আরব্য রজনী পার্ট ৯৭ (Arabyarajani Part 97)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

চোখের পানি ফেলে জুমূর্যদ করুণ মিনতি জানায়--খােদা মেহেরবান, যােশেফ’কে তাে তুমিই তার আব্বার বুকে ফিরিয়ে - দিয়েছিলে। তবে আমার বেলায় কেন মুখ ফিরিয়ে রাখলে ? আমার 'দিকে মুখ তুলে তাকাও। আলী শার-কে আমার বুকে এনে দাও। যারা পথ ভুল করে তুমিই তাে মেহেরবানি করে তাদের সাচ্চা পথের নিশানা বাৎলে দাও।

এদিকে নিমন্ত্রিতরা খানাপিনা সারছে আর নসীববিড়ম্বিতা জুমুরদ চোখের পানি ঝরিয়ে ভিড়ের মাঝে তার বাঞ্ছিতের মুখটির তল্লাশী চালাচ্ছে। ঠিক তখনই এক সুদর্শন নওজোয়ান খানাপিনার আসরে ধীর পায়ে হাজির হ’ল। তার চোখে-মুখে খানদানি পরিবারের ছাপ সুস্পষ্ট। আসরে বিরিয়ানির রেকাবির জায়গা বাদে তিল ধারণের জায়গা পর্যন্ত নেই। তাই উপায়ান্তর না দেখে আগন্তুক নওজোয়ানটি সেখানেই বসে পড়ল। উপস্থিত সবাই চোখের তারায় আতঙ্কের ছাপ এঁকে তার দিকে তাকাল।
আগন্তুক নওজোয়ানটির মুখের দিকে তাকিয়েই জুমূর্যদ চিনতে পারল। সচকিত হয়ে সােজাভাবে বসল। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিমেলে বার বার তার মুখের দিকে তাকাতে লাগল। জুমুর্যদ আচমকা চিল্লিয়ে উঠতে চেয়েও নিজেকে গুটিয়ে নিল। জোর করে উচ্ছ্বাস-আবেগকে দমন করে রাখল। আর তার কলিজাটি বার বার মােচড় মেরে উঠতে লাগল। শিরা-উপশিরায় খুনের গতি দ্রুত থেকে ক্রমে দ্রুততর হতে লাগল। জুমূর্যদ কাপা কাপা ঠোট দুটো সামান্য নাড়িয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে, প্রায় স্বগতােক্তি করল-“হ্যা, আলী শার। আমার জান, আমার কলিজা আলী শারই বটে।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন। 
তিন শ’ আটাশতম রজনী 
রাত্রি একটু গভীর হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাহাপনা, চলুন আমরা আলী শার-এর খোজ করি। আলী শার বুড়ির সক্রিয় সহযােগিতায় তার মনময়ূরী জুমূর্যদ-এর হদিস পেয়ে শয়তান রসিদ-এর মকান-এর কাছে এল। তারপর নিদ গেল। তার নিদ যখন টুটল তখন ভােরের আলাে উকি দিতে শুরু করেছে। দোকানিরা দোকানপাট খুলছে। তখন সে চোখ মেলে তাকাল। সে রীতিমত অপ্রস্তুতে পড়ে গেল। এ কী কারবার, সে পথের ধারে শুয়ে কেন? মাথার পাগড়ী হাপিস হয়ে গেছে। গায়ের দামী কোর্তাটি পর্যন্ত গায়েব হয়েছে। এবার আর তাজ্জব বনল না। এক এক করে বিলকুল ঘটনা তার দিমাকে ভেসে উঠতে লাগল। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। সুযােগ পেয়েও বরাতগুণে তার সদ্ব্যবহার করতে পারল না। চোখ দুটো পানিতে ছল ছল করে উঠল। বিষন্ন মুখে সে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
বুড়িটির কাছে নিজের নসীবের ব্যাপার খােলসা করে বলল। কিছই ছাপাল না।
বুড়ি ফিন তার ফেরীকরার ঝুড়িটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। হাজির হ’ল শয়তান রসিদ-এর মকানে। সাধ্যমত কোশিস করে বুড়ি ফিন আলী শার-এর মকানে গেল। সববৃত্তান্ত তার কাছে রাখল। সব শেষে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুড়ি বলল—“বেটা, তােমার বিবি তাে রসিদ এর মকানে নেই। তার আশা ছেড়ে দিয়ে নিজের কাম কাজে মন দাও। তােমার ভুলের জন্যই তাকে পেলে না। আমি ধান্দায় থাকছি। যদি কোন ফিকির বের করতে পারি তবে জরুর তােমাকে বাতিয়ে দেব। খােদার নাম কর। তিনি যদি মেহেরবানি করে তােমার বিবির হদিস দেন তবেই তুমি তাকে বুকে ফিরে পাবে। একমাত্র তিনিই তােমার বল ভরসা।
আলী শার বুঝল, নিজের সামান্য গলতির জন্যই তার মেহবুবাকে পেয়েও হারাতে হয়েছে। এ দুঃখ কোথায় রাখবে। তার চোখের সামনে বিলকুল ক্রমেই অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল। তার হতাশা আর হাহাকার প্রবল থেকে প্রবলতর রূপ নিয়ে দেখা দিল। চোখের পানি ঝরাতে ঝরাতে এক সময় তার বিছানা সম্বল হ’ল। খানাপিনা উঠে গেছে। চোখের নিদ উধাও আর দিল থেকে সুখশান্তি চির নির্বাসিত। এমনি করেই একদিন হয়ত তাকে গােরে গিয়ে আশ্রয় নিতে হবে। বুড়িটি আলী শার-এর সর্বক্ষণের সাথী হয়ে দাঁড়াল। সেবা যত্ন বা সান্ত্বনা সবই তাকেই দিতে হয়।
আলী শার-এর পরিস্থিতি ক্রমেই সঙ্গীন হয়ে পড়তে লাগল। বুড়ি একদিন তার গায়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল—“বেটা, নিজেকে শক্ত কর। এমন ক'রে যদি দিন দিন ভেঙে পড়, দিলকে দুর্বল করে ফেল তবে তােমার মেহবুবাকে ফিরে পাবে কি করে?
বুড়ি প্রায়ই একথা-সেকথার মাধ্যমে তাকে বহুভাবে সাহস ও উৎসাহ দিতে লাগল।
আলী শার একদিন সত্যি সত্যি নিজের দিকে শক্ত করে বাঁধল। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। শেষ পর্যন্ত একদিন বুড়ির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জুমূর্যদ-এর খোঁজে বেরিয়ে পড়ল। বহুৎ মুলুক ঢুঁড়ে, বহুৎ সুলতানিয়তে চক্কর মেরে তবে বিরিয়ানির রেকাবির সামনে এসে বসেছে।
ক্ষিদেতে আলী শার-এর পেট চো চো করছে। তাই সে ব্যস্ত- হাতে রেকাবি থেকে বিরিয়ানি তুলে গােগ্রাসে গিলতে লাগল।
আশে পাশের নিমন্ত্রিতরা আলী শার'কে বিরিয়ানি খেতে বারণ করল। শুনল না। যার পেটের ভেতরে আগুন জ্বলছে তার পক্ষে কোন হুসিয়ারী তাে কার্যকর হওয়ার কথা নয়।
আলী শার-এর হালৎ দেখে এক আদমি তাে বলেই ফেলল—আরে ইয়ার করছ কী। তােমার নসীবে যে ফাসির দড়ি লেখা রয়েছে দেখছি। নয়ত গায়ের চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে তােমার দোস্তদের চামড়ার সঙ্গে সেঁটে দেবে। হুঁশিয়ার।
-“দোস্ত, আমি যেভাবে দিন গুজরান করে চলেছি তার চেয়ে ফাঁসির দড়িতে লটকে পড়া হাজার গুণ কাম্য। আর বিরিয়ানি খেলেই যদি মরা যায় তবে তাে আমি অবশ্যই খাব।'
জুমুর্যদ আলী শার-এর প্রতিটি মুহূর্তের ওপর নজর রেখে চলেছে। ভাবল, খিদের সময় খানার রেকাবি হাতে নিয়ে বসেছে এসময়ে তাকে ডেকে বিরক্ত করা মােটেই সঙ্গত নয়।
আলী শার খানা সেরে খালি রেকাবিটি এক ধারে সরিয়ে রেখে এক বদনা পানি ঢক ঢক করে গলায় ঢেলে দিল। এবার যেন তার কলিজা একটু ঠাণ্ডা হ’ল। এক সিপাহী এসে আলী শার’কে সসম্মানে সুলতান জুমুরদ এর কাছে নিয়ে গেল।
আসরে যারা খানাপিনা নিয়ে ব্যস্ত তাদের মধ্যে এক প্রজা তার পাশের একজনকে বলল “কি দোস্ত, ব্যাপারটিকে কিন্তু খুব সােজা করার কোনই কারণ নেই। অন্যান্যদের পিঠ মােড়া করে বেঁধে, চ্যাঙদোলা করে সুলতানের সামনে হাজির করেছিল। কিন্তু এনওজোয়ানটির বেলায় যে একেবারে আলাদা বন্দোবস্ত। রীতিমত তােয়াজ করে নিয়ে গিয়ে সুলতানের সামনে হাজির করা হল। কসুর এক-ই, শাস্তি আলাদা। সুলতানের মর্জি কি, তিনি নিজেই জানেন। 
সিপাহী রীতিমত তােয়াজ করতে করতে তাকে কিন্তু সুলতানের সামনে হাজির করল। আলী শার সুলতানের সামনে গিয়ে অবনত হয়ে কুর্নিশ করল। জুমুরদ এবার যেন বিলকুল মাটির পুতুল বনে গেল। তার সুলতানােচিত আচরণ যেন নিঃশেষে অন্তর্হিত হয়ে গেছে।
জুমুরদ শান্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করল—নওজোয়ান, তােমার নাম কি?কোন পেশায় নিযুক্ত? তােমার এখানে আসার কারণই বা কি ?
আলী শার জবাব দিল—জাহাপনা, আমার নাম আলী শার। আমি কোন পেশায় লিপ্ত নই। আমার আব্বা ছিলেন একজন বড় কারবারী। অগাধ অর্থ আমার জন্য রেখে গিয়েছিলেন। আর আমার নসীবই আমাকে এখানে হাজির করেছে।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ উনত্রিশতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর শুরু হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কোনরকম ভূমিকার অবতারণা না করেই সরাসরি কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাহাপনা আলী শার সুলতান জুমর্যদ-এর প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলল-“আমার নসীব-ই আমাকে এখানে টেনে এনেছে। আমি বিবিকে হারিয়ে উন্মাদের মত এমুলুক সেমুলুক ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছি। হন্যে হয়ে তার তল্লাশী চালাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত হাজির হয়েছি আপনার সুলতানিয়তে। ডাকুরা তাকে চুরি করে নিয়ে গেছে। আজ আমি উন্মাদ দশা প্রাপ্ত হয়ে তার তল্লাশী চালাচ্ছি। জানি না, খােদাতাল্লা মেহেরবানি করে আমার বিবি, আমার কলিজা জুমুরদ’কে আমার বুকে আদৌ কোনদিন ফিরিয়ে দেবেন, কিনা।
জুমুরদ ফিন বালি আর কলম আনাল। আগের মতই বালি বিছিয়ে আঁক কেটে চলল। তারপর শুরু হ’ল বিড় বিড় করে মন্ত্রপাঠ। কয়েক মুহূর্ত পরেই সে মুখ খুলল—“হ্যা, তােমার নাম আলী শার। গ্লোরি-র বেটাই বটে তুমি। আর আদতে তুমি যে এক সাচ্চা আদমি তা আমি গণনার মাধ্যমে স্পষ্ট জানতে পারছি। তােমার বাৎ বিলকুল সাচ্চা। আমি তােমাকে বলছি নওজোয়ান, তােমার মেহবুবাকে শীঘ্রই তুমি খুঁজে পাবে। ঘাবড়াও মাৎ।
খানাপিনা শেষ হলে জুমুরদ রাজকীয় পােশাকে আলী শার’কে সাজাল। এবার এক নফরকে হুকুম করল, আস্তাবল থেকে সবচেয়ে ভাল ঘােড়া বের করে আনতে। তার পিঠে চাপিয়ে প্রাসাদে হাজির করতে।
সুলতান জুমুরদ-এর ব্যাপার স্যাপার প্রজাদের মধ্যে কৌতূহল সঞ্চার করল। করার কথাই তাে বটে কারণ, এর আগে যাদের খানাপিনার আসর থেকে পাকড়াও করে আনা হয়েছে তাদের সবার ছাল চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে নগরের প্রবেশদ্বারে লটকে দেয়া হয়েছে। আর এর প্রতি একেবারে বিপরীত আচরণ করছে। তাজ্জব! বলার মতই কাণ্ডই তাে বটে। কেউ কেউ এরকম মন্তব্যও করে বলল, খুবসুরৎ নওজোয়ান পেয়েই আমাদের সুলতানের দিমাক বিলকুল ঘুরে গেছে।
আবার কেউ কেউ এর মধ্যে এর চেয়ে বেশী রহস্যের গন্ধ খুঁজতে লেগে গেল। 
এ-মুহূর্তে সুলতান জুমূর্যদ-এর একমাত্র চিন্তা কখন রাত্রির আন্ধার নেমে আসবে। তার হৃদয় দেবতাকে কাছে পাবে। বুকে জড়িয়ে ধরবে। চুম্বনের পর চুম্বন দিয়ে নিজে তৃপ্তি পাবে, তৃপ্তিতে ভরপুর করে তুলবে আলী শার-এর দিল। উফ! কতকাল তার মধুর সান্নিধ্য থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখেছে ভাবলে দিল ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠছে। আজ না পাওয়ার সবজ্বালা মুহুর্তে মিলিয়ে যাবে। আলী শার শান্তিবারির মাধ্যমে তার কলিজার জ্বালা জুড়িয়ে বিলকুল হিমশীতল করে দেবে। উঃ সে যে কী আনন্দ ভাবলেই তার দিল-জান মাদকতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এক সময় প্রাসাদের বুকে আন্ধার নেমে এল। জুমুরদ-এর যেন আর সবুর সইছে না।
অস্থিরমতি জুমূর্যদ সন্ধ্যার কিছু পরেই পােশাক বদলে রাত্রের পােশাক গায়ে চাপিয়ে নিল। সামান্য একটি অতি মিহি সেমিজ ছাড়া। গায়ে আর কিছুই রাখল না।।
রাত্রি আরও একটু গভীর হলে জুমুরদ এক খােজাকে হুকুম দিল আলী শারকে তার কামরায় হাজির করার জন্য।
এদিকে উজির নাজির ও অন্যান্য অমাত্যরাও সুলতানের এরকম অদ্ভুত আচরণে কম বিস্মিত নয়। তারা পরস্পরের মধ্যে আলােচনা করতে লাগল সুলতান নির্ঘাৎ দরবেশটির প্রেমে মজে গেছেন। তবু রক্ষা, লেড়কি টেড়কি নয়। আজ রাত্রে তারা হয়ত একই কামরায় শোবেন। একই পালঙ্কে যে শোবেন এরকম ভাবাও পাগলের প্রলাপ নয়। পারিষদদের মধ্য থেকে একজন এরকম মন্তব্যও করতে ছাড়ল
—‘সুলতান শীঘ্রই দরবেশটিকে তার ভেক খুলিয়ে মন্ত্রী বা প্রধান সেনাপতি গােছের কোন একটি পদে বহাল করে দেবেন। সুলতানের হুকুম তামিল করল খােজা ভৃত্যটি। সে আলী শারকে সুলতানের কামরায় পৌছে দিয়ে বাইরে থেকে দরওয়াজা টেনে দিল।
আলী শার কামরায় ঢুকে সুলতান জুমুরদ’কে কুর্ণিশ করে হুকুমের অপেক্ষায় মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
জুমুরদ ভাবল, গােড়াতেই যদি নিজের পরিচয় দিয়ে দেই তবে হয়ত আকস্মিক আবেগে-উচ্ছ্বাসে সে মূর্ছাই যাবে। তাই নিজেকে সংযত রেখে তার দিকে পিছন ফিরে বলল—“ওহে নওজোয়ান, কাছে এসাে। আমার একেবারে কাছে এসে দাঁড়াও।
আলী শার দু’পা এগিয়ে কি ভেবে ফিন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে।
জুমুরদ এবার বলল—“তােমার খিদেটিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই। ওই দেখ, টেবিলে খান সাজানাে রয়েছে। খানাপিনা সেরে নাও। 
আলী শার খানা সারলে জুমুরদ এবার বলল—‘নেশাটেশা একটু-আধটু নিশ্চয়ই কর? পাশের টেবিলে হরেক কিসিমের সরাব রয়েছে। মর্জি মাফিক বােতল ও পেয়ালা টেনে নাও।
আলী শার-এর খানাপিনা সারা হলে জুমুর্যদ এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরে পালঙ্কে এনে বসাল। তার হাত দুটো ধরে এবার বলল—'নওজোয়ান তােমাকে কাছে পেয়ে, তােমার আচরণে আমি বহুৎ খুশী হয়েছি। তােমার মত খুবসুরৎ মুখ এর আগে আমার চোখে পড়েনি।' মুহূর্তকাল নীরবে ভেবে বলল—নওজোয়ান, আমার পায়ে ব্যথা হচ্ছে, একটু আধটু টিপে দেবে? দাও না—একটু টিপে
দাও।
আলী শার উপায়ান্তর না দেখে সুলতানের পা টিপতে লেগে গেল। কয়েক মুহূর্ত যেতে না যেতেই সুলতান বলল—কেবল পা নিয়েই পড়ে রইলে যে হে! আর একটু ওপরে ওঠ-উরু পর্যন্ত। আচ্ছা করে টিপে দাও। খুব যন্ত্রণা হচ্ছে।
আলী শার সুলতানের পায়ের কাপড় সরিয়ে কিছুটা তাজ্জব বনেছিল, পায়ে লােমের লেশমাত্রও নেই। এবার উরু পর্যন্ত কাপড় তুলে টিপতে গিয়ে আরও তাজ্জব বনল। আর পা আর উরু কী তুলতুলে, একেবারে যেন পেঁজা তুলাের বস্তা। সে আপন মনে বলে। উঠল—‘হায় আল্লাহ! পুরুষের পা এমন তুলতুলে করে গড়ে দিয়েছ!’ |
সুলতান এবার আরও এক ধাপ এগােতে গিয়ে বলল—নওজোয়ান, তুমি তাে বহুৎ আচ্ছা পা টিপতে পার! ওঠো, আর একটু ওপরে উঠে যাও। বেশ করে দলাই মালাই কর। একেবারে কোমরের কাছাকাছি উঠে যাও। উঃ তুমি কী যে আরাম দিচ্ছ ভাষায় বুঝাতে পারব না।'
আলী শার হাত দুটো আরও সামান্য ওপরে তুলে নিল। ঝট করে নামিয়ে এনে বলল—জাঁহাপনা, আমি মাফি মাঙ্গছি।
“কেন? অসুবিধে কিসের? —“উরুর ওপরে কি করে টিপে দেব আমার দিমাকে আসছে না ।
—সে কী হে! উরু পর্যন্ত যেভাবে টিপেছ'
--যেটুকু বুঝেছি তা-তাে দিলামই। এর বেশী উঁচুতে কি হাত তােলা যায়, নাকি তোলা উচিত, আপনিই বলুন?
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন।
তিন শ ত্রিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগমের কোলে মাথা রেখে পালঙ্কে শরীর এলিয়ে দিয়ে কিসসা শােনার প্রস্তুতি নিলেন। বেগম
তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, সুলতান আলী শার-এর কথা শুনে যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। কণ্ঠস্বরে কৃত্রিম গাম্ভীর্য এনে বলল—কী বললে, এত স্পর্ধা তােমার। ধানাই পানাই রেখে যা বলছি, কর। যদি একমুহূর্তও দেরী কর তবে তােমার গর্দান নেয়া হবে। আমার হুকুম তামিল করে আমাকে তৃপ্তিতে ভরিয়ে দাও। বিনিময়ে তুমি আমার স্নেহ-ভালবাসা পেয়ে জীবন ধন্য করতে পারবে। নাও,দেরী কোরাে না, কোমর পর্যন্ত ভাল করে টিপে দাও।”
—“জাঁহাপনা সবই তাে মালুম হ’ল, কিন্তু আপনার মর্জি যে ঠিক কি তা-ই তাে আমার দিমাকে আসছে না। যদি মালুমই না হয় তবে হুকুম তামিল কি করে করা যাবে ভাবছি।
-এক কাজ কর। তােমার পাৎলুনটি খুলে ফেল। তারপর আমার পাশে, একেবারে আমার গা-ঘেঁষে উপুড় হয়ে শােও। তারপর যা করতে হবে আমিই সব বলে দেব।
-“জাঁহাপনা, গােসসা করবেন না। জিন্দেগীতে এ ধরনের কাজ কোনদিনই আমি করি নি। আর আমি ইচ্ছুকও নই। তবে আপনি যদি এ সব কাজের জন্য আমার ওপর বল প্রয়ােগ করেন তবে খােদাতাল্লার কাছে আপনাকে এর জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে।
সুলতান বড়বড় চোখে তার দিকে তাকাল।
আলী শার বলে চলল—“আপনি মেহেরবানি করে আমাকে ছেড়ে দিন। আমি কসম খাচ্ছি, আপনার মুলুক ছেড়ে চলে যাব।
–‘আমি কোন অনুরােধই মানতে রাজী নই। আমার হুকুম, পাৎলুন খুলে আমার পাশে শুয়ে পড়। উপুড় হয়ে শােও। অন্যথায় এখন, এখানেই তােমার গর্দান যাবে। কী খুবসুরৎ তুমি। উলঙ্গ হয়ে আমার পাশে শোবে। এরজন্য তােমার তাে অনুতাপের কোন ব্যাপার নেই।
আলী শার নিতান্ত নিরুপায় হয়ে সুলতানের হুকুম তামিল করতে গিয়ে পাৎলুনটি খুলে ফেলল। এবার তার পাশে উপুড় হয়ে, অনেকটা কেন্নোর মত জড়ােসড়াে হয়ে শুয়ে পড়ল।
পরমুহূর্তেই সুলতান ঝট করে তার পিঠের ওপর উঠে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল। আবেগের সঙ্গে আলী শার’কে দু'হাতে জাপ্টে ধরল। তৃপ্তিতে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। ব্যাপার দেখে আলী শার ধরেই নিল এবার আমার কম্মফতে। তার সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল।
আলী শার আচমকা শিহরিত হয়ে উঠল। তার শিরা-উপশিরায় যেন বিদ্যুতের চমক খেলে গেল। সে পিঠে যেন নরম ও গােলাকার দু’টো বস্তুর চাপ অনুভব করল। সুলতানের নিশ্বাস উষ্ণ। আর শরীরও যেন ক্রমেই উষ্ণ হয়ে উঠছে স্পষ্ট বুঝতে পারল।

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments