গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
তােমার মত অনেকে পাথরের নুড়ির থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের অনুসরণ করবে। তারপর তারা যা-যা করবে তুমিও অবিকল তা-ই করবে। দেখবে বহুৎ মুনাফা পিটে জাহাজে ফিরতে পারবে। আমি হিতাকাঙক্ষী সওদাগরের পরামর্শ অনুযায়ী পাথরের নুডি বােঝাই থলিটি নিয়ে নগরের প্রবেশদ্বারে হাজির হলাম। সওদাগর ঠিক বাৎই বলেছে। আমার মত অনেককেই পাথরের থলি কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তারা পাহাড়ের দিকে এগােতে লাগল। আমি তাদের পিছু নিলাম।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লাম। সেখানে অসংখ্য লম্বা লম্বা নারকেল গাছ। মাথায় বানরের আড্ডা। আমার সঙ্গী সাথীরা এবার থলে থেকে পাথর নিয়ে বানরগুলােকে লক্ষ্য করে ছুঁড়তে লাগল। উদ্দেশ্য তাদের উত্তেজিত করা। হ্যা, কৌশলটি প্রয়ােগ করে হাতেনাতে ফল পাওয়া গেল। বানরগুলাে ক্ষেপে গিয়ে নারকেল ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারতে লাগল। আমিও থলে থেকে পাথর নিয়ে অনবরত ছুঁড়তে লাগলাম। আমি এবার অন্য সব আদমিদের সঙ্গে আমার সংগৃহীত নারকেলগুলি নিয়ে বাজারে হাজির হলাম। ভাল দামে বিক্রি হ’ল। এ এমনই একটি কারবার যে, বিনা পুঁজিতে মুনাফা লােটা।
জাহাজ কয়েকদিন সে বন্দরে রইল। আমি রােজই নারকেলের কারবার করে পুঁজি বাড়াতে লাগলাম। আমার দোস্তটি অর্থোপার্জনের চমৎকার ফিকির শিখিয়ে দিয়েছে।
সবশেষে কিছু নারকেল জাহাজে এনে তুললাম। অন্য বন্দরে চড়া দামে বিক্রি করার প্রত্যাশায় আমার মত অনেকে নারকেল সংগ্রহ করে জাহাজ একেবারে বােঝাই করে ফেল্ল।
জাহাজ নােঙর তুলল। এবার জাহাজ এমন এক বন্দরে নােঙর করল যেখানের সমুদ্রে মুক্তো মেলে। মুক্তো ঝিনুকের মধ্যে থাকে। এক বিশেষ কিসিমের ঝিনুক। তা-ও আবার সবার পেটে মুক্তোর দেখা মেলেনা। পাওয়া বাস্তবিকই নসীবের ব্যাপার। সবার বরাতে জোটে না।
আল্লাতাল্লা এখানেও আমাকে সহায়তা করলেন। নইলে আমি যে-ক’টি ঝিনুক খুলি, দেখি মুক্তো চকচকে করছে। খুশীতে দিল ডগমগিয়ে উঠল। আশমানের দিকে মুখ তুলে আমাকে বলতেই হল—খােদা মেহেরবান। অসীম দোয়া তােমার।
আমার মুনাফা দিনদিন বেড়ে বহুৎ মােহর জমে গেল। নিজের মুলুকের জন্য দিল ছটফট করতে লাগল। আর নয়। বহুৎ-ই তাে হ’ল। এবার ঘরে ফেরা যাক। বিবি আর বালবাচ্চার সঙ্গে মিলিত হওয়া দরকার।
আমি আর জাহাজের অপেক্ষায় রইলাম না। জাহাজ এখনও বহুৎ মুলুকে ঢুঁড়ে বেড়াবে। তার অপেক্ষায় থাকলে কবে মুলুকে ফিরতে পারব ঠিক ঠিকানা নেই। বাধ্য হয়ে বড়সড় একটি নৌকা ভাড়া করে বসরাহ বন্দরের উদ্দেশে রওনা হলাম। তারপর বসরাহ বন্দরে নৌকা থেকে নেমে বাগদাদে হাজির হলাম।
ঘরে ফিরে আত্মীয়-বান্ধবদের বুকে পেয়ে দিল শান্ত হ’ল। এই হ’ল আমার পঞ্চম সমুদ্রযাত্রার কিসসা । কিসসা শেষ করে সিন্দবাদ নাবিক এবার শেরওয়ানির জেব থেকে এক শ’টি সােনার মােহর বের করে সিন্দবাদ কুলীর হাতে দিয়ে বল্ল-কাল সকালে ফিন এসাে। আল্লাতাল্লা যদি সবাইকে বহাল তবিয়তে রাখেন তবে আমার ষষ্ঠ সমুদ্রযাত্রার কিসসা শােনাব। সিন্দবাদ কুলী কোর্তার জেবে মােহরগুলি রাখতে রাখতে সিন্দবাদ নাবিককে বহুৎ সুকরিয়া জানিয়ে বিদায় নিল।
পরের সকালে সিন্দবাদ কুলী বিছানা ছেড়ে উঠল। পানি দিয়ে ভালভাবে রুজু করে পবিত্র হয়ে নামাজ সারল। এবার কোর্তাপালুন গায়ে চাপিয়ে সিন্দবাদ নাবিকের মকানের উদ্দেশ্যে পাবাড়াল। 

           সিন্দবাদ নাবিকের ষষ্ঠ সমুদ্রযাত্রার কিসসা 

সিন্দবাদ নাবিক তার সুবিশাল কামরায় ইয়ার দোস্তদের নিয়ে নাস্তা সারতে সারতে কিসসা শুরু করল।
এক রাত্রে আমি ইয়ার দোস্তদের নিয়ে হরেক কিসিমের খানা আর দামী সরাব দিয়ে খানাপিনা সারছিলাম। জানালা দিয়ে হঠাৎ দেখতে পেলাম, কয়েকজন সওদাগর পয়দল পাড়ি দিচ্ছে। আমি ছুটে বাইরে গেলাম। ডাকলাম তাদের। অভ্যর্থনা করে কামরার ভেতরে নিয়ে এলাম।
সওদাগরদের সঙ্গে বাৎচিৎ করে জানতে পারলাম, তারা বাণিজ্য করতে ভিনদেশে চলেছে। তাদের মুখে বাণিজ্যের বাৎ শুনেই আমার দিল নেচে উঠল। বাণিজ্যে যাওয়ার জন্য রীতিমত ছটফট করতে লাগলাম। কথা প্রসঙ্গে সওদাগরদের একজন বলল—“জী, আমরা এখানে
দু’দিন থেকে সওদা খরিদ করব। তারপর বসরাহ বন্দর থেকে জাহাজে উঠব।
আমি সে-মুহুর্তেই সমুদ্রযাত্রার পাক্কা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। সকাল হতে না হতেই বাজারে বেরিয়ে পড়লাম সওদা খরিদ করতে। ভিন দেশের বাজার ও সেখানকার আদমিদের রুচি-মর্জি তাে আমার ভালই জানা আছে। সেদিকে নজর রেখে হরেক কিসিমের বিলাস সামগ্রী জড়াে করে কামরা বােঝাই করে ফেললাম। এবার খরিদ করা সামানপত্র দিয়ে বড় বড় কয়েকটি গাঁটরি পেটরায় বাঁধাছাদা করে নিলাম।
সদ্য পরিচিত সওদাগর-দোস্তদের সঙ্গে শুভ মুহুর্তে বসরাহ বন্দরে হাজির হলাম। একটি সওদাগরী জাহাজ ঘাটেই দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম। ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আল্লাহর নাম স্মরণ করে আমি গাঁটরি-পেটরা নিয়ে জাহাজে উঠলাম।
জাহাজ নােঙর তুলল । তরতর করে এগিয়ে চলল গভীর সমুদ্রের দিকে। চারদিকে কেবল পানি। নীল পানি। আর সমুদ্রের নিরবচ্ছিন্ন গর্জন।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
              তিন শ’ নয়তম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর শুরু হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। কিছুটা সময় বেগমকে আদর-সােহাগ করে নিজে তৃপ্তি লাভ করলেন। বেগমের যৌবনের জোয়ার লাগা দেহ আর দিলকেও তৃপ্তি দিলেন।
বেগম শাহরাজাদ এবার তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাঁহাপনা, সিন্দবাদ নাবিক তার ইয়ার দোস্ত আর সিন্দবাদ কুলীর কাছে তার সমুদ্রযাত্রার কিসসা বলে চলেছে—আমাদের সুবিশাল জাহাজটি পালে হাওয়া পেয়ে তরতর করে এগিয়ে চল্ল। তারপর শুরু করল এ-বন্দর থেকে সে-বন্দর নােঙর করা। প্রতি বন্দরেই আমরা সওদা বিক্রি করি। প্রয়ােজনে সেখান থেকে অন্য বন্দরের আদমিদের পছন্দ মাফিক সামানপত্র খরিদ করে ফিন জাহাজ বােঝাই করি। আমার সওদা চড়া দামে বিক্রি হতে থাকে। ফলে দু’হাতে মুনাফা পিটতে লাগলাম। এক গভীর রাত্রে আমরা একেবারে নিদে বিভাের হয়ে নাক ডাকাচ্ছিলাম। আচমকা ক্যাপ্টেনের চিল্লাচিল্লিতে নিদ টুটে গেল। হুড়মুড় করে উঠে বসে পড়লাম।
শােনলাম ক্যাপ্টেন চিল্লিয়ে বলছে-‘সবাই শোন, আমাদের জাহাজ এক অজানা দ্বীপে এসে পড়েছে।
আমি আড়মােড়া ভেঙে একটু চাঙা হয়ে নেয়ার কোশিস করছিলাম। ক্যাপ্টেনের বাৎ শুনে সচকিত হয়ে নিদ-জড়ানাে চোখ দুটো অতর্কিতে কপালে তুলে সবিস্ময়ে তার দিকে তাকালাম।
ক্যাপ্টেন বলে চলেছে—“হ্যা, একেবারেই অজানা-অচেনা এক দ্বীপে আমরা হাজির হয়েছি। আমি এ-পথে আগে কোনদিন আসিনি। নিতান্তই অচেনা। নসীবে কি আছে কিছু বলতে পারি না। খােদাতাল্লার নাম স্মরণ করা ভিন্ন গতি নেই। তিনি যদি জান রাখেন। তবেই এখান থেকে জিন্দা ফিরতে পারব।'
কথা বলতে বলতে ক্যাপ্টেন লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে গেল।
আমি দুরু দুরু বুকে উঠে দাঁড়ালাম। ডেকের দিকে দু’পা যেতেই দেখি, ক্যাপ্টেন মাস্তুলের ওপর উঠে গেছে। পালের কাছি কেটে দিল।
বিপদ নয়া রাস্তা ধরে এল। মুহুর্তে তুফান উঠল। ভীষণ তুফান। তুফানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জাহাজটি কিছুক্ষণ টিকে ছিল। ব্যস, তার পরই দিয়াশলাইয়ের খােলের মত জাহাজটি তীরবেগে ছুটতে ছুটতে এক পাহাড়ের সঙ্গে দুম করে ধাক্কা মারল। ব্যস, খতম। জাহাজ ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেল। আমি ছিটকে গিয়ে পড়লাম। ভাবলাম, হাড়গোেড় বুঝি গুড়িয়ে গেছে। বরাত ভাল যে, সেখানে কিছু ডালপালা লতা-পাতা তুফানে এনে জড়াে করে রেখেছিল।। জানি না তুফান, নাকি আল্লা-তাল্লার এ-কাজ। আমি মােক্ষম আছাড়টি খেয়ে একটু-আধটু জখম হলাম বটে। তবে অচিরেই আল্লাহর দোয়ায় সামলে উঠতে পেরেছিলাম। জাহাজের অন্যান্য যাত্রীদের কি হাল হয়েছে কিছুই মালুম হ’ল না। একে ঘুটঘুটে অন্ধকার তার ওপর প্রবল তুফান। কে, কার হদিস করে। আমি ওই শুকনাে গাছপালার স্তুপের মধ্যে চিৎ হয়ে পড়ে থেকে সারারাত্রি আল্লাতাল্লার নাম করে কাটিয়ে দিলাম। ক্যাপ্টেন, সওদাগর দোস্ত বা জাহাজের খালাসীদের কে, কোথায় এবং কিভাবে আছে কিছুই আমার জানা নেই।
সকাল হ'ল। লতাপাতার স্কুপের ওপর বসে থেকেই আমি চারদিকে তাকাতে লাগলাম। সামনেই অনুচ্চ এক পাহাড়। বুঝলাম পাহাড়টি থাকাতেই তুফান আমাকে সমেত শুকনাে লতাপাতা গুলােকে উড়িয়ে নিয়ে সমুদ্রের বুকে ফেলতে পারেনি।
আল্লাহর নাম নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। এবার আর যা দেখলাম | তাতে আমার কলিজাটি আচমকা কেঁপে উঠল। আমাদের জাহাজের ভাঙা অসংখ্য ছােট-বড় টুকরাে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আর ? তার মাঝখানে দু’জন হতভাগ্য খালাসীর মৃতদেহ।
আমি এক পা দু’পা করে দ্বীপের ভেতরের দিকে এগােতে লাগলাম। সামান্য এগােতেই ছােট্ট একটি পার্বত্য নদী নজরে পড়ল। পাহাড় ছেড়ে দ্বীপের মধ্যে কিছুটা ঘােরাফেরা করে নদীটি পাহাড়ের একটি গুহার ভেতরে ঢুকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তার পরিণতি শেষ পর্যন্ত যে কি হয়েছে, চুপি চুপি সাগরে গিয়ে পড়েছে, নাকি গুহার ভেতরেই কোন কায়দা কৌশলের মাধ্যমে থাকার জায়গা করে নিয়েছে মালুম হল না। নদীর পাড় ধরে কিছুপথ হাঁটা চলা করে নদীর তীরভূমির আদৎ চেহারা সম্বন্ধে মােটামুটি আঁচ করতে পারলাম।
নদীর পাড়ে কোটি কোটি ছােট-বড়-মাঝারি নুড়ি ছড়ানাে। কোন কোনটি অত্যুজ্জ্বল। শ্যাওলাও তাদের আদৎরূপ চাপা দিতে পারে নি। কি এগুলাে? কোন্ কিসিমের পাথরের নুড়ি ?
কৌতুহলের শিকার হয়ে অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে একটি নুড়ি হাতে তুলেই সরবে বলে উঠলাম-ইয়া আল্লাহ। শােভন আল্লাহ! আল্লা তুমি আমাকে এ কোথায় এনে ফেললে। তামাম দুনিয়ার ধন দৌলত যে এখানে এনে জড়াে করা হয়েছে। আমি প্রায় উন্মাদের মত কথা ক'টি ছুড়ে দিয়ে হাতের ইয়া বড় চুনীর টুকরােটির দিকে বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। কেবল কি চুনী-ই না, হরেক কিসিমের সব অমূল্য পাথর নদীটির দু'পাড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। কতরকম অমূল্য গ্রহরত্নের যে বিচিত্র সমাবেশ এখানে ঘটেছে তার হদিস একমাত্র অভিজ্ঞ জহুরীর পক্ষেই দেয়া সম্ভব। আমি কৌতূহলের শিকার হয়ে নদীর পাড় ধরে পায়ে পায়ে এগােতে থাকলাম। কিছুদূর যেতে না যেতেই একটি ঝর্ণার মুখােমুখি হলাম। পাহাড়ের গা বেয়ে কোমর দুলিয়ে নাচতে নাচতে নিচে নেমে এসেছে। কি নামছে? পানি? অবশ্যই না। তবে? আলকাতরার মত কুচকুচে কালাে এক কিসিমের তরল পদার্থ। ঝর্ণাটি অনুসরণ করে হাঁটতে গিয়ে দেখলাম সেটি সরাসরি সমুদ্রে গিয়ে মিলেছে। সমুদ্রের এক কিসিমের মছলির খুবই প্রিয় খাদ্য এই কালাে তরল পদার্থটি। তারা এগুলাে সাগ্রহে গিলে নিয়ে কিছুসময় উদরে জমা করে রাখে। তার পর এক সময় ফিন উগরে দেয়। ওগরান তরল পদার্থগুলাে মােমের মত সাগরের বুকে ভেসে বেড়ায়। তাদের খুসবুতে সাগর বাহিত বাতাস দিকে চাঙা করে তােলে।
হায় আল্লাহ! একী তােমার বিচিত্র খেয়াল! এত সব অমূল্য সম্পদ এখানে, এ নির্জন দ্বীপে পাকার করে রেখেছ যার এক কণাও দুনিয়ার কোন কাজেই লাগছে না! জাহাজ পথভুলে এখানে এসে পড়লেও বিধ্বস্ত হতে বাধ্য। সমুদ্রের অতল গহ্বরে হতভাগ্যর দল অসহায় ভাবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তাই এ-দ্বীপের অমূল্য সম্পদ দুনিয়ার কাছে অজ্ঞাতই রয়ে গেছে।
আমার হাতের নাগালের মধ্যে অতুল বৈভব। কিন্তু পেটের জ্বালা নেভানাের মত এক তিল খানাও খুঁজে পেলাম না। গাছপালা ঝােপঝাড় আছে বটে। কিন্তু সারা দ্বীপ ঢুঁড়ে ঢুঁড়েও এমন কোন ফলমূল পেলাম না যা দিয়ে উপবাস ভঙ্গ করতে পারি। চোখ দুটো বেয়ে পানির ধারা নেমে এল। নিশ্চিত মৃত্যু বুঝতে পেরে চোখের পানি আটকে রাখা সম্ভব, নাকি আটকা থাকে?
উপবাসের মধ্য দিয়ে এক-দুই-তিন করে পর পর কয়েকটি দিন কোনরকমে গুজরান করলাম। না, আর পারলাম না।
অনাহারক্লিষ্ট দেহটি এক সময় বালির ওপর আছাড় খেয়ে পড়ে গেল। ক্ষুধার জ্বালা যে কী দুর্বিষহ রূপ নিয়ে দেখা দিতে পারে তা বুঝিয়ে বলার মত ভাব ও ভাষা নেই। খিদে-তেষ্টায় বালির ওপর পড়ে কাত্রাতে থাকি। নিজের হাতে চুল ছিড়ি, বুক চাপড়াই আর ক্ষীণকণ্ঠে ‘হায় খােদা’ ‘হায় খােদা’করি। এক সময় দুর্বল হাত দুটো দিয়ে বালি সরিয়ে সরিয়ে নিজের কবর নিজেই খুঁড়তে শুরু করলাম।
নিজের কাছে নিজেই অবাক মানলাম। বালি সরিয়ে সরিয়ে এতবড় একটি গর্ত, মােটামুটি একটি কবর এরকম শরীর নিয়ে খুঁড়তে পারব ভাবতেই পারি নি। কবরটির ভেতরে দলামােচড়া পাকিয়ে শুয়ে পড়লাম। আর কোন চিন্তা নেই। বাতাস বাহিত বালি এসে আজ না হােক কাল আমাকে ঢেকে দেবে। ব্যস, জিন্দেগীর খেল খতম।
কবরের ভেতরে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকার পর নিজের ওপর দারুণ গােসসা হ’ল। একী তাজ্জব কাণ্ডে আমি মেতেছি। অতীতে তাে এর চেয়েও চরম দুর্গতি সহ্য করেছি। দাঁতে দাঁত চেপে বিরুদ্ধ প্রকৃতির মােকাবেলা করেছি। আজ তবে এমন দুর্বুদ্ধি আমার ঘাড়ে চাপল কেন? হাত দুটোতে ভর দিয়ে কোনরকমে উঠে বসে পড়লাম। গালে হাত দিয়ে বসে কিছুক্ষণ ভাবলাম। মাথায় এল—নদীটির উৎপত্তিস্থল তাে আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে এসেছি। কিন্তু কোথায়, কিভাবে এর শেষ হয়েছে তা তাে দেখা হ’ল না। পাহাড়ের গুহায় তো সে ঢুকল-তারপর? তার পরেরটুকু? আমার মাথায় এল—নদীটি নির্ঘাৎ পাহাড়ের ওই গুহাটির মধ্যে গিয়ে খতম হয়ে যায় নি। অন্য কোন না কোন মুলুক অবধি ধাওয়া করেছে।
আমি আপন মনে বলে উঠলাম— নদীটির শেষ আমাকে দেখতেই হবে। আমার মােউত কাঁধে চেপেছেই। না নিয়ে ছাড়াবে না। তবু শেষ বারের মত কোশিস করেই দেখা যাক। মৃত্যু এভাবে না হয় অন্য কোনভাবে হবে এর বেশী তাে কিছু নয়। গুহাটির ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পাক্কা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। পানির তােড়ে ভাসতে ভাসতে কোথায় গিয়ে ঠেকি, দেখাই যাক
যদি গুহার মধ্যে ঢুকে আর বেরিয়ে আসতে না-ই পারি তবে বড় জোর বালির সমাধির পরিবর্তে পানির সমাধি হবে—এই তাে?
এবার গর্তটি থেকে উঠে এসে জাহাজভাঙ্গা একটি পাটাতন খুঁজে বের করে টেনেহিচড়ে নদীর ধারে নিয়ে এলাম। আরও কিছু কাঠ সংগ্রহ করে চমৎকার একটি ভেলা তৈরী করে ফেললাম। এবার চিন্তা হ’লমরি আর জিন্দাই থাকি এখানে ফিন আর আসার কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু দ্বীপের অতুল ঐশ্বর্যের মায়া হেলায় কাটিয়ে ফেলা হয়ত ঠিক হবে না। এমনও হতে পারে খালি হাতে বিদায় নিলে পরে এর জন্য হাত কামড়াতে হবে।
ছেড়া পাল থেকে কয়েক হাত লম্বা একটি টুকরাে নিয়ে এলাম। নদীর পাড় থেকে বেছে বেছে অত্যুজ্জ্বল দেখে বেশ কিছু পাথর কুড়িয়ে ইয়া পেল্লাই একটি পুটুলি বানিয়ে ফেললাম। এবার সেটিকে ভেলার ওপর চাপিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলাম। আল্লাহর নাম নিয়ে ভেলাটিকে দিলাম জলে ভাসিয়ে। তার ওপরে চেপে বসলাম। শরীর এলিয়ে শুয়ে পড়লাম। শুরু হ’ল আমার ভেলা অভিযান। আমার খিদে-তেষ্টায় কাতর দেহটি কখন যে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিল, বলতে পারব না।
এক সময় আমার সংজ্ঞা ফিরে এল। চোখ মেলে তাকালাম। চমকে গেলাম। দুর্বল শরীরেও যন্ত্রচালিতের মত তড়াক করে লাফিয়ে বসে পড়তে পারলাম। দেখি শ'খানেক মুখ চারদিক থেকে কৌতূহল মিশ্রিত উৎসাহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। তাদের সুরৎ আর পােশাক আশাক দেখে মালুম হ’ল আমি হিন্দুস্থানে পৌছে গেছি। এরা হিন্দুস্থানী।
কৌতুহলী লােকগুলাে আমাকে টুকরাে টুকরাে বহুৎ বাৎ জিজ্ঞাসা করল। আমি তাদের কথার একটি বর্ণও উদ্ধার করতে পারলাম না। জবাব দেবার প্রশ্নই ওঠে না। আমিও তাদের একের পর এক প্রশ্ন করলাম। সব কোশিসই বৃথা গেল। কেউ, কারাে বাৎ সমঝে উঠতে না পারায় আমার বা উপস্থিত কৌতূহলী আদমিদের কারাে পক্ষে কৌতুহল দমন করা সম্ভব হল না।
বাৎচিৎ-এর আশা ছেড়ে দিয়ে আমি তাদের ইঙ্গিতে মনােভাব বুঝবার কোশিস করলাম। পেটে হাত দিয়ে বুঝিয়ে দিলাম, বড় খিদে পেয়েছে।
বুঝলাম, আমার কোশিসটি ফলপ্রসু হয়েছে। দু-চার আদমি পিছন ফিরে ছুটতে শুরু করল। কিছু সময় বাদেই তারা ফিন ঘুরে এল। হাতে তাদের খানার থালা আর লােটা ভর্তি পানি। আমি
(চলবে )