আরব্য রজনী পার্ট ১১ ( Part 11)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
হিংস্র দৈত্যটা হাতের খুন জড়ানাে তরবারিটা প্রচণ্ড বিদ্বেষে ছুঁড়ে ফেলে দিল। এবার আমার দিকে তাকিয়ে, হাড়িতে মুখ ঢুকিয়ে কথা বলছে এরকম গলায় বলল শােন মানুষের বাচ্চা, আমাদের দৈত্য-সমাজের নিয়ম ব্যাভিচারিণীর একমাত্র শাস্তি জান নেওয়া মৃত্যু। হতচ্ছাড়ি লােচ্চার মাগীটাকে বিয়ের রাতে চুরি করে এখানে লুকিয়ে রেখেছিলাম। বিশ সাল সে আমাকে সঙ্গ দিল। আমি দিলাম দেহের সুখ। কিন্তু সে সুখ তার দিলটাকে ভরিয়ে দিতে পারল না। আমি বিশ বিশটা সাল ধরে যা পারি নি, একদিনেই তুমি তা পেরে গেলে। তার দিলটাকে ধরতে পারলে। আমি অবাক মানছি বটে। কিন্তু নিজের চোখে তাে কিছু দেখি নি। তােমাদের লােঞ্চামি তাে আর চোখের সামনে দেখতে পাই নি। কিন্তু আমার মন কইছে কি, আমার ধারণাই ঠিক বটে। কিন্তু শুধুমাত্র ধারণার বশে তােমার জান আমি নিতে চাই না। তবে তােমাকে একেবারে রেহাইও দেব না। আমার যাদুবলে তােমাকে একটা জানােয়ার বানিয়ে দেব। তুমি নিজেই বল, কোন্ জানােয়ার তুমি হতে চাও?'

নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভাল। ভাবলাম, তবু জানটা তাে বাঁচবে। বাঘ, সিংহ, গাধা, খচ্চর-কোনটা হলে যে আমার সুবিধা হবে বুঝতে পারলাম না।
আমাকে ইতস্ততঃ করতে দেখে শয়তান দৈত্যটা শোঁ শোঁ শব্দে বাতাসে ভর দিয়ে ভেসে গেল। পাহাড় থেকে এক মুঠো ধূলাে নিয়ে ফিরে এল। বিড়বিড় করে কি যেন সব বলে সেগুলাে দিল আমার ওপর ছড়িয়ে। ব্যস, মুহূর্তে আমার বুকের তীব্র আলােড়ন শুরু হয়ে গেল। আমি মনুষ্যদেহ ছেড়ে বানরে পরিণত হয়ে গেলাম। ছােটখাটো দেহ, চারটে পা আর বড় বড় লােমে আমার সর্বাঙ্গ ছেয়ে গেল। নচ্ছার দৈত্যটা বিশ্রি সুরে হেসে অদৃশ্য হয়ে গেল।
হায় আমার নসীব! অগাধ বিদ্যা, বুদ্ধি আর জ্ঞান নিয়ে আমি বানর জীবন যাপন করতে লাগলাম। একেই বলে নসীবের ফের। মনের দুঃখে সমুদ্রের তীরে গাছের ডালে ডালে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম।
একদিন গাছের ডালে বসে লম্বা লম্বা আঙুলগুলাে দিয়ে গা  চুলকাচ্ছি। এমন সময় একটা জাহাজকে তীরের কাছ দিয়ে যেতে দেখে তার মাস্তুলে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। এক সময় নেমে গেলাম ডেকের ওপর। আমাকে দেখেই জাহাজের নাবিক আর লস্কর সবাই লাঠি নিয়ে তেড়ে এল। একজন তরবারি উঁচিয়ে ধরল। আমি  কৌশলে তার হাত থেকে সেটা ছিনিয়ে নিলাম। লােকগুলাে হঠাৎ ঘাবড়ে গেল। আমি গালে হাত দিয়ে কাঁদতে লেগে গেলাম। তারা বুঝল, আমি আশ্রয়প্রার্থী। | জাহাজের ক্যাপ্টেন আমার মনের কথা বুঝলেন। আমি যে তাদের কোন ক্ষতি করতে চাইছি না, আশ্রয় ভিক্ষা করছি বুঝতে পারলেন। দোয়া করলেন। আমাকে ডেকে নিজের কেবিনে নিয়ে গেলেন। আমাকে তিনি যা যা বললেন, বুঝতে পারলাম সবই। কিন্তু মুখে প্রকাশ করতে পারলাম না। কিচির মিচির শব্দ করে, ঘাড় কাৎ করে, ইঙ্গিতে সাধ্যমত তার কথার জবাব দিলাম।

ক্যাপ্টেনের অনুগ্রহে আমি তার ব্যক্তিগত নােকরের পদে নিযুক্ত হলাম। আমার কাজকর্মে কোন খুঁত রাখতাম না। ক্যাপ্টেন তাে মহাখুশি।
পঞ্চাশ দিন এক নাগাড়ে জাহাজ চালিয়ে এক বন্দরে জাহাজ নােঙর করলেন।
দেশের সুলতানের আমিররা এসে ক্যাপ্টেনকে কুর্নিশ করল। খাতির করল খুবই। তারা জানাল, দেশের উজির কিছুদিন হ’ল বেহেস্তে যাত্রা করেছেন। দু-চারদিন রােগভােগেই মারা গেছেন। নানা বিদ্যায় বিশারদ একজন উজিরের খোঁজ করেছেন সুলতান। তেমন কাউকেই পাচ্ছেন না। জাহাজে কোন সর্বগুণান্বিত ব্যক্তি থাকলে তিনি সুলতানের কাছে হাজির হতে পারেন।
কথা বলতে বলতে আমির - ওমরাহরা একটা জড়ানাে কাগজ খুলে সুলতানের ইচ্ছার কথা ক্যাপ্টেনকে দেখালেন। ব্যস, জাহাজের ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে প্রত্যেক কর্মী আমার নাম লিখে তাতে সানন্দে স্বাক্ষর দান করলেন।
সুলতানের আমির ওমরাহরা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। আমার যােগ্যতার পরিচয় দিয়ে আমি যাতে তাদের দ্বিধা দূর করতে পারি তার জন্য তাড়াতাড়ি দোয়াত কলম এনে আমার সামনে রাখলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন।

 আমি সুন্দর হস্তাক্ষরে কিছু শায়ের লিখে ফেলাম। আমার পাণ্ডিত্যে তারা মুগ্ধ হ’ল। বিস্ময়বােধ করল যার পর নাই। আমাকে নিয়ে হাজির করল সুলতানের সামনে। সুলতান আমার পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হলেন। চকমকা পােশাক পরতে দিলেন। আমাকে উজির পদে বহাল করলেন। আর জাহাজের ক্যাপ্টেনকে প্রচুর মােহর ইনাম স্বরূপ পাঠিয়ে দিলেন। আমি ভূমিতে দু’হাত ছুঁইয়ে সুলতানকে সালাম জানালাম।

আমার জন্য সুন্দর একটা কুরশি বন্দোবস্ত করা হ'ল। দেওয়া হ’ল কাগজ-কলম। আমি শায়ের লিখে লিখে সুলতানের হাতে তুলে দিতে লাগলাম। সুলতান তাে পড়ে মহাখুশি। স্তম্ভিতও কম হন নি।

আমার অগাধ পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানগম্যির কথা সুলতান তার আদরের লেড়কীকে না জানানাে পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। তাকে ডাকালেন। সে ঘরে ঢুকেই তাড়াতাড়ি ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। রাগে ফোস ফোস করতে করতে বলল – আব্বাজান, এক বিদেশীর সামনে আমাকে আচমকা হাজির করিয়ে তুমি ঠিক কাজ কর নি। তুমি যাকে বানর দেখছ, তিনি প্রকৃতপক্ষে বানর নন। এক বাদশাহের লেড়কা। ফার দেশের বাদশাহ। তার আব্বাজানের নাম বাদশাহ ইফতি মারাস। আফ্রিদি দৈত্য জারসিজ যাদুবলে একে বানরে পরিণত করেছে। এর জ্ঞান বুদ্ধির তুলনা একমাত্র সাগরের সঙ্গেই চলতে পারে।  নসীবের ফেরে আজ এ হেয় জীবন যাপন করছে, লােকের করুণার পাত্র হয়ে দিন গুজরান করছে। সুলতান সব শুনে আমার দিকে জিজ্ঞাস দষ্টিতে আমি ঘাড় কাৎ করে জানালাম, যা শুনেছেন সবই সত্যি। আমার সম্বিত জীবনের কিসসা শুনে সুলতান তাে একেবারে থ বনে গেলেন। তিনি এবার লেড়কিকে জিজ্ঞেস করলেন -' বেটি এত সব কথা তুমি কি করে জানলে, বল তাে?”

‘যাদুবলে। আমার শৈশবে আমাকে দেখভাল করার জন্য যে বুড়ি পরিচারিকাকে রেখে দিয়েছিলে তিনি যাদুবিদ্যা খুবই ভাল জানতেন। আমাকে তার বিদ্যার কিছু কিছু দান করেছিলেন। তারপর  থেকে চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি সবার অলক্ষ্যে। আব্বাজান, তুমি মন করলে, আমি এক লহমায় তােমার এ সুবিশাল মহলটাকে অদৃশ্য করে দিতে পারি। আবার তােমার নগরটাকে বানিয়ে দিতে পারি বিশাল এক মরুভূমি। এক গণ্ডুষ পানি কেবল দরকার। ব্যস, যা খুশি আমি করে ফেলতে পারি।

–‘ভারি তাজ্জব ব্যাপার দেখছি! তােমার যাদুবিদ্যার কথা বিন্দু-বিসর্গও তাে আমি জানতাম না! তবে এক কাজ কর, যাদুবিদ্যা প্রয়ােগ করে তুমি এর আসল দেহ ফিরিয়ে দাও। আদমির দেহ দান কর। তার মত জ্ঞানী-গুণী তামাম দুনিয়ায় খুব বেশী আছে বলে মনে হয় না। আমি দরবারে তাকে পাকাপাকিভাবে উজির করে রাখতে চাচ্ছি।

সুলতানের লেড়কি রাজি হ’ল। আমার বুকটা খুশি-আনন্দে ভরপুর হয়ে গেল।

এমন সময় প্রাসাদের বাইরে, বাগিচায় পাখিদের ছুটোছুটি আর কিচির - মিচির শুরু হয়ে গেল। বেগম শাহরাজাদ তার কিস্সা বন্ধ করলেন।

                             চতুর্দশ রজনী

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগমের কাছে ফিরে এলেন।

বেগম শাহরাজাদ তাঁর কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন -শুনুন জাঁহাপনা, বড় মেয়েটার কাছে দ্বিতীয় কালান্দার নিজের জীবন কথার অবশিষ্ট অংশ বলতে গিয়ে বললেন—“শাহজাদী একটা ছুরি এনে তার ফলা দিয়ে মেঝেতে হিব্রুভাষায় কি যেন লিখল। এবার ছুরির ফলাটা দিয়েই তার চারদিক একটা বৃত্ত অঙ্কন করল। তারপর অবােধ্য ভাষায় অনুচ্চ কণ্ঠে কি সব বলতে লাগল। ব্যস, দেখতে দেখতে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। ভয়ানক দুর্যোগ। সারা বাড়িটা দুলতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে অন্ধকার কেটে গিয়ে স্বাভাবিকতা ফিরে এল। সবার চোখের সামনে দেখা দিল ভয়াল  আফ্রিদি দৈত্য। নাম তার জারসিজ। শাহজাদী নির্বিকার, আর আমরা

সবাই ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। | আফ্রিদি জারসিজ কর্কশ স্বরে গর্জে উঠল –“তােমার কাণ্ড আমাকে অবাক করেছে। যে - বিদ্যা আয়ত্ব করেছিলে তাকে তুমি ধরে রাখতে সক্ষম হলে না। আমাদের মধ্যে শর্ত হয়েছিল, কারাে কাজে আমরা প্রতিবন্ধকতা করব না, ক্ষমতাও জাহির করব না কারাে বিরুদ্ধে। তুমিই কথা রাখলে না। এর জন্য উচিত শিক্ষা তােমাকে পেতেই হবে।

কথা বলতে বলতে আফ্রিদি দৈত্য জারসিজ এক অতিকায় হিংস্র সিংহের রূপ পরিগ্রহ করল, শুরু করে দিল তীব্র গর্জন। সে কী গর্জন! আমার বুকের ভেতরে কলিজাটা তাে দাপাদাপি শুরু করে দিল।

শাহজাদীর জন্য আমি কম ভাবিত হইনি। ভাবলাম হিংস্র জানােয়ারটা বুঝি এক্ষুণি তার হাড়-মাস চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। কিন্তু সে - ও কমতি কিসে? মুহুর্তে নিজের মাথার একটা চুল ছিড়ে নিয়ে বারকয়েক অনুচ্চকণ্ঠে কি যেন বলল। হাতের চুলটা সুতীক্ষ্ণ একটা তরবারিতে পরিণত হয়ে গেল। এক কোপে সিংহের মুণ্ডটাকে ধড় থেকে নামিয়ে দিল। এবার ঘটল আরও অত্যাশ্চর্য এক ঘটনা। সিংহের কাটা মুণ্ডুটা বিশাল একটা কাঁকড়া বিছের রূপ ধারণ করল। শাহজাদীও যাদুর খেল দেখাতে লাগল। ইয়া বড় একটা বিষধর কালনাগিনীর রূপ পরিগ্রহ করে ফেলল। শুরু হ’ল কাকড়া বিছে আর কালনাগিনীর তুমুল লড়াই। বেগতিক দেখে কাকড়া বিচ্ছেটা শকুনিতে পরিণত হ'ল। আর কালনাগিনীটা ঈগলের রূপ  পরিগ্রহ করল। আবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শুরু হল। এতেও আফ্রিদি সুবিধা করতে পারল না। শকুনি বনবিড়ালে পরিণত হ'ল | এ আর ঈগলটা নেকড়ে বাঘের রূপ ধারণ করল। এবার লড়াই করতে  গিয়ে বনবিড়ালটা বেশ বেকায়দায় পড়ে গেল। উপায়ান্তর না দেখে বিড়ালটা ইয়া পেল্লাই একটা ডালিমের রূপ ধরে প্রাচীরের ওপর চলে গেল। নেকড়েটা লাফিয়ে প্রাচীরের ওপরে উঠতেই ডালিমটা শূন্যে উঠে যেতে চেষ্টা করল। পারল না, প্রাসাদের কার্নিশের গায়ে ধাক্কা খেয়ে গুড়াে গুড়াে হয়ে গেল। আর নেকড়ে বাঘটা ? মুহূর্তে মুরগীর রূপ ধারণ করে ডালিমের দানাগুলাে ঠোট দিয়ে ঠুকরে খেতে লাগল। একটামাত্র দানা বাদ দিয়ে বাকি সবগুলিই উদরস্থ করল। কিন্তু শেষ দানাটা মেঝের একটা ফাটলে সিঁধিয়ে গেল। ঠোট দিয়ে বের করার চেষ্টা করল। পারল না। আমাদের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কি যেন বলতে চাইল। তার মনের কথা আমরা কেউই অনুধাবন করতে পারলাম না। পরে অবশ্য অনুমান করেছিলাম, শেষ দানাটা খাওয়ার জন্য পাথরটাকে আমাদের ভেঙে দিতে বলছিল। আর তারই ফলে আফ্রিদি দৈত্য জারসিজকে পুরােপুরি হজম করে ফেলতে পারত। কিন্তু নসীবের ফের কে রুখবে।

দীর্ঘ নিরলস চেষ্টার পর পাথরের ফাটল থেকে যাও ডালিমের দানাটাকে বের করে আনল তাও সেটা মুরগীটার ঠোট থেকে চৌবাচ্চার জলে ছিটকে পড়ল। ব্যস, সেটা সঙ্গে সঙ্গে একটা মাছে পরিণত হয়ে গেল। তবুও ছাড়া নেই। মুরগীটা এবার পানকৌড়ীতে পরিণত হয়ে মাছটাকে ধরার চেষ্টা করতে লাগল। আবার চন্দ্র তুমুল লড়াই। প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে পানকৌড়ীটার আর দেখা মিলল না। জল থেকে উঠে এল সেই অতিকায় আফ্রিদি দৈত্য জারসিজ। কিন্তু তার সেই বীভৎস রূপ আর নেই। জলন্ত অঙ্গার।

ধিকধিক করে অঙ্গার জ্বলছে। আর নাক, মুখ আর চোখ দিয়ে গল গল করে ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। | আমরা সবাই নীরবে চোখ চাওয়া-চায়ি করতে লাগলাম। সবার মনেই একই জিজ্ঞাসা, শাহজাদীর কি হ'ল? আরও কয়েক মুহূর্ত পরে সে ধীরে ধীরে জল থেকে উঠে এল সেই রূপ। রূপসী কুমারী যুবতীর সে রূপ নিয়ে সে জল থেকে উঠে এল। আগুনে তারা উভয়েই আমাদের দিকে এগােতে লাগল। ভয়ে আমাদের কলিজা চিপসে গেল। কোথায় পালাব? পথ যে বন্ধ। কয়েক পা এগিয়েই আফ্রিদি দৈত্য জারসিজ ধড়াস্ করে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে শাহজাদী তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। আবার শুরু হ’ল তুমুল লড়াই। অতর্কিতে এক টুকরাে অঙ্গার ছুটে এসে আমার চোখটাকে কানা করে দিল। আর একটা টুকরাে এসে লাগল সুলতানের মুখে। কিছুটা অংশ পুড়ে গেল। কিছুক্ষণ বাদে । একটা অঙ্গারের টুকরাে এসে সুলতানের হারেমের খােজার বুকে আঘাত করল। সে মারা গেল।

এক সময় বেকায়দায় পড়ে আফ্রিদি দৈত্য জারসিজ বুকফাটা আর্তনাদ করে আল্লাতাল্লার কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইতে লাগল। তারপরই তার অতিকায় দেহটা বিকট আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অঙ্গারের তেজ ক্রমে স্তিমিত হতে লাগল। তারপরই তার দেহটা ভষ্মে পরিণত হয়ে গেল।

শাহজাদী এবার গণ্ডুষ ভরে পানি নিয়ে বিড় বিড় করে মন্ত্র

আওড়ে আমার গায়ে ছিটিয়ে দিয়ে বলল – তুমি তােমার আগের রূপ ধারণ কর।' ব্যস, আমি বানর রূপ থেকে মনুষ্যরূপ ফিরে পেলাম। কিন্তু আমার বরবাদ হয়ে যাওয়া চোখটা ফিরে পেলাম না। আবার সুলতানের মুখেও রয়ে গেল পােড়া দাগ।

শাহজাদী এবার সুলতানের দিকে সামান্য এগিয়ে এসে | বিষাদপূর্ণ কন্ঠে বল্ল – “আব্বাজী, এবার আমারও বিদায় নেবার  সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমি যদি ডালিমের শেষ দানাটা উদরস্থ করতে পারতাম তবে আর কোন চিন্তাই থাকত না। আফ্রিদি দৈত্য জারসিজ - এর মৃত্যু ঘটত। হয়ত খােদাতাল্লার এটাই মর্জি ছিল। আমার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে আফ্রিদি সুবিধা করতে না পেরে  শেষ অস্ত্রটাকে আঁকড়ে ধরল। অগ্নিকুণ্ডের দরজা খুলে তাতে  ঝাপিয়ে পড়ল। আমি চাইনি সে আত্মঘাতী হােক। তবে তাে তার আংশিক হলেও জয় হবে। তাই আমিও তার পিছন পিছন অগ্নিকুণ্ডে ঝাপ দিলাম। আল্লার মর্জিই বটে। নইলে সে আত্মহত্যা করলে তাে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারতাম। আগুনে ঝাপ দিতে যাব কেন? কথা বলতে বলতে শাহজাদা মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়ল। মূহর্তে। নিস্তেজ হয়ে গেল তার রূপ লাবণ্য আর আঠারাে বছরের যৌবনভরা শরীরটা। লেড়কীর আকস্মিক মৃত্যুতে সুলতান কেঁদে আকুল হলেন। দু’ চোখের কোল বেয়ে হরদম পানি গড়াতে লাগল। নিজের কাজের জন্য বহুভাবে অনুশােচনা প্রকাশ করতে লাগলেন। কেন সে বানরকে মানুষের রূপ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আকুল হয়েছিলেন সে কথাই বুক চাপড়ে বার বার বলতে লাগলেন।

সুলতানের দরবারে, প্রাসাদে আর প্রজাদের ঘরে ঘরে নেমে এল শােকের ছায়া। কারাে মনে সুখ নেই, নেই এতটুকু শান্তি।

সুলতানের এবার আমার ওপর নজর পড়ল। তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন – 'বাছা, তুমি আসাতেই আমার বুকের একটা পাঁজর খুলে গেল। যদিও আমার নসীবেরই ফের এটা, তবু তােমাকে বলছি, এ দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও তুমি বরং চলে যাও। আমার লেড়কী তাে তার নিজের জান দিয়ে তােমাকে আফ্রিদি দৈত্য জারসিজ-এর হাত থেকে রেহাই দিয়ে, ফিরিয়ে দিয়েছে তােমার মনুষ্যরূপ। ব্যস, আর নয় তুমি আমার রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র চলে যাও।' দ্বিতীয় কালান্দার এবার বড় মেয়েটার দিকে ফিরে, চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল  – বিশ্বাস করুন, আমার তখন নিজের ওপর খুব রাগ হল। আমার জন্য এমন তরতাজা প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর একটা লেড়কী অকালে জান দিল! খােদাতাল্লার দরবারে এখন কি গুণাই না আমি করেছি! অনুশােচনার জ্বালায় দগ্ধ হতে হতে আমি সুলতানের প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। এবার শুরু হ’ল উদ্দেশ্যহীনভাবে পথ চলা। এভাবে এক সময় হাজির হলাম এ - বাগদাদ নগরে।

বাগদাদে নাকি কারাে কোনরকম দুঃখ নেই। দেশের ছােট -বড় প্রতিটা মানুষের জন্য এখানে যাবতীয় সুখের অঢেল ব্যবস্থা রয়েছে। এক সময় ফকিরের বেশে ক্লান্ত অবসন্ন দেহে বাগদাদের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এখানে এলাম। দাড়ি - গোঁফ কামিয়ে ইতিমধ্যেই আমি বিলকুল কালান্দর ফকির বনে গিয়েছি। এখান থেকে অদূরবর্তী। মােড়ের কাছে এসে আমারই মত আর এক কালান্দার ফকিরের সঙ্গে মােলাকাৎ হ'ল। তার দাড়ি - গোঁফ কামানাে, বাঁ চোখ কানা। এবার তৃতীয় কালান্দার ফকিরকে দেখিয়ে বল – একটু বাদে ইনি এসে আমাদের সঙ্গে মিললেন। তৃতীয় কালান্দার। তারও দাড়ি - গোঁফ কামানাে, আর বাঁ চোখ কানা।

আমরা তিন কালান্দার মিলে পথ চলতে লাগলাম। এখানে এসে রাত্রের জন্য আশ্রয়ের খোঁজ করতে লাগলাম। সামনে এ - বাড়িটা দেখতে পেয়ে কড়া নাড়লাম।

দ্বিতীয় কালান্দার ফকির বলল –‘আমার জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা তাে শুনলেনই। আপনারা এবার যদি চান তৃতীয়। কালান্দার ফকিরের জীবনের ঘটনাবলী শুনতে পারেন।


                                      তৃতীয় কালান্দার ফকিরের কিত্সা 

দ্বিতীয় কালান্দার ফকির তার জীবনের ঘটনাবলী পেশ করার মাধ্যমে তার বাঁ চোখ হারানাে এবং দাড়ি-গোঁফ কামানাের কারণ। বর্ণনা করল।

এবার বড় মেয়েটার নির্দেশে তৃতীয় কালান্দার ফকির তার জীবনের ঘটনাবলীর কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলল – শুনুন, আমার বিড়ম্বিত জীবনের কিসসা। প্রথম আর দ্বিতীয় কালান্দার ফকিরের কিস্সা যেমন রহস্য আর রােমাঞ্চে ভরপুর আমার জীবনে তেমনি কোন চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে নি যা শুনিয়ে আপনাদের তৃপ্ত করতে পারব। কিন্তু আমি যা কিছু বলব তার এক শ’ ভাগই সত্য, তিলমাত্র খাদও তার মধ্যে নেই।

প্রথমে আমার বাঁ চোখ হারানাের কথা আপনাদের শােনাচ্ছি। আমি কিন্তু সম্পূর্ণ নিজের দোষেই তা হারিয়েছিলাম। আমার আব্বাজী ছিলেন এক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বাদশাহ। পরবর্তীকালে আমি উত্তরাধিকার সূত্রে আব্বাজীর মসনদে বসেছিলাম। আমার কাছ থেকে সুবিচার পেয়ে প্রজারা সুখেই দিনাতিপাত করত।

বাল্য ও কৈশােরের সে দুরন্তপনার দিনগুলাে থেকেই আমার সমুদ্র যাত্রার প্রতি বিশেষ ঝোক ছিল। এর কারণ হয়ত এ-ই ছিল যে, আমাদের রাজ্যের রাজধানী - নগরটা ছিল সাগরের লাগােয়া। সমুদ্রের অভ্যন্তরস্থ নিকট ও দূরবর্তী দ্বীপগুলাে আমাদের

অধিকারভুক্ত ছিল। আমি মাঝে-মধ্যেই যুদ্ধ-জাহাজ নিয়ে মাসখানেক ধরে চক্কর মেরে বেড়াতাম সমুদ্রের বুকে, দ্বীপে দ্বীপে। আমি একবার জাহাজ নিয়ে আমার অধিকৃত দ্বীপগুলাে পরিদর্শনে বেরিয়ে ভয়ঙ্কর সমুদ্র ঝড়ের মুখখামুখি হলাম। সারাদিন, সারারাত্রি ধরে চলল ঝড়ের তাণ্ডব আর সমুদ্রের ফেঁসফোসানি।

সকাল হলে দেখি, আমার জাহাজগুলাে ছােট্ট একটা দ্বীপের চড়ায় আটকা পড়ে গেছে। অসহায় বােধ করলাম। | আমি জাহাজগুলােকে নিয়ে মহাফাপরে পড়লাম। সাগর তখন একেবারে শান্ত-সৌম্য। কেউ ধারণাও করতে পারবে না যে গতরাত্রি পর্যন্ত সাগর প্রলয়ঙ্কর ছিল। | দুইদিন আটকা পড়ে থাকার পর নিতান্ত অনন্যোপায় হয়েই জাহাজে পাল তুলে দিয়ে আবার সাগরে ভাসলাম। নিরবচ্ছিন্নভাবে কুড়িদিন পাল তােলা জাহাজে কাটালাম। কিন্তু হারাণাে পথের হদিস তবু পেলাম না। সাগরে ভাসছি তাে ভেসেই চলেছি। কোথায় চলেছি, কোনদিকে যে চলেছি কিছুই জানা নেই।

ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেস করেও কোন সদুত্তর পাওয়া গেল না। হতাশ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল -হুজুর, সাগরের এদিকে আমি এর আগে আর কোনদিন আসি নি। এটা একেবারেই অজানা - অচেনা অঞ্চল।'

মনটা বিষিয়ে উঠল। উপায়ান্তর না দেখে সাগরের পানিতে একজন ডুবুরিকে নামিয়ে দিলাম। কিছু সময় বাদে সে ভুস করে ভেসে উঠল। সাতরে জাহাজের কাছে এল। দডির মই বেয়ে উঠে এল জাহাজে। সে বলল - জাঁহাপনা, সাগরের ওদিকে অতিকায়  সব মাছ সাতরে বেড়াচ্ছে দেখলাম। আর দেখলাম একটা পাহাড় মাথা উচিয়ে দাড়িয়ে। তার কিছু অংশ কালাে আর অবশিষ্টাংশ সাদা।' ডুবুরির কথা শেষ হতে না হতেই ক্যাপ্টেন হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কাদতে কাদতে বলল—“আর নিস্তার নেই জাঁহাপনা। ডুবুরি যে-পাহাড়টার খোঁজ নিয়ে এসেছে সেটা সাধারণ পাহাড় নয়। তার গায়ে গেঁথে দেওয়া আছে সহস্রাধিক চুম্বকের বর্শা। আমাদের জাহাজ তার দিকে এগােতে থাকলে তীব্র আকর্ষণে কাছে টেনে নেবে। ব্যস, শেষ পর্যন্ত জাহাজ হুমড়ি খেয়ে গিয়ে পড়বে তার গায়ে। ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে যাবে। আমাদের পরমায়ু ফুরিয়ে এসেছে। এখন আল্লাতাল্লার নাম করা ছাড়া উপায় নেই। সকাল। হলেই আমরা চুম্বক-পাহাড়ের দৌলতে জান খােয়াব। আজ পর্যন্ত যত নাবিক এপথে এসেছে কেউই জান নিয়ে ফিরতে পারে নি। আমাদেরও ফিরে যাওয়ার ভরসা নেই।

চোখের পানি মুছতে মুছতে ক্যাপ্টেন এবার বলল—জাঁহাপনা। পাহাড়ের মাথায় একটা গম্বুজ রয়েছে। তার মাথায় এক ব্রোঞ্জের তৈরি ঘােড়সওয়ার। তার মাথায় শিরস্ত্রাণ, বুকে বর্ম। ডান হাতে তরবারি আর বাঁ হাতে ঢাল। যতদিন ওই ব্রোঞ্জের মূর্তিটা পাহাড়ের চুড়ায় থাকবে ততদিন আর কারাে রেহাই নেই। তবে কোনক্রমে তাকে ওখান থেকে ফেলে দিতে পারলে আর কোন বিপদাশঙ্কা থাকবে না।

আমি দু’বাহু ওপরে তুলে বললাম—‘হায় খােদা, এমনকি গােস্তাকি করেছি তােমার কাছে যার জন্য এমন ফাঁদে ফেলে দিলে? অথৈ সাগরে জান দিতে হবে!’ নিরবচ্ছিন্ন হতাশা আর হাহাকারের মধ্য দিয়ে রাত্রি কাটালাম। ভােরের আলাে ফুটে উঠল সাগরে। 

ক্যাপ্টেন আমার কাছে ছুটে এসে বলল—‘জাহাপনা, আমরা চুম্বক-পাহাড়ের কাছাকাছি পৌছে গেছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের জাহাজগুলাে পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে গুড়িয়ে যাবে। এখন খােদাতাল্লার নাম করুন। পরপারে যাবার জন্য মনকে শক্ত করে বাঁধুন।

ক্যাপ্টেনের কথাই বাস্তবে পরিণত হল। বিকট শব্দ করে জাহাজ গিয়ে আছড়ে পড়ল পাহাড়ের গায়ে। মুহুর্তে ভেঙেচুরে একসার হয়ে গেল। উত্তাল-উদ্দাম সাগরের বুকে পড়ে আমরা কে যে কোথায় ছিটকে পড়লাম তার হদিস মিলল না।।

ঢেউয়ের সঙ্গে মিতালি করে আমি হারা উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম। এত কষ্ট করেও আমি কিন্তু হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিইনি। দাঁতে দাঁত চেপে নিরবচ্ছিন্ন লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলাম। সে আর কতক্ষণ? আমি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললাম। কতক্ষণ যে অচৈতন্য অবস্থায় কাটিয়েছিলাম তা আমার নিজেরই জানা ছিল না। সংজ্ঞা ফিরলে দেখলাম, এক বালির চড়ায় আমি চিৎপটাং হয়ে পড়ে। আল্লাহর ওপর বিশ্বাস আরও অনেকাংশে বেড়ে গেল আমার।

সামনেই অভিশপ্ত পাহাড়টা মাথা উঁচিয়ে দাড়িয়ে। বালির চড়া ছেড়ে পাহাড়ের কাছে গেলাম। সামনেই একটা পথ নজরে পড়ল। এঁকেবেঁকে পাহাড়ের চূড়া পর্যন্ত উঠে গেছে।

খােদার নাম নিয়ে আঁকাবাঁকা পথটা ধরে পাহাড়ে উঠতে লাগলাম। মনে আমার অদম্য উৎসাহ-উদ্দীপনা।

বেগম শাহরাজাদ দেখলেন ভােরের আলাে একটু একটু করে উঁকি দিতে শুরু করেছে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

                                        পঞ্চদশ রজনী। 

 যথা সময়ে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে এলেন।

বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করলেন—তৃতীয় কালান্দার ফকির তার জীবনের ঘটনাবলী বলে চলল—“খােদার নাম নিয়ে আমি যখন পাহাড়ের খাড়া পথ বেয়ে ধীর-মন্থর গতিতে উঠছিলাম তখন হঠাৎ এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখােমুখি আমাকে হতে হল।

বাতাসের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে গেল। বাতাসের সঙ্গে লড়াই করে খাড়া পথ বেয়ে ওপরে উঠতে খুবই তকলিফ হতে লাগল।

অমানুষিক তকলিফ সহ্য করে আমি এক সময় বহু আকাঙিক্ষত চড়াটায় উঠতে সক্ষম হলাম। আনন্দ-উচ্ছাসে আমি ডগমগ। গম্বুজটার নীচে শুয়ে পড়লাম। অনভ্যস্থ পা দুটো টনটন করছে। মনে অফুরন্ত উন্মাদনা বটে, কিন্তু শরীর ক্লান্ত-অবসন্ন। ফুরফুরে বাতাস পেয়ে ক্লান্ত চোখের পাতা দুটো বুজে এল। ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। ঘুমের ঘােরে শুনতে পেলাম কে যেন বলছে-‘শােন কাসিব-এর লেড়কা, তুমি যেখানে শুয়ে আছ, সেখানে, তােমার ঠিক পায়ের কাছে সামান্য গর্ত খুড়লেই একটা তীর আর ধনুক মিলবে। এ দুটো দৈবশক্তি সম্পন্ন। ধনুকে তীর সংযােজন করে ঘােড়সওয়ারটার গায়ে আঘাত করলে তবেই ব্রোঞ্জের ঘােড়সওয়ারের মূর্তিটা হুমড়ি খেয়ে সাগরের পানিতে পড়বে। তােমার কাজে দুনিয়ার মানুষ বড়ই উপকৃত হবে। যেখান থেকে ধনুকটা তুলেছিলে সেখানেই সেটাকে রেখে আগের মতই মাটিচাপা দিয়ে দেবে। | ব্রোঞ্জের মুর্তিটা সাগরে পড়ামাত্র সাগরের উন্মাদনা অনেকাংশে বেড়ে যাবে। পানি ফুলে ফেঁপে উঠতে উঠতে তােমার পায়ের তলায় পাহাড়ের চূড়ার সমান হয়ে যাবে। ঠিক তখনই তােমার চোখে পড়বে একজন একটা ছােট্ট নৌকো নিয়ে তােমার কাছে এসেছে। তােমার মনে হবে, ঘােড়সওয়ার। ঘােড়সওয়ার আর ডিঙির লােকটাকে একই ছাঁচে গড়া মনে হবে। আসলে কিন্তু তােমার চোখের ভুলের জন্যই উভয়কে অবিকল একই রকম মনে হবে। নৌকো আরও কিছুটা এগিয়ে এলে তােমার চোখের সামনে ভেসে উঠবে পাটাতনের ওপর একগাদা মড়ার খুলি। তা দেখে তুমি আবার মুষড়ে পােড়াে না যেন। লােকটার নৌকোটা নিয়ে আসার উদ্দেশ্য তােমাকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌছে দিয়ে আসা।।

খবরদার! নৌকোয় পা দেওয়ার পর থেকে যতক্ষণ তাতে থাকবে ততক্ষণ ভুলেও যেন খােদাতাল্লার নাম উচ্চারণ কোরাে না। নৌকোয় ওঠার পর থেকে শুরু করে নিরবিচ্ছিন্নভাবে দশদিন নৌকোর দাঁড় বেয়ে তােমার দেশের কাছাকাছি শান্ত সমুদ্রের বুকে তােমাকে নামিয়ে দিয়ে আসবে। সামনেই এক বণিকের নৌকো দেখতে পাবে। বণিক তােমাকে নৌকোয় তুলে নিয়ে তােমার বন্দরে নামিয়ে দিয়ে আসবে। আচমকা আমার ঘুম ভেঙে গেল। ব্যস্ত-হাতে পায়ের তলার মাটি খুঁড়তে শুরু করলাম। সামান্য খুঁড়তেই বাঞ্ছিত তীর-ধনুকটা চোখে পড়ল। তুলে নিলাম।

ব্রোঞ্জের মূর্তিটার গায়ে তীরটা গিয়ে আঘাত করতেই সেটা হুড়মুড় করে ভেঙে সাগরের পানিতে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সাগর....... To be continued

Post a Comment

0 Comments