গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
ব্রোঞ্জের মূর্তিটার গায়ে তীরটা গিয়ে আঘাত করতেই সেটা হুড়মুড় করে ভেঙে সাগরের পানিতে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সাগর উত্তাল উদ্দাম রূপ ধারণ করল। তারপরই দ্রুত ফুলে ফেঁপে উঠতে উঠতে পানি পাহাড়ের চূড়াটার সমান উঁচুতে উঠে গেল। তারপরই একজন ছােট্ট একটা নৌকো নিয়ে আমার কাছে এল। নৌকোর পাটাতনের তলা থেকে একগাদা মড়ার খুলি উকি মারতে লাগল। দেখতে সে-ঘােড়সওয়ারটার মত হলেও আসলে একই লােক নয়।
একেবারে কাছে যেতে আমার ধারণা স্পষ্ট হ’ল যে, লােকটা রক্ত-মাংসের মানুষ নয়। পিতলের তৈরি মূর্তি। তার বুকে একটা সীসার ফলক। দৈববাণী খােদাই করা।
আমি নিঃশব্দে নৌকোয় উঠে বসতেই লােকটা নৌকো বাইতে শুরু করল। দশদিন এক নাগাড়ে নৌকোয় কাটালাম। দশদিন পরে সমুদ্রটাকে পরিচিত মনে হ’ল। বড়ই আনন্দ হ’ল। দু হাত তুলে খােদাকে ধন্যবাদ জানালাম।
ব্যস, মুহূর্তে ঘটে গেল বিপর্যয়। পিতলের মূর্তিটা আমাকে প্রচণ্ড আক্রোশে দু হাতে তুলে সাগরের পানিতে ছুড়ে ফেলে দিল। পরমুহূর্তেই নৌকো ও রহস্যজনক সে-পিতলের মূর্তি দু-ই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। আবার সাগরের পানি সম্বল করে ভাসতে লাগলাম। সারাদিন অবিশ্রান্ত লড়াই চালিয়ে খােদার নাম স্মরণ করতে লাগলাম। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল সাগরের বুকে। হঠাৎ ঢেউয়ের তাণ্ডব গেল বেড়ে। আমায় ভাসিয়ে নিয়ে চলল উপকূলের দিকে। এক সময় ঢেউয়ের ঝাপটায় তীরে গিয়ে আছাড় খেয়ে পড়লাম।
সমুদ্রের ঠাণ্ডা বাতাসে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতে লাগল। জামাকাপড় খুলে বালির ওপর শুকোতে দিলাম। জায়গাটা সমুদ্রের মাঝখানে ছােট্ট একটা দ্বীপ। চারদিকে কেবল পানি আর পানি।
আমার নিজের ওপর খুব রাগ হতে লাগল। ভাবলাম, সামান্য একটা ভুলের জন্য আমাকে এরকম করে খেসারত দিতে হচ্ছে। | হতাশাজর্জরিত মনে দ্বীপের এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতে হঠাৎ নিজেকে ভাগ্যবান মনে হতে লাগল। একটা জাহাজ নজরে পড়ল। দ্বীপের দিকেই এগােতে দেখলাম। কিন্তু মনের আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হ’ল না। ভাবলাম, আবার নতুনতর কোন বিপদে পড়াও কিছুমাত্র বিচিত্র নয়। এরকম আশঙ্কা করে তাড়াতাড়ি একটা গাছের মগডালে উঠে বসলাম। পাতার ঝােপের আড়ালে লুকিয়ে রইলাম। এক সময় জাহাজটা কূলে ভিড়ল। দশ-বারােজন গাট্টাগােট্টা নফর নেমে এল একটা করে কোদাল-হাতে। কূল থেকে কিছুদূরে এক জায়গার মাটি কাটতে লাগল ব্যস্ত হাতে। মনে হ’ল, কিছু খুঁজছে নফরগুলাে। হ্যা, অনুমান অভ্রান্ত। সামান্য খোঁড়াখুঁড়ির পর তারা একটা গুপ্ত দরজা পেয়ে গেল। এবার জাহাজ থেকে কতগুলাে বড় সড় পেটিকা এনে গুপ্ত দরজাটা দিয়ে নিচে নামিয়ে দিল। সেগুলাের মধ্যে দামী খাবার দাবার এবং মদ ভর্তি রয়েছে। কয়েকটা পেটিকায় দামী পােশাক পরিচ্ছদও রয়েছে দেখলাম। সব মিলিয়ে একটা পরিবারের যা কিছু দরকার সবই জাহাজটাতে ছিল।
এবার জাহাজ থেকে নামিয়ে আনা হ’ল এক অশিতিপর বৃদ্ধকে। কেবল বার্ধক্য নয় জরাব্যাধিও তার ওপর ভর করেছে মনে হল। বৃদ্ধের পিছন পিছন সুদর্শন এক কিশােরও জাহাজ থেকে নেমে এল। আর তাদের দেখভাল করছে কয়েকজন নফর। বৃদ্ধটি থপ থপ করে হেঁটে গুপ্ত দরজায় গেল। অন্যান্যরা তাকে অনুসরণ করল। কিছু সময় কেটে গেল নিঃশব্দে। এক সময় সে-কিশােরটি ছাড়া অন্যান্য সবাই এক এক করে গুপ্ত দরজাটা দিয়ে বেরিয়ে এল।
বৃদ্ধকে নিয়ে সবাই জাহাজে উঠে গেলে জাহাজ আবার অথৈ সাগরের দিকে এগিয়ে চলল। আমি গাছ থেকে নেমে এলাম। ব্যস্ত-হাতে মাটি সরিয়ে গুপ্ত দরজাটা বের করলাম। তার মুখে একটি পাথর চাপা দেওয়া। অতি কষ্টে সেটাকে সরিয়ে ফেলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল সঙ্কীর্ণ একটা সিঁড়ি। ভেতরে আবছা অন্ধকার। সিঁড়ি হাতড়ে হাতড়ে নেমে গেলাম নিচে। হঠাৎ চমকে গেলাম। এক সুদৃশ্য ঘরে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। মূল্যবান শ্বেত পাথরের মেঝে। আসবাবপত্র যা কিছু একটি পরিবারের দরকার সবই ঘরে সাজানাে রয়েছে। আমি পর্দা সরিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দিতেই কিশাের বালকটিকে দেখতে পেলাম। সােনার পালঙ্কে শরীর এলিয়ে দিয়ে সােনার পাখায় বাতাস খাচ্ছে। আমাকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই সে ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে গেল। আমি তাকে অভয় দিতে গিয়ে বল্লাম—‘আমাকে দিয়ে তােমার কোনই অহিত সাধিত হবে না। আমি দত্যি-দানাে নই, সাধারণ মানুষ। এক বাদশাহের লেড়কা। আবার আমি নিজেও এক দেশের বাদশাহ। তােমার কোন অনিষ্ট তাে করবই না বরং মৃত্যুর কবল থেকে তােমাকে উদ্ধার করতেই আমার এখানে আগমন। তারা তােমাকে এখানে বন্দী করে রেখে গেছে। তােমাকে এ পাতালপুরী থেকে আমি উদ্ধার করতে এসেছি।'
আমার কথায় কিশাের বালকটার উৎকণ্ঠা দূর হ’ল। মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। | কিশাের বালকটির চোখ-মুখ দেখে মনে হ’ল কোন আমিরওমরাহের ঘরের ছেলে। তার চেহারায় সারল্যের ছাপ। আমাকে কাছে ডাকল। ঘরের ভেতরে যেতেই সামান্য সরে গিয়ে পালঙ্কের ওপরে আমাকে বসতে দিল।
আমাকে পাশে বসিয়ে কিশাের বালকটি মিষ্টি-মধুর স্বরে কেটে কেটে বলতে লাগল—“শুনুন বাদশাহ, তারা আমাকে এখানে বন্দী করে রেখে যায় নি। আমাকে হত্যা করতে নয়, আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার জন্যই তারা আমাকে এখানে লুকিয়ে রেখে গেছে।
আমার আব্বাজী সর্বজন পরিচিত। তুমিও তার নাম অবশ্যই শুনে থাকবে। তামাম দুনিয়ায় তার মত বড় জহুরি আর দ্বিতীয় কেউ নেই। আমির আদমি। খানদানি বংশ আমাদের। বাবার বুড়াে বয়সে আমার জন্ম হয়েছে। খুবই আদুরে।।
আমার জন্মের পর এক প্রখ্যাত গণৎকার ভবিষ্যদ্বাণী করেন। পিতা-মাতার জীবদ্দশাতেই আমি বেহেস্তে চলে যাব। আর এ-ও বলেছেন, আমার পনের বছর বয়সে বাদশাহ কাসিবের লেডকা আমাকে হত্যা করবে। তিনি তার গণনার ফলাফলের বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন বাদশাহ কাসিবের পুত্র সাগরের ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে এক দ্বীপে গিয়ে আশ্রয় নেবে। সেখানকার পাহাড়ের চুঁড়ার ব্রোঞ্জের তৈরি এক ঘােড়সওয়ারকে সাগরের পানিতে ফেলে দিয়ে হাজার হাজার নাবিকের জীবন রক্ষা করবে। গণৎকারের ভবিষ্যদ্বাণী শােনার পর থেকে আমার আব্বাজী আমাকে বাদশাহ কাসিবের লেড়কার ভয়ে পনের বছর ধরে নানাভাবে রক্ষা করে চলেছে।
কিছুদিন আগে চারদিকে খবর হয়ে গেছে, বাদশাহ কাসিবের লেড়কা নাকি সে-ব্রোঞ্জের ঘােড়সওয়ারটাকে পাহাড়ের চূড়া থেকে সাগরের পানিতে ফেলে দিয়েছে। খবরটা কানে যাওয়ার পর থেকেই আমার আব্বাজী আমাকে নিয়ে বড়ই উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছেন। আমার বৃদ্ধ জরাজীর্ণ আব্বাজীর শরীর দ্রুত কাবু হয়ে পড়তে থাকে। আমার আম্মা কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছেন। | কিশাের বালকটার মুখে গণৎকারের কথা শুনে রাগে আমার মাথায় খুন চেপে যাওয়ার জোগাড় হ'ল। যত্তসব মিথ্যাবাদী ভণ্ড গনৎকারের দল। অযথা মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তােলে। তাদের ধরে কচুকাটা করলেও গায়ের ঝাল মেটে না। এমন সুন্দর সহজ সরল ফুলের মত পবিত্র এক কিশােরকে হত্যা করবে এমন নরাধম দুনিয়ায় কেউ আছে! আমি কিশাের বালককে লক্ষ্য করে বললাম—তুমি মিছে ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পােড়াে না ভাইয়া। আমি তােমাকে রক্ষা করবাে। আমি থাকতে তােমার কেশাগ্রও কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। চল্লিশদিন আমি তােমাকে ছায়ার মত অনুসরণ করব। উক্ত সময় অতিক্রান্ত হলে আমি নিজে তােমাকে সঙ্গে নিয়ে তােমার আব্বাজানের কাছে যাব। তুমিই হবে আমার সত্যিকারে জিগরি দোস্ত। আমার মসনদে তােমাকেই আমি অভিষিক্ত করে যাব। কথা দিচ্ছি।' আমার কথায় লেড়কাটা আশ্বস্ত হ’ল। আমার ওপর তার মনে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আর ভালবাসার সঞ্চার হ’ল। পাতালপুরীতে আমাদের কোন অসুবিধাই হ’ল না। রাশীকৃত খাবার, পােশাক পরিচ্ছদ আর অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী বৃদ্ধ জহুরী। সেখানে জড়াে করে রেখে গেছেন।
জহুরীর কিশাের ছেলেটা আমাকে কাছে পেয়ে যে স্বস্তি ও আনন্দ পেয়েছে তা বুঝলাম সারা রাত্রি তার সুনিদ্রার মধ্য দিয়ে। মনে হ’ল বহুদিন পর সে এরকম স্বস্তিতে ঘুমােতে পেরেছে।
আমরা নিজেদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনের গল্পকথা, খেলাধুলা আর হাসি-আনন্দের মধ্য দিয়ে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে লাগলাম। কিশােরটার মন থেকে তার আম্মা আর আব্বাজীর অভাব মুছে গেল। মৃত্যুভয়ও কিছুমাত্র রইল না। আমাদের পারস্পরিক আন্তরিকতাই উভয়কে পাতালপুরীর জীবনেও নিরবচ্ছিন্ন আনন্দের মধ্যে রেখেছে।
এক সকালে সে আমাকে বলল—‘ভাইজান, আজ আমি ঘরে ফিরে যাব। আমার আব্বাজী আমাকে নিয়ে যেতে আসবেন। আমি তাকে গরম পানি দিয়ে ভাল করে গােসল করালাম। সােনার জরি দিয়ে কাজকরা দামী পােশাক পরিয়ে দিলাম। সে সেজেগুজে একটা আরাম কেদারায় শরীর এলিয়ে দিয়ে তার আব্বাজীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম—“ভাইয়া, কি খাবে বল?
‘তরমুজ। আমাকে একটু তরমুজ দাও ভাইজান।
—“আমি একটা তরমুজ নিয়ে তার আরাম-কেদারার পাশে রাখলাম। আরামকেদারার মাথার ওপর দেওয়ালে একটা বড়সড় ছুরি ঝুলানাে ছিল। একটা টুল টেনে নিয়ে তার ওপর উঠে দাঁড়ালাম। ছুরিটিকে নাগালের মধ্যে পাওয়ার জন্য গােড়ালি দুটোকে উঁচু করতেই তার মনে দুষ্টুমি বুদ্ধির উদয় হল। আমার উঁচু গােড়ালির তলায় সুড়সুড়ি দিতে লাগল। আচমকা সুড়সুড়ি দেওয়ায় একটা পা উঁচু করতেই হ’ল। ব্যস, আর দেহের ভারসাম্য বজায় রাখা আমার পক্ষে সম্ভব হ’ল না। আমি তার আরাম-কেদারার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। হাতের ছুরিটা অতর্কিতে তার বুকে গেথে গেল। গণৎকারের ভবিষ্যদ্বাণী হাতে নাতে ফলে গেল। বারকয়েক ছটফট করে কিশােরটার রক্তাপ্লুত শরীরটা এলিয়ে পড়ল।
আমার তখনকার মনের অবস্থা বুঝিয়ে বলার মত ভাষা আমার নেই। আমি জহুরীর কিশাের লেড়কার রক্তাপ্লুত নিঃসাড় দেহটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কাদলাম, উন্মাদের মত দাপাদাপি করতে লাগলাম। বৃদ্ধ জহুরীর সন্ধ্যাবেলা ছেলেকে নিয়ে যেতে আসার কথা। তখন আমার কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার সামনে আমি কোন মুখে দাঁড়াব? কি বলে তাকে প্রবােধ দেব? বৃদ্ধ পিতার সে হৃদয়বিদারক দৃশ্য আমি চোখের সামনে দেখতে পারব না। কিছুতেই না। চোখের পানি ফেলতে ফেলতে আমি পাতালপুরীর প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। গুপ্ত দরজাটা পাথরচাপা দিয়ে বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু আমার মনে শান্তি নেই, স্বস্তি নেই।
কিন্তু দূরে চলে যেতেও মন সরল না। পুরাে ব্যাপারটা কোথাও আত্মগােপন করে থেকে নিজের চোখে দেখার জন্য চিত্তেচাঞ্চল্য বােধ করতে লাগলাম। নইলে বৃদ্ধের নােকরগুলাে আমাকে ছিড়ে টুকরাে টুকরাে করে দেবে।
আগেকার সে-গাছটার মগডালে উঠে পাতার আড়ালে লুকিয়ে রইলাম।
প্রায় এক ঘণ্টা আমি গাছের ডালে কাটানাের পর সে জাহাজটা এসে তীরে ভিড়ল। দশজন নােকর পরিবেষ্টিত হয়ে সে-অশিতিপর বৃদ্ধ আগের মতই লাঠি ভর দিয়ে দিয়ে জাহাজ থেকে নেমে এলেন। সঙ্গের নােকরদের বলেন—“নিয়ে এসাে আমার প্রাণনিধিকে।
বৃদ্ধ নােকরদের নিয়ে থপ থপ করে আমার গাছটার নিচের গর্তটার মুখের সামনে এল। সেদিকে চোখ পড়তেই সবিস্ময়ে বলে উঠলেন—এ কী কাণ্ড! মনে হচ্ছে কেউ সদ্য মাটি খুঁড়ে রেখেছে, কি ব্যাপার? তবে কি আমার লেড়কা জিন্দা নেই? বৃদ্ধের সঙ্গের নােকরগুলাে ব্যস্ত হাতে মাটি সরিয়ে গর্তের মুখটা খালি করল। বৃদ্ধ উন্মাদের মত ছেলের নাম ধরে চিৎকার করতে লাগলেন। কিন্তু কে-ই বা সাড়া দেবে? যাকে বুকে ফিরে পাওয়ার জন্য বৃদ্ধটি প্রায় উন্মাদদশা প্রাপ্ত হয়েছেন, তাকে যে আমি অনিচ্ছায় হলেও নিজের হাতে খতম করেছি। সে আজ চিরনিদ্রায় শায়িত। তার ঘুম কেউ ভাঙাবে সাধ্য কি! নফররা বিষমুখে বৃদ্ধকে পাতালপুরীর প্রাসাদে নিয়ে গেল। ধরাধরি করে।
কিছুক্ষণ বাদে নােকররা বৃদ্ধের সংজ্ঞাহীন দেহটাকে নিয়ে ওপরে উঠে এল। সে মর্মান্তিক দৃশ্য সহ্য করাই তাে দুষ্কর।
বৃদ্ধ তখন লেড়কার নাম ধরে বুক চাপড়ে কাদতে লাগলেন।
এবার নােকরগুলাে ছুরিকাবিদ্ধ রক্তাপ্লুত নিঃসাড় শিশুর দেহটাকে ধরাধরি করে ওপরে নিয়ে এল। গাছটার ছায়াতেই তার লাসটাকে গাের দেওয়া হল। আর পাতাল পুরীতে যেসব দ্রব্য সামগ্রী ছিল সবই জাহাজে তুলে নেওয়া হ’ল। জাহাজ ছেড়ে দিল। জাহাজ চলে গেলে আমি গাছ থেকে নেমে বিষগ্নমনে ছােট্ট সে দ্বীপটার এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। চারদিকে কেবল জল আর জল। ডাঙার কোন চিহ্নও চোখে পড়ল না। কিন্তু আমাকে যে তীরের সন্ধান পেতেই হবে।
একদিন গাছের তলায় বিষন্ন মনে শুয়েছিলাম, অপ্রত্যাশিত এক দৃশ্য নজরে পড়ল। দেখলাম, অভাবনীয় উপায়ে সাগরের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বালির চড়া সৃষ্টি হয়ে গেল। আমি আশান্বিত হয়ে হাঁটতে লাগলাম। ভাবলাম, কোথায় এর শেষ, কোথায় গিয়ে পৌছায় দেখাই যাক না। হেঁটে হেঁটে পুরাে দিনটা কাবার করে দিলাম। সন্ধ্যার কিছু আগে দেখতে পেলাম আসল মাটিতে আমি হাঁটছি, এক সময় যা সমুদ্রের তীর ছিল। খােদাতাল্লার প্রতি মন কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল। | আমি উল্লসিত মনে বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত প্রান্তর দিয়ে হেঁটে চলেছি। কিছুদূরে আগুন জ্বলছে দেখলাম। ভাবলাম, অবশ্যই কোন জনবসতি সেখানে আছে। আগুন জ্বেলে কেউ ভেড়াও পােড়াতে পারে। আশান্বিত মন নিয়ে লম্বা লম্বা পায়ে হাঁটতে লাগলাম। কাছে যেতেই আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। দেখি বিশালায়তন একটা পিতলের তৈরি প্রাসাদ। বিকালের বিদায়ী সূর্যের লালচে আভা পড়ায় মনে হয় পিতলের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
আমি প্রাসাদের সিংহদরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখেই দশজন ষণ্ডামার্কা লােক আমার সামনে এসে দাঁড়াল। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী সুপুরুষ। কিন্তু অবাক মানলাম যে, সবারই বাঁ-চোখ কানা। একটু পরে এক অতিবৃদ্ধ তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। গায়ের চামড়া ঢিলা হয়ে পড়লেও এক নজরে দেখলেই মনে হয় এক সময় তিনি সুপুরুষ ছিলেন। জরা-ব্যাধিতে জীর্ণদশা প্রাপ্ত হয়েছেন।
অশিতিপর বৃদ্ধটি আটজন গাট্টাগােট্টা লােকসহ আমার দিকে এগিয়ে এলেন আর বাকি দু’জন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। আমি প্রথমে একটু ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। কিন্তু বৃদ্ধ ও অন্যান্যরা আমাকে হেসে স্বাগত অভিনন্দন জানালেন। আমার কলিজায় জল এল। মন থেকে ভয়-ডর নিঃশেষে মুছে গেল। আমি মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বৃদ্ধকে অভিবাদন জানালাম।
বৃদ্ধ আমাকে তার প্রাসাদে স্বাগত জানালেন। আমি তাদের সবার সঙ্গে প্রাসাদাভ্যন্তরে প্রবেশ করলাম। আমার বিড়ম্বিত জীবনের কথা তাদের কাছে, বিশেষ করে বৃদ্ধের কাছে ব্যক্ত করলাম। আমার জন্য তারা নানাভাবে দুঃখ প্রকাশ করল। বৃদ্ধ আমার পিঠ চাপড়ে সান্তনা দিলেন।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবার পর বৃদ্ধটি আমাকে সঙ্গে করে প্রাসাদটি ঘুরে ঘুরে দেখালেন।
আমাকে সুউচ্চ একটি কারুকার্য শােভিত প্রাসাদে আসনে বসতে দেওয়া হল। বৃদ্ধ নিজে বসলেন মূল্যবান ভেলভেটে মােড়া গালিচায়। আর অন্যান্যরা নিজ নিজ কুর্সি দখল করল।
আমাকে বলা হ’ল চুপ করে বসুন কিছুক্ষণ। আমরা এখন আপনার জন্য প্রার্থনা করছি।
নিরবচ্ছিন্ন নীরবতার মধ্য দিয়ে কিছুটা সময় কেটে গেল। এক। সময় প্রার্থনা শেষ করে বৃদ্ধসহ সবাই আঁখি খুলে তাকালেন।।
তারপর বৃদ্ধের সঙ্গী দশজন আর আমি দামী সুরা ও মুখরােচক খাদ্যবস্তু দিয়ে ভােজন সারলাম।
বৃদ্ধের আতিথ্যে আমি মুগ্ধ হলাম। ভাবা যায়, নিজের হাতে আমার উচ্ছিষ্ট থালাবাসন সাফ করলেন! কিন্তু মুখে একটি কথাও বললেন না।
দশজন যুবকদের মধ্য থেকে এক সুদর্শন যুবক একটু রাগত স্বরেই বলল—‘প্রার্থনা জানাবার জন্য দরকারী সামগ্রী এখনও আনলে না?
বৃদ্ধ নীরবে পাশের ঘরে চলে গেলেন। মূল্যবান সার্টিনের কাপড়ে মােড়া দশ বারে দশটা পাত্র আর দশটি জ্বলন্ত চিরাগবাতি আর ধূপদানি এনে প্রত্যেক যুবকের সামনে একটা করে রাখলেন। আমার সামনে কিছুই রাখলেন না।
এবার যুবকেরা নিজ নিজ পাত্র হাতে নিয়ে ঢাকনা খুলে ফেল। দেখা গেল, চিরাগবাতির কালি, চুলার ছাই এবং কাজল মাখানাে প্রত্যেকটি পাত্র। পাত্রের ঢাকনা খুলেই সবাই ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লেগে গেল। আঁখির পানি ফেলতে ফেলতে কান্নাপ্লুত কণ্ঠে সবাই বলল —আমাদের কৃতকর্মের, আমাদের পাপের ফল। এবার তারা নিজ নিজ পাত্র থেকে চিরাগবাতির কালি আর ধূপের ছাই নিয়ে মুখে মেখে নিল। আর তর্জনী দিয়ে কাজল নিয়ে ডানচোখে পরল।
ভােরে কালি কাজল সব মুছে মূল্যবান পােশাক পরে কেতাদুরস্ত হয়ে গেল। কে বলবে, এরাই রাত্রে অবিশ্বাস্য কৌশলে প্রার্থনা করে সং সেজেছিল।
তাদের বিচিত্র সব কাজকর্ম সম্বন্ধে মনে অদম্য কৌতূহল জমা হলেও সতর্কতার সঙ্গে নিজেকে সংযত রাখতেই হ’ল। কারণ, বৃদ্ধ আমাকে বার বার বলে দিয়েছিলেন—কোন কথা বলবে না। সর্বদা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকবে।
অবিশ্বাস্য কাণ্ডকারখানার মধ্যে তিনদিন তিনরাত্রি কেটে গেল। রােজ তাদের একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে দেখলাম। নিজেকে আর সংযত রাখতে পারলাম না। একদিন বলেই ফেলাম—আচ্ছা, আপনাদের এসব আচরণের অর্থ কি ? যদিও এসব ব্যাপারে কোন প্রশ্ন করতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরকম অত্যাশ্চর্য সব কাণ্ড চোখের সামনে দেখে মুখবুজে থাকাও তাে যায় না। আমার নসীবে যা থাকে থাক, তবু আমাকে আজ শুনতেই হবে। আপনাদের সবার বাঁ-চোখ কানা কেন? আর রােজ রাত্রে আপনারা কেনই বা ছাই আর কাজল চোখে-মুখে মাখেন? এসবের অর্থ কি আমাকে বলতেই হবে।
–কেন এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ, জানতে চাইছ। নিষেধ করা সত্ত্বেও এসব প্রশ্ন করে নিজের পায়ে নিজেই কুড়ােল মারতে। উৎসাহী হচ্ছ কেন, বুঝছি না তাে!
-নসীবে যা আছে তা-তাে ঘটবেই। তবু আমি জানতে আগ্রহী। বলুন, এসব কাণ্ডকারখানার অর্থ কি?
‘শােন, তােমার কৌতূহলের জন্য তােমাকেও বাঁ-চোখটি কিন্তু খােয়াতে হবে,জেনে রেখাে। | ‘পরােয়া করি না। তবু আমাকে কৌতূহল মেটাতেই হবে। জীবনভর একটা জমাট বাঁধা কৌতূহল জগদ্দল পাথরের মত বুকে করে বয়ে নিয়ে বেড়নাের চেয়ে বাঁ-চোখটি যদি বিনিময়ে খােয়াতে হয় তবু ভাল। আপনারা বলুন, বরাত ঠুকে আমি সব শুনব। | ‘শােন তবে, আমরা নিজেদের দোষেই নিজ নিজ বাঁ চোখ। খুইয়েছি। তােমাকেও নিজেরই দোষে খােয়াতে হবে। আর মনে রেখাে, বাঁ চোখ খােয়াবার পর কিন্তু এখান থেকে তােমাকে। পাততাড়ি গােটাতে হবে। তােমার ঠাই এখানে হবার নয়। কারণ। এখানে মাত্র দশজনের জায়গা রয়েছে। এগারােজনকে ঠাঁই দেওয়া সম্ভব নয়। অতএব তােমার। | তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই সে বৃদ্ধ একটি ভেড়া নিয়ে ঘরে এলেন। জ্যান্ত ভেড়া। নিঃশব্দে একটি সুতীক্ষ ছুরির ফলা দিয়ে সেটাকে জবাই করলেন। ছালচামড়া মুক্ত করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। | ষণ্ডামার্কা বাঁচোখ কানা যুবকদের একজন বলশােন, তােমাকে ভেড়ার চামড়াটির মধ্যে পুরে প্রাসাদের ওপরে ফেলে রেখে দিয়ে আসা হবে। একটি রুম পাখি উড়ে এসে তােমাকে ছোঁ মেরে নিয়ে চলে যাবে। রুম পাখি অতিকায় এবং অমিত শক্তিধর। একটি হাতীকে ঠোটে নিয়ে উড়ে যাওয়াও তার পক্ষে সমস্যা নয়। কারণ, সে ভাববে তুমি সত্যিকারের একটা ভেড়া। যা-ই হােক তােমাকে নিয়ে গিয়ে বসবে একটি পাহাড়ের চূড়ায়। তােমার গােত দিয়ে উদরপূর্তির ইচ্ছায়ই রুম পাখিটি তােমাকে সেখানে নিয়ে যাবে। ভাল কথা, তােমাকে ভেড়ার চামড়ায় ভরার আগে একটা ছুরি দিয়ে দেয়া হবে। সুযােগ মত যাতে চামড়া কেটে তুমি নিজেকে মুক্ত করতে পার। ঘাবড়ে যেয়াে না। রুম পাখি মানুষের গােস্ত খায় না ।
ফলে চামড়ার ভেতর থেকে তােমাকে বেরিয়ে আসতে দেখে | পাখিটি হতাশ হয়ে শূন্যে ডানা মেলবে। তুমি এবার হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে হাজির হবে সুবিশাল এক | প্রাসাদে। কম করেও এ প্রাসাদের দশগুণ বড় তাে হবেই। মনে করতে পার তার প্রায় সবটুকুই সােনার পাত দিয়ে মােড়া। মনে হবে বুঝি খােয়াব দেখছ। এবার বলছি আসল কথা। এ-প্রাসাদেই তােমাকে বাঁ-চোখটি খােয়াতে হবে। আর কি ভাবে, তাইনা? আমরা দশজনে এক এক করে যেভাবে বাঁ-চোখ হারিয়েছি তােমাকেও খােয়াতে হবে একই রকম ভাবে। আর রােজ রাত্রে আমরা তার কাছে প্রার্থনা জানিয়ে মানসিক স্বস্তি লাভ করি। | যুবকটি যখন আমার কাছে তাদের কাণ্ডকারখানার কথা বলে আমার কৌতূহল নিবৃত্ত করছিল তখন অন্যান্যরা ভেড়ার চামড়াটাকে তৈরি করে নিতে লাগল। তার বক্তব্য শেষ হলে তারা আমার হাতে একটা ছুরির ফলা ধরিয়ে দিল। বল্ল-পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে চামড়া কেটে বেরনাের কাজে এটি ব্যবহার কোরাে। এবার আমাকে ভেড়ার চামড়ার থলিটাতে ভরে মুখ সেলাই করে দিল। কাধে করে প্রাসাদের মাথায় রেখে এল। তার একটু বাদেই বুঝলাম আমি মহাশূন্যে ভেসে চলেছি। প্রকাণ্ড একটি রুম পাখি আমাকে ঠোটে করে পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে রাখল। মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে ছুরির ফলা দিয়ে চামড়াটি কেটে বেরিয়ে এলাম। | রুমপাখিটি যাকে ভেড়া ভেবে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল তাকে মানুষের রূপে দেখে ভড়কে গেল। হতাশ হয়ে উড়ে পালাল। একটি পাখি কত বড় এবং কী ভয়ঙ্কর রূপবিশিষ্ট হতে পারে একে দেখার আগে আমার সে ধারণা তিলমাত্র ছিল না।
আর নয়। এবার আমি লম্বা লম্বা পায়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে। নামতে লাগলাম। সুবিশাল সে সুরম্য অট্টালিকার খোঁজ আমাকে পেতেই হবে। যুবক দশজন মধ্যাহ্ন ভােজনের আগে আমাকে যেসব কথা বলেছিল তা থেকে আমি মােটামুটি একটি ধারণা নিয়ে নিতে পেরেছিলাম। সেসব কথা অন্তরের অন্তঃস্থলে আঁকা রয়েছে। কিন্তু এখন বাস্তবে যা চোখের সামনে দেখছি তাতে করে মনে হচ্ছে তারা প্রাসাদটি সম্বন্ধে তেমন কিছুই বলে নি। | একের পর এক করে নিরানব্বইটি চন্দনকাঠের কারুকার্যমণ্ডিত অতিকায় দরজা ডিঙিয়ে প্রাসাদ অভ্যন্তরের বড়সড় একটি ঘরে এসে দাঁড়ালাম। আরে ব্বাস! কেবল হীরা, মানিক, পান্না, চুনি প্রভৃতি বহুমূল্য সব পাথরের ছড়াছড়ি। চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। | এবার হাঁটতে হাঁটতে একটি ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। দেখলাম, চল্লিশজন পরমা সুন্দরী যুবতী বিচিত্র কায়দায় বসে। প্রত্যেকেই যােড়শী, বা বড়জোর অষ্টাদশী। বেহেস্তের শ্রীপরীদের চেয়ে তারা কোন অংশে কম সুন্দরী নয়। আবার বিস্ময়কর ব্যাপার যে, তাদের একের সঙ্গে অন্যের দৈহিক সাদৃশ্য রয়েছে পুরােদস্তুর।।
রূপসী যুবতীরা আমাকে দেখামাত্র মুচকি হেসে সাদর সম্ভাষণ জানাল।
তারা সানন্দে আমাকে নিয়ে গিয়ে একটি উচ্চাসনে বসাল। আমি যেন তাদের মেহমান এরকম আদর-আপ্যায়ন করতে লাগল। আমার হুকুম তামিল করার জন্য তারা ব্যস্ত। আমার সামান্য সুখ উৎপাদন করাই যেন তাদের প্রথম ও প্রধান কাজ।।
তাদের মধ্যে দু’জন মখমলের তােয়ালে ও মৃদু গরম পানি নিয়ে | এল আমার পা ধুইয়ে দেবার জন্য। একজন বদনা থেকে পানি ঢেলে ঢেলে পা ধুইয়ে দিল আর দ্বিতীয়জন তােয়ালে দিয়ে যত্ন করে মুছিয়ে দিল। আহারান্তে রূপসী যুবতীরা আমাকে ঘিরে বসল। বিভিন্ন কৌশলে আমাকে আদর করতে লাগল। এক সময় আমার জীবনকথা শােনানাের জন্য অনুরােধ করল।। | রূপসী যুবতীরা এখানে যেন নির্বাসন-জীবন যাপন করছে। হাসি-খুশী-আনন্দ কাকে বলে তারা ভুলেই গেছে। আমাকে কাছে পেয়ে তারা যেন এই প্রথম হাসি-আনন্দের স্বাদ পেল। সবার মধ্যেই খুশীর আমেজ। অফুরন্ত হাসির ছােপ। তাদের সবার মুখে একটাই | কথা—‘তুমি আদর দিয়ে দিয়ে আমাদের মন-প্রাণ ভরিয়ে দাও।
ভালবেসে কাছে টেনে নাও। দাও অনাবিল আনন্দের স্বাদ ।
রূপসী যুবতীদের আব্দার আগ্রাহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমার জীবনের টুকরাে টুকরাে ঘটনা তাদের কাছে বাত করলাম। | সারাদিনের কর্মক্লান্ত সূর্যটি বিদায় নেবার জন্য উন্মুখ। তারই | রক্তিম ছােপ পড়েছে পশ্চিম-আকাশের গায়ে। এক সময় অদূরবর্তী ঝাকড়া গাছের আড়ালে গা-ঢাকা দিল রক্তিম সূর্যটি। প্রকৃতির কোলে শুরু হয়ে গেল আলাে-আধারির খেল। তারই কিছুক্ষণের মধ্যেই নেমে এল রাত্রির অন্ধকার।
প্রাসাদের কক্ষগুলােতে জ্বলে উঠল মােমবাতির আলাে। ঝলমলিয়ে উঠল বিশালায়তন প্রাসাদটি। | রূপসী যুবতীরা এবার উৎকৃষ্ট সরাবের পাত্র আর পেয়ালা নিয়ে এল। একের পর এক পেয়ালার সরাব উজাড় হতে লাগল।। তারপরই শুরু হ’ল বাজনার তালে তালে গান আর নাচ। আমি সরাবের পেয়ালা নিয়েই মজে রইলাম। তাদের নাচ পুরুষের হৃদয়ে। দোলা দেয়। রক্তে জাগায় মাতন।
রাত্রি ক্রমে গভীর হয়ে এল। নাচ-গান বন্ধ হ'ল। রূপসীদের একজন আমার একটি হাত জড়িয়ে ধরে মিষ্টি-মধুর স্বরে ব —রাত্রি তাে অনেক হ’লএবার শােবে চল। আমরা চল্লিশজন রয়েছি। এর মধ্যে যাকে তােমার মনে ধরে তাকেই আজ রাত্রের জন্য। বেছে নাও। সে-ই হবে তােমার আজ রাত্রের মহব্বতের বেগম, শয্যাসঙ্গিনী। সে-ও তােমাকে মহব্বত-ভালবাসায় ভরিয়ে দেবে। এ নিয়ে আমাদের কারাে মনেই কিছুমাত্রও ঈর্ষার উদয় হবে না। হবেই বা কেন? আমরা চল্লিশ বহিন তাে পালা করে তােমাকে আজ
হােক কাল তত পাবই। তােমাকে সঙ্গদানের মাধ্যমে নিজে সুখ পাব, আবার তােমাকেও সুখে-আনন্দে ভরপুর করে তুলব।
এ তাে এক মহাসমস্যার ব্যাপার রে বাবা, কী পরেই না পড়া। গেল। সে-মুহূর্তে আমার কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কাকে ফেলে কাকে নেই। সবাই একই রকম সুন্দরী। কারাে দেহে তিলমাত্রও খুঁত নেই।
মাথা খাটিয়ে উপায় একটি বের করে ফেললাম বটে। চোখ বুজে আচমকা একজনের হাত চেপে ধরলাম। চোখ খুলতেই | দেখতে পেলাম এক রূপসী-যােড়শীর হাত ধরে আমি দাঁড়িয়ে। তার চোখে-মুখে যুদ্ধ জয়ের অপার আনন্দ।
আমাকে টু-শব্দটা পর্যন্ত করার সুযােগ না দিয়ে সে আমাকে হাত ধরে নিয়ে গেল পাশে এক সজ্জিত ঘরে। পালঙ্কের ওপর মখমলের। চাদর পাতা। সাগরের ফেনার মত নরম বিছানায় নিয়ে গিয়ে বসাল আমাকে। আমাকে অমৃততুল্য মধু পান করাল নিরবচ্ছিন্নভাবে। চল্লিশবার। চাওয়া আর পাওয়া, দেওয়া আর নেওয়ার মধ্যে দিয়ে সুখের রাত্রিটি যেন চোখের পলকে কেটে গেল।
প্রতিটি রাত্রি আমার কাছে নিত্য নতুন আনন্দের ফোয়ারা নিয়ে হাজির হতে লাগল। চল্লিশটি বহিন এক এক করে আমাকে অমৃত সাগর মথিত করে সুখ দান করতে লাগল। নারীর সবথেকে মূল্যবান সম্পদ সতীত্ব তা-ই স্বেচ্ছায়, হাসি আর আনন্দের মধ্য দিয়ে আমার কাছে নিবেদন করল।
চল্লিশটি সুখের রাত্রি অতিবাহিত হয়ে গেলে রূপসী যুবতীদের মখে নেমে এল বিষাদের কালাে ছায়া। আর এখানে নয়। তাদের এবার বিদায় দিতেই হবে। তারা কেঁদে কেটে বলতে লাগল
–আমাদের নসীবের ফের! নইলে অতীতে এক সুপুরুষ পেয়েও হারিয়ে ছিলাম। তারপরই পেলাম তােমাকে। তা-ও আজ ছেড়ে যেতে হচ্ছে। তারা সবাই আমাদের মন সুখে-আনন্দে ভরিয়ে তুলেছিল খুবই সত্য বটে। কিন্তু আজ তুমি যে-আনন্দ দিলে তা | সত্যই অতুলনীয়, এক অনাস্বাদিত আনন্দ। তােমার পৌরুষের তুলনা একমাত্র সিংহের পৌরুষের সঙ্গেই তুলনীয়। সারাটা বছর আমরা প্রেম জ্বালায় জর্জরিত হই। প্ৰেমজ্বালায় জর্জরিত দেহ-মন নিয়ে পথ চেয়ে বসে থাকি কবে আমাদের নাগর এসে দরজায় দাঁড়াবে। বুকে টেনে নেবে। সােহাগে-আদরে মন-প্রাণ ভরিয়ে.........To be continued (চলতে থাকবে )।

0 Comments