্চরটির পিঠে কে যাচ্ছে? আর সঙ্গের ওই লেড়কাটিকে ডেকে নিয়ে আসবি।' সরাই-বালকটি এলে উজির নূর-অল-দিন-এর পরিচয় জানতে চাইলেন। সে কিছুই বলতে পারল না। তবে খানসাহেবের সরাইখানায় আজই প্রথম এসেছেন, তার সঙ্গের সমানপত্তর বহু মল্যবান। নবাব, বাদশাহ বা সুলতানই কেবল সেগুলাে ব্যবহার করতে পারেন।

উজির খানসাহেবের সরাইখানার ঠিকানাটি নিয়ে সরাই বালকটিকে বিদায় দিলেন।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে না হতেই উজির সরাইখানায় এসে খানসাহেবের সঙ্গে মােলাকাৎ করলেন। উজিরের অত্যুগ্র আগ্রহে খানসাহেব অতিথি নুর-অল-দিনকে ডেকে আনলেন।

নূর-অল-দিন উজিরকে অভ্যর্থনা করে ঘােড়া থেকে নামিয়ে সরাইখানায় নিয়ে গেল। একটি ছােট্ট খাটিয়া পেতে বসতে দিল।

কথা প্রসঙ্গে উজির বললেন--সে কী বাছা! তুমি আমাদের দেশের মেহমান। আর তুমি কিনা এরকম একটি ভাঙাচোরা সরাইখানায় পড়ে থাকবে, হতেই পারে না, আমার বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করবে চল। তােমার কোন আপত্তিই শুনব না।'

নূর-অল-দিন বহুভাবে আপত্তি করল। ধােপে টিকল না। অনন্যোপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত উজিরের বাড়িতে তাকে আতিথ্য গ্রহণ করতেই হল।।

খানাপিনা সেরে গল্প করতে বসে প্রসঙ্গক্রমে উজির তাকে বলল-বাছা, তােমার মনের কথা খােলসা করে বল তাে—এত পথ পাড়ি দিয়ে তুমি আমাদের দেশ এ বসরাহ নগরে এলে কেন? নিছকই দেশভ্রমণের তাগিদে, নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে?

–না কোন বিশেষ উদ্দেশ্য প্রণােদিত হয়ে এখানে অবশ্যই আসিনি। নিছকই ঘুরে ঘুরে দেশ দেখতে দেখতে এখানে এসে পড়েছি। মিশরের সুলতানের উজির ছিলেন আমার আব্বাজী। তিনি বেহেস্তে গেলে আমরা দু'যমজ ভাই উজিরের পদে বহাল হই। কিন্তু সংসারের স্বার্থপরতা, লােভ, নীচ মনােবৃত্তি প্রভৃতি দেখে বিতৃষ্ণায় আমার মন-প্রাণ বিষিয়ে ওঠে। ভাবলাম কি, এ-জায়গা তাে আমার জন্য নয়। চারদিকে স্বার্থপর মানুষের ভিড়ে আমার প্রাণ তাে ওষ্ঠাগত হয়ে উঠছে। বিরক্ত হয়ে খচ্চরটিকে নিয়ে হারা উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। ঘুরে ঘুরে নিত্য নতুন দেশ দেখে বেড়াব, এই তাে চাই। ব্যস, একদিন সত্যি সত্যি কাউকে কিছু না বলে উধাও হয়ে গেলাম। নূর-অল-দিন-এর যুবক বয়সেই ঘর-সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণা জেগেছে দেখে উজির সবিনয়ে বললেন—এ কী কথা ! আজ বয়স কম, রঙিন স্বপ্নে মসগুল হয়ে পড়েছ। কিন্তু চিরদিন তাে আর এমনােভাব স্থায়ী হবে না। তারপর একদিন দেহের তাকতও কমতে থাকবে। পথ চলার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলবে। তখন কিন্তু তােমার নিজের দেহকেই এক বাড়তি বােঝা বলে মনে হবে, জেনে রাখ। তুমি সুন্দরের পিয়াসী, খুবই সত্য। কিন্তু এ-সুন্দরকে তাে চিরদিন সুন্দর বলে মনে হবে না। বিতৃষ্ণা জন্মাবে। তামাম দুনিয়া কুঁড়ে কুঁড়ে না বেড়িয়ে এক জায়গায় বসেই সব সৌন্দর্যকে উপভােগ করা সম্ভব। বৃদ্ধ উজির খুবই বিচক্ষণ ব্যক্তি। অমিত বুদ্ধির আধার। এমন সুদর্শন এক যুবককে পেয়ে তার মনে অদম্য উৎসাহ জাগল। মনস্থির করে ফেললেন, নিজের লেড়কিকে এর হাতে তুলে দেবেন। শাদী দিয়ে সুলতানকে অনুরােধ করে শেষে দরবারে একটি নােকরি জোগাড় করে দেবেন।

উজির নিজের প্রাসাদের সুসজ্জিত কক্ষে মেহমান নূর-অলদিন-এর থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।

এক সকালে বৃদ্ধ উজির নূর-অল-দিনকে বললেন–বাছা বুড়ো হয়েছি। আর নােকরি করার মন নেই, তাই উজিরের পদ থেকে এবার বিদায় নেৰ ভাবছি। সুলতানকে বলে আমার পদে তোমাকে নিয়ােগ করার ব্যবস্থা করব। তার আগে আমার বেটির সঙ্গে তােমার শাদীর ব্যাপারটি মিটিয়ে নিতে চাই। আমার বেটিকে তাে তুমি দেখেছই। সে যে খুবসুরৎ তা আমি নিজমুখে না-ই বা বললাম। বিচারের ভার আমি তােমার হাতেই দিচ্ছি। তারপর যদি মন চায় আমার বেটিকে শাদী করে তােমার জীবনসঙ্গিনী করে নিতে পারবে।'

কথাটি শুনে নূর-অল-দিন-এর খুবই শরম হ'ল। শির নিচু করে দাড়িয়ে রইল। এক সময় সঙ্কোচে লজ্জাতুর কণ্ঠে বলল—‘এতে আমার আর কি বলার থাকতে পারে? আপনি ভাল বুঝে যা হয় করুন । 

নর-অল-দীন-এর সম্মতি পেয়ে বৃদ্ধ উজিরের মনে আনন্দ যেন আর ধরে না। খুশীতে একেবারে ডগমগ। প্রাসাদের অন্দর মহলেও খুশীর জোয়ার বয়ে চলল।

উজির খুবই জাকজমকের সঙ্গে তার বেটির শাদীর আয়ােজন করলেন। আত্মীয়-বন্ধুরা কজী ডুবিয়ে খানাপিনা করল। দামী সরাবের বন্যা বয়ে চলল।

নিমন্ত্রিত মেহমানরা বিদায় নিলে উজির নূর-অল-দীনকে হামামে পাঠালেন। সঙ্গে দু’জন নফর গেল। হামামে যাওয়ার ব্যাপারটি সে দেশের প্রচলিত প্রথা। জামাতা বাবাজীকে হামাম থেকে গােসল সেরে বেরিয়ে লেড়কির আব্বাজীর হাত থেকে নতুন পােশাক পরতে হয়। তারপর সুসজ্জিত খচ্চরের পিঠে চেপে নগর পরিভ্রমণে বেরােবেন।

নূর-অল-দীন খচ্চরের পিঠে চেপে নগর পরিভ্রমণ করে ফিরে এল। উজির অপেক্ষা করছেন। জামাতা বাবাজীকে অভ্যর্থনা করে অন্দরমহলে নিয়ে গেলেন।

বেগম শাহরাজাদ দেখলেন ভােরের আলাে ফুটতে আর বিলম্ব নেই। এবার কিসসা বন্ধ করলেন।  রাত্রে আবার বাদশাহ শারিয়ার এলেন। বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করলেন-“জাহাপনা, সে উজির তার জামাতা নূরআল-দীন’কে অভ্যর্থনা করে অন্দরমহলে নিয়ে ফুলমালায় সুশােভিত একটি ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। নূর-অল-দীন দেখল তার বিবি সােনার জরিবুটি দেওয়া পােশাক পরে সুসজ্জিত পালঙ্কের ওপর অপেক্ষা করছে। আজ তার জীবনে সবচেয়ে মধুর রাত্রি। সবচেয়ে আনন্দঘন মুহূর্ত। আজই প্রথম চরম আনন্দের স্বাদলাভে জীবন ধন্য হবে। | নূর-অল-দীন সদ্য শাদীকরা বিবিকে পাশে বসিয়ে দেশবিদেশের বহু চটকদার গল্প শােনাল। রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর। নূর-অল-দীন তার বিবিকে বুকে টেনে নিল। একে অন্যের মধ্যে নিঃশেষে বিলীন হয়ে গেল। দোহে মিলে এক ও অভিন্ন। একজনকে বাদ দিয়ে অন্যের অস্তিত্বের কথা কল্পনাও করা যায় না।

ছােট ভাইয়া নূর-অল-দীন যখন সদ্যবিবাহিতা বিবিকে নিয়ে আনন্দে মসগুল হয়ে দিন কাটাচ্ছে তখন তার বড় ভাইয়া সামস অল-দীন সুলতানের সঙ্গে গীজের পিরামিড দেখে বাড়ি ফিরল। দেখে, নূর-অল-দীন বাড়িতে অনুপস্থিত।

নফরের মুখে সামস-অল-দীন শুনল, কদিন আগে তার ছােট ভাইয়া খচ্চরের পিঠে চেপে কোথায় গেছে। ব্যস আর বাড়ি ফেরে নি। কোথায় গেছে, কবে ফিরবে কিছুই নাকি বলে যায় নি।

সামস-অল-দীন ছােট ভাইয়ার শােকে মুহ্যমান হয়ে পড়ল। তার বুঝতে কিন্তু বাকি রইল না যে, রাগের মাথায় সেদিন যেসব অসঙ্গত কথা বলেছে তারই ফলে তার ভাইয়া ঘর-সংসার ছেড়ে বিবাগী হয়ে গেছে। নিজের কাজের জন্য খুবই মর্মাহত হ’ল সে।।

উপায়ন্তর না দেখে সামস-অল-দীন সুলতানের কাছে সবকিছু খােলসা করে বললেন, সুলতান ব্যাপারটিতে মনে খুবই ব্যথা পেলেন।

ব্যথিত মর্মাহত সুলতান বহু দেশের দরবারে দূত পাঠিয়ে নূর-অল-দীন-এর খবরাখবর নিতে লাগলেন। বৃথা চেষ্টা। দূতরা এক এক করে খালি হাতে ফিরে এল। দূতদের কেউ-ই কিন্তু বসরাহ.........To be continued.

Post a Comment

0 Comments