আরব্য রজনী পার্ট ৬২ ( Arabyarajani part 62 ) Arabya rajani bangla

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
পুনরায় গােড়া থেকে তার অপরাধের কথা খতিয়ে দেখতে হবে।
সম্রাটের নজরে দেশের ছােট-বড় প্রতিটি মানুষই সমান। অতএব সবাই তার কাছ থেকে সমান আচরণ পাবে এটাই বড় কথা। প্রজা যদি বিদ্রোহী হয়, সম্রাটের বিরুদ্ধাচারণে প্রবৃত্ত হয় তবে মনে করতে হবে সম্রাটের শাসনব্যবস্থাই-এর জন্য সর্বতােভাবে দায়ী।

বদর যখন দরবারে শাসনব্যবস্থা নিয়ে পারিষদদের সঙ্গে লিপ্ত তখন বৃদ্ধ-প্রাক্তন সম্রাট আরমানুস তার বিবিকে নিয়ে লেড়কি হায়াৎ এর কামরায় গুটি গুটি প্রবেশ করলেন। বৃদ্ধা সম্রাজ্ঞী লেড়কিকে বুকে জড়িয়ে ধরে সস্নেহে জিজ্ঞাসা করলেন—“বেটি বর তাের পচ্ছন্দ হয়েছে তাে?

হায়াৎ আব্বার সামনে শরমে মুখ তুলে তাকাতে পারল না। অবনত মস্তকে ম্লান হেসে ছােট্ট করে জবাব দিল-  'বহুৎ আচ্ছা! বহু আদর সােহাগ করল। অনেক্ষণ ধরে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এক সময় আমি নিদ যাই। বিভাের হয়ে পড়ি। কি করে যে ভাের হয়ে গেল সমঝে উঠতেই পারি নি মা। তার আম্মা সবিস্ময়ে বললেন—সে কী রে! ব্যস, এটুকুই ? আর?'—“কেন, বললাম আমাকে খুব আদর সােহাগ করেছে। সােহাগে সােহাগে দিল একেবারে ভরিয়ে দিয়েছে মা।

আমতা আমতা করে তার আম্মা বললেন—‘আমি এসব কথা বলছি না, বেটি। মানে মানে আর কিছু কি—'।

—“আর কিছু বলতে কি বলতে চাইছ, মালুম হচ্ছে না ছাই। বেশ একটু রাগত স্বরেই হায়াৎ তার আম্মার উদ্দেশ্যে কথাটি ছুঁড়ে দিল।

তার আম্মা এত সহজে ব্যাপারটি থেকে সরে যেতে রাজী নয়। মুহূর্তকাল ভেবে নিয়ে আবার বললেন-বলছি কি, আদরসােহাগ টোহাগ ছাড়া আর কিছু মানে ইয়ে টিয়ে—নিদ যাওয়ার আগে তােকে—তােকে সে গ্রহণ করে নি বেটি ?

‘গ্রহণ? কিসের গ্রহণ ? কিভাবেই বা গ্রহণ করবে? গ্রহণ বলতে কি-ই বা তুমি সমঝাতে চাইছ, বুঝছি না।
তার আম্মা মহার্ফ্যাসাদে পড়লেন, অথচ লেড়কির কাছ থেকে ব্যাপারটি তার জানা একান্ত দরকার বােধ করছেন। কামিজের খুট নাড়াচাড়া করতে করতে এবার আরও খােলসা করে সমঝাতে গিয়ে তিনি বললেন—“বেটি, বলতে চাইছি, নিদ যাওয়ার আগে সে তাের সালােয়ার-কামিজ খুলেছিল কি ?

হায়াৎ সবিস্ময়ে আম্মার মুখ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে ভুমির দিকে তাকাল। ডান-পায়ের বুড়াে আঙুলটি মেঝেতে ঘষতে ঘষতে এবার কেটে কেটে বলল- সালােয়ার-কামিজ? এসব কথা কেন জিজ্ঞেস করছ? এসবের আবার জরুরৎ কি?--- 

তাকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই তার আম্মা এবার প্রসঙ্গটি চাপা দিতে গিয়ে বললেন—“থাক বেটি, ওসব কথা এখন ছাড়ান দেওয়া যাক। পরে সময়-সুযােগ মত—এখন বিশ্রাম কর। রাত্রে ভাল ঘুম হয় নি মালুম হচ্ছে, তাের মেজাজ এখন শরিফ নয়।

বুড়াে-বুড়ি চোখের ভাষায় কি যেন সিদ্ধান্ত নিলেন, হায়াৎ ঠিক সমঝে উঠতে পারল না। বিষন্ন ও চিন্তিত মুখে তারা কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

আম্মার হেঁয়ালি-পূৰ্ণ কথাগুলি হায়াৎ-এর বুকের ভেতরে তােলপাড় করতে থাকে, ‘গ্রহণ করা। সালােয়ার-কামিজ খােলা প্রভুতি টুকরাে টুকরাে কথাগুলাে বারবার তার মাথায় চক্কর মারতে থাকে।

এমন সময় দরবারের কাজকর্ম মিটিয়ে বদর অন্দরমহলে হায়াৎ-এর কামরায় ঢুকল। তার গায়ে সম্রাটের পােশাক আশাক এখনও রয়েছে। কামরায় ঢুকে বদর মুচকি হসে বলল—সুন্দরী এমন নিবিষ্ট মনে কি ভাবছ, বল তাে?' আচমকা বদর-এর কণ্ঠস্বর শুনে হায়াৎ সচকিত হয়ে সােজা হয়ে বসল। সলজ্জমুখে বলল—না, কিছুনা। এমনি একেলা বসে কিনা তাই

--কেন, তােমার আব্বা-আম্মা তােমার সাথে ভেট করতে আসেন নি? আমি তাে ভাবলাম কি ওঁদের সাথে বাৎচিৎ করছ।

তােমার কামরায় তারা-

তাকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই হায়াৎ সামান্য ঘাড় কাৎ করে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল—‘এসেছিলেন, একটু আগেই ওনারা গেলেন।

—“কিছু পুছতাছ—কি বাৎচিৎ হ’ল ?

‘আম্মা আমাকে শুধালেন রাত্রে নিদ যাওয়ার আগে তুমি আমার সালােয়ার কামিজ খুলেছিলে কিনা?

বদর-এর মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।

হায়াৎ অত্যুগ্র আগ্রহান্বিত হয়ে বলল—“আচ্ছা, আমি ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছিনা আম্মা বারবার একথা শুধালেন কেন?’ বদর মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে, মুখে জোর করে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল—“হ্যা, এটিই প্রচলিত প্রথা। শাদীর পর বাসর ঘরে পাত্র নিজেহাতে পাত্রীর সালােয়ার-কামিজ খুলে দেয়।

হায়াৎ চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ একে বদর-এর মুখের দিকে তাকায়।

বদর মুখে হাসির রেখাটুকু অক্ষুন্ন রেখেই এবার বলল-“হ্যা, পাত্রীর গা থেকে সব পােশাক আশাক খুলে নিয়ে তারা পাশা পাশি শােয়। কিন্তু কাল রাত্রে মন বলল কি তুমি বড়ই ক্লান্ত। তাছাড়া তুমি তাে শােবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চোখ বন্ধ করলে, নিদ গেলে। তাই তােমাকে বিরক্ত করতে আমার দিল চাইল না। তার জন্য আপশােষের কি আছে। আজ তােমাকে সেভাবেই শুইয়ে দিচ্ছি। ব্যস, শােধবাদ, ঠিক কিনা? 

হায়াৎ-এর মুখ শরমে লাল হয়ে গেল। বদর তার শরমকে পাত্তা না দিয়ে নিজেহাতে প্রথমে তার গা থেকে কামিজ এবং সালােয়ার প্রভৃতি সব খুলে ফেলল। এবার তাকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে কোলে তােলার ভঙ্গিতে তুলে নিয়ে ধপাস করে পালঙ্কের ওপর শুইয়ে দিল।

হায়াৎ আকস্মিক শরমটুকু সামলে উঠতে না পেরে দু'হাতে মুখ ঢাকল।

বদর জোর করে তার হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে বার বার তার ঠোটে, গালে কপালে চুম্বন করতে লাগল। হায়াৎ আবার হাত দুটো মুখের কাছে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। বদর হাত দিয়ে তার হাত দুটোকে সরিয়ে দিয়ে এবার জিজ্ঞাসা করল—‘পেয়ারী, পুরুষ মানুষকে তােমার কেমন লাগছে? ভাল তাে?” 

হায়াৎ আগের চেয়ে কিছুটা জড়তা কাটিয়ে সামান্য স্বাভাবিক কণ্ঠে জবাব দিল—“আমি জিন্দেগীতে পুরুষ বলতে আমার আব্বা আর হারেমের কয়েকজন খােজা নােকরকে দেখেছি। ব্যস, এর বেশী কাউকেই দেখি নি। আব্বার বাৎ তাে প্রশ্নই ওঠে না। আর খােজাদের দেখে কি পুরুষ বলা যায়, নাকি ভাবাই সম্ভব, বল? এক কথায় তারা তাে পরিপূর্ণ মানুষই না। একজন পুরুষ জনানার যা কিছু থাকা দরকার তার কোনটিই তাে তাদের মধ্যে উপস্থিত নেই।

বদর মুচকি হাসে।

হায়াৎ এবার সহজ-সরলভাবেই বদর-এর উদ্দেশ্যে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেয়—“আচ্ছা,তুমি বলতে পার, তাদের কেন আধা-মানুষ বলা হয় ? তাদের মধ্যে এমন কি অনুপস্থিত যার ফলে তাদের পুরুষ বা জনানা কোন পর্যায়েই না ফেলে আধা মানুষ বলা হয় ?

–‘দ্যুৎ, তােমার মত বােকা লেড়কি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। আরে এ-তাে সােজা বাৎ, তােমার যা নেই তাদেরও তা-ই নেই।'

—“আমার নেই? কি নেই? কি আমার নেই? হেই, বল না আমার মধ্যে কোন জিনিস অনুপস্থিত? এ আবার কী ধরনের কথা?

বদর তার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে সামান্য কাছে টেনে নেয়। আবার তার ঠোটে, গালে ও কপালে ঘন ঘন চুম্বন দিতে লাগল। হায়াৎ প্রতিটি চুম্বনে শিহরিত হতে থাকে। তার দিল যেন একটু একটু করে রােমাঞ্চে ভরে উঠতে থাকে। কেমন যেন এক অনাস্বাদিত উত্তেজনায় তার বুকের ভেতরে কম্পন অনুভব করে। শিরা-উপশিরায় খুনের গতি দ্রুততর হয়। বুকের ভেতরে কলিজাটি দলামােচড়া হয়ে যেতে থাকে।

বদর বুঝতে পারে হায়াৎ আর বেশীক্ষণ স্বাভাবিক থাকতে পারবে না। রােমাঞ্চে-শিহরণে-কম্পনে শরীর শীঘ্রই এলিয়ে পড়বে। এবার সে তার বিবস্ত্র দেহটিতে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখ দুটো আবেশে জড়িয়ে আসতে থাকে। চোখ দুটো ছােট হতে হতে এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। সে নিদ যেতে থাকে। বদর ও তার পাশে শুয়ে চোখ বন্ধ করে।।

বেগম শাহরাজাদ কিত্সার এ পর্যন্ত বলার পর ভােরের পূর্বাভাস পেয়ে কিসসা বন্ধ করলেন।

              দুশ এগারতম রজনী 

রত্রির দ্বিতীয় প্রহর পড়তে না পড়তেই বাদশাহ শারিয়ার আবার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাহাপনা, হায়াৎ নিদ গেলে বদর নিশ্চিত হ'ল। এবার সে-ও তার পাশে শুয়ে চোখ বন্ধ করল।

সকাল হ’ল। বদর পালঙ্ক থেকে নামল। হায়াৎ তখনও বেহুঁস হয়ে নিদ যাচ্ছে। সে বিবস্ত্র হায়াৎ-এর গায়ে একটি চাদর চাপা দিয়েছিল।

বদর এবার পােশাক আশাক বদলে দরবারের উদ্দেশে পাবাড়াল।

বৃদ্ধ সম্রাট আরমানুস তার বিবিকে নিয়ে অন্দরমহলে তার লেড়কির কামরায় এলেন।

বৃদ্ধা সম্রাজ্ঞী লেড়কির গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে সস্নেহে বললেন—“বেটি, গত রাত্রি কেমন কাটল, বল তাে?

‘বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা কেটেছে আম্মা! . সম্রাট আরমানুস ঠোটের কোণে হাসির রেখা টেনে বলল—‘বেটি, এখনও তুমি চাদর মুড়ি দিয়ে বিছানা আকড়ে পড়ে ব্যাপার কি? কাল রাত্রে বুঝি খুব পরিশ্রম—শরীরের ওপর দিয়ে খুবই ধকল গেছে?

‘ধকল? ধকল আবার কিসের ? সে আমাকে কত সােহাগ করেছে? গায়ে-মাথায় অনেকক্ষণ হাত বুলিয়ে দিয়েছে। আমার নিদ না আসা পর্যন্ত সে জেগেই ছিল। তারপর আরও কত কি করেছিল! আজ নিজেহাতে আমার সালােয়ার-কামিজ খুলে দিয়েছে। গালে, ঠোটে, কপালে চুম্বন করে করে কতই না আদরসােহাগ করেছে। তখন আমার দিল কেমন করে যে বার বার নেচে উঠছিল সে তােমাকে বলে সমঝাতে পারব না আব্বা! তখন আমার কেমন লাগছিল—'

—“কেমন ? কেমন লাগছিল বেটি ?

‘সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। চমকলাগা যাকে বলে। এর আগে কোনদিন এমন বােধ হয় নি, সত্যি বলতে কি আমি যেন একা মরায় শুয়েই বেহেস্তের স্বাদ পাচ্ছিলাম!! সম্রাজ্ঞী এবার আর মুখবুজে থাকতে পারলেন না। লেড়কির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে তিনি বললেন-‘বেটি, তােমাকে যে তােয়ালেটি দেওয়া হয়েছিল, কোথায়? তাতে খুব খুনটুন লেগেছে বুঝি?

–‘তােয়ালে? কোথায়, তােয়ালে টোয়ালে তাে এ- কামরায় আনি নি। সে-তাে হামামে রেখে এসেছি। আর খুন? কিসের খুন? 

খুনটুন আবার বেরােতে যাবে কেন আম্মা? এর মধ্যে আবার খুন খারাবি কারবার আসবে কেন? কি যে সব যা-তা বলছ। 

লেড়কিকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই তার আম্মা এবার বললেন—খুনটুন মােটেই ঝরে নি বেটি ?

লেড়কির কথায় তার আম্মা-আব্বা উভয়েরই কপাল চাপড়াবার মত পরিস্থিতি হ'ল।

সম্রাজ্ঞী কপাল চাপড়ে বলে উঠলেন--“হায় বেটি, একী কাণ্ড! তােমার স্বামী তােমাকে কেন যে এভাবে ধোঁকা দিচ্ছে, মালুম হচ্ছে না!

সম্রাট আরমানুস-এর মুখে বিষাদের ছাপ ফুটে ওঠে। তিনি চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—ব্যাপার তাে খুব সুবিধের মনে হচ্ছে না বেগম সাহেবা। সে যদি এভাবে তার কর্তব্যে অবহেলা করতেই থাকে তবে তাে আমাকে অন্য পথ নিতেই হবে। স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্ক যদি না-ই গড়ে ওঠে তবে অহেতুক শাদীর ঝামেলা করার দরকার কি ছিল? 

সম্রাজ্ঞী বললেন-“হ্যা, আমিও তাে তা-ই ভাবছি। 

‘কাল সকালেও যদি আমি শুনতে পাই আমার বেটির কুমারীত্ব বজায়ই রয়ে গেছে তবে যা-ই হােক একটি হিল্লে আমাকে করতেই হবে। আর এভাবে মুখবুজে থাকা মােটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

–হ্যা, এ-বিয়ের ফয়দা কিছু তাে আমি বুঝছি না।

–‘দেখি কোথাকার জল গড়িয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। বেশী বেগড়বাই করলে আমি কামার অল-জামান-এর কাছ থেকে মসনদ ছিনিয়ে নিতে বাধ্য হব। আমার লেড়কি বঞ্চিত হবে, আর সে মৌজ করে মসনদ ভােগ করবে, অসম্ভব।' 

সম্রাজ্ঞী বললেন—করছ কী বল তাে! এত দিমাক গরম করলে আখেরে পস্তাতে হবে। ভাব বিলকুল ব্যাপারটি ভেবে দেখ। তার কাছে থেকে মসনদ কেড়ে নিয়ে মুলুক থেকে ভাগিয়ে দিলে পরিণামে কি হতে পারে একবারটি ভেবে দেখা দরকার।

—“কি আবার হবে। কিচ্ছু হবে না। আমি আমার বেটি হায়াতকে ফিন শাদী দেব। তাই বলে এমন একটি কচি লেড়কির জীবন তাে আর বরবাদ করে দেওয়া যায় না।

‘হায়াৎ-এর আব্বা, সুলতান শাহরিমান গােসসা করলে আমাদের আখেরে কোন তকলিফ—' 

‘হােক। করুক গােসসা, আমি কাউকে ডরাই না। তাই বলে আমার বেটির জিন্দেগী বরবাদ তাে আর করতে পারি না। দিন ভর দরবারের কাজে ডুবে থাকার পর সন্ধ্যার কিছু পরে বদর আবার হায়াৎ-এর কামরায় ফিরে এল। আদর-সােহাগ করতে করতে থমকে গিয়ে সবিস্ময়ে বলল-“কি ব্যাপার সুন্দরী, তােমার চোখে পানি হয়েছে কি বল তাে?’ গায়ে-মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে এবার বলল-বুঝেছি, আজ ফিরতে দেরী হয়েছে বলে তােমার গােসসা হয়েছে, ঠিক কিনা? চোখ মুছতে মুছতে হায়াৎ বলল—না, এসব কিছু নয়।

—“তবে? তবে তােমার চোখে পানি কেন? হয়েছে কি, বলবে তাে?'

—“আজ সকালে আব্বা এসেছিলেন আমার কামরায়। আম্মাও সাথে ছিলেন।

—এ তাে খুবই স্বাভাবিক, বেটির খবরাখবর নিতে তারা আসবেন এ-ই তাে সঙ্গত কাজ।

—“আব্বা তােমার ওপর খুব গােসসা করেছেন। তিনি যা বাতালেন তাতে মালুম হ’ল তােমার কাছ থেকে তিনি মসনদ ছিনিয়ে নিতে পারেন।

আতঙ্কিত বদর জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল—তা তিনি অবশ্যই পারেন বটে। কিন্তু আমি এমন কি গােস্তাকি করলাম যার জন্য তার গােসসা এতদূর গড়াতে পারে? কিছু বললেন নি ?

‘অবশ্যই বলেছেন। আমার শাদীর পর দু'রাত্রি চলে গেল কিন্তু তুমি নাকি আমাকে কুমারী করেই রেখে দিয়েছ ? আব্বা সাফ বাৎ বলে গেছেন, আজ রাত্রে তুমি যদি আমার দেহ গ্রহণ না কর তবে মসনদ ছিনিয়ে নিয়েই তিনি ক্ষান্ত হবেন না, আরও ভয়ঙ্কর কিছু ঘটিয়ে দিতে পারেন। তােমার কোন ক্ষতি করলে যে আমি'- 

—“কি ? তুমি কি? আমার ক্ষতি করলে তুমি খুব ব্যথা পাবে, না? হায়াৎ, তুমি আমাকে বহুৎ পেয়ার কর, তাই না?

বদরকে জড়িয়ে ধরে হায়াৎ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। এক সময় কান্না ভেজা গলায় বলতে থাকে, বা রে, আমি ব্যথা পাব না ।

দু দিনেই আমি সমঝে গেছি, তুমি আদমি হিসাবে বহুৎ আচ্ছা। এবার বদর-এর গালে হাত বােলাতে বােলাতে বলল—“তুমি এক কাজ করলেই তাে পার। আমার আব্বা ঠিক যেমনটি চাচ্ছেন তেমন তেমন করলেই তাে ল্যাটা চুকে যায়। আমার কুমারীত্ব নাশ হলে যদি তারা খুশী হন তবে কেন আমি কুমারীত্বকে আঁকড়ে ধরে থাকব। আর তুমিই বা কেন তা খুশী হয়ে ঘােচাবে না?'

–তারা আর কিছু বলেছেন?

-হ্যা। আরও বাৎ বলেছেন। আমার তােয়ালেতে খুনের চিহ্ন খুজছিলেন। কাল ভােরে যদি তাতে খুন না দেখাতে পারি তবে হয়ত খুনখারাবি কাণ্ডই বাঁধিয়ে দেবেন। দু'হাত দিয়ে বদর-এর মুখটিকে সরাসরি নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে হায়াৎ এবার বলল–শােন, ডরে আমার কলিজা কাপছে। তুমি যা ভাল বােঝ কর আমি আর ভাবতে পারছি না। তােমার পথ, তােমার নিশানাই আমার নিশানা, এর বেশী কিছু আমার মালুম নেই।

হ্যা, আমাদের দু'জনের পথ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে মেহবুবা। বদর বুঝল এই সুযোেগ। একে কাজে লাগাতে হবে। এবার হায়াৎ-এর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলল—'আমি একটি বাৎ তােমাকে বলব বলব করে বলা হয়ে উঠছে না।'

–“কি বাৎ? আমার কাছে তােমার এত দ্বিধা কিসের, বলতাে তুমি আর আমি কি আলাদা কিছু যে আমরা ছাপাতে যাব? বল, কি বাৎ তােমার দিলে জাগছে মেহবুব?’

–তােমার আর আমার মধ্যে যদি কোন কামনা-বাসনার সম্পর্ক না থাকে তবে তােমার আপত্তি আছে? আমাদের পেয়ার মহব্বৎ যদি বেহেস্তের পেয়ার হয়, আপত্তি কি ? - বহুৎ আচ্ছা বাৎ! সােল্লাসে হায়াৎ বলে—আপত্তির কিছুই নেই। কিন্তু আমার আব্বা আম্মা কেন যে রােজ ঘ্যানর ঘ্যানর করেন, আমার কিছুই মালুম হয় না। আমার পেয়ার মহব্বৎ বহুৎ আচ্ছা একেবারেই খাটি, নিখাদ।

–‘যদি এমন হয় আমরা জিন্দেগী ভর ভাই আর বহিন হয়ে থাকব, ক্ষতি কি ? তােমার দিল-এর জন্য ব্যথিত-মর্মাহত হবে হায়াৎ ?

-“অবশ্যই না। আমরা খােশ মেজাজে চলব। আমি তােমার কাছে দিলের দরওয়াজা খুলে দেব। তুমিও আমার কাছে কিছু ছাপাবে না। ব্যস, খুশী। আমরা উভয়েই খুশী।

বদর দেখল, দাওয়াইয়ে কাজ হচ্ছে। বিমারি একটু একটু করে সারছে। এবার ঝট করে সে আর একটু এগিয়ে গেল—“আর একটি কথা। খুব ভাল করে নিজের দিলের সঙ্গে বােঝাপড়া করে জবাব দেবে। মনে কর, আমি তােমার ভাইয়া না হয়ে যদি বহিন হই, তবে? ভেবে দেখ, তুমি কি তখনও আমাকে একই রকম ভাবে পেয়ার করতে পারবে হায়াৎ ?

– পারব। জরুর পারব। জাদা পেয়ার করতে পারব তােমাকে। তুমি হবে আমার সবচেয়ে বড় সহচরী। আমাদের পেয়ারে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। আর কোনদিন আমরা কেউ কারাে কাছ থেকে দূরে সরে যাব না। এক দিল, এক আত্মা হয়ে আমরা পাশাপাশি কাছাকাছি রইব।

বদর এবার আচমকা হায়াৎকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘন ঘন চুম্বন করে বলল-“হায়াৎ, যদি কসম খাও কারাে কাছে ফাস করবে না তবে তােমাকে বহুৎ আচ্ছা এক তামাশা দেখাতে পারি। আগে বল, কারাে কাছেই ব্যাপারটি ফাস করবে না?'

‘খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, কারাে কাছেই ফাস করব না। বল, কি বলতে চাইছ?’ অত্যুগ্র আগ্রহ প্রকাশ করে হায়াৎ বলল।

বদর এবার হায়াৎ'কে পর পর দু'তিনটে চুম্বন সেরে দাঁড়িয়ে পড়ে। নিজের গা থেকে কোর্তা, শেরিওয়ানি, চোস্ত প্রভৃতি এক এক করে খুলে ফেলে। একেবারে উলঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর তার আঠার সালের যৌবনভরা দেহটিকে হায়াৎ-এর সামনে মেলে ধরে। নিজের সুডৌল নিখুঁত স্তন দুটোকে দু’হাতে মুঠো করে ধরে মুচকি হেসে বলল—“কি ভাবছ হায়াৎ আমি তােমাকে ধােকা দিয়েছি, জালিয়াতি করেছি তােমার আব্বার সঙ্গে। তােমাকে ধাপ্পা দিয়েছি, এই তাে?” হায়াৎ সবিস্ময়ে বলল—‘আমি আমার নিজের কথা কিছুই ভাবছি না। কিন্তু তােমার এরকম পুরুষের বেশ ধারণের কারণ কি, আমাকে খােলসা করে বলবে কি?

বদর হেসে বলে—“জরুর বলব। আর সব খােলসা করেই বলব। আমরা যখন বহিন হয়েছি। একে অন্যকে পেয়ার করে ফেলেছি, কিছুই ছাপাব না তােমার কাছে। আমার দুঃখ-যন্ত্রণার কিসসা শুনলে তােমার চোখের পানি বন্ধ হবে না। তবু সবই তােমাকে বলব। এবার হায়াৎ-এর কাঁধে হাত রেখে বদর কামার অল-জামান এর সঙ্গে তার সে প্রথম রাত্রির পরিচয়, মিলন ও সম্ভোগ থেকে শুরু করে তার রহস্যজনক ভাবে হাফিস হয়ে যাওয়ার ঘটনা পর্যন্ত সব খােলসা করে বলল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-নসীব, সবই নসীব। কবে যে আমার নসীব ফিন ঘুরবে, তাকে আমার বুকে ফিরে পাব একমাত্র আল্লাতাল্লাই জানেন। এবার সস্নেহে হায়াৎ-এর মাথায় হাত বােলাতে বােলাতে বলল–বহিন, আমি মনে করি, জামান আজ না হােক কাল ফিরে আসবেই। তখন আমরা দু’বহিন ভাগাভাগি করে তাকে ভােগ করব। তুমি হবে তার দ্বিতীয় বেগম।

হায়াৎ সবিস্ময়ে বদর-এর মুখের দিকে তাকায়। বদর বলে চলল-'তুমি আমার জবানের ওপর পুরােপুরি আস্থা রাখতে পার। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমি যদি তাকে তােমার হয়ে অনুরােধ করি, সে জরুর তা ফেলতে পারবে না।

'তাতেও যদি তিনি রাজী না হন?' 

-এতে যদির কোন সম্ভাবনাই নেই। 

হায়াৎ এবার ছােট্ট শিশুর মত বদর-এর বিবস্ত্র দেহটির দিকে মন দেয়। তার স্তন দুটোকে তাকাতে তাকাতে বলে বহিনজী তােমার দুটো কী বড়। আর আমার দুটো এই এত্তটুকু, কেন?

সময় লাগবে। সবে তাে গাছে ফল ধরেছে। বহিন, সময় হােক তােমার দুটোও দেখবে এমন সুডৌল হয়ে উঠবে। 

হায়াৎ বলে-'বহিনজী, আমি কতদিন বাঁদীদের কাছে জানতে চেয়েছি, আমার শরীরে এই যে এত সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের আয়ােজন। এর কোটি কোন কাজে লাগে?

-তারপর? তারা কি বলল?

-'কি আবার কিছু না। একথা-সেকথা বলে বার বার কাটিয়ে গেছে। কী বজ্জাৎ তারা, ভেবে দেখ তাে! একদিন এক তাজ্জব কাণ্ড করে বসেছিলাম আমি, এক বাঁদী আমার নগ্নদেহে সাবান মেখে দিচ্ছিল। আমি তাকে চেপে ধরলাম, তােমাকে আজ আর ছাডছি । আমার শরীরের এসব অঙ্গের কাজ কি ? আমি যত বারই জিজ্ঞাসা করেছি ততবারই সে ইঙ্গিতে, ভাসা ভাসা জবাব দিয়েছে। বদর মুচকি হেসে বলল—“তাই বুঝি?

তবে আর বলছি কি ? তােমাকে আজ আর ছাড়ছি না বহিনজী। তুমি আমাকে আজ বুঝিয়ে দাও।

‘তারা কিছুই বলে নি ?

-“আমি একদিন এক বাঁদীকে চেপে ধরেছিলাম আচ্ছা করে সে হতচ্ছাড়ি কিছুতেই মুখ খুলতে চায় না। আমিও জুলুম শুরু করে দিলাম। শেষ পর্যন্ত যখন কিছুতেই খােলসা করে বলল না তখন আমি গলা ছেড়ে চেঁচামেচি জুড়ে দিলাম। ব্যস, আমার চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আমার আম্মা ভীতা-সস্ত্রস্ত হয়ে হামামে ছুটে গেলেন। আমাকে বললেন—হয়েছি কি? এমন চেঁচামেচি কিসের? আমি চুপ। বাঁদীটিও মুখে কলুপ এঁটে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। আম্মার পীড়াপীড়িতে মুখ খুলতে বাধ্য হ’ল। আমতা আমতা করে বলল—“শাহজাদী জানতে চাইছেন, শরীরের কোন্ অঙ্গ কোন কাজে ব্যবহৃত হয়?

বাঁদীটির বাৎ শুনে আমার আম্মার মুখও কেমন ফ্যাকাসে হয়ে

Post a Comment

0 Comments