আরব্য রজনী পার্ট ৯৬(Arabyarajani Part 96)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

সুলতান জুমুরদ অপলক চোখে তার প্রতিটি মুহূর্তের কার্যকলাপ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ' পঁচিশতম রজনী  
পরের রাত্রে বাদশাহ শারিয়ার-এর উপস্থিতিতে বেগম শাহরাজাদ কোনরকম ভূমিকা না করে কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন। বেগম বললেন—“জাঁহাপনা, নিমন্ত্রিত মেহমানরা যখন খানার রেকাবি খালি করার জন্য ব্যস্ত তখন সুলতান খ্রীষ্টান বরসুম রেকাবির পর রেকাবি খানা উদরে চালান দিতে প্রাণান্ত কোশিস চালিয়ে যাচ্ছে আর মাঝে-মধ্যে সুলতানের চোখ দুটোর গতিবিধির ওপর কড়া নজর রেখে চলেছেন। বরসুম-এর পাশের লােকটি তার খাওয়ার বহর দেখে বলল—করছ কি হে! এমন গােগ্রাসে খানা চালান দিচ্ছ, গরহজম হয়ে মরবে নাকি। এবার রেহাই দাও।বরসুম পাত্তা দিল না, পাশের আর একজনের পাত থেকে একটি গােস্তর টুকরা তুলে নিল। বরসুম যখন ইয়া বড় একটুকরাে গােস্ত দাঁতের সাহায্যে বাগে আনার জন্য প্রাণান্ত কসরৎ চালাচ্ছে ঠিক তখনই চারজন সিপাহী অতর্কিতে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিনা কৈফিয়তেই পিঠমােড়া করে বেঁধে ফেলল। শয়তান খ্রীষ্টান বসুম তাে চিল্লাচিল্লি করে, হাত-পা ছুঁড়ে হৈ হৈ রৈ রৈ কাণ্ড বাঁধিয়ে দিল।

জুমুর্যদ গােড়া থেকেই তার চালচলনের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে চলছিল। তাই গ্রেপ্তারী পরােয়ানা জারি করেছে। সিপাহীরা বরসুম’কে বেঁধে সুলতানের সামনে হাজির করল। ব্যাপার দেখে উপস্থিত সবাই তাে তাজ্জব বনে গেল। 
একজন পাশ থেকে বলে উঠল—“উচিত শাস্তিই হয়েছে। যত পার খাও। খানার তাে আর ঘাটতি নেই। তাই বলে একজনের পাত থেকে খানা ছিনিয়ে নেবে নাকি! গুনাহ-অন্যের খানা ছিনিয়ে খাওয়া ঘােরতর গুনাহ। জুমুরদ-এর চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরােতে চাচ্ছে। ক্রোধের আগুন।
জুমুরূদ অতি কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে বলল—তুমি কে হে? তােমার চোখের তারা দুটো নীল দেখছি। এরকম চোখ গুনাহের কারণ। কি নাম তােমার ? পেশা কি? তুমি তাে এ-মুলুকের কেউ নও। এখানে এসেছ কেন, বল তাে?
বন্দী বরসুম-এর শিরে মুসলমানদের মাফিক একটি সাদা পাগড়ী বাঁধা। সাদা পাগড়ী জড়ালেই নিস্তার পাওয়া যায় না। সুলতানের প্রশ্নের জবাবে বন্দীটি বলল-“জাঁহাপনা, আমি এক ফেরীওয়ালা। ফিতে, চুড়ি প্রভৃতি হরেক সাজসজ্জার সামগ্রী ফেরী করে কোনরকমে দিন গুজরান করি।
জুমুরদ এবার এক খােজাকে বলল—“আমার কামরায় আল্লাতাল্লার দোয়া দেয়া বালি রাখা আছে, নিয়ে আয়। আর কলমটিও খেয়াল করে আনবি।
খােজাটি এক ছুটে সুলতানের আদিষ্ট দ্রব্য সামগ্রী নিয়ে এল।
জুমুরদ এবার বালিগুলােকে একটি পাটাতনের ওপর বিছিয়ে দিল। কলম বুলিয়ে বুলিয়ে আঁক কেটে কেটে একটি বানর আঁকল। আর তারই পাশে কয়েকটি সােজা সােজা দাগ। এগুলাে কেন এঁকেছে কিছুই মালুম হ’ল না।
জুমুরদ নিজের আঁকা ছবিটির দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে কি যেন বলল। এক সময় গর্জে উঠল—‘উল্লু কাঁহিকার! ঝুট! ঝুট বাৎ বলছিস জানােয়ার কাঁহিকার। তাের স্পর্ধা তাে কম নয়! সুলতানের সামনে দাঁড়িয়ে বেমালুম ঝুট বাৎ বললি! তুই মুসলমানের ভেক ধরলেও নিজেকে ছাপাতে পারিস নি। তুই খ্রীষ্টান। তাের নাম বরসম, ঠিক কিনা? একটি ক্রীতদাসীর খোঁজে এদেশে চুপিচুপি এসেছিলি। লেড়কিটিকে তুই গায়েব করেছিলি, ঠিক তাে? কসুর কবুল কর। এ মন্ত্রপূত বালির সামনে দাঁড়িয়ে ঝুট বললে রেহাই পাবার জো নেই, যদি নিজের ভাল চাস, কসুর স্বীকার কর।
সুলতানের বাৎ শুনে শয়তান বরসুম-এর কলিজা শুকিয়ে গেল। ডরে কাঁপতে কাঁপতে আচমকা আর্তনাদ করে উঠল –‘জাহাপনা, মেহেরবানি করে আমার গুস্তাকি মাফ করে দিন।
চোখের পানি মুছতে মুছতে বরসুম এবার বলল—কসুর কবুল করছি। আর ঝুট বলব না। কোন কিছুই আপনাকে ছাপাব না। সাচ্চা বাৎ বটে। আমি খ্রীষ্টান। আমার ঘর থেকে এক ক্রীতদাসী ভেগে গিয়েছিল। তারই তল্লাশী চালাতে গিয়ে ঢুঁড়তে ঢুঁড়তে আমি আপনার সুলতানিয়তে একদিন এসে পড়েছিলাম। তারপর এক খুবসুরৎ ক্রীতদাসীকে চুরি করে ভেগে যাই। তার ওপর জুলুমও বহুৎ-ই করা হয়েছে। আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলছি, ভবিষ্যতে আর এরকম কাম কাজে মতি হবে না।
নিমন্ত্রিতরা ফিসফিসিয়ে বলাবলি করতে লাগল—ইয়া আল্লা! দুনিয়া ঢুঁড়ে এলেও এরকম আর একজন সর্ববিদ্যায় পারদর্শী সুলতানের দেখা মিলবে না। খ্রীষ্টানটির পেট থেকে কেমন টেনে হিচড়ে সমাচার বের করে নিলেন।
জুমুরদ এবার জল্লাদকে বলল—“খ্রীষ্টান কুত্তাটিকে নিয়ে যাও। নগরের বাইরে নিয়ে গিয়ে এর গা থেকে ছাল চামড়া ছাড়িয়ে নেবে। তারপর ছালটিকে নগরের প্রবেশদ্বারের সঙ্গে সেঁটে দেবে। আর ধড়টি আধ-পােড়া করে নালায় ফেলে দেবে।
জল্লাদ সুলতানের হুকুম তামিল করল। বরসুম-এর প্রতিবেশীরা মহল্লায় ফিরে গিয়ে ব্যাপার নিয়ে বাৎচিৎ করল।
পরের মাহিনায় ফিন সুলতান খানা পিনার বন্দোবস্ত করল। এবার সবাই সতর্ক। নিজের রেকাবি ছাড়া অন্য কোনদিকে কেউ ভুলেও তাকাল না।
সুলতানের নিমন্ত্রিতরা যখন খানার রেকাবি নিয়ে মেতে রয়েছে। ঠিক তখনই ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড। দামড়ার মত দশাসই চেহারার এক আদমি খানাপিনার আসরে এল। বিরিয়ানির রেকাবি নিয়ে হালুম হালুম করে খেতে লেগে গেল। কদাকার ষণ্ডামাকা লােকটিকে এক নজরে দেখেই জুমুর্যদ সনাক্ত করে ফেলল। এ-ই সেই ডাকু। চল্লিশ ডাকুর মধ্যে একজন। আহমদ অল-জানাফ। ছিনতাই করা লেড়কিটিকে নিয়ে একটু ইয়ে টিয়ে করবে বলে সাকরেদদের নিয়ে দুপুরের পরেই গুহায় ফিরে ছিল। ব্যস, গুহার মুখে বুড়িটির মুখে শােনে, চিড়িয়া ভাগ গই, চিড়িয়া পালিয়েছে। ব্যস, তার খুন শিরে চেপে গেল। তখনই কসম খায়, লেড়কিটি যেখানে থাক, পাতালের ভেতর লুকিয়ে থাকলেও খুঁজে তাকে বের করবেই। এমুলুক-সেমুলুক ঢুঁড়তে ঢুঁড়তে সে এখানে হাজির হয়েছে।
নসীবের খেল। নসীব কে খণ্ডন করবে? অল-জানাফ-এর নসীবই তাকে এখানে হাজির করেছে। এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ' ছাব্বিশতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার কিসসা শােনার অতুগ্র আগ্রহ নিয়ে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম বাদশাহকে যথােচিত সম্ভাষণ সেরে কিসসা শুরু করলেন -জাঁহাপনা, ডাকূটি খানাপিনার মজলিশে ঢুকেই একটি বিরিয়ানির রেকাবি টেনে নিয়ে তা থেকে গােগ্রাসে বিরিয়ানি গিলতে লাগল। তার কাণ্ড দেখে উপস্থিত সবার কলিজা মােচড় মেরে উঠল। হায় হায় করে উঠল সবাই। ওই খানায় গুনাহ জড়িয়ে রয়েছে। ওটা রেখে দাও। সুলতান তােমার ছাল চামড়া ছাড়িয়ে নেবেন। জ্যান্ত পুতে দেবেন! তােমার গােস্ত কুত্তা দিয়ে খাওয়াবেন।
ডাকু জানাফ-এর কোনদিকে ক্ষেপমাত্রও নেই। একই ভাবে হালুম হালুম করে বিরিয়ানি খেয়ে মুহূর্তে রেকাবিটি খালি করে দিল। শয়তানটির হাত দুটো কুচকুচে কালাে। তার ওপর অস্বাভাবিক লােমশ। কাকের পায়ের মত অনেকটা দেখতে। খানা তুলে মুখে পােরার সময় আরও বেশী কদাকার দেখাচ্ছিল। একটি উট যেন অনবরত পা চালাচ্ছে। ইয়া পেল্লাই বলের মত বিরিয়ানির ডেলা পাকিয়ে মুখে পুরে বুড়াে আঙুল দিয়ে ঠেলে ঠেলে ভেতরে চালান দিয়ে দিচ্ছে। দৈত্যটির কাণ্ডকারখানা দেখেই অনেকের গা পাকাচ্ছিল। রাক্ষসরাও বুঝি এর থেকে ধীরে ধীরে সমঝে টমঝে খানা খায়। সে একের পর এক বিরিয়ানির থালা সাবাড় করে চলল।
ডাকু জানাফ-এর ওপর আগের সেই চার সিপাহী ঝাঁপিয়ে পড়ল। পিঠমােড়া করে বেঁধে হাজির করল সুলতান জুমুর্যদ-এর সামনে।
জুমুর্যদ জিজ্ঞাসা করল—“কি নাম তােমার ? তােমার পেশা কি? আমাদের নগরে আসার কারণ কি?
–‘জাঁহাপনা, আ্যাটমাম আমার নাম। বাগিচার কাজ করি —মালী। নিজের মুলুকে রুটির ধান্দা হ’ল না। যদি কাম কাজ কিছু মেলে তাই ঢুঁড়তে ঢুঁড়তে এখানে হাজির হয়েছি।
জুমুরদ-এর হুকুমে ফিন সেই মন্ত্রসিদ্ধ বালি এল। কলমও আনা হ’ল একটি। ফিন শুরু হ’ল আঁক কষাকষি। বিড়বিড় করে আগের মতই কি সব পাঠ। তারপর চলল হিসাব জোড়া।
কয়েক মুহুর্ত নীরবে কি যেন ভেবে নিয়ে জুমুরদ এক সময় চিল্লিয়ে উঠল—“ঝুট! বিলকুল ঝুট। শয়তান কাঁহিকার। সুলতানের সামনে দাঁড়িয়ে ঝুট বাৎ বলছিস, ডর নেই তাের! তাের নসীব তোকে জাহান্নামের দরওয়াজায় পৌছে দিয়েছে। আমার গণনার ফল হচ্ছে, তাের নাম জানাফ। ডাকু জানাফ। ডাকাতি, রাহাজানি আর হামলা-হুজ্জতি তাের পেশা। কুত্তা কাঁহিকার! জল্লাদ ডেকে তাের জান খমত করে ছাডব! গর্দান নিয়ে ছাড়ব।
ডাকু জানাফ এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল —জাঁহাপনা, খােদার কসম, আর ভুলেও ঝুট বাৎ বলব না। আপনার বাৎ-ই সাচ্চা বটে, খােদার নামে ফিন কসম খেয়ে বলছি। আমি এ-মুহুর্তেই এনগর ছেড়ে চলে যাব। জিন্দেগীতে আর আপনার মুলুকের নামও করব না। মেহেরবানি করে এবারের মত দোয়া করুন, মাফ করে দিন।
–তুই এক সাচ্চা শয়তান! তােকে জিন্দা রাখলে আমার গুনাহ হবে। তােকে যত জলদি সম্ভব দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
কথা বলতে বলতে জুমূর্যদ জল্লাদকে ডেকে একই রকমভাবে ডাকু জানাফ-এর ছাল চামড়া ছাড়িয়ে নগরীর প্রবেশদ্বারে টাঙিয়ে রাখার নির্দেশ দিল। আর ছালচামড়াহীন ধড়টিকে আধ-পােড়া করে নালায় ফেলে দেয়ার হুকুমও দিল।
জল্লাদ সুলতানের হুকুম তামিল করল। পাখির ডাকে ভাের হ’ল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন। '
তিন শ' সাতাশতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর পড়তে না পড়তেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাঁহাপনা, সুলতান ছদ্মবেশী জুমুর্যদ আগের মতই ঢেঁড়া পিটিয়ে তৃতীয় খানাপিনার মজলিসের বন্দোবস্ত করল। উজির, নাজির, আমীর, ওমরাহ থেকে শুরু করে তার সুলতানিয়তের সাধারণ প্রজারাও যথাসময়ে হাজির হ’ল। খানাপিনা শুরু হ’ল। বাদশাহী খানা আর সরাবের ঢালাও বন্দোবস্ত। সবার সামনে অন্যান্য খানার সামনে বিরিয়ানির রেকাবিও একটি করে রাখা হয়েছে। কিন্তু বিরিয়ানির রেকাবি কেউ ভুলেও ছুঁলাে না। খাওয়া তাে দূরের কথা, সেদিকে তাকাতেও কারাে সাহসে কুললাে না। ওরে ব্বাস! বিরিয়ানি খেয়ে দু'দুটো জান খতম হয়ে গেল! কোন—সাহসে আবার কেউ এদিকে হাত বাড়াব?
খানাপিনা যখন পুরােদমে চলছে তখন হঠাৎ এক বুড়াে আসরে হাজির হ’ল। তার চুল-দাড়ি সব শন পাটের মত সফেদ।
জুমুর্যদ আগন্তুক বুড়ােটিকে সহজেই চিনতে পারল। হতচ্ছাড়া শয়তান রসিদ অল-দিন। সেই সাকরেদদের নিয়ে তাকে জোর করে তার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে এসেছিল। শয়তানটিকে দেখেই জুমুরূদ-এর শিরে খুন চেপে গেল। পারলে ধরে এনে সে এখনই তাকে জ্যান্ত গিলে খায়।
জুমুর্যদ কুঁচকে রসিদ-এর দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল, সে এখানে কি করে হাজির হ’ল? তার ভাই বরসুম তাে এক মাস আগেই এখানে এসেছিল। এক মাস পেরিয়ে গেল। তবুও সে না ফেরায় উষ্ঠিত হয়ে নিজেই ঘর ছেড়ে বেরােয়। এখানে-ওখানে ঢুঁড়ে ভাইয়ার তল্লাশী করে সব শেষে এখানে হাজির হয়েছে। নসীব। হ্যাঁ, নসীবই রসিদ’কে এখানে, ভােজের মজলিসে হাতছানি দিয়ে ডেকে এনেছে। ফিন নসীবই তার হাতে বিরিয়ানির রেকাবিও তুলে দিয়েছে।
জুমুর্যদ আপন মনে হেসে ভাবতে লাগল—“আল্লাহ-এর মর্জি বােঝার সাধ্য কি। নইলে বেছে বেছে শয়তান, দোজাকের কীটগুলাে একে একে এখানে হাজির হতে যাবে কেন! আর এতসব খানা থাকতে বিরিয়ানির রেকাবি-ই বা কেন হাতে তুলতে যাবে? কিন্তু এ তাে ঠিক বাৎ নয়। প্রজারা কেন তাদের প্রিয় খানা বিরিয়ানি খাবে না ? খানা সামনে রেখে আত্মাকে কষ্ট দেবে কেন? অসম্ভব! এ হতে পারে না। আমি হুকুম জারি করব, যে বিরিয়ানি না খাবে তাকে ফাঁসির দড়িতে লটকে দেব।
সুলতান জুমুরদ এবার ক্রোধােন্মত্তা হয়ে উঠল। চিল্লিয়ে হুকুম দিল, বিরিয়ানির রেকাবি নিয়ে যে সফেদ চুল-দাড়িওয়ালা বুড়ােটি বসে তাকে পিঠমােড়া করে বেঁধে আমার সামনে হাজির কর।
সিপাহীরা রসিদকে বেঁধে টেনে হিচড়ে সুলতানের সামনে হাজির করল।
সুলতান তাকে জিজ্ঞাসা করল— তাের নাম কি? পেশা কি? আর এ-মুলুকেই বা এসেছিস কোন্ মতলবে?'
‘আমার নাম রুস্তম, জাঁহাপনা। পেশা বলতে নির্দিষ্ট কোন কিছু আমার নেই। তবে একটি নেশা আছে বটে। মুলুকে মুলুকে ঢুঁড়ে বেড়ানােই আমার কাজ। আমি দরবেশ কিনা তাই - 
—“চুপ কর শয়তান কহিকার!
সুলতানের হুকুমে ফিন মন্ত্রপূত বালি এল। সঙ্গে একটি পেন্সিলও আনা হল।।
আগের মতই পাটাতনের ওপর বালি বিছিয়ে আঁক কাটা শুরু হ’ল। আঁক কাটা হয়ে গেলে সুলতান জুমর্যদ বিড় বিড় করে কী সব মন্ত্র আওড়াল। ব্যস, এবার বাজখাই গলায় গর্জে উঠল—“শয়তান কুত্তা কাহিকার। সুলতানের সামনে ঝুটবাৎ বলতে তাের মুখে এতটুকু আটকাল না। আমার গণনা তাে হিসাব দিচ্ছে, তুই দরবেশ টরবেশ কিছুই না, সাক্ষাৎ শয়তান। তাের নাম রসিদ অল-দিন, ঠিক তাে? লেড়কি আর অন্যের বিবির ওপর অত্যাচার, ইজ্জৎ হানি করাই তাের একমাত্র ধান্দা, মুসলমানের ভেক ধরে তুই ঢুঁড়ে বেড়াস। আদতে তুই খ্রীষ্টান। তা-ও ফিন ধর্মচ্যুত। এখনও বাতাচ্ছি, তাের গুণাহ মেনে নে। আমার উজির নাজির আর প্রজাদের সামনে তাের সাচ্চা পরিচয় রাখ। নইলে এখানে, এমুহুর্তেই তাের ধড় থেকে শিরটি আলাদা হয়ে যাবে।' শয়তান রসিদ জান রাখার তাগিদে বিলকুল কসুর স্বীকার করে নিল। আর বার বার গুস্তাকীর জন্য মাফি মাঙ্গতে লাগল। বদনা বদনা চোখের পানিও ঝরাল।
সুলতান জুমর্যদ জল্লাদকে তলব করল। জল্লাদ এলে তাকে হুকুম করল, উলটি পায়ে দড়িবেঁধে শির নিচের দিকে দিয়ে ঝুলিয়ে রাখবি। পাছায় হাজার ঘা জুতাে মেরে শরীর থেকে ছাল চামড়া খিচে নিবি। তারপর চামড়াটি নিয়ে আগের কুত্তাগুলির চামড়ার পাশে সেঁটে রাখবি। নিয়ে যা, জলদি সব সেরে ফেল।
জল্লাদ এবার রসিদ’কে সদর রাস্তায় নিয়ে গেল। সুলতানের হুকুম বিলকুল তামিল করল। সবশেষে রসিদ-এর চামড়াটি নিয়ে নগরের প্রবেশ দ্বারে সেঁটে দিল।
জুমুরদ এক এক করে তার শত্রুদের প্রাপ্য শাস্তি বিধান করল বটে। কিন্তু সে কোথায়? কোথায় তার মেহবুব? বহুৎ কায়দা কৌশল করে, বহুৎ তল্লাশী চালিয়েও তার জান, তার কলিজা আলী শার-এর পাত্তা তাে কিছুতেই মিলছে না। তার দিল থেকে শান্তিসুখ নির্বাসিত।
জুমুরদ সবার অলক্ষে চোখে পানি ঝরিয়ে বলে--খােদা, আমাকে নিয়ে একী তাজ্জব খেলায় মেতেছ। খােদা, আমাকে বদলা নেয়ার ক্ষমতা দান করেছ বলে তােমাকে হাজার সুকরিয়া জানাচ্ছি। আমার আলী শার'কে আমার বুকে ফিরিয়ে দাও। তাকে না পেলে আমার জিন্দেগী যে একদম বরবাদ হয়ে যাবে, তুমি কি তা জান না, বােঝ না?
জুমুরদ দিনভর দরবারে কাজের মধ্যে ডুবে থাকে আর রাতভর আলী শার-এর জন্য চোখের পানি ঝরায়। দিন যায়, মাহিনা যায়-জুমুরদ ফিন পরের মাহিনার জন্য অধীর প্রতীক্ষায় থাকে। সুলতান জুমুর্যদ-এর খানাপিনার আসর ফিন জমজমাট হয়ে ওঠে। পারিষদ ও প্রজারা কবজি ডুবিয়ে খানা সারে। সরাবের বন্যা বয়ে যায়।
চোখের পানি ফেলে জুমূর্যদ করুণ মিনতি জানায়--খােদা মেহেরবান, যােশেফ’কে তাে তুমিই তার আব্বার বুকে ফিরিয়ে
( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments