আরব্য রজনী পার্ট ১৫ ( Part 15 )

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
একটি নারী, একটি যৌবন আর একই মাংসপিণ্ড কতদিন আর স্বাদ লাগতে পারে।
আঁখির পানি মুছতে মুছতে ডুকরে কেঁদে বল্লাম-কোতল  তাে আমাকে তুমি করবেই। নসীবের ফেরে জান আমাকে দিতেই  হবে । আমার মত বােকা মেয়ের নসীবে-এর চেয়ে বেশী আর কি-ই বা জুটতে পারে।

ষণ্ডামার্কা হাবসী যুবকটি আবার আমাকে লক্ষ্য করে হাতের তরবারিটি উঁচিয়ে ধরল। এমন সময় সে বুড়িটি থপ থপ করে ঘরের দরজার সামনে এসেই সচকিত হয়ে বলে উঠল—একে মেরাে না বাছা! জান নেয়ার মত গুস্তাকী কিছু করেনি। আমি তােমাকে পেটে ধরলেও মায়ের মত করে মানুষ করেছি। বুকের স্তন দিয়ে তােমার জান টিকিয়ে রেখেছিলাম একদিন। যদি লঘু পাপে এমন গুরুদণ্ড  দাও তবে আল্লাতাল্লা তােমাকে, কিছুতেই মাফ করবেন না।
বুডির কথা আমার স্বামী ফেলতে পারল না। আমার গুস্তাকী মাফ করল কিনা জানি না। তবে সে এবারের মত আমার জান নিল না ।


আবার তেমনি গর্জন করে উঠল—“ঠিক আছে, জান নেব না। কিন্তু এমন এক ক্ষতচিহ্ন এর দেহে এঁকে দেব যে, যা আমৃত্যু তাকে একথা স্মরণ করিয়ে দেবে।


আমার স্বামী তখন হাবসী নােকরদের বিদায় দিল। বুড়িকে বাইরে যেতে বলল। তারপর বলপূর্বক আমার অঙ্গের যাবতীয় আচ্ছাদন খুলে একেবারে উলঙ্গ করে দিল। একটি চাবুক নিয়ে ক্রোধােন্মত্ত সিংহের মত আমাকে একের পর এক আঘাত হানতে লাগল। কতক্ষণ যে আমার ওপর দৈহিক নির্যাতন করেছিল, বলতে পারব না। কারণ কয়েক ঘায়ের বেশী চাবুকের ঘা আমি সহ্য করতে পারিনি। সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। সংজ্ঞা ফিরে পেলে দেখি, আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অসংখ্য ক্ষত। চুইয়ে চুইয়ে  খুন ঝরছে।


বুড়ি কোত্থেকে যেন ভাল দাওয়াই এনে দিল। নিজে হাতে ক্ষতস্থান গুলিতে প্রলেপ দিয়ে দিতে লাগল। ক্ষত শুকোতে দেরী হ’ল না । কাল রাত্রে এ ক্ষত চিহ্নগুলােই আপনারা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।


মাস চারেক পর আমি ঘর থেকে বেরােতে পারলাম। দরজার বাইরে আসতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। চোখের সামনে ভেসে  উঠল এক ধ্বংস স্তুপ। কে বা কারা যেন চরম আক্রোশে বাড়িটিকে বিরাট একটি ধ্বংস স্তুপে পরিণত করে দিয়েছে। অন্য সব বাড়ি অক্ষতই রয়ে গেছে। আমার স্বামীর দেখা পেলাম না। কেউ তার কোন হদিসও দিতে পারল না। বুক ভরা দুঃখ-যন্ত্রণা নিয়ে ফিরে এলাম আমার ছােট বহিন কহিমা-র আশ্রয়ে। আমার দু’ বহিন জুবেদা ও কহিমা আমার নসীবের বিড়ম্বনার কথা শুনে ব্যথিত মর্মাহত হ’ল। আমাকে নানা ভাবে প্রবােধ দিল তারা। মানুষ তাে কেবল একচেটিয়া সুখের প্রত্যাশাই করে। কিন্তু খােদাতাল্লার মর্জি যে তা নয়। দুঃখের পরিমাপই তিনি বেশী দেন। ফলে মানুষ সুখের প্রকৃত স্বাদ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। আমরা তিন বহিন এবার থেকে এক সঙ্গে বাস করতে লাগলাম। সাদী-নিকার ধারকাছ দিয়েও গেলাম না। আমরাই দোকানপাট সারি, খানাপাকাই, ভাগজোক করে আহার করি। আমাদের দু'বহিনের বড় জুবেদার মর্জি মাফিকই আমাদের সংসার চলতে লাগল।

 বেশ কয়েক বছর দিব্যি কাটিয়ে দিলাম। কোন পুরুষের সাহচর্য ছাড়াই। তারপর কুলি-যুবকটিকে পেলাম আমাদের কাছে। হাসিমস্করা আর দৈহিক সুখ ভােগের মধ্য দিয়ে পরমানন্দে আমাদের যে-দিন কেটেছিল। আমাদের অনুরােধে সে রাত্রেও আমাদের কাছে রয়ে গিয়েছিল। তারপর এল বাঁ-চোখ কানা, দাড়ি-গোঁফ কামানাে কালান্দার ফকির। তারপর যা কিছু ঘটেছে, সবই তাে আপনারা অবগত আছেন।

মেজো বােন আমিনা-র জীবন কথা খালিফা হারুণ-অল| রসিদকে মুগ্ধ করল। ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ তার কিস্সা বন্ধ করলেন।

                                           তিন বহিনের শাদী
                                              অষ্টাদশ রজনী 
বাদশাহ শারিয়ার মধ্যরাত্রের কিছু আগে বেগম শাহরাজাদ-এর মহলে উপস্থিত হলেন।

কোনরকম ভূমিকার অবতারণা না করেই বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন – জাঁহাপনা, খলিফা হারুণ - অল - রসিদ - এর ফরমাস অনুযায়ী জুবেদার ছােট বহিন কহিমা সে - কালাে কুত্তী দুটোকে এবং বাঁ - চোখ - কানা কালান্দার ফকির তিনজনকে তার সামনে উপস্থিত করল। লিপিকাররা খলিফার সামনে দুটো পান্ডুলিপি পেশ করল। তিনি বড় বহিন জুবেদা এবং মেজ বহিন আমিনার জীবন কথা লিখে রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ দুটো তারই পান্ডুলিপি।

খলিফা এবার জুবেদাকে কাছে ডাকলেন। সে এলে তিনি নির্দেশ করলেন, যে জিনিয়াহ তার বড় দুই বহিনকে মানুষ থেকে কুত্তীতে পরিণত করেছিল তাদের ঠিকানা তাকে দেওয়ার জন্য।

জুবেদা বলল - ‘জাঁহাপনা, এবারই তাে আমাকে বিপদে ফেলেন। তাদের পাত্তা তাে আমার জানা নেই।

—“তবে তাকে পাওয়ার উপায় কি?

—“জাহাপনা, তাকে কাছে পাওয়ার জন্য আমাদের যখনই দরকার পড়ে তখনই একটি বিশেষ পদ্ধতি প্রয়ােগ করি। ব্যস, সে আমাদের সামনে হাজির হয়।

—‘ভাল কথা, কি সে পদ্ধতি জানতে পারি কি? বড় বহিন জুবেদা এবার নিজের মাথা থেকে দু’গাছি চুল ছিড়ল। সে - দুটো খলিফার হাতে দিয়ে বলল - জাঁহাপনা, এ-দুটোকে আগুনে পুড়িয়ে দিন। পুড়ে একেবারে নিঃশেষ হওয়া মাত্র জিনিয়াহ আমাদের সামনে হাজির হয়ে যাবে।'

খলিফা চুল দু’গাছি এক কর্মচারীর হাতে দিলেন। বললেন - ‘আগুন জ্বেলে এদের পুড়িয়ে দাও।  খলিফার নির্দেশ পালিত হ’ল। চুল দু’গাছি পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া মাত্র সমগ্র প্রাসাদটি প্রবল ভূমিকম্পের মত দুলতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত ধরে প্রাসাদটি দুলে আবার স্বাভাবিক হ’ল। ব্যস, এবার দরজার কাছে দর্শন দিল এক কুদর্শনা হাবশী যুবতী।

জুবেদা হাবশী যুবতীকে হাতের ইশারা করে কাছে ডাকল। সে এগিয়ে এলে জুবেদা বলল – ‘জাঁহাপনা, এ-ই সেই ‘জিনিয়াহ, এর কথাই আপনাকে বলেছিলাম।

জিনিয়াহ এবার খলিফার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। যথােচিত কায়দায় কুর্নিশ করল।
খলিফা বললেন – তােমার কথা আমি জানতে চাই। তুমি নিজ মুখে বল, কিভাবে তাদের সঙ্গে তােমার পরিচয় হয়েছিল?' 
-“জাঁহাপনা, এক সময় এ-যুবতীর অনুগ্রহে আমার প্রাণ বেঁচেছিল। আমি তারই প্রতিদান স্বরূপ এর কিছু উপকার করতে প্রয়াসী হয়েছিলাম। এর জন্য কিছু করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য জ্ঞান করছি। জাহাপনা, এই যে কুত্তী দুটোকে দেখতে পাচ্ছেন এরা উভয়েই ত এ - যুবতীর বড় বহিন। বড়ই বিশ্বাসঘাতিনী। সুযােগ বুঝে এরা তার প্রাণনাশের চেষ্টা করতেও কসুর করে নি। তাদের মনােভাবের কথা আমি নিজ ক্ষমতাবলে জানতে পারি। তখনই আমি এর বিহিত করে ফেলি। তাদের কুত্তীতে পরিণত করে দিই। খলিফা হারুণ - অল - রসিদ মুহুর্তের জন্য কুত্তী দুটোর দিকে তাকালেন। জিনিয়াই বল্ল – জাহাপনা, অবশ্য আপনি যদি এদের প্রতি সহানুভূতিশীল হন তবে আমি আবার যাদুবলে এদের পূর্বশ্রা ফিরিয়ে আনতে পারি। অর্থাৎ মন্ত্রবলে আবার এদের মনুষ্যদেহ দান করতে আমি সক্ষম।


চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খলিফা বললেন – জিনিয়াহ, আমার বিশ্বাস এদের কৃতকর্মের উপযুক্ত ফল এরা ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছে। অতএব এদের আর কষ্ট দেওয়ার প্রয়ােজন নেই। তুমি তাে বলেইছ, তােমার যাদুবিদ্যার বলে এদের পূর্বশ্রী মনুষ্যদেহ আবার ফিরিয়ে দিতে পার। তবে তা - ই কর, এদের আবার মানুষ করে দাও।।


—“জাঁহাপনার আদেশ শিরােধার্য।


–হ্যা, তুমি শীঘ্র এদের মনুষ্যদেহ দান কর। তারপর আমি আমিনা-র ব্যাপারটি ভেবে দেখছি, কি করা যায়। হ্যা, সে যা কিছু বলল সবই যদি সত্য হয় তবে যেভাবেই হােক, তার স্বামীর সন্ধান আমাদের পেতেই হবে। তার জন্য যদি আমাকে আমার তামাম রাজ্য জুড়ে খোঁজখবর করতে হয় তবু আমি দ্বিধা করব না। আমার দেশে এমন অন্যায় - অবিচার আমি কিছুতেই বরদাস্ত করব না। এর হিল্লে আমি করবই। এবার জিনিয়াই খলিফাকে কুর্নিশ করে বল্ল – জাহাপনা, আপনার আদেশ শিরােধার্য। আপনার বাঞ্ছা পূরণ করতে গিয়ে আমি এখনই এদের মনুষ্য দেহ ফিরিয়ে দিচ্ছি। এবার সে হাত কচলে বিনম্র বিনয়ের সঙ্গে বল –‘জাঁহাপনা, এর আগে একটি কথা আপনার কাছে নিবেদন করতে চাই।


—কথা? কি সে - কথা ?

 –‘আমিনার স্বামীর খোঁজে আপনাকে তামাম রাজ্য ছুঁড়ে বেড়াতে হবে না। সে আপনার কাছাকাছিই অবস্থান করছে। আপনি হাত বাড়ালেই হাতের মুঠোর মধ্যে তাকে পেয়ে যেতে পারেন।

—সে কী কথা! আমার কাছেই রয়েছে, অথচ আমি তাকে 

জানি না! কে? কে সে, বল তাে?

-“আপনার লেড়কা। আপনার লেড়কা অল-আমিন। জিনিয়াহ-র মুখ থেকে কথাটি বেরােতে না বেরােতেই দরবার কক্ষে নেমে এল অখণ্ড নীরবতা। সবাই নির্বাক-নিস্তব্ধ।।

খলিফা হারুণ-অল রসিদ-এর মুখে নেমে এল লজ্জা, অপমান আর ঘৃণার ছাপ। বিষাদের কালােছায়া। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি হতাশার দৃষ্টিতে জিনিয়াহ-র দিকে তাকালেন।

জিনিয়াই এবার খলিফার আদেশ কার্যকরী করার জন্য তৎপর হ’ল। একটি পাথরের বাটিতে সামান্য পানি আনাল। পানির পাত্রটি হাতে নিয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে কি সব মন্ত্র আওড়াল। মন্ত্র পড়া শেষ হলে পানিটুকু গণ্ডুষ ভরে হাতে নিল। আবার একই রকমভাবে বিড়বিড করতে করতে হাতের পানিটুকু কুত্তী দুটোর গায়ে ছিটিয়ে দিল। তার যাদুবিদ্যা কার্যকরী হতে শুরু করল। ধীরে ধীরে কুত্তীর দেহ পরমা সুন্দরী দুটো মেয়ের দেহে পরিণত হতে শুরু করল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দুই যুবতী নিজ দেহ ফিরে পেয়ে খলিফাকে নতজানু হয়ে কুর্নিশ করল। রূপসী দুই যুবতী। জুবেদা ও তার অন্য দুই বহিনের চেয়ে এদের রূপের আভা কোন অংশে কম নয়।

দরবার কক্ষের সবাই বিস্ময়ভরা চোখে ব্যাপারটি প্রত্যক্ষ করতে লাগল।

দরবার কক্ষে এতক্ষণ অখণ্ড নীরবতা বিরাজ করছিল। কারাে মুখে টু-শব্দটিও ছিল না। তখন কি খলিফাও নীরবতার মধ্য দিয়ে জিনিয়াহর কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করছিলেন? না। জিনিয়াহ একটু আগে তার লেড়কা অল-আমিন সম্বন্ধে যে উক্তি করেছে তা নিয়েই তিনি আকাশ পাতাল ভেবে চলেছেন। তিনি আপন মনে বলে উঠলেন – তার কথাটি কি বিশ্বাস করার মত ? এ-ও কি অলআমিন-এর পক্ষে সম্ভব? সে না হয়ে অন্য কেউ হলেও না হয় ভেবে দেখা যেত। কিন্তু – না খলিফা হারুণ-অল-রসিদ আর ভাবতে পারছেন না। কিন্তু জিনিয়াহদের কথা অবিশ্বাস করাও তাে যায় না। তারা সর্বজ্ঞ। সর্বত্র তাদের অবাধ গতি। তামাম দুনিয়ার খবর তাদের হাতের মুঠোর মধ্যে। অতএব তার কথাটিকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিতে পারলেন না তিনি। অনন্যোপায় হয়ে উজির জাফরকে বললেন – “ আমার লেড়কা অল-আমিনকে দরবারে হাজির করার ব্যবস্থা কর।

কিছুক্ষণের মধ্যেই অল-আমিন দরবারে উপস্থিত হয়ে আব্বাজীকে কুর্নিশ করে এক পাশে দাঁড়াল।

খলিফা লেড়কাকে জিনিয়াহ-র কথা বললেন। কথাটি শুনে সে যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়ল। কপালের চামড়ায় ভাঁজ এঁকে আব্বাজীর মুখের দিকে পরমূহুর্তেই জিনিয়াহর দিকে তাকাল। তারপর সে যে বিবৃতি দিল তা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার ব্যর্থ প্রয়াস ছাড়া কিছুই বলা যায় না। তার বক্তব্য শােনার পর তাকে তেমন দোষী বলে মনে হ’ল না।

খলিফা কিন্তু লেড়কার কথায় সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। সে তার বক্তব্যে আসলের চেয়ে খাদই যে বেশী সংযােজন করেছে বুঝতে পারলেন। তিনি উজিরকে বলেন – মৌলভীকে তলব কর। তাকে বলবে, শাদীর ব্যবস্থা করতে। আর যা কিছু লাগে সবই যেন সঙ্গে করে নিয়ে আসে।'

খলিফার তলব পেয়ে মৌলভী হন্তদন্ত হয়ে দরবারে উপস্থিত হলেন। খলিফা তাকে শাদীর কবুলনামা লিখতে নির্দেশ দিলেন।

মৌলভী অল – আমিন - এর সঙ্গে দ্বিতীয়বার আমিনার শাদী দিলেন। তারপর প্রথম কালান্দার ফকিরের সঙ্গে শাদী দিলেন বড় বহিন জুবেদার।

আর অন্য দুই বহিনের শাদী হ’ল দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কালান্দার ফকিরের।

খলিফা নিজে? তিনি নিজে শাদী করলেন ছােট বহিন । কহিমাকে।

শাদী হয়ে গেল। খানাপিনাও হ’ল খুবই। রাজ্যের প্রজারাও কম আনন্দ করল না।

শাদী হ’ল। সবাই আনন্দও করল প্রাণভরে। কিন্তু এদের সবার বসবাসের জন্য মহলও তাে চাই। খলিফার নির্দেশে কারিগররা লেগে গেল সবার জন্য পৃথক পৃথক মহল বানাতে। সুদক্ষ কারিগররা চমৎকার সব মহল বানিয়ে ফেলল অল্প সময়ের মধ্যেই।

খলিফা নিজে উপস্থিত থেকে মহলগুলাে সুন্দর করে বসবাসযােগ্য করে সাজিয়ে দিলেন।

সবাই নিজ নিজ মহলে সুখে ঘর সংসার করতে লাগল। 

                                              খণ্ডিত নারী ও তিন আপেলের কিসসা 
এক সন্ধ্যার কিছু আগে খলিফা হারুন-অল-রসিদ উজির জাফরকে তাঁর প্রাসাদে ডেকে পাঠালেন। । উজির ব্যস্ত হয়ে খলিফার সামনে উপস্থিত হলেন। কুর্নিশ করে বললেন –“জাঁহাপনার কি আদেশ ?'
—“আজ এখনই আমি নগর পরিদর্শনে বেরুবাে। আমার কাছে। চারদিক থেকে বহু অভিযােগ এসেছে। আমি ঘুরে ঘুরে সবকিছু নিজের চোখে দেখতে ইচ্ছুক। ওয়ালি আর নগরপালকরা নাকি কৰ্ত্তব্যকর্মে অবহেলা করছে। যদি অভিযােগ সত্য হয় তবে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবাে। কঠোর শাস্তিদান করতেও আমি কুণ্ঠিত হব না।'

উজির জাফর বললেন-“জাহাপনা, আপনার আদেশ শিরােধার্য, আজ রাত্রেই তবে বেরুনাে যাক।

সন্ধ্যার কিছুপরে খলিফা, উজির জাফর এবং খলিফার নিজস্ব দেহরক্ষী প্রাসাদ ছেড়ে পথে নামলেন।

পথ চলতে চলতে তারা পথের বাঁকে এক জেলের দেখা পেলেন। বুড়াে জাল মাথায় করে মাছ ধরে ফিরছে। পথ চলতে চলতে জেলেটি অদ্ভুত কণ্ঠে স্বগতােক্তি করতে লাগল—সবই নসীবের ফের। তার ওপর যে দুর্দিন পড়েছে উদয়াস্ত মাথার গান পায়ে ফেলেও রুটির জোগাড় করতে পারি না। গুড়া বাচ্চাগুলাে খিদের জ্বালায় ছটফট করে। খােদা, এ কী তোমার বিচার, তোমার মর্জি কিছুই বুঝি না।

বুড়ােকে দেখে খলিফা তার কাছে গেলেন। পথ আগলে দাঁড়ালেন। বললেন—“ভাইয়া, তােমার কিসের কারবার, বলবে কি?

–‘জেলে আমি। নদীতে মছলি ধরি। বুড়াে হয়েছি। হাড়-মাস ঠিক কাজ করতে চায় না। দেহের কলকবজা বেইমানি করে হরবকত। জোয়ান বয়সের মত খাটতে পারি নে।”

—“আজ মছলি পাওনি?'

–“দেখছেনই তাে মাথায় জাল আর হাতে খালি ঝুড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরছি। সারাটা দিন নদীর ধারে ধারে ছুঁড়ে বেড়ালাম। শরীর কাহিল হ’ল। ঘাম ঝরল খুবই। কিন্তু একটি মছলিরও দেখা মিলল

আজ রােজগারপাতি কিছুই হল না। গুড়া বাচ্চাদের মুখে কি দেব, ভাবছি। তারা তাে পেটে কিল মেরে আমার জন্য পথ চেয়ে বসে... । চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার বলল-“মালিক, খােদাতাল্লার কাছে আমি হরকত আর্জি জানাই-খােদা, আর কেন? দুনিয়ার বহুত খেলাই তাে দেখলাম। এবার দোয়া করে তােমার কাছে টেনে নাও। আর পারছিনে সংসারের বােঝা বয়ে নিয়ে বেড়াতে।

‘আমি একটি কথা বলছি, মর্জি হলে রাজি হতে পার। –বলুন মালিক, শুনি আপনি…

তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই খলিফা বলতে শুরু করলেন-“আমার সঙ্গে তােমাকে টাইগ্রিস নদীর ধারে যেতে হবে।

–‘মালিক, যদি কিছু রােজগারের ধান্দা হয় তবে আমি জাহান্নামেও যেতে রাজি আছি। টাইগ্রিস নদী তাে সামান্য ব্যাপার।'

-“টাইগ্রিসের পানিতে তােমার জাল ফেলবে। জালে যা ধরা পড়বে সেটি আমার হবে। আর যদি খালি জাল উঠে আসে তবু তােমাকে বিমুখ করব না। আমি তােমাকে পারিশ্রমিক বাবদ এক শ’ দিনার দেব।

বুড়াে জেলেটি চোখে-মুখে অবিশ্বাস ও বিস্ময়ের ছাপ একে খলিফার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

খলিফা বলে চললেন—হ্যা, মুখে যা বলছি, কাজেও তা-ই হবে। তােমাকে দিয়ে আজ আমি আমার বরাতের পরীক্ষা করতে চাচ্ছি। তুমি রাজি তাে?”

বুড়াে জেলেটি কোন কথা না বলে টাইগ্রিস নদীর পথে হাঁটা জুড়ল।

উল্লসিত বুড়াে নদীর তীরে পৌছেই ঝপ করে পানিতে জালটি ছুঁড়ে মারল। প্রায় বৃত্তাকারে পানির ওপরে জালটি ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত নীরবে অপেক্ষা করে জাল গুটাতে শুরু করল। জালে এক ভারি কি যেন আটকেছে মনে হ’ল তার। মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল। ভাবল, আল্লাহ মুখ তুলে তাকিয়েছেন। কোনরকমে জালটি গুটিয়ে তীরে তুলে আনতেই বুড়াের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। হতাশায় চকের মত ফ্যাকাসে হয়ে গেল সম্পূর্ণ মুখটি। একটা বাক্স জালে বেঁধে উঠে এসেছে। বেজায় ভারি। জাল ছিড়ে যাবার জোগাড়। টানাটানি করে কোনরকমে পাড়ে তুলল। তালাবন্ধ। বুড়াে জেলে খলিফার কাছ থেকে নগদ এক শ’ দিনার বুঝে নিয়ে বেজায় খুশী হয়ে ঘরে ফিরল।

খলিফার নির্দেশে উজির জাফর এবং রক্ষী মসরু কাঁধে বয়ে বাক্সটা প্রাসাদে নিয়ে এল।

মসরু একটি হাতুড়ি নিয়ে এসে বাক্সের তালাটি ভেঙে ফেলল। ডালাটি ফাক করেই চমকে উঠল। হায় আল্লা! এ যে কতকগুলাে শুকনাে তালপাতা বােঝাই! হাল ছাড়ল না। ব্যস্ত-হাতে তালপাতাগুলাে সরাতে লাগল। এবার একটা কার্পেট তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। কার্পেটটি বের করতেই দেখা গেল সাদা একটি বােরখা। মসরুর কৌতূহল বেড়ে গেল। ব্যাপারটি নিয়ে খলিফার মধ্যেও কম উৎসাহের সঞ্চার হ’ল না।

খলিফা বললেন—“মসরু, বােরখাটি তােল, দেখা যাক, আর কি আছে রহস্যজনক এ বাক্সটিতে। খলিফার আদেশে মসরু এবার বােরখাটি সামান্য তুলেই চমকে উঠে এক লাফে অনেকখানি পিছিয়ে গেল। তার মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে এল—“হায় আল্লাহ!

খলিফা বললেন—“কি ব্যাপার মসরু? তুমি হঠাৎ ভড়কে গেলে যে? কি আছে বাক্সের ভেতরে?

—জাহাপনা, লাশ! বীভৎস ব্যাপার! একটি লেড়কিকে টুকরাে টুকরাে করে কেটে বাক্সের মধ্যে রেখে দেওয়া হয়েছে।।

সামান্য এগিয়ে গিয়ে বাক্সের ভেতরে উঁকি দিতেই খলিফার সর্বাঙ্গে কম্পন শুরু হয়ে গেল। ভয়ঙ্কর দৃশ্যই বটে, তার শরীরের সব কটি স্নায়ু এক সঙ্গে ঝনঝনিয়ে উঠল। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন—জাফর, আমার রাজত্বে এমন সব অমানবিক কাণ্ডকারখানা ঘটে চলেছে। অসম্ভব! আমি কিছুতেই বরদাস্ত করব না। তােমরা সব থাক কোথায় ? তােমাদের কাড়ি দিনার দিয়ে পুষছি কিসের জন্য, বুঝছি না তাে! কী বীভৎস ব্যাপার। কী নৃশংস আচরণ! মানুষ মানুষকে খুন করছে, আমি যে কল্পনাও করতে পারি না!  উজির জাফর নিতান্ত অপরাধীর মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে অসহায়ভাবে হাত কচলাতে লাগলেন।

খলিফা বলে চললেন—“তােমরা আমাকে প্রায়ই মিথ্যা প্রবােধ দাও, এমন ন্যায় বিচারের দেশ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। আমার কথা মনে রেখাে জাফর, অনেক ধোঁকা আমাকে দিয়েছ  তােমরা। আর নয়। তােমাকে আমি তিনদিন সময় দিলাম। এর মধ্যে খুনীকে পাকড়াও করে আমার সামনে হাজির করা চাই। আর যদি ব্যর্থ হও তবে তােমার গর্দান নেওয়া হবে। না, গর্দান নিয়ে তােমার শাস্তির পরিমাণ কমানাে হবে না। সদর দরজায় কাঠের পাল্লার গায়ে পেরেক গেঁথে তােমাকে হত্যা করা হবে, মনে রেখাে। 

শুধুমাত্র তােমাকে হত্যা করেই নিবৃত্ত হব না। তােমার বংশের প্রত্যেকের গর্দান নেওয়া হবে। বংশে বাতি দেওয়ার কাউকে রাখব না। তিন-দিন—মাত্র তিনদিন সময় তােমাকে দিলাম। এ অন্যায়ের প্রতিকার না করলে অন্তিম বিচারের সময় আমি আল্লাহর কাছে কি জবাবদিহি করব?'

মৃত্যুভয়ে কাতর জাফর কাদতে কাদতে ঘরে ফিরলেন। এতবড় বাগদাদ নগর। কোথায় কুঁড়ে কুঁড়ে হত্যাকারীর খোঁজ করবেন? আর হত্যাকারী কি সামনে সাক্ষী কাউকে রেখে হত্যা করে? আর যদি কেউ দেখেই থাকে তবে তাে নিজেই ছুটে এসে নবাবের দরবারে অভিযােগ করত। কী কঠিন সমস্যা রে বাবা! বিনা কারণে শেষ পর্যন্ত গর্দানটি দিতেই হবে? আবার নিছক সন্দেহের বশে কাউকে ধরে নিয়ে এসে শূলে চড়ালেও বেইমানি করা হবে, অবিচারের দায়ে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কোথায় যাবেন উজির জাফর ? কাকে পাকড়াও করে নিয়ে আসবেন এ নিয়ে মহা ধন্ধে পড়ে গেলেন। কাউকে পাকড়াও করে নিয়ে গিয়ে খলিফার সামনে হাজির করে দিতে পারলে তার নিজের ও পরিবারের সবার জান বাঁচতে পারে বটে, কিন্তু নিরীহ-নিরপরাধ একটি লােকের জান নিয়ে তবেই তা সম্ভব হতে পারে। না, এরকম একটি অধর্মের কাজ তিনি প্রাণ গেলেও করতে পারবেন না। | এক এক করে তিনটি দিন অতিবাহিত হল। উজির জাফর-এর প্রাণ ওষ্ঠাগত। এবার আর কেউ তার জান বাঁচাতে পারবে না। ভয়ে জড়াে সড়াে হয়ে সন্ধ্যার কিছু পরে খলিফার সামনে হাজির হলেন। তার নিজের জান এর জন্য যত না ভাবিত তার চেয়ে অনেক বেশী করে ভাবছেন তার পরিবারের চল্লিশজন নিরীহ মানুষের জন্য। তার অযােগ্যতা অক্ষমতার জন্য শেষ পর্যন্ত পরিবারের সবার গর্দান যাবে এ যে ভাবলেও গলা পর্যন্ত শুকিয়ে আসছে। উজির জাফরকে খালি হাতে ফিরতে দেখে হারুণ-অল-রসিদ তাে রেগে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। গুলিবিদ্ধ বাঘের মত গর্জে উঠলেন। ‘অপদার্থ কোথাকার! তােমার গর্দান আমি নেবই।'

খলিফা এবার বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন—জল্লাদ ! জল্লাদ!’ খলিফার তলব পেয়ে জোয়ান মরদ জল্লাদ পড়ি কি মরি করে ছুটে এল। খলিফা বললেন—“নিয়ে যাও জাফরকে। সদর দরজার কাঠের পাল্লায় পেরেক গেঁথে একে লটকে রাখবে।

খলিফার অমানবিক হুকুমের কথা শুনে নগরের সবাই তাে একেবারে থ বনে গেল। আতঙ্কিতও কম হল না। এমন একজন প্রবীণ, তার ওপর শিক্ষিত, নানাগুণে গুণান্বিত এবং বিচক্ষণ ব্যক্তির ওপর খলিফার আকস্মিক ক্রোধের কারণ কি-ই বা থাকতে পারে তার কিছুই অনুমান করতে পারল না কেউ। তবে এটুকু অনুমানে বুঝল, বড় রকমের কোন গুস্তাকী না করলে কারাে জান, এমন কি সবংশে নিধন করতে পারে না।

উজির জাফরকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হল। পেরেকবিদ্ধ করে হত্যা করার যাবতীয় কাজ শেষ। এখন শুধুমাত্র হাতুড়ির ঘায়ে পেরেক ঠোকার কাজটুকু বাকী। এমন সময় এক যুবক অকস্মাৎ কৌতূহলী জনতার ভিড় ঠেলে খলিফার কাছে এসে বলল—“জাহাপনা, আপনি সুবিবেচক, আপনার কাছে আমার একটি অনুরােধ, বিনাদোষে উজির জাফরকে হত্যা করে নিজের গায়ে কলঙ্কের কালিমা লেপন করবেন না। ওঁকে মুক্তি দিন। আপনি বরং আমাকে হত্যা করে তামাম দুনিয়ার ন্যায়। বিচারের স্বাক্ষর রাখুন। কারণ, মেয়েটির হত্যাকারী আমি। আমিই তাকে হত্যা করে সিন্দুক বন্দী করে টাইগ্রিসের পানিতে ফেলেছিলাম। এতে তার তাে কসুর নেই।'

অজ্ঞাত যুবকটির কথা শেষ হতে না হতেই এক বৃদ্ধ এসে খলিফার সামনে দাঁড়াল। যথােচিত কায়দায় কুর্নিশ করে বলল—জাহাপনা, ওর কথা বিশ্বাস করবেন না। ও ঝুট বাত কইছে। কসুর যা কিছু আমিই করেছি। আমার জান নিয়ে উচিত বিচার করুন। ওকে খালাস করে দিন।

যুবক বলল—জাহাপনা, মেহেরবানি করে ওর কথায় কান দেবেন না। এত বয়স হয়েছে যে, ওর দিমাক ঠিকমত কাজ করছে না। মেয়েটিকে আমিই খতম করেছি। কসুর আমার। শাস্তি আমারই প্রাপ্য। বৃদ্ধ তখন এগিয়ে গিয়ে মিনতির স্বরে বলল- 'বাছা, কেন ঝুটমুট ঝামেলা করছ! তােমার বয়স কম। জীবনে সাধ-আহ্লাদ অনেকই বাকি। আমার তাে এমনিতে গােরে যাবার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। এ নড়বড়ে দেহটার পরিবর্তে যদি তােমার, উজির সাহেবের এবং তার পরিবারের এতগুলাে লােকের জান বাঁচে তবে আর আমার জান দিতে আপত্তিটা কোথায়, বুঝছি না তাে?

পরিস্থিতি খুবই জটিল। এর উচিত মীমাংসা সম্ভব নয় বুঝে খলিফা ঘাতককে হুকুম দিলেন—‘উজিরকে ছেড়ে দিয়ে এদের দু'জনেরই গর্দান নাও। ল্যাটা চুকে যাক।

উজির জাফর প্রতিবাদ করে ওঠেন –‘হুজুর, এতে কিন্তু ন্যায় বিচারের পরিবর্তে অন্যায়কেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে। একজনের অপরাধে দু'জনের জান নেওয়াকে মােটেই ন্যায় বিচার বলা যাবে না।”

যুবকটি উন্মাদের মত চেঁচিয়ে ওঠে—‘জাহাপনা, আমার কথা শুনুন, আমি আল্লাহর নামে হলফ করে বলছি, আমি, আমি নিজের হাতে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছি।

–‘প্রমাণ? প্রমাণ কি?’ খলিফা বলেন। খলিফার হুকুমে যুবকটি হত্যার ঘটনাটি গােড়া থেকে শেষ পর্যন্ত বিবরণ দিল।............... To be continued.

Post a Comment

0 Comments