গল্পের পরবর্তী অংশঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
আলী শার চোখের পানি মুছতে মুছতে নিজের নসীবের বিড়ম্বনার ঘটনা বুড়িকে সবিস্তারে বলল।
বুড়ি তাকে প্রবােধ দিতে গিয়ে সমবেদনা প্রকাশ করে বলল-“বেটা ঘাবড়াও মাৎ! সবঠিক হয়ে যাবে। খােদার ওপর ভরসা রাখ।
বুড়ি বুঝল নওজোয়ানটি বিরহ-জ্বালায় দগ্ধ হচ্ছে। আমার বাৎ মান। তুমি এখনি বাজারে যাও। ঝটপট ফেরি করার একটি ঝুড়ি খরিদ করে নিয়ে এসাে। আর কিছু কাচের চুড়ি, সস্তা দামের কানের দুল আর কিছু পুঁতির মালাও খরিদ করবে। তােমার এসব সামানপত্র নিয়ে আমি বাড়ি-বাড়ি ফেরি করে বেড়াব। তােমার বিবি জুমুর্যদএর হদিস না পাওয়া পর্যন্ত আমি হররােজ ফেরি করে বেড়াব। খােদাতাল্লার মর্জিতে আজ না হােক কাল সে তােমার ডেরাতেই ফিন ফিরে আসবে। আমার বাৎ মিলিয়ে নিও বেটা। কান্না থামাও, ভাবনা ছাড়। যা বললাম সব নিয়ে জলদি ফিরে আসবে।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ বাইশতম রজনী
মাঝরাত্রে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—‘জাঁহাপনা, বুড়ির পরামর্শ অনুযায়ী আলী শার বাজারে ঢুঁড়ে ঢুঁড়ে একটি ফেরি করার ঝুড়ি আর সামানপত্র খরিদ করে নিয়ে এল। বুড়িটি এবার মাথায় ফেরির ঝুড়ি চাপিয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে ঠকঠক করতে করতে শহরের বাড়ি বাড়ি ঢুঁড়ে বেড়াতে লাগল।
বুড়ি এ-বাড়ি সে-বাড়ি ঢুঁড়তে ঢুঁড়তে একদিন শয়তান রসিদ এর বাড়ির দরজায় এসে হাঁক দিল—‘চুড়ি, মালা, দুল নেবে গাে? চুড়ি, মালা, দুল নেবে?
বুড়ি যখন তার সওদা নিয়ে রসিদ অল-দিন-এর মকানের দরওয়াজায় এসে হাঁক দিল ঠিক তখনই আধমরা জুমুর্যদ’কে কয়েক জন দাসী রসুইখানায় ক্রীতদাসীদের আড্ডায় নিয়ে এল। দীর্ঘসময় ধরে তার ওপর জানােয়ারের মাফিক অত্যাচার চালানাে হয়েছে। কপাল ফেটে খুন গড়াচ্ছে। সওদার ঝুড়ি মাথায় করে বুড়ি মকানের কড়া নাড়ল। এক ক্রীতদাসী দরওয়াজা খুলে দিলে বুড়ি তার সামানের বিবরণ দিল। তারপর বলল এসব সামানপত্র খরিদ করতে পারে তােমাদের এমন কেউ আছে কি?
–‘আছে। এসাে, ভেতরে এসাে,’ ক্রীতদাসীটি বলল।
বুড়িকে নিয়ে রসুইখানার কামরার দরওয়াজায় বসতে দিল। ব্যস, ক্রীতদাসীরা তাকে ঘিরে ধরল। সবাই কিছু না কিছু কিনতে আগ্রহী। উৎসাহের সঙ্গে সবকিছু দেখতে লাগল।
বুড়ির চোখ এদিক-ওদিকে চক্কর মারতে লাগল। এক সময় দেখল, রসুই খানার মেঝেতে পড়ে এক আউরৎ কাৎরাচে ব্যাপারটি বুঝতে তার বাকী রইল না।
ক্রীতদাসীরা যখন সামানপত্র নিয়ে মেতে রয়েছে তখন বুড়ি গুটি গুটি রসুইখানার ভেতরে ঢুকে বলল—‘বেটি, আল্লাহকে ডাক। তিনিই তােমার তকলিফ দূর করবেন, তাঁর নির্দেশেই আমি তােমাকে উদ্ধার করার জন্য এখানে হাজির হয়েছি। তুমিই তাে আলী শার-এর বিবি ক্রীতদাসী জুমুর্যদ, তাই না? বুড়ি এবার সমানপত্র ফেরী করার অছিলায় কিভাবে এখানে হাজির হয়েছে সে বৃত্তান্ত তার কাছে সংক্ষেপে ব্যক্ত করল।
বুড়ি বার কয়েক এদিক-ওদিক তাকিয়ে ক্রীতদাসীদের অবস্থা দেখে নিয়ে অপেক্ষাকৃত গলা নামিয়ে বলল—কাল সন্ধ্যাবেলা তৈরী থেকো, আমি তােমাকে পালাবার ফিকির করে এখান থেকে ভাগিয়ে নিয়ে যাব। আর একটি বাৎ, এখান থেকে জানালা দিয়ে রাস্তা দেখা যায়। রাস্তা থেকে শিসের আওয়াজ পেলে তুমি শিস দিয়ে জানান দিও।
জুমুর্যদ ঘাড় কাৎ করে সম্মতি জানাল।
বুড়ি বলে চলল—“শিস শুনতে পাওয়া মাত্র তুমি প্রাচীর টপকে নিচে নেমে যাবে, মনে থাকবে? আলী শার তােমার জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করবে।
বুড়ির বাৎ শােনামাত্র জুমূর্যদ খুশীতে চিকচিক করতে লাগল। আনন্দে ডগমগ হয়ে বুড়ির হাত দুটো জড়িয়ে ধরে কৃতজ্ঞতা জানাল।
বুড়ি এবার রসিদ-এর বাড়ি থেকে বেরিয়ে লম্বা লম্বা পায়ে আলী শার-এর মকানে গেল। জমর্যদ-এর সঙ্গে যে-পরামর্শ হয়েছে। তার কাছে সবিস্তারে ব্যক্ত করল।
আলী শার বুড়িকে বহুভাবে ধন্যবাদ দিল। কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ কিছু উপহারও তাকে দিতে চাইল। বুড়ি কিছুতেই কোন পুরস্কার নিতে সম্মত হ’লনা। সে বলল—আল্লাহর নির্দেশেই সে এ-কাজ করেছে। পুরস্কার নেয়ার অধিকার তাে তার নেই।
বুড়ি আলী শার-এর কাছ থেকে ফিরে নিজের ডেরায় এল। রুজু সেরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাল, আলী শার যেন আগামীকাল তার বিবিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
বুড়ি বিদায় নিলে অফুরন্ত খুশীর মুহুর্তেও আলী শার-এর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তার মধ্যে এখন আতঙ্ক দেখা দিল জুমুর্যদ ফিরে এলে সে কোন্ মুখে তার সামনে দাঁড়াবে? সে তাকে যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশী করে সতর্ক করে দিয়েছিল—পঞ্চাশ দিনারের একটি কানাকড়ির বেশী দামে কার্পেট বিক্রি করবে না। ভুলেও যেন অচেনা কোন ফেরীওয়ালার কাছে কার্পেট বিক্রি কোরাে না। কিন্তু তার কোন নির্দেশই তাে সে পালন করে নি। আর এরই জন্য এ প্রমাদ ঘটল। আলী শার পরের দিন যথা সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে তার বিবি জুমুর্যদ-এর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। রাত্রি ক্রমেই গভীর হতে থাকে। কিন্তু তার বাঞ্ছিতার দেখা নেই। সময় ক্রমে এগিয়ে চলে। চোখ দুটোতে নিদ জড়িয়ে আসে। নিদ কখন টুটল যখন সে সংজ্ঞা ফিরে পেল। তখন নিজের হাত-পায়ের দিকে তাকিয়ে থমকে যায়। হাত-পা বাঁধা। হায় আল্লাহ! এ-হালৎ কে, কখন করল? নসীব। বিলকুল নসীবের খেল। কোশিস যতই করা যাক না কেন, নসীব এড়াবার সাধ্য কারাে নেই। নইলে সে রাত্রেই রসিদ এর বাড়ি ডাকুরা কেনই বা ঘিরতে যাবে? ডাকুরা রসিদ-এর বাড়ি ঘেরাও করতে গিয়ে আলী শারকে প্রাচীরে হেলান দিয়ে গভীর নিদে আচ্ছন্ন অবস্থায় দেখতে পায়। তার গায়ে বহুমূল্য পােশাক আশাক ছিল। ডাকাতরা তার গা থেকে সেগুলাে খুলে নিল। ডাকুরা হঠাৎ দেখল রসিদ-এর বাড়ির ওপরতলার একটি জানালা খুলে গেল। ঝটপট তারা এক ধারে সরে গিয়ে আত্মগােপন করে রইল।
কিছুক্ষণ বাদেই ডাকাত-সর্দার শুনতে পেল খােলা জানালা দিয়ে এক লেড়কি:শিস দিয়ে যেন কাকে তলব করছে। ব্যাপারটি প্রত্যক্ষ করে তার কৌতূহল হ’ল। লােভও গেল বেড়ে। সে-ও আচমকা একটি শিস দিল। পরমুহূর্তেই সে অবাক হ’ল। দেখতে পেল, একটি লেড়কি জানালা দিয়ে, ঝুলন্ত দড়ি বেয়ে বেয়ে প্রাচীরের এপাশে চলে আসছে। লেড়কিটি মাটিতে পা দেবার আগেই ডাকাত-সর্দার তাকে পড়ন্ত পাকা ফলের মত লুফে নিল।
ডাকু লেড়কিটিকে হাতের নাগালের মধ্যে পাওয়ামাত্র তাকে পিঠের ওপর নিয়ে উধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। তার গায়ে অসুরের তাগদ। জুমুরদ’কে নিয়ে ছুটে পালাতে তাকে কিছুমাত্রও বেগ পেতে হ’ল না। আলী শার তখনও সংজ্ঞাহীন অবস্থাতেই প্রাচীরে হেলান দিয়ে শুয়ে তার বিবিকে উদ্ধার করার ফিকির বের করার খােয়াব দেখে চলেছে।
এদিকে অসুরের মত প্রবল বিক্রমে ডাকাতটি জুমুর্যদ’কে নিয়ে দৌড়ােবার সময়েও জুমুর্যদ এতটুকু বুঝতে পারে নি সে আলীশার-এর পিঠে নয়, অন্য কারাে পিঠে অবস্থান করে পথ পাড়ি দিচ্ছে। তবে দৌড়ােনাের গতি দেখে সে বিস্মিত হয়। সে এক সময় বলল—“কি গাে, তবে যে বুড়িটি বলল, তুমি আমার শোকে একেবারে কাবু হয়ে গেছ। কিন্তু কার্যত তাে তােমার চেয়ে দ্রুত দৌড়ােতে দেখছি! বুড়িটি বানিয়ে বানিয়ে বেমালুম এমন ঝুট বাৎ বলে গেল!
ডাকুটি মুখে কলুপ এঁটে রইল। কোন উত্তর দেয়া দূরের কথা টু-শব্দটিও করল না। জুমুর্যদ-এর কৌতুহল হল। শক্ত করে তার চুলের মুঠি ধরে ঘাড় কাৎ করল। তার মুখটি দেখার কোশিস করল। ডাকাতটির চুল মুঠো করে সামান্য কাৎ হয়ে ঝুঁকতেই তার কলিজা ছাৎ করে উঠল। ভাবল, আলী শার-এর চুল তাে এমন পাটের মত নয়। হাত দুটো আরও নামিয়ে তার গালের ওপর বার কয়েক ঘষল। এবার সে নিঃসন্দেহ হল, নির্ঘাৎ অন্য কেউ তাকে ছল করে নিয়ে চলেছে। চিল্লিয়ে উঠল—কে? কে তুই? তুই কে, কথা বল।
ইতিমধ্যে ডাকুটির তেজী ঘােড়া তাদের নিয়ে নগর ছাড়িয়ে প্রায় ফাকা এক জায়গায় হাজির হয়ে গেছে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। চিল্লিয়ে গলা ফাটালেও কেউ শুনতে পাবে না। কোশিস অবশ্য করল। ফয়দা কিছু হ’ল না।
ডাকু সর্দার বলল—সুন্দরী, কোন ফয়দা হবে না। কেউ শুনবে না তােমার গলা। শােন, আমি এক ডাকু। জনাফ আমার নাম। আহমদ অল-দানাব আমার সর্দার। তার দলে আমার মত চল্লিশজন ডাকু আছে। সবাই আমার মত গায়ে গতরে এমন বিশাল। তবে দুঃসাহস বলতে যা কিছু আমারই সবচেয়ে বেশী। আবার বদমাইশিতেও আমি সেরা। আমার সাফ বাৎ শােন সুন্দরী। আজ রাত্রিতে তােমার যৌবনের জোয়ার লাগা এ তুলতুলে নরম শরীরটিকে আমি আগে দলন, পেষণ আর সম্ভোগের মাধ্যমে সাধ মিটিয়ে ভোগ করব। তারপর ছিবড়েটুকু ছুঁড়ে দেব আমার সাঙ্গাৎ ডাকুদের দিকে। তারাও একে একে তােমাকে ছিড়ে ফেঁড়ে খুবলে খুবলে খাবে। দেখবে, জিন্দেগীতে এত সুখ কোন মরদ তােমাকে দিতে পারে নি। অনেকেই হয়ত তােমার ওপর চেপেছে। লদকালদকি করেছে। নিজেরা সুখ কতটুকু পেয়েছে, জানি না। কিন্তু তােমাকে নির্ঘাৎ আমার মত এত সুখ দিতে পারে নি। তােমার ওপরে আমি চেপে যখন তলপেটে সুড়সুড়ি দেব তখন তােমার দিল বলবে, আমাকে দলাইমলাই করে শেষ করে দাও। জান একদম খতম করে দাও—এত সুখ আমি আর সইতে পারছি না। ঠিক তখনই তােমার কামােন্মাদ শরীরের দুই উরুর মাঝখানে আমি ডুবে যাব। তারপর ? আমরা উভয়ে পরম তৃপ্তির অতল অন্ধকারে একটু একটু করে ডুবে যাব, হারিয়ে যাব। তারপরই তােমার চাওয়ার চেয়ে অনেক অনেক বেশী পাওয়ার মধ্য দিয়ে শরীর এলিয়ে পড়ে থাকবে। এবার একই ভাবে আমরা চল্লিশজন জোয়ান মরদ একে একে তােমার শরীরটি নিয়ে নাড়াচাড়া করব। ছিবড়ে চুষে চুষে রস নিঙড়ে নেয়ার কোশিসে মেতে উঠব।
-উফ! খােদা মেহেরবান! কী ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে আমাকে ঠেলে দিলে! এমন কি গুণাহ করেছি আমি যার জন্য আমাকে এমন চরম পরীক্ষার মধ্যে ঠেলে দিলে! আমাকে এনে ফেললে একেবারে বিশ জোড়া হিংস্র জানােয়ারের হাতে! জুমূর্যদ চিল্লিয়ে কাদতে চেষ্টা করল। চি চি শব্দ ছাড়া আর কিছুই তার গলা দিয়ে বেরলাে না। কারণ, ইতিমধ্যেই ডাকুটি তার মুখ চেপে ধরেছে। বিপদের মােকাবেলা করার জন্য সে খােদাতাল্লার কাছে শক্তি, সাহস ও ধৈর্য প্রার্থনা করতে লাগল।
জুমূর্যদ ভাবল, খােদাতাল্লার মর্জিতেই দুনিয়ার সব কাজ হয়। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে একচুলও এদিক ওদিক হবার জো নেই। নসীবকে মুখ বুজে সহ্য করতেই হবে।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ তেইশতম রজনী
রাত্রি একটু গভীর হতেই বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাহাপনা, দুর্ধর্ষ সে ডাকুটি জুমুরদ’কে ফিন পিঠে তুলে নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করল। এক সময় এক পাহাড়ের গুহায় হাজির হ’ল। চল্লিশটি ডাকূর ডেরা। তারা দিন গুজরান করে এখানে। সারারাত্রি নিজেদের ধান্দায় ঢুঁড়ে বেড়ায়। নিশাচররা যা করে থাকে। ডাকুদের ডেরায় এক বুড়িও থাকে। সে এ-ডাকুটির আম্মা। গুহার মুখে গিয়েই ডাকুটি তার বুড়ি আম্মাকে ডাকল। জুমুরদ’কে বুড়ির হাতে সপে দিয়ে সে বলল—“আমি ফিন ফিরে না আসা পর্যন্ত হুরীটি তােমার জিম্মায় রইল। একটু তােয়াজ টোয়াজ করে ওর দিলকে তৈরী কর। আমি দোস্তদের সঙ্গে এক জায়গায় হামলা চালাতে যাচ্ছি। এতগুলাে জোয়ান মরদের মহব্বত সহ্য করতে হলে দিলকে শক্ত করতে হবে তাে।”কথা বলতে বলতে ডাকুটি ঘােড়া ছুটিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ডাকুটি বিদায় নিলে বুড়ি জুমুর্যদকে পাশে বসাল। তার গায়েমাথায় হাত বুলিয়ে বলল—‘বেটি, চোখের পানি মােছ। আনন্দ কর। ভাবতে পার, চল্লিশটি জোয়ান মরদ এক এক করে তােমার তুলতুলে দেহটিকে নিয়ে যখন লদকালদকি করবে তখন কী সুখই পাবে! সুখে-তৃপ্তিতে তােমার দিল নেচে নেচে উঠবে। একা চল্লিশজন জোয়ান মরদকে পাড় করার নসীব কয়জনের হয়, বল?”
জুমুর্যদ বুড়ির সব বাৎ নিঃশব্দে শুনল। টু-শব্দটিও করল না। বােরখাটি খুলে মাথার তলায় দিয়ে শুয়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদে পানি ঝরাতে লাগল। অবশিষ্ট রাত্রিটুকু দু’চোখের পাতা এক করতে পারল না। ভােরে গুহার মুখ দিয়ে সূর্যের আলাে উকি দিল। সে গুহার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে চোখের পানি ঝরাতে ঝরাতে আপন মনে বলতে লাগল-শয়তানের নজর পড়েছে আমার উপর। একটি নয়, চল্লিশটি শয়তান আমার দিকে জুল জুল করে লােলুপ দৃষ্টিতে তাকাবে। তারপর ? আমার দেহটিকে নিয়ে সবাই হিংস্র জানােয়ারের মত-উফ! আর ভাবতে পারছি না! ইয়া আল্লাহ! একী কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেললে আমাকে! এ কয়েদখানা থেকে ভেগে যাওয়ার চিন্তা পাগলের প্রলাপ। ফিন নিশ্চেষ্ট হয়ে এখানে বসে থাকাও সম্ভব নয়। কিন্তু কি করে আমি আত্মরক্ষা করব! ফিকির আমাকে করতেই হবে। আমার আত্মা, আমার ইজ্জৎ আর আমার সতীত্বকে রক্ষা আমি করবই করব। খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, আমার দেহটিকে কিছুতেই আমি গুনাহের অতল-গহ্বরে ডুবিয়ে দিতে পারব না। জুমুরদ নিজের দিলের সঙ্গে বােঝাপড়া সেরে উঠে দাঁড়াল। ওড়না দিয়ে চোখের পানি মুছল। এবার গুটিগুটি বুড়ির কাছে এল। জোর করে কণ্ঠস্বরের স্বাভাবিকতা এনে বলল—তােমার আদর যত্নে আমার দিল আর দেহ দু’-ই চাঙা হয়ে উঠেছে। চল্লিশটি জোয়ান মরদের লদকালদকি সহ্য করতে কোন তকলিফই হবে না। কিন্তু সবে তাে সকাল হ’ল। কাম কাজ তাে শুরু হবে সেই রাত্রির অন্ধকার নেমে এলে, ইয়া পেল্লাই দিন। এতক্ষণ একা একা মুখ বন্ধ করে বসে থাকলে কামজ্বালা আমাকে পেয়ে বসবে। কলিজাটিকে কুঁরে কুরে খাবে। বুড়ি সবিস্ময়ে তার মুখের দিকে চোখের নিস্তেজ মণি দুটোকে মেলে জুমুরদ-এর মুখের দিকে তাকাল। তার তােবড়ানাে মুখে যুদ্ধ জয়ের হাসি।
জুমুর্যদ বলে চলল—‘চুপটি করে বসে না থেকে বরং চলুন গুহার বাইরে গিয়ে রােদে পিঠ দিয়ে বসে আপনার মাথার উকুন বেছে দেই। তার বাৎ শুনে বুড়ি তাে খুশীতে একেবারে ডগমগ। হাত বাড়িয়ে তার গালে চুমু খেয়ে বলল—“তুমি পারবে বেটি, চল্লিশটি জোয়ান মরদ-কে পাড় করতে। তােমার ওপর খােদাতাল্লার দয়া আছে।
-হ্যা, আমারও এরকমই বিশ্বাস।
–‘তা বেটি, আমার উকুনের ব্যাপারেই যখন বললে, শােন। তবে—কেনই বা উকুনের ঝক সরাইখানার মত আমার মাথা আশ্রয় করবে না। এখানে আসা অবধি এক বদনা পানিও মাথায় ঢালার সুযােগ হয় নি। তাই-তাে তামাম দুনিয়ার উকুন এসে আমার মাথায় জমায়েত হয়েছে। খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, তুমি আমার মাথায় উকুনগুলােকে যদি ঝেটিয়ে বিদেয় করে দিতে
( চলবে )

0 Comments