গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
প্ৰেমজ্বালায় জর্জরিত দেহ-মন নিয়ে পথ চেয়ে বসে থাকি কবে আমাদের নাগর এসে দরজায় দাঁড়াবে। বুকে টেনে নেবে। সােহাগে-আদরে মন-প্রাণ ভরিয়ে তুলবে। আল্লাতাল্লা বছরান্তে একজন করে সুঠামদেহী যুবক আমাদের উপহার দেন। তােমাকেও একই নিয়মে পাঠিয়েছেন। তুমি আমাদের মহব্বতের আগুনে শান্তিবারি সিঞ্চন করতে গিয়ে যে-সুখ আর তৃপ্তি দিলে তা অতীতে যেমন কেউ দিতে পারে নি তেমনি ভবিষ্যতেও কেউ দিতে পারবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
আমি সবিস্ময়ে তাদের দিকে তাকিয়ে বললাম-কেন? আমাকে কেন তােমাদের ছেড়ে চলে যেতে হবে? তােমাদের সান্নিধ্যে কেন আমি আর থাকতে পারব না, বলবে কি?
–শােন, আমাদের আব্বাজী এখানকার বাদশাহ। আমরা চল্লিশ বহিন একই বাবার ঔরসে জন্মগ্রহণ করেছি বটে কিন্তু আমাদের সবার মা আলাদা। আমরা প্রাসাদে অবস্থান করি সারা বছর ধরে। বছর পূরণের চল্লিশদিন বাকি থাকতে খােদাতাল্লা একজন করে সুদেহী যুবককে পাঠিয়ে দেন আমাদের কাছে। আমাদের যৌবনরক্ষার জন্যই এ ব্যবস্থা। চল্লিশদিন অতিক্রান্ত হলে আমরা আবার আব্বা আর আম্মাদের কাছে চলে যাই। আজ সে-দিন। আজ তােমাকে ছাড়তে হবে, চলে যেতে হবে তাদের কাছে। তােমার মত যৌবনের ভরা জোয়ার কারাে মধ্যেই দেখি নি। তােমার অকৃত্রিম অফুরন্ত মহব্বত আমাদের মন-প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু মন না চাইলেও তােমাকে ছেড়ে আমাদের চলে যেতে হবেই।
—তােমরা আমাকে ছেড়ে চলে গেলেও আমার পক্ষে এ জায়গা ছেড়ে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। তােমরা আব্বা-আম্মার সঙ্গে মােলাকাত সেরে এসাে গিয়ে। আমি তােমাদের প্রতীক্ষায় এখানেই থাকব।
আমার কথায় তারা উল্লসিত হ’ল। প্রাসাদের সবগুলাে ঘরের চাবির গােছা আমার হাতে তুলে দিল। তারপর বলল প্রাসাদের সব ঘরে যেতে পারবে। কিন্তু প্রাসাদের যেদিকে বাগিচা আছে খবরদার সেদিকের দরজা ভুলেও যেন খুলাে না। যদি আমাদের কথা অগ্রাহ্য করে সে-দরজা খোেল তবে কেলেঙ্কারী হয়ে যাবে। আমাদের সঙ্গে পুনর্মিলনের পথ কিন্তু চিরদিনের মত বন্ধ হয়ে যাবে, খেয়াল রেখাে।
পরদিন আমার হাতে প্রাসাদের চাবির গােছা দিয়ে রূপসী যুবতীরা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বিদায় নিল।
রূপসী যুবতীরা বিদায় নিলে বিশাল প্রাসাদটা আমি একা আগলাতে লাগলাম। মন খুবই বিষিয়ে উঠল। অফুরন্ত হাসি আনন্দ উচ্ছলতার মধ্য দিয়ে দিন যে কিভাবে কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। আজ আমি একা যেন গােরস্তান আগলাচ্ছি। আজ আমার সামনে জমাট বাঁধা হাহাকার আর হাহুতাশ সম্বল। অখণ্ড নীরবতার মধ্যে বার বার মৃত্যুর কথাই আমার অন্তরের অন্তস্থলে ভেসে উঠতে লাগল।
প্রথম দরজাটি খুলতেই আমার চোখের সামনে বেহেস্তের বাগিচার মত মনলােভা এক ফল-ফুলের বাগিচা ভেসে উঠল। চাবি ঘুরিয়ে দ্বিতীয় দরজাটি খুললাম। কেবলই জানা-অজানা রঙ বেরঙের কত সব ফুল গাছের বিচিত্র সমারােহ যে এখানে ঘটেছে তা বলে শেষ করা যাবে না। এমন চিত্তাকর্ষক অনন্য সৌন্দর্য অন্য কোথাও আছে বলে আমার অন্ততঃ জানা নেই। আমার অন্তরাত্মা পুলকে নেচে উঠল। মনের কোণে বার বার একই কথা ভেসে উঠতে লাগল, আমি কি সত্যি জেগে, নাকি ঘুমের ঘােরে খােয়াব দেখছি?
চাবি ঘুরিয়ে প্রাসাদের তৃতীয় দরজাটি খুলে ফেললাম। এবার বাগিচার অন্য এক প্রান্ত চোখের সামনে ভেসে উঠল। পাখি। গাছের ডালে ডালে কত রঙ আর কতই না আকৃতি বিশিষ্ট পাখির একত্র সমাবেশ ঘটেছে এখানে। তাদের খেলা দেখতে দেখতে চোখ দুটো বুজে এল। কখন যে আমার চোখের পাতা দুটো এক হয়ে এসেছিল, বুঝতেই পারি নি। ঘুমের মধ্যে নিজেকে সঁপে দিয়ে ঘাসের বিছানায়। শরীর এলিয়ে দিলাম।
পাখির কাকলিতে সকাল হ’ল। চাবির গােছাটি হাতের মুঠোর মধ্যেই রয়েছে দেখলাম। চতুর্থ দরজাটি খুললাম। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল সুপ্রশস্ত এক উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। চন্দন কাঠের অতিকায় চল্লিশটি দরজা প্রাঙ্গণটিকে ঘিরে রেখেছে। প্রত্যেকটি দরজার গায়েই সুদক্ষ শিল্পীর মনলােভা কারুকার্যের স্বাক্ষর সুস্পষ্ট।
এ কৌতূহলের শিকার হয়ে একটি দরজা খুলে ফেলাম। আমি যেন মুক্তার সাগরে পড়ে গেলাম। রাশি রাশি বস্তা বস্তা মুক্তা ঘরের মেঝেতে রাখা রয়েছে। আর এক একটির আকৃতিও এমনই বিশাল যা এর আগে কোনদিন প্রত্যক্ষ করার বরাত আমার হয় নি। পাশের ঘরে যেতেই আমার মুখ দিয়ে আচমকা বেরিয়ে এল—“হায় আল্লাহ! এযে রুবী আর হীরার পাহাড় গড়ে তােলা হয়েছে। তারপরের ঘরে ঢাই করে রাখা হয়েছে পান্না। তার পাশের ঘরে পর্বত সমান সােনা। ইয়া বড় বড় সােনার তালের পর্বত। আর একটি ঘরে মােহরের টিবি। তার পরেরটিতে ছাদ পর্যন্ত স্তরে স্তরে সাজানাে রূপাের বাট। তার পরেরটিতে রৌপ্যমুদ্রার পাহাড়।
আমি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম—হায় খােদা! এত ধনরত্ন তাে আমার সারা রাজ্যেও নেই!
আমার অখণ্ড অবসর। নেই বলতে কিছুই করার নেই। ফলে চাবি ঘুরিয়ে এক একটি দরজা খুলে প্রাসাদের কোথায় কি রয়েছে দেখে বেড়াতে লাগলাম। এবার একটিমাত্র চাবি বাকি রয়েছে। আর আমার অদেখা রয়েছে একটিমাত্রই ঘর। তবেই যােলকলা পূর্ণ হয়। সে-মুহূর্তেই রূপসী যুবতীদের সতর্কবাণীর কথা আমার মনের কোণে ভেসে-এ উঠল চাবিটি ভুলেও ব্যবহার কোরাে না। কৌতুহলের শিকার হয়ে চাবি ঘুরিয়ে ঘরটি খুললেই কেলেঙ্কারীর চূড়ান্ত হয়ে যাবে।।
জ্ঞান হওয়ার পর থেকে অজানাকে জানার, অদেখাকে দেখার এবং অচেনাকে চেনার কৌতূহল আমার মনকে প্রতিনিয়ত নাড়া দেয়। এবার তাদের আর একটি কথা মনের কোণে ভেসে উঠল—“যদি কৌতুহলের শিকার হয়ে চাবি ঘুরিয়ে ঘরের দরজাটি খােল তবে আর কোনদিনই আমাদের দেখা হবে না। মেহেবুব | তােমাকে হারানাের ইচ্ছা আমাদের মােটেই নেই। আমাদের অনুরােধটি রাখবে আশা করছি। ওই দরজার ত্রি-সীমানায়ও যেয়ো না।
উদ্ভিন্ন যৌবনা রূপসীদের পাওয়ার লােভ আর ঘরের ভেতরে এমন কি আছে তা দেখার অদম্য কৌতূহল—এই দুয়ের মাঝখানে পড়ে আমি প্রায় বে-সামাল হয়ে পড়লাম। কোনটিকে আমি বেছে নেব, তাদের যৌবনের জোয়ারলাগা সুখ ও তৃপ্তিদায়ী দেহ, নাকি ঘরের ভেতরের বস্তু দেখা ? তাদের মহব্বত অনন্য সৌন্দর্যের স্বাদ আর দেহলতা আস্বাদনের মাধ্যমে পরিতৃপ্তি লাভের কথা এ জন্মে আমার পক্ষে ভােলা সম্ভব নয়। একের পর এক করে চল্লিশটি রাত্রি আমি উদ্ভিন্ন যৌবনা রূপসীর দেহলতা দলন, পেষণ, চুম্বন আর সম্ভোগের মধ্য দিয়ে নিজে স্বর্গীয় সুখ লাভ করেছি আবার তাদেরও দিয়েছি অপার আনন্দ। সে-সুখ চিরদিনের মত বিসর্জন দিতে কোন আহাম্মকের মন চায় ? আমার সর্বনাশের চূড়ান্ত হবে, নারীদেহ সুখ, স্বর্গসুখ চিরদিনের মত বিলুপ্ত হবে জেনেও আমি অদম্য কৌতূহলের শিকার হয়ে এক নিঃশ্বাসে তালার ভেতরে চাবিটি ঢুকিয়ে দিলাম। বরাত ঠুকে চাবিটি ঘােরালাম। ব্যস, দরজাটা আমার চোখের সামনে ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হয়ে গেল। কিন্তু হায়! কিছুই আমার চোখে পড়ল না। উৎকট একটি গন্ধ ছাড়া কিছুই উপলব্ধিও করতে পারলাম না।
আশ্চর্য ব্যাপার তাে। উৎকট গন্ধটি ক্রমে উগ্র থেকে উগ্রতর হতে লাগল। আমার মাথার মধ্যে ঝিমঝিমানি শুরু হয়ে গেল। আর কোন্ অদৃশ্য হাত যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে আমার মাথার মধ্যে হাতুড়ি পিটিয়ে চলল। ব্যস, তারপরই আমি সংজ্ঞা হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম। তারপরই সব বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেল। কতক্ষণ সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়েছিলাম ঠিক মনে নেই। জ্ঞান যখন ফিরল তখন ধীরে ধীরে উঠে পাশের ঘরের ভেতরটা দেখার জন্য ধীর পায়ে এগােতে লাগলাম। দরজাটি ফাঁক করে ভেতরে উঁকি দিতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল মােমবাতির মিষ্টি মধুর আলাের অপরূপ রশ্মি মােমবাতির আলােয় দেখলাম, ঘরের কোণে রয়েছে একটি কালাে ঘােড়া। খুবই মােটাসােটা। তার কপালে সাদা একটা তারা। সামনের ডান-পায়ে আর পিছনের বাঁ-পায়ে র সুদৃশ্য সাদা তারার মােজা পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর পিঠের সোনার জিনে মােমবাতির আলাে পড়ে চকচক করছে। একটি গামলায় খাবার আর একটিতে খাবার জল রাখা রয়েছে। ছেলেবেলা থেকেই বেপরােয়া ঘােড়সওয়ার হিসাবে আমার নাম ডাক ছিল। বহু তেজী দৌড়বীর ঘােড়াকে আমি বহুবার দৌড়ে হারিয়ে দিয়েছি। তাই এমন মােটাসােটা ও তেজী কালাে ঘােড়াটি দেখেই আমার খুব লােভ হল।।
লােভের বশবর্তী হয়ে কালাে সে ঘােড়াটাকে বাগিচায় এনে দাঁড় করালাম। কিন্তু যখন তাকে নিয়ে এগােবার চেষ্টা করলাম তখন সে পাথরের মত ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। এমন বেয়াড়া জানােয়ার আমি জন্মেও দেখিনি। অধৈর্য হয়ে ঘা কতক চাবুক কষিয়ে দিলাম। মহর্তে তার দেহের দু' পাশ থেকে দুটো সুদৃশ্য পাখা বেরিয়ে এল। পাখা দুটো যে চমৎকার ভাবে গােটানাে ছিল আগে দেখতেই পাই নি। আমি তড়াক করে লাফিয়ে তার পিঠের জিনের ওপর বসে পড়লাম। দুহাতে শক্ত করে লাগাম ধরলাম। এবার পা দুটো দিয়ে তার পেটের দু'পাশে বার কয়েক গুতাে দিতেই সে বাতাসের বেগে শূন্যে উঠতে শুরু করল। পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা আর বনবাদাড অতিক্রম করে আমার কালােমাণিক পঙ্খীরাজটা আমাকে নিয়ে বাতাসের বেগে এগিয়ে চলল। দেহ-মনে এক অনাস্বাদিত পুলক, অনুভব করতে লাগলাম।
এক সময় এক ছাদের ওপর ধীরে ধীরে নামল আমার পঙ্খীরাজ। আমি ব্যস্ত হয়ে নামতে গেলাম। আচমকা তার একটি ডানার আঘাত লাগল আমার বাঁ - চোখে। আমি আর্তনাদ করে চোখটি চেপে ধরলাম। এ-সুযােগে সে আকাশে ডানা মেলে চলে গেল একেবারে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
আমি বাঁ-চোখের যন্ত্রণায় কাৎরাতে কাৎরাতে সিঁড়ি ভেঙে কিছুটা নিচে নামতেই বাঁ-চোখ কানা যুবক দশজন আমার সামনে আবির্ভূত হ’ল। তারা ক্রুদ্ধস্বরে বলল—কতবার নিষেধ করেছিলাম, পাত্তাই দাওনি তখন। এখন? আর এ-ও তো বলেছিলাম এখানে দশজনের বেশী স্থান সঙ্কুলান হবার নয়। আমরা তাে দশজন আগে থেকেই রয়েছি। তােমাকে কিছুতেই জায়গা করে দেওয়া সম্ভব নয়। মানে মানে কেটে পড়।
একজন মুহূর্তকাল ভেবে নিয়ে বলল—‘তােমাকে একটি বুদ্ধি দিচ্ছি, বাগদাদ নগরে চলে যাও। সেখানকার খালিফা হারুণ-অল রসিদ পরম মহানুভব। তার দয়া দাক্ষিণ্যের খ্যাতি তামাম দুনিয়ায় কে না জানে। তার কাছে গেলে তােমার বসবাসের যা হােক একটি বিহিত হয়েই যাবে।'
আমি যেন অথৈ সাগরে পড়ে গেলাম। দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে ফেললাম। কালান্দার ফকিরের সাজে সজ্জিত হলাম। পরিচিত জনও বুঝতে পারবে না, আমি বাদশাহ কাসিব-এর বেটা। বাগদাদে পৌছে চৌরাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ভাবছি, কোথায় যাব, কোথায় গেলে আমার ঠাঁই মিলতে পারে। এমন সময় আরও দু’জন কালান্দার ফকিরের দেখা পেয়ে গেলাম। তাদেরও দাড়ি-গোঁফ কামানাে আর বাঁ-চোখ কানা। তারপরই এ বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লাম। আপনারা মেহেরবানি করে আশ্রয় দিলেন। | তৃতীয় কালান্দার ফকিরের কাহিনী শুনে তিন বহিনের মধ্যে বড়টি বলল-ফকির সাহেব, তােমার কাহিনী আমাদের মুগ্ধ করেছে। তােমাকে আমরা মুক্তি দিলম। তুমি যেখানে খুশী যেতে পার।
এবার উজির জাফর ছােট মেয়েটির দিকে তাকিয়ে
বললেন—আমাদের যা কিছু কথা সবই তাে তােমার কাছে ব্যক্ত করেছি। আমার জীবনে তাে এর চেয়ে বেশী উল্লেখযােগ্য কোন ঘটনা ঘটেনি যা বলে তােমাদের হর্ষ উৎপাদন করতে পারি।'
বড় লেড়কিটি মুচকি হেসে বল্ল-“যাক গে, তােমাদেরও মুক্তি দিলাম। যে, যেখানে খুশী চলে যাও, আপত্তি নেই।'লেড়কি তিনাটর কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ প্রাসাদে ফিরলেন।নির্ঘুম অবস্থায় নিদারুণ অস্থিরতার মধ্যে তিনি রাত্রি কাটালেন।
জুবেদার জীবনকথা
পরদিন সকালে দরবারে গিয়ে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ জাফরকে ডেকে বললেন-“যতশীঘ্র সম্ভব সে-লেড়কি তিনটি আর তাদের কুচকুচে কালাে কুকুর দুটোকে দরবারে হাজির কর।'
তিন বহিন বােরখার আড়ালে নিজেদের ঢেকে নিয়ে দরবারে খলিফা ও তার পারিষদদের সামনে হাজির হল।
উজির জাফর বললেন-“কালরাত্রে আমরা যখন তােমাদের হাতে বন্দী হয়েছিলাম তখন কিন্তু আমরা তােমাদের কাছে আমাদের প্রকৃত পরিচয় গােপন করেছিলাম। এখন তােমরা খলিফা হারুণ- অল-রসিদের দরবারে উপস্থিত হয়েছ। তােমরা এখানে যা কিছু বলবে তাতে কিন্তু ভুলেও কিছু মাত্র মিথ্যার আশ্রয় নেবে না। আমরা তােমাদের পরিচয় এবং মাদী কুকুর দুটোর কথা জানতে চাচ্ছি। বল,এ ব্যাপারে তােমাদের কি বলার আছে?'
বড় লেড়কিটি এবার এগিয়ে এসে যথােচিত কায়দায় কুর্নিশ করে বলতে শুরু করল—জাঁহাপনা, আপনার সামনে মিথ্যা বলার ইচ্ছা আমার নেই, সম্ভবও নয়। আমার জীবনকথা এমনই অদ্ভুত যে, নিতান্তই অবিশ্বাস্য মনে হবে। মিথ্যার প্রলেপের সন্ধান পাবেন না ।'
বেগম শাহরাজাদ এ পর্যন্ত বলতেই প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় ভােরের পাখিদের কলকোলাহল শুরু হয়ে গেল। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
ষোড়শ রজনী
বাদশাহ শারিয়ার অন্দর মহলে বেগমের কাছে আসতেই তিনি আবার কিসসা শুরু করলেন—জাহাপনা, তারপর বড় মেয়েটি তাদের কাহিনী ব্যক্ত করতে গিয়ে বলল —'আমার নাম জুবেদাহ। আমার মেজো বহিনের নাম আমিনাহ আর ছােট বহিন কহিমাহ। আমাদের তিনজনেরই আব্বা একজন, আম্মা অবশ্য আলাদা আলাদা। আমার বাবার বড় বিবির গর্ভে আমার জন্ম। আমার আরও দু'জন সহােদরা ছিলেন। তারা আমার চেয়ে বড় ছিলেন। আর দুই বিবির গর্ভে জন্ম গ্রহণ করে আমিনাহ ও কহিমাহ। মৃত্যুকালে আমার আব্বাজী পাঁচ হাজার দিনার রেখে যান।
আব্বাজী মারা গেলে কহিমা ও আমিনা তাদের আম্মার কাছে যায়। আমরা তিন বহিন রয়ে গেলাম বাড়িতেই।
এক সময় আমার বড় বহিনদের শাদী হয়ে গেল। তারা আব্বাজীর রেখে যাওয়া দিনারের ভাগ দিয়ে বাণিজ্য করার ধান্দা করল। ভগ্নীপতিদের একজন তার যা কিছু অর্থ ছিল সব নিয়ে নৌকায় চাপলেন। সওদাগরী ব্যবসা করার জন্য ভিন দেশে যাত্রা করলেন। তারপর অন্যজনও একই ব্যবসার জন্য জাহাজ নিয়ে ভিন্ন দেশের উদ্দেশে পাড়ি জমালেন। আমার বড় বহিনরাও নিজ নিজ স্বামীর সঙ্গ নিলেন। | আমি একা বাড়ি আগলাতে লাগলাম। এক এক করে চার চারটি বছর কেটে গেল। তারপর সব খুইয়ে তারা ভিখারী হয়ে ঘরে ফিরে এল। জীর্ণ তাদের বেশ। শীর্ণকায় দেহ। মাথার চুল পর্যন্ত রুক্ষ। এমতাবস্থায় আমি তাদের প্রথমে চিনতেই পারি নি। নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পর তবে চিনতে পারলাম যে, তারা আমার বড় বহিন। আমার ভগ্নীপতিরা যা কিছু সওদা করেছিল সবই লুঠপাট করে নিল। এমন কি একটি দিনারও তাদের সম্বল ছিল না। বেকায়দায় পড়ে তারা আমার বড় বহিনদের এক শহরে ফেলে গা-ঢাকা দেয়। পালিয়ে যায়। একবস্ত্র সম্বল তাদের। দু' বছরের মধ্যে একদিনও গােসল করতে পারে নি। সবই খােদাতাল্লার মর্জি।
বাড়ি ফিরে আসার পর আমি আমার বড় বহিনদের যা কিছু দরকার সবই সরবরাহ করলাম। নতুন করে বাঁচার ধান্দা করতে বললাম। কবুল করলাম, আমার সার্বিক সাহায্য-সহযােগিতা থেকে তারা কোনদিনই বঞ্চিত হবে না।।
আমার বড় বহিনরা আমার কাছেই থেকে গেল। আমি মূলধন দিয়ে তাদের ব্যবসায় লাগিয়ে দিলাম।
একদিন আমার বড় বহিনরা আবার শাদীর চিন্তা করল। তাদের ইচ্ছার কথা আমাকে জানাল। আমি সবিস্ময়ে বললাম—সে কী কথা! আবারও শাদী! একবার শাদী করে তাে তােমাদের যথেষ্টই শিক্ষা হয়েছে। আজ কালকার মানুষ প্রায় সবই ঠগ, আর বিশ্বাসঘাতক। প্রকৃত মানুষ নেই বললেই চলে।
আমার কথা তারা শুনল না। নিজেরাই গােপনে পাত্র নির্বাচন করে ফেলল। ফলে অনন্যোপায় হয়েই আমি তাদের শাদীতে মত দিলাম এবং পাশে দাঁড়িয়ে যাবতীয় ব্যবস্থাদি করলাম। - শাদীর পর আমার বড় বহিনরা তাদের স্বামীদের সঙ্গে আবার সওদাগরী ব্যবসা করার জন্য ভিন্ দেশে পাড়ি জমাল।।
কয়েক মাস পেরােতে না পেরােতেই এবারও পূর্ব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। তারা সবকিছু নষ্ট করে একেবারে নিঃস্ব-রিক্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরল। আর এবারের স্বামীরাও আগের দুজনের মতই এক জনবহুল বন্দরে তাদের ফেলে রেখে চম্পট দিল। তারা এসে গােমড়া মুখে আমার সামনে দাঁড়াল। নিজেদের কৃতকর্মের এক জন্য আমার কাছে নানাভাবে অনুশােচনা শুরু করল। আমি প্রবােধ দিলাম। তারা নিজেরাই বল্ল-ভুলেও আর কোনদিন শাদীর পিঁড়িতে বসব না। আমি তাদের আবার নতুন করে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য প্রেরণা দিতে লাগলাম।।
আমরা তিন বহিন আবার এক সঙ্গে বছর খানেক কাটালাম। এবার বাণিজ্যে যাবার জন্য আমি উৎসাহী হয়ে পড়লাম। আমার বড় বহিনরাও আমার পিছু নিল। আমার জাহাজ ভাসল। আমার যা কিছু অর্থকড়ি ছিল তার অর্ধেক বাড়িতেই গােপন স্থানে মাটির কোন তলায় পুঁতে রেখে গেলাম। অবশিষ্টাংশ নিলাম সঙ্গে। নইলে সব খুইয়ে বাড়ি ফিরতে হলে দুর্গতির সীমা থাকবে না।আমাদের জাহাজ চলেছে তাে চলছেই। কাপ্টেন ব্যাজার মুখেএকদিন বলেন—'আমরা নসীবের ফেরে পড়েছি। পথভ্রষ্ট হয়েছি। বহু চেষ্টার পর একটি বন্দরে জাহাজ ভেড়ানাে সম্ভব হ'ল। জানা গেল বন্দরটি ডিসেম্বার্ক নামে পরিচিত। | খােদাতাল্লার নাম নিয়ে নগরের পথে চলতে লাগলাম। প্রথম দর্শনেই আমরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। পথের ধারে যত বাড়ি চোখে পড়ল সেগুলাে সবই কুচকুচে কালাে, কষ্টিপাথরের তৈরি। আরও বিস্মিত হলাম যখন দেখলাম, দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়েও আমরা ধারে কোন মানুষের দেখা পেলাম না। আবার দোকান-বাজার সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দামী দামী দ্রব্য সামগ্রীতে দোকান একেবারে তুলে ঠাসা। কিন্তু কোন দোকানেই দোকানির দেখা পেলাম না। আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটি চৌরাস্তার কাছে এলাম। এবার চারজন চারদিকে হাঁটা জুড়লাম। উদ্দেশ্য মূল্যবান অলঙ্কারাদি ও চকচকে পােশাক পরিচ্ছদ ক্রয় করা।
আমি একা একা কিছুদূর অগ্রসর হতেই বিশালায়তন একটি প্রাসাদের সামনে উপস্থিত হলাম। সােনার তৈরি তার সিংহদরজাটি, প্রাসাদের দরজা পর্যন্ত খাঁটি সােনার। দরজাটি ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকতেই আমাকে থমকে যেতে হল। সুসজ্জিত বিশালায়তন কক্ষে মণি মাণিক্য খচিত মনলােভা এক সিংহাসনে বাদশাহ উপবিষ্ট। তার উভয় পার্শ্বে নিজ নিজ সােনা ও রূপার আসনে উজির-নজির এবং আমির-ওমরাহরা অবস্থান করছেন। কিন্তু অবিশ্বাস্য ব্যাপার হচ্ছে, সবাই যেন নিপ্রাণ। পাথরের মূর্তির মত নিশ্চল নিথর। ভাবলাম এ কী কারাে অভিশম্পাতের জের?
আমি দরবারকক্ষ ডিঙ্গিয়ে হারেমে প্রবেশ করলাম। সেখানেও সােনার ছড়াছড়ি। বেশ কয়েকজন বেগম সােনার পালঙ্কে গাএলিয়ে দিয়ে শুয়ে। তাদের সবার পাশেই সােনার পাখা হাতে পরিচারিকারা কেউ দাঁড়িয়ে আবার কেউ বা রূপাের জলচৌকিতে বসে। এখানেও কারাে প্রাণের স্পন্দন আছে বলে মনে হল না। এবার পাশের আর একটি ঘরে ঢুকলাম। সেটি আরও মনােরম করে সাজানাে।
এক এক করে অনেকগুলাে কক্ষে ঘুরে বেড়ালাম। কিন্তু ক্রমেই আমার বিস্ময় গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে উঠল। প্রাসাদের কোথাও কোন জীবন্ত মানুষের দেখা পেলাম না। তবে এটুকু নিঃসন্দেহ হলাম যে, একদিন না একদিন এরা সবাই রক্ত-মাংসে গড়া জীবন্ত মানুষই ছিল। ব্যাপারটি জানবার জন্য আমার অন্তরের অন্তস্থলে কৌতূহল জমাট বাঁধতে লাগল। আশ্চর্য ব্যাপার! এতবড় একটি প্রাসাদে কোনই জীবন্ত মানুষের দেখা পেলাম না যার কাছ থেকে এখানকার রহস্যের কথা জানতে পারব। তবে এমন নিদর্শন আমার সামনে আছে যাতে করে আমি নিশ্চিত হতে পারছি কোন না কোন জীবন্ত মানুষের অস্তিত্ব এখানে রয়েছে। আমি উদভ্রান্তের মত আমার বাঞ্ছিত জীবন্ত মানুষের খোঁজে প্রাসাদের সর্বত্র হন্যে হয়ে ছুটোছুটি করে বেড়াতে লাগলাম।
ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল। আমি ক্লান্ত অবসন্ন দেহে বাদশাহের ঘরে ফিরে এলাম। দরবার কক্ষে নয়। বাদশাহের শয়ন কক্ষে। শয্যায় গা এলিয়ে দিলাম। শিয়রে একখণ্ড কোরাণ শরিফ রাখা ছিল। বিছানায় শুয়ে, ঘুমােবার আগে পর্যন্ত আমি বহুদিন ধরে কয়েক পাতা করে কোরাণ পড়ি। মন পরিষ্কার থাকে, আনন্দের সঞ্চার হয়। সােনার পাত দিয়ে যত্ন করে বাঁধানাে কোরাণটি হাতে তুলে নিলাম। অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে কয়েকটি উপদেশামৃত পাঠ করলাম। তারপর ধর্মগ্রন্থটি যথাস্থানে রেখে ঘুমােতে চেষ্টা করলাম।
না, কিছুতেই দু' চোখের পাতা এক করতে পারলাম না। মাঝরাত্রি পেরিয়ে গেল। এমন সময় হঠাৎ শুনতে পেলাম, কে যেন সুমিষ্ট স্বরে কোরাণের বাণী সুর করে পাঠ করছে। উৎকর্ণ হয়ে লক্ষ্য করলাম। হ্যা, অনুমান অভ্রান্ত। কোরাণের বাণীই বটে। | তড়াক করে লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লাম। কণ্ঠস্বরটি অনুসরণ করলাম। একটি জ্বলন্ত চিরাগ নিয়ে কণ্ঠস্বরটি অনুসরণ করে বিশালায়তন এক ঘরে ঢুকলাম। মনমুগ্ধকর কারুকার্যশােভিত | একটি মসজিদ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সবুজ একটি বাতি টিম টিম করে জ্বলছে। আর মেঝেতে বসে পশ্চিম দিকে মুখ করে এক সুদর্শন যুবক মিষ্টি-মধুর সুরে কোরাণের বাণী পাঠ করে চলেছে। আমি যে তার পাশে, প্রায় গা-ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে রয়েছি। কিছুমাত্র খেয়ালও তার নেই।।
কোরাণ পাঠরত যুবকটির পাশে দাঁড়িয়ে একটি কথাই আমার মনে বার বার জাগছিল, পাষাণ পুরীতে ছােট-বড় সবাই যখন প্রস্তরীভূত হয়ে পড়ে আছে তখন এ-যুবকটি কি করে অব্যাহতি পেল। রক্ত-মাংসের মানুষই রয়ে গেল। যদি সে মুহূর্তে প্রাসাদের বাইরে থেকে থাকত তবু তাে অভিশাপ এড়াতে পারা সম্ভব ছিল না ।
কারণ, প্রাসাদের বাইরেও তাে কোন প্রাণবন্ত প্রাণীর দেখা মেলে নাই। তবে? কি করে এ-যুবকটি প্রাণ নিয়ে টিকে রইল? আমি তাকে সালাম জানিয়ে বল্লাম—‘ভাইজান, তােমার মধুরস্বরে কোরাণের বাণী পাঠ আমার মন-প্রাণকে মুগ্ধ করেছে। পাঠ করে যাও। আল্লাহর পবিত্র নাম শুনে জীবন ধন্য করি। মেহেরবানি করে পাঠ বন্ধ করাে না। সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল । তারপর তেমনি মধুর স্বরে বল—“তােমার কথা আমি রাখব সুন্দরী। তার আগে আমাকে বল, তুমি কি করে এখানে, এ-প্রাসাদে এলে ? তার বাঞ্ছা পূরণ করতে গিয়ে আমি তাকে আমার আদ্যোপান্ত কাহিনী বললাম। তারপর তার নিটোল-নিখুঁত মুখের দিকে তাকালাম। অতি অপরূপ তার দেহসৌষ্ঠব। চোখ ফেরানাে দায়। আমার দেহ-মনে রােমাঞ্চ জাগল। অন্তরের অন্তস্থলে যেন দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করে দিতে লাগল আমাকে। প্রথম পরিচয়ে মুহূর্তেই নিজেকে নিঃস্ব রিক্ত করে কাউকে যে বিলিয়ে দেওয়া সম্ভব এর আগে কোনদিন বুঝিনি। আমার সবকিছু যেন কেমন এলােমেলাে হয়ে যেতে লাগল। আমার কথা শেষ করে তাকে বললাম—‘আমার বৃত্তান্ত তাে শােনালাম, এবার তবে তােমার কথা কিছু বলে আমার কৌতূহল নিবৃত্ত কর।
যুবকটি এবার তার কাহিনী শুরু করল—“আমার আব্বা এক সময় এ-নগরের সুলতান ছিলেন। প্রজারা তাকে অন্তর দিয়ে পেয়ার করত, শ্রদ্ধা-ভক্তি করত। তিনিও তাদের নিজের সন্তানের মতই স্নেহ-মায়া-মমতা দিয়ে আগলে রাখতেন। কিন্তু আল্লাহর মর্জিতে এখানকার মানুষজন, পশু-পাখি ও কীট-পতঙ্গ সবই পাথরে পরিণত হয়ে যায়। আর ওই যে সিংহাসনে উপবিষ্ট দেখছ তিনিই আমার আব্বা। আর হারেমে প্রস্তুরিভূত যে প্রধানা বেগমকে পালঙ্কের ওপর অর্ধ শায়িত দেখে এসেছিলে তিনিই আমাৰ গৰ্ভধারিণী।।
আমার আব্বা এবং আম্মা উভয়েই যাদুবিদ্যায় পারদর্শী। তারা ছিলেন অস্বাভাবিক রকম নাস্তিক। ঈশ্বরটিশ্বর মােটেই মানতেন না। কি করেই ৰা মানবেন? তারা উভয়েই যে শয়তান নারদুন-এর বশীভূত। তাকেই মন-প্রাণ সঁপে দিয়েছেন।আমার আব্বার বিয়ের বহুদিন পর আমার জন্ম হ'ল। আমি তাদের একমাত্র লেড়কা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আমি তাদের চোখের মনি হয়ে পলে পলে বাড়তে লাগলাম। আমার আব্বা আমার ওপর দুটো ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। আমি যেন বড় হয়ে তার মসনদের মর্যাদা রাখতে পারি। আর তার একান্ত আরাধ্য শয়তান নারদুন-এর প্রতি আস্থাভাজন হই।
আগেই বলেছি আমার আব্বার আল্লাহের প্রতি কিছুমাত্রও বিশ্বাস তাে ছিলই না বরং অন্তরে অশ্রদ্ধা পােষণ করতেন। আর তার প্রাসাদে ও দরবারে আল্লাহর নামাজ পড়া তাে দূরের কথা তার নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করা নিষেধ ছিল। কিন্তু প্রাসাদে এক মহিলা লুকিয়ে চুরিয়ে আল্লাহর নামগান করত। নামাজ পড়ত। পয়গম্বর হজরত মহম্মদ-এর নাম করত। কিন্তু বাইরে, বিশেষ করে আমার বাবার কাছে প্রকাশ করত, সে যেন পরম নাস্তিক। তার মত ইসলামের শত্রু দ্বিতীয় একজন নেই। আমার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সে বৃদ্ধার ওপর বর্তাল। বাবা তাকে বলে দিলেন—“আমার একমাত্র লেড়কাকে ভবিষ্যৎ যােগ্য সুলতানরূপে গড়ে তােলাই হবে তােমার একমাত্র কর্তব্য। সে যেন আমার বংশের এবং আমার মুখ উজ্জ্বল করতে সক্ষম হয়। আর তাকে আমার উপাস্য নারদুন-এর শ্রেষ্ঠ ভক্তে পরিণত করবে। বৃদ্ধা রীতিমত দৃঢ়তার সঙ্গে বল্ল-জাহাপনা, আপনি আমার উপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেন। আমি অবশ্যই তাকে আপনার মনের মত করে তৈরি করতে পারব। সে হবে আদর্শ মানব আর আদর্শ সুলতান। আমার আব্বাকে কথা দেওয়ার পর সে কিন্তু গােপনে আমাকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করল। শয়তান নারদুন-এর নামও আমাকে উচ্চারণ করতে দিল না। আমাকে কোরাণ শরিফ পাঠ করে শােনাতে লাগল। আল্লাহর মহিমার কথা, তার ফরমানের কথা আমাকে নিয়মিত শােনাত। আমিও সর্বান্তকরণে আল্লাহর ফরমান মান্য করে পরম অস্তিক হয়ে উঠলাম।
আমাকে সতর্ক করে দিতে গিয়ে বৃদ্ধা প্রায়ই বলত—'খবরদার, এ সব কথা যেন তােমার আব্বার কানে ভুলেও তুলাে না। তিনি ...............To be continued(চলতে থাকবে)।

0 Comments