গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
আমি আরও অবাক মানলাম, যখন দেখলাম ছােট্ট এক লাঠির আঘাতেই সাপটি এলিয়ে পড়ে গেল। আর খতমও হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই।
আমি উন্মাদের মত ছুটে গিয়ে হতভাগ্যটিকে বিষধর সাপটির মুখগহ্বর থেকে ছুটে বের করে ফেল্লাম। হতভাগ্যটি বলল —আমি আদমিটাদমি কিছু নই।
আমি তাকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই আমি সবিস্ময়ে বলে ওঠলাম—‘তুমি আদমি নও! তবে? তবে কি তুমি!
—“জিন। এ-পথে উড়ে যাচ্ছিলাম। তােমার মুখে আল্লাতাল্লার নাম শুনে আমি হঠাৎ কক্ষচ্যুত হয়ে যাই। পাথরের ওপর পড়তেই সাপটি আমাকে টপ করে মুখে পুরে নেয়।
তারপর বলল —“তুমি আমার জান বাঁচিয়েছ। তােমার জন্য আমি কিছু করতে পারলে নিজেকে ধন্য জ্ঞান করব। বল, তােমার কোন কাজে আমি লাগতে পারি।
—“বহুৎ আচ্ছা! তবে এক কাজ কর। আমাকে আমার বিবির কাছে দিয়ে এসাে।
মুচকি হেসে সে আমাকে এক ঝটকায় পিঠে তুলে নিল। বায়ুর বেগে উড়তে উড়তে চোখের পলকে আমার মকানের দরওয়াজায় নামিয়ে দিল।
আমার বিবি তখন হাপুস নয়নে কান্নাকাটি করছে। এরই মধ্যে কয়েক বদনা চোখের পানি ফেলেছে। সে নিঃসন্দেহ আমার কম্মফতে হয়ে গেছে। আমাকে পেয়ে বলল—এ-শয়তানের মুলুকে আর নয়। চল, জমি জিরাত আর মকান প্রভৃতি যা আছে বিলকুল বিক্রিটিক্রি করে আমরা এখান থেকে চম্পট দেই।
—“তারপর ? যাবে কোথায় ?
—“কেন, বাগদাদে। তােমার নিজের মুলুকে। আমার আব্বাজীরও তাে সেরকমই মত ছিল—তিনি গােরে যাবার পর আমি যেন তােমার সাথে বাগদাদে চলে যাই। আমার আব্বাজী অগাধ সম্পত্তি রেখে গেছেন। বিলকুল বেচে সাফসুতরা হয়ে যাও। তারপর একটি সওদাগরী জাহাজ খরিদ করে সামানপত্র নিয়ে এখান থেকে চল চম্পট দেই।
–হ্যা, বহুৎ আচ্ছা মতলব! বিবিজান, তবে তা-ই করা যাক।
অত্যাবশ্যক কিছু সামানপত্র রেখে বাকী সব দিলাম নিলামে চড়িয়ে। প্রচুর দিনার আমদানি হয়ে গেল। একটি জাহাজ খরিদ করে ফেললাম। তারপর বিবিকে নিয়ে জাহাজে উঠলাম। ব্যস, বসরাহ বন্দর হয়ে আমরা সােজা বাগদাদে পৌঁছে গেলাম।
আমার নয়া বিবিকে দেখে আত্মীয়-দোস্তরা তাে মহাসুখী।
সুদীর্ঘ সাতাশ সাল বাদ আমি মুলুকে ফিরে এসেছি। আমার আত্মীয়-দোস্তরা বলল—“সিন্দবাদ, জনমভর তাে সাগরে ভেসে বেড়ালে আর পরদেশে ঢুঁড়ে বেড়ালে। এখন বুড়াে হয়েছ। হাড্ডির জোর কমে গেছে, এবার ঘরে থিতু হও। যে ক’দিন দুনিয়ায় থাক বিবি-বালবাচ্চা নিয়ে কাটিয়ে দাও।
আমিও সেরকমই ভাবলাম। আমার অগাধ ধন দৌলত। বাগদাদের সেরা ধনী। বিবি আর বালবাচ্চা নিয়ে ঘর সংসারে লিপ্ত থাকব। আর অবসর বিনােদনের জন্য ইয়ার দোস্তরা তাে রয়েছেই। তারপর থেকে বিপদ আপদ অগ্রাহ্য করে সুখে দিন গুজরান করছি।'
সিন্দবাদ নাবিক এবার সিন্দবাদ কুলির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বল্ল-“দোস্ত, এবার ভেবে দেখ তাে তােমার বয়সে আমার জীবন যাত্রার সঙ্গে তােমার কী আশমান-জমিন ফারাক। আমি প্রায়ই এমন পরিস্থিতিতে পড়তাম। জিন্দেগীতে আর কোনদিন বিবি আর বালবাচ্চার কাছে ফিরতে পারব কিনা একমাত্র আল্লাতাল্লাই জানতেন। আর তুমি হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে দিনভর মােট বয়ে বেড়াও। কিন্তু তােমার তাে এক ভরসা থাকে দিনের শেষে ফিন ঘরে ফিরে বিবি আর বালবাচ্চার মুখ দেখতে পাবেই।
সিন্দবাদ কুলী এবার বৃদ্ধ সিন্দবাদ নাবিকের হাত দুটো জড়িয়ে ধরে অনুতাপের স্বরে বলে উঠল—“জী, আমাকে মাফ করে দেবেন। আমার সেদিনের দুঃখের গান শুনে আপনি নির্ঘাৎ গােসসা করেছেন। এবার আমি আদৎ বাৎ সমঝেছি—যে আদমি যেরকম কর্ম করে ফলভােগও সেরকমই করে।
বেগম শাহরাজাদ কিসসা শেষ করে এবার বললেন‘জাঁহাপনা কিসসা খতম হ’ল বটে। তবু বলছি। সিন্দবাদ নাবিক আর সিন্দবাদ কুলীর মধ্যে হৃদ্যতার সম্পর্ক কিন্তু জিন্দেগীভর অক্ষুন্ন ছিল। সিন্দবাদ কুলী দিনভর কাজকর্মে লিপ্ত থেকে দিনের শেষে দোস্ত সিন্দবাদ নাবিকের মকানে হাজির হয়। খানাপিনা, নাচা-গানা আনন্দ-ফুর্তি চলে প্রায় সারারাত্রি অবধি তারপর ফিরে আসে বিবি আর বালবাচ্চার কাছে।
বেগম শাহরাজাদ সিন্দবাদ নাবিকের সর্বশেষ সমুদ্রযাত্রার কিসসা শেষ করে চুপ করলেন।
ইতিমধ্যে প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচার পাখিদের কিচিমিচি শুরু হয়ে গেছে। ভােরের পূর্বাভাষ।
বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। নানাভাবে তাকে আদর সােহাগ করতে থাকেন। এমন সময় উজিরের ছােট লেড়কি দুনিয়াজাদ তার দিদির গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠল—বহিনজী, তােমার কিসসা কী সুন্দর, কিসসা শুনলে—
বেগম শাহরাজাদ অধৈর্য ভরে তাকে ধমক দিয়ে ওঠে—“চুপ কর মুখপুড়ী! সময়-অসময় বােঝে না! ওদিকে যা। পাশ ফিরে শুয়ে থাক। কিশােরী দুনিয়াজাদ পাশ ফিরে শােয়ামাত্র তারা উভয়েই সক্রিয় হয়ে ওঠেন। বাদশাহ ধীরে ধীরে নিজের ঠোট দুটোকে বেগমের ঠোটের কাছে নিয়ে যান। তারপর চুম্বনের মাধ্যমে নিজে তৃপ্তিলাভ করেন আর উদ্ভিন্ন যৌবনা বেগমকে তৃপ্তিতে তৃপ্তিতে ভরিয়ে তােলেন। তারপর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব দলন, পেষণ ও সম্ভোগের মাধ্যমে পরমতম তৃপ্তি লাভের পর্ব।
এক সময় বাদশাহ শারিয়ার বেগমের সান্নিধ্য থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে মৃদু হাঁপাতে লাগলেন।
বেগম শাহরাজাদও বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে তৃপ্তির রেশটুকুর পুরােপুরি উপলব্ধি করতে লাগলেন।
দুনিয়াজাদ এবার পরিস্থিতি অনুকূলে এসেছে অনুমান করে পাশ ফিরল। শাহরাজাদের গলা জড়িয়ে ধরে বলল–বহিনজী, তােমার কিসসা কী সুন্দর! সিন্দবাদ নাবিকের কিসসা তাে দিলকে একদম উতলা করে দেয়, রােমাঞ্চ জাগায়।
বেগম শাহরাজাদ বলেন—বহিন এ তাে নিছক কিসসাই নয়। সিন্দবাদ নাবিকের দুঃসাহসিক নৌ-অভিযানের ঐতিহাসিক সত্যতাও রয়েছে। এ মিথ্যে নয়, মনগড়া কিসসাও নয়।
বাদশাহ শারিয়ার ভাবলেন, লেড়কিটির রূপ-যৌবন যেমন শরীর ও দিলকে তৃপ্তি দেয় তার চেয়ে ঢের বেশী আনন্দ দান করে তার কিসসাগুলি। এর মধ্যে না জানি রােমাঞ্চকর কত কিসসাই না রয়েছে। আমার চোখের নিদ কেড়ে নিয়েছে। একে কোতল করলে তার দিল-পাগল করা কিসসা থেকে আমাকে বঞ্চিত হতে হবে। এর কিসসা শেষ না হওয়া অবধি একে টিকিয়ে রাখতেই হবে।
বাদশাহ শারিয়ার যখন নিজের কর্তব্য নির্ধারণে ব্যস্ত তখন বেগম শাহরাজাদ বলেন—বহিন, আল্লাতাল্লা যদি জান টিকিয়ে রাখেন তবে কাল তােমাদের আলী শার ও জুমুর্যদ’-এর কিসসা শোনাব। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার বললেন—“দেখি, আল্লাতাল্লার কি মর্জি।
বাদশাহ শারিয়ার আর কিছু না বলে বেগমের কোলে মাথা রেখে চোখদুটো বন্ধ করলেন।
আলী শার ও জুমুর্যদ-এর কিসসা
তিন শ’ যােলম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর আসতে না আসতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসা শুরু করলেন—‘জাঁহাপনা, কোন এক সময়ে খােরাশান নগরে এক বণিক বাস করত। সে ছিল খুবই ধনী। তার নাম ছিল গ্লোরি। বণিক গ্লোরির এক খুবসুরৎ লেড়কা ছিল। তার নাম আলী শার। গ্লোরি ছিল বৃদ্ধ। অতিবৃদ্ধ। শরীরের তাগদ শেষ সীমায় এসে পড়েছে। কোনরকমে চলাফেরা করতে পারে, ব্যস এটুকুই। ব্যবসাপত্র দেখভাল করার ক্ষমতা সে প্রায় হারিয়েই ফেলেছে।
বৃদ্ধ গ্লোরি একদিন তার লেড়কাকে কাছে ডাকল। তার গায়ে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল —“বেটা, আমার দিন ফুরিয়ে এসেছে। এবার যে আমাকে খােদাতাল্লার কাছে যেতেই হচ্ছে। আলী শার আব্বার মুখের দিকে বিষন্ন মুখে, নীরব চাহনি মেলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কি বলবে, এ পরিস্থিতিতে কি বলা উচিত সে সহসা গুছিয়ে উঠতে পারল না।
বৃদ্ধ গ্লোরি বলে চলল —“হ্যা বেটা, আমাকে এবার যে যেতেই হবে। যাবার আগে তােকে কয়েকটি বাৎ বলে যেতে চাইছি।
—“আব্বাজান, কি ? কি বাৎ?
—“বেটা, আমার বাৎ ইয়াদ রাখবি। এ-দুনিয়ার সাথে নিজেকে কোনদিন, কোন অবস্থাতেই জড়িয়ে ফেলবি না। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার বল্ল—তামাম দুনিয়াটিই এক পেল্লাই কামারশালা। তােকে হয় আগুনে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খাক করবে, নয়ত টকটকে লাল আগুনের টুকরায় তাের চোখ দুটোকে অকেজো করে দেবে। আর তা নইলে নিদেন পক্ষে ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় তাের দম বন্ধ করে ছাড়বে। দুনিয়ার কাছ থেকে এমন কিছু পাবি না যার মাধ্যমে ফয়দা কিছু লুঠতে পারবি।।
-“আব্বাজান, আপনার উপদেশ আমি জরুর ইয়াদ রাখব। আমার প্রতি আপনার আর কোন উপদেশ থাকলে বলুন।
‘যদি পারিস তবে কারাে উপকার করবি। কিন্তু ইয়াদ রাখবি বিনিময়ে কিছু প্রত্যশা করবি না। তবে এ-ও ইয়াদ রাখবি, পরােপকার বা আচ্ছা কোন কাজ করার সুযােগ কিন্তু হরবখত আসে । তাই আচ্ছা কোন কাজ হাতের কাছে-
বণিক গ্লোরির কথা শেষ হবার আগেই আলী শার বলে উঠল—“আব্বাজান আপনার এ বাৎ-ও আমি জরুর ইয়াদ রাখব।
‘আমি তাের জন্য প্রচুর ধনদৌলত রেখে গেলাম। খবরদার কিছুই নষ্ট করবি না। অকারণে-অবহেলায় ফুঁকে দিস নে যেন। আর এক বাৎ ইয়াদ রাখবি, দুনিয়ায় যার অর্থকড়ি আছে আদমিরা তাকেই খাতির করে, আদমি ব'লে জ্ঞান করে।
–‘জরুর ইয়াদ রাখব আব্বাজান।
—“আর একটি বাৎ, দিন গুজরান করতে গিয়ে যার অভিজ্ঞতা তাের থেকে বেশী তাকে কখনও অগ্রাহ্য করবি না। বরং তার সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞান-অভিজ্ঞতা যতটুকু পারিস নিয়ে নিবি। আর পরদেশে যেতে গেলে সবার আগে পাকা মাথাওয়ালা আদমির পরামর্শ নিয়ে তবে পাড়ি জমাবার ধান্দা করবি। অবশ্যই তার আগে নয়।
—এ-ও জরুর ইয়াদ থাকবে আব্বাজান।
-এবার তােকে আমার শেষ বাৎ শােনাতে চাইছি। -বলুন আব্বাজান, কি সে বাৎ। —“দুনিয়ায় যতদিন থাকবি, ভুলেও কোনদিন সরাব স্পর্শ করবি না। ইয়াদ রাখবি, জ্ঞানী-গুণীদের মতে, সরাব হচ্ছে দোজখের দক্ষিণ দুয়ার।
—“জরুর ইয়াদ রাখব আব্বাজান।
—সরাব পেটে গেলে কোন কাম আচ্ছা আর কোন্ কাম বুরা সে-জ্ঞান দিল থেকেই লােপ পেয়ে যায়। বেটা, আমার বাৎ ইয়াদ রাখবি, আমি দিল থেকে তােকে দোয়া করছি। এ-দোয়া তােকে সর্বদা ঘিরে থাকবে, বিপদ আপদের মুহূর্তে রক্ষাকবচের মত কাজ করবে।
–এ-ও আমি জরুর ইয়াদ রাখব আব্বাজান।
একনাগাড়ে অনেকক্ষণ বাৎচিৎ করায় বৃদ্ধ বণিক হাঁপাতে লাগল। পর মুহূর্তেই একটু স্বস্তি লাভের প্রত্যাশাস চোখ বুজল।
কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেবার পর বৃদ্ধ ফিন চোখ মেলে তাকাল। তারপর এক সময় হাতদুটো ওপরে তুলে, ঠোট দুটো তিরতির করে কাপিয়ে অস্পষ্টস্বরে কি যেন বলতে শুরু করে। বলতে পারল না। শেষবারের মত হয়ত আল্লাহ-র প্রার্থনা সেরে নিল।। এক সময় বৃদ্ধ বণিকের চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এল। দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে আল্লাহর দরবারের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাল।
আব্বার মৃত্যুর পর আলী শার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কারবার দেখা শােনা করার কাজে নিজেকে পুরােপুরি নিয়ােগ করল।
বিদায় মুহূর্তে তার আব্বাজী যেসব উপদেশামৃত দান করে গেছে তা পালন করার কিছুমাত্র যৌক্তিকতা আছে বলে জ্ঞান করল না ।
সে গােড়া থেকেই হিতাকাঙক্ষীদের এড়িয়ে চলতেই বেশী উৎসাহী হয়ে পড়ল। কিছুদিনের মধ্যেই আলী শার-এর কিছু নয়া নয়া দোস্ত জুটে গেল। সুযােগ সন্ধানী দোস্ত। দোস্তীর অছিলায় নিজের আখের গােছাবার ধান্দা এরকম কিছু নওজোয়ান তার চারদিকে মৌমাছির মত ঘুর ঘুর করতে লাগল। সে তাদের কাছে যেন মাথা বিকিয়ে দিয়েছে এরকম ভাব নিয়ে চলাফেরা করতে লাগল। আলী শার-এর নয়া দোস্ত যারা এল তাদের অধিকাংশের আম্মা আর বহিনরা দেহ বিক্রি করে রুটির বন্দোবস্ত করে। সে নিজের মনে বলে—“আব্বাজান যে অপরিমিত ধন দৌলত রেখে গেছেন তা যদি আমি নিজে না ভােগ করি তবে ফয়দা যা হবে তা হচ্ছে, অন্যের ভােগের জন্য রেখে দেয়া। সেটি হতে দিচ্ছিনে। আমি নিজেই ভােগ করে দুনিয়ার যা কিছু সুখ সাচ্ছন্দ্য উপভােগ করে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
আলী শার ভােগ-লালসা পরিপূর্ণভাবে উপভােগ করার জন্য উঠে পড়ে মেতে গেল। ভােগের সঙ্গে দুর্ভোগের নিকট-সম্বন্ধ।।
ভােগের পরেই আসে দুর্ভোগ। আলীশার-এর ক্ষেত্রেও এর সত্যতা লাফত হল। অর্থকড়ি যা কিছু ছিল ফুরােতে ফুরােতে এক সময় একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেল। শেষে হালৎ এমন হল বসতবাটা, আসবাবপত্র, বাসনকোসন যা কিছু ছিল সবই খােয়াতে হ’ল তাকে।
এক সময় আলী শার একেবারে ভিখমাঙ্গাতে পরিণত হয়ে গেল। সব কিছু খুইয়ে সে এবার অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে পারল, আব্বাজান তাকে যে উপদেশবাণী দিয়ে গিয়েছিল তা তার রেখে যাওয়া বিত্ত সম্পদের চেয়েও ঢের ঢের মূল্যবান।
যেসব ইয়ার দোস্তরা এতদিন মৌমাছির মত আলী শার-এর চারদিকে ঘুর ঘুর করত তারা মৌচাক মধুহীন হয়ে পড়ায় নানা অছিলায় এক এক করে কেটে পড়তে লাগল। আলী শার-এর পরিস্থিতি এবার এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়াল যে রুটির জোগাড় করাই তার পক্ষে কষ্টকর হয়ে উঠল। অনন্যোপায় হয়ে তাকে ভিক্ষার বাটি হাতে তুলে নিতেই হ’ল।
একদিন ভিক্ষার বাটি হাতে ভিক্ষা করতে করতে আলী শার বাজারের কাছে এসে হাজির হ’ল। বাজারে ঢােকার মুখে হঠাৎ সে দেখতে পেল, এক জায়গায় কিছু আদমি জড়াে হয়ে কি যেন করছে। তার কৌতূহল হ’ল। ভিড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে দেখে খুবসুরৎ এক লেড়কি। তাকে ঘিরেই এ-জটলা। এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ সতেরতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসা শুরু করলেন—‘জাহাপনা, আলী শার ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা আদমিদের পুছতাছ করে জানতে পারল, লেড়কিটিকে বিক্রি করার জন্য বাজারে এনে দাঁড় করানাে হয়েছে। আলীশার বিস্ময়মাখানাে দৃষ্টিতে লেড়কিটির আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করতে লাগল। বাস্তবিকই খুবসুরৎ লেড়কিই বটে। যেন বেহেস্তের হুরী। গুলাবের পাঁপড়ির মত তার ঠোট দুটো। মুখ নয় তো যেন গােটা একটি পান বসিয়ে দেয়া হয়েছে। আর গায়ের রঙ, দুধে-আলতায়। সূর্যের অত্যুজ্জ্বল কিরণ পড়ায় লেড়কিটির শরীরের দৃশ্য স্থানগুলাে যেন চিকচিক করছে। লেড়কিটির বুকের ওপরে দৃষ্টি পড়তেই চোখের মণি দুটো থমকে গেল। দৃষ্টি আটকা পড়ে গেল। বাস্তবিকই বুক দুটোর দিকে তাকালে চোখ ফেরানাে দায়। হবে নাই বা কেন? পূর্ণ যৌবনা লেড়কিটির নিটোল স্তন দুটোর ভারে সে যেন সামনের দিকে ঝুঁকে পড়তে চাইছে। আর তার নিতম্বটিও যেন সালােয়ার-কামিজের বাধা অগ্রাহ্য করে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আর কোমরটিকে যেন হাতের মুঠোয় ধরে ফেলা সম্ভব। সব মিলিয়ে লেড়কিটিকে বেহেস্তের হুরী মনে করলেও ভুল হবে না।
আলী শার বার কয়েক খুবসুরৎ লেড়কিটিকে নিরীক্ষণ করে এক সময় স্বগতােক্তি করল—শােভন আল্লা! বেহেস্তের হুরী যে জমিনে নেমে এসেছে। আলী শার লেড়কিটির রূপের সায়রে তলিয়ে যাবার উপক্রম হ’ল। নিষ্পলক চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে পাথরের মূর্তির মত নিশ্চল-নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
লেড়কিটির চারদিকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা আদমিগুলাের মধ্যে কেউ কেউ বলাবলি করতে লাগল—এমন বেহেস্তের হুরীকে খরিদ করার সামর্থ্য একমাত্র গ্লোরির বেটা আলী শার-এরই রয়েছে। আসলে তারা তাে জানে না আলী শার যে ইতিমধ্যেই স্ফুর্তি করে পৈত্রিক সম্পত্তির কানাকড়ি পর্যন্ত ফুকে দিয়ে আজ ভিক্ষার বাটি সম্বল করেছে।
এবার যে-দালালটি লেড়কিটিকে বেচার জন্য বাজারে নিয়ে এসেছে সে অভিজ্ঞ চোখ দুটোকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা আদমিদের ওপর বার কয়েক বুলিয়ে নিয়ে চিল্লাতে শুরু করল—এমরুভূমি অঞ্চলের আমীর-ওমরাহরা শুনুন—বেহেস্তের হুরীর মত এ-লেড়কিটির নাম জুমুর্যদ। একেবারে একশ ভাগই আনকোরা। কোন মরদ আজ পর্যন্ত একে ছুঁতেও পারে নি। রাতের আন্ধারে বহুৎ লেড়কিকে নিয়ে সম্ভোগ করা যেতে পারে বটে। কিন্তু এর সমান আরাম-আনন্দ কোন লেড়কির কাছ থেকেই মিলবে না। এ যেন এক গুলাবের হােড়া–খুসবুতে নেশা লাগাবে, দিলকে মাতােয়ারা করে দেবে। দর হাঁকুন, নিলাম ডাকুন, রাতে কী বেগম জুমূর্যদ আপনার জিন্দেগীকে ভরপুর করে তােলার জন্য হাজির। ডাকুন—দর হাঁকুন!
এক ব্যাপারী সবার আগে পাঁচ শ’ দিনার দর হাঁকল।

0 Comments