গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
এবার আয়না সমেত বটুয়াটি হাত বাড়িয়ে পিছনের দিকে রাখল। এবার ফুলদানির ফুলের ঝাড়ের মধ্যে লণ্ঠনটিকে ভরে নিল। চুল এলােমেলাে করে মুখ ঢাকল। ব্যস, আবার জানালাটি যথারীতি বন্ধ হয়ে গেল।
আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম। ভাবতে লাগলাম, আয়না, বটুয়া, ফুলদানি আর লণ্ঠনের মধ্যে সে কি বুঝাতে চাইছে?
আমি আমার মেহবুবার এবারের ইশারা-ইঙ্গিতের অর্থ উদ্ধারের ব্যর্থ প্রয়াস চালাতে চালাতে ঘরে ফিরলাম। আমি সদর-দরজা ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকতেই অজিজা উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নিয়ে ছুটে এল। আমি তাকে এবারের ঘটনাটিও সবিস্তারে বললাম। সে এবার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলল- বটুয়ার ভেতরে আয়নাটি পুরে পিছনে রেখে সে বুঝাতে চাইছে—যখন রাত্রি নেমে আসবে। চুল আলুথালু করে মুখ ঢেকে বুঝাতে চাইছে—অন্ধকারে যখন সূর্যের আলাে চাপা পড়ে যাবে। ফুলের মাধ্যমে বুঝাচ্ছে, ফুল বাগিচায় তােমাকে থাকতে বলছে। আর লণ্ঠন? বুঝাতে চাইছে তখন একটি আলাে দেখতে পাবে।
সাতাশিতম রজনী
আজিজ বলল —এবার আর আমি আজিজার ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। আসলে তার ব্যাখ্যার সত্যতা-যৌক্তিকতা নিয়ে আমার মনে সন্দেহের সঞ্চার ঘটেছিল।
আজিজা কিন্তু আমাকে সে বাগিচায় যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল। আমি গররাজি হওয়া সত্ত্বেও আজিজা র কথামত যথা সময়ে বাগিচার সে গাছটির তলায় গিয়ে দাঁড়ালাম। হ্যা, এবার সত্যি তার সঙ্গে মােলাকাৎ হ’ল। হঠাৎ দেখলাম। একটি ঝােপের কাছে একটি লণ্ঠন জ্বলছে। আলােটি লক্ষ্য করে এগােতে লাগলাম। তাজ্জব ব্যাপার। আমার সঙ্গে সঙ্গে আলােটিও এগােতে লাগল। আলােটি অনুসরণ করে আমি এবার একটি সুবিশাল মহলে ঢুকলাম। দরজার রেশমী পর্দা ঠেলে কামরার মধ্যে ঢুকে গেলাম। কিন্তু কামরার ভেতরে ঢুকে আরও তাজ্জব বনে গেলাম। কেউ-ই নেই। ঘর শূন্য। আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোন আদমি এতবড় মহলে আছে বলে আমার মনে হল না। কৌতুহল মিশ্রিত ভয়ে ভয়ে এঘর-ওঘর ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। আমার বিস্ময় কাটল না। আদমি তাে দূরের কথা অন্য কোন প্রাণীও আমার চোখে পড়ল না। আর আশায় আশায় তিন-তিনটি ঘন্টা কাটিয়ে দিলাম। এঘর ওঘর ঘুরে ঘুরে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তার ওপর মনে জমাট বাঁধা হতাশা। আর পারলাম না হাঁটাহাঁটি করতে। কার্পেটের ওপর বসে পড়লাম। হঠাৎ চোখে পড়ল তাকের ওপর খাবারদাবার আর সরাবের বােতল রয়েছে। ঝট করে উঠে কয়েকটি পিস্তার বরফি টপাটপ মুখে পুরে দিলাম। বােতল থেকে সরাব ঢেলে ঢকঢক করে কয়েক পেয়ালা দিলাম সাবাড় করে। মুহূর্তে শরীরটি একটু চাঙা হয়ে উঠল। আবার গিয়ে কার্পেটের ওপর বসে দেয়ালের গায়ে হেলান দিলাম। সরাবের নেশা আমাকে পেয়ে বসল। কখন যে কার্পেটের ওপর শরীর এলিয়ে দিয়ে ঘুমে অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলাম, বলতে পারব না। তারপর সারা রাত্রি কিভাবে কাটল তা-ও আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। জানালা দিয়ে কখন যে রােদ এসে আমার মুখের ওপর পড়েছিল তা-ও আমি বলতে পারব না।
আচমকা চোখ মেলে তাকালাম। হঠাৎ অনুভব করলাম আমি যেন কাটার ওপর শুয়ে। ঘাড় ঘুরিয়ে মেঝের দিকে চোখ ফেরাতেই অবাক হয়ে গেলাম। দেখি, সারা মেঝেতে মােটা-দানার নিমক ছড়ানাে। আর ? আমার পেটের ওপরে কে যেন উঁই করে কয়লার গুড়াে রেখে গেছে। একলাফে উঠে বসলাম। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে এদিক-ওদিক তাকালাম। না, একই পরিস্থিতি। মানুষের নামগন্ধও নজরে পড়ল না। আবার নতুন করে তাজ্জব বনলাম। নিজের বােকামির জন্য নিজেকে বারবার ধিক্কার দিতে লাগলাম।
সে মহল থেকে বেরিয়ে উদ্ভান্তের মত ছুটতে ছুটতে আমি পথ পাড়ি দিতে লাগলাম। এক সময় আজিজার কাছে এসে ঢিব করে বসে পড়লাম।
আমার এরকম ভয়াবহ রূপ দেখে আজিজা আতঙ্কিত হ'ল। সে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই আমি বলতে লাগলাম-ঘুম ভেঙে দেখি আমি নিমকের ওপর শুয়ে। আর গা ভর্তি কয়লার গুঁড়ো ।
আজিজা বলল- লেড়কিটি কি বলল? সে-ও কি এসবের কিছুই জানে না ?
-“আরে ধুৎ। লেড়কিটির সঙ্গে আমার মােলাকাৎ হলে তাে!” আমার কথায় আজিজা তাজ্জব বনে গেল। চোখ দুটো কপালে তুলে সে সবিস্ময়ে বলল - 'সে কী! লেড়কিটির সঙ্গে তােমার আদপেই যদি দেখা না হয়ে থাকে তবে তার ঘরে গেলে, পিস্তর বরফি, সরাব খেলে কি করে? আবার রাতভর ঘুমিয়েছও বললে—কি করে সম্ভব হ’ল? বুঝছি না, তুমি কি খােয়াব দেখছ, নাকি গুলতাপ্পি দিচ্ছ?
আমি তার কথার কি জবাব দেব বুঝে পেলাম না। তবে বাগিচায় ঝােপের আড়ালে লণ্ঠনের আলােটি দেখার পর থেকে সব ঘটনা, যেটুকু আজিজার কাছে বলা হয়ে ওঠে নি, খােলসা করে বললাম।
আজিজা এবার গুম হয়ে কয়েক মুহূর্ত ভাবল। তারপর একসময় মুখ খুলল ‘আজিজ, তােমার কথায় আমার কলিজা শুকিয়ে আসছে। লেড়কিটির হাতে তােমার নসীবের বহুৎ তকলিফ আছে। লবণ ছিটিয়ে দেবার অর্থ হচ্ছে, তােমার দেহে যৌবন পুষ্টিলাভ করে নি। তাই তাে উদ্ভিন্ন যৌবনাকে সম্ভোগের মাধ্যমে তৃপ্তিলাভের চেয়ে খানাপিনা আর নিদ যাওয়ার ব্যাপার স্যাপারে তােমার আকর্ষণ বেশী। আর কয়লার গুঁড়াে? এর অর্থ হচ্ছে তােমাকে সে ঘৃণার চোখে দেখে। তােমার কাছে পেয়ার মহব্বতের মূল্য খুবই নগণ্য। এবার আমি বুঝছি, তােমার আর সে পথ না মাড়ানােই সঙ্গত। তার মােহ থেকে নিজেকে বিছিন্ন করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আজিজার কথায় আমার কলিজাটি আচমকা মােচড় মেরে উঠল। বুক উজাড় করে, দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আপন মনে বলে উঠলাম- ‘হায় খােদা! আমারই তাে কসুর! আমি তাে উপযাচক হয়েই আমার পেয়ার মহব্বতকে অপমান করার সুযােগ করে দিয়েছি। নিজের ভােগ-লালসার বশবর্তী হয়ে আমি এগিয়ে গিয়ে দাগা খেলাম। বিলকুল কসুরই তাে আমার।'
আমি নিজেকে আর সংযত রাখতে পারলাম না। জবাই হওয়া খাসীর মত ছটফট করতে লাগলাম। নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতা আমাকে পেয়ে বসল। আজিজার দিকে অসহায় দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে বললাম- ‘আজিজা, আমি তাে তাকে ছাড়া জান রাখতে পারব। জিন্দেগী বিলকুল বরবাদ হয়ে যাবে। যা হােক কিছু একটি ফিকির তাে বালাও। সে যদি আমাকে পায়ে ঠেলে দেয় তবে আমি মারা যাব।'
আজিজার মুখে বিষাদের কালাে-ছায়া ফুটে উঠল। আর কেউ না জানুক, আমি তাে ভালই জানি, জিন্দেগীতে আমি ছাড়া আর কেউ বল-ভরসা নেই। আমার দুঃখে সে এখন যেমন কাতর ঠিক তেমনি আমার সামান্য সুখে সে উদ্বেল হয়ে পড়েছে বহুবার। নইলে কোন লেড়কি তার মেহবুবকে অন্য কারাে হাতে তুলে দিতে উৎসাহী হয়? আজিজার বুকের ভেতরে তুষের আগুনের মত আগুন ধিকধিক করে জ্বলছে। কথাটি তাে মিথ্যা নয়। তবু সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল আজিজ আমার হাত-পা ক্রমে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে, জান কি ? আমার চাচা, তােমার আব্বা, আমার শাদীর পাত্র ঠিক করে ফেলেছেন। তাই এখন আমাকে আর বাড়ির বাইরে বেরােতে দেবেন না। যা কিছু করার তােমাকেই করতে হবে। আমার ফন্দি-ফিকির যদি তােমার পক্ষে গ্রহণীয় হয় তবে আজ আবার তার বাড়ি যাও। খানাপিনার লােভ সামলে নিজেকে শক্ত রাখবে। আমার বিশ্বাস, আজ তােমাদের মােলাকাৎ হবেই হবে। খােদাতাল্লার ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাও। আখেরে ফল পেতেও পার।
সন্ধ্যার কিছু আগে আজিজা আবার নিজেহাতে আমাকে সাজিয়ে দিল। আতর ছড়িয়ে দিল পােশাক-আশাকে। খুসবুতে ঘর ভরে গেল। আমার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে সে বলল - যখন তােমার গালে টোকা দিয়ে সােহাগ জানাবে তখন তাকে যেন একটি প্রেমের গান শােনাতে ভুলাে না।
আমি তখন পেয়ার মহব্বতের খােয়বে ডুবে রয়েছি। আজিজার কলিজার ব্যথা বুঝবার মত দিল আর সময় উভয়েরই অভাব ছিল আমার। তার চোখ দুটোতে পানি ভিড় করেছে। কেন এ-পানি, কিসের ব্যথা-বেদনায় তার কলিজাটি জর্জরিত হচ্ছে তার হদিস করার ফুরসৎ আমার ছিল না।
অষ্টাশিতম রজনী
আজিজ বলল- “আমি আবার সে বাড়ির ভিতরে গুটিগুটি ঢুকে গেলাম। একই দৃশ্যের মুখােমুখি হলাম। এতবড় মহলে জনপ্রাণীর চিহ্নও দেখলাম না। আজ তাকে দেখতে পাবই, মােলাকাৎ হবেই একরকম নিশ্চিন্ত বিশ্বাস নিয়ে একটি কুর্শিতে গাএলিয়ে দিয়ে বসে রইলাম। রাত্রি ক্রমে গভীর হতে হতে দ্বিতীয় প্রহর পেরিয়ে তৃতীয় প্রহর শুরু হ’ল। আজিজার পরামর্শ ভুলে পেট পুরে খেয়ে নিলাম। সরাব গিললাম গলা পর্যন্ত। আর বসলাম না। যদি ঘুমিয়ে পড়ি এ ভয়ে রাতভর পায়চারি করে বেড়ালাম। শেষ রাত্রির দিকে কখন যে গালিচার ওপর বসে ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছিলাম কিছুই বলতে পারব না। ঘুম যখন ভাঙল তখন জানালা দিয়ে ঝলমলে রােদ ঢুকে মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে।
চোখ মেলে এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেরাতে চমকে উঠলাম। দেখি, আমি এক আস্তাবলে। তাজ্জব বনে গেলাম। আমি তাে ছিলাম মহলের বৈঠকখানায়, তবে আস্তাবলে কখন কি করে এলাম? আমি চিৎ হয়ে শুয়েছিলাম। বুকের ওপর কে যেন কতগুলি হাড়ের টুকরাে আর একটি গােলাকার বল রেখে গিয়েছিল। আরও ছিল, কিছু সবজীর খােসা, শুকনাে রুটির টুকরাে কয়েকটি, একটি ছুরি আর দুটো দিরহাম রেখে গিয়েছিল।
আমি আর সেখানে এক মুহূর্তও থাকতে পারলাম না। ছুরিটি হাতে নিয়ে বদ্ধ পাগলের মত বাড়ির দিকে ছুটতে লাগলাম।
আমার কাদা-গােবর মাখা পােশাক, উসকো খুসকো চুল আর, চোখ-মুখের আতঙ্কের ছাপ দেখে আজিজা বলে উঠল- “কি ব্যাপার, আজও ঘুমিয়ে পড়েছিলে বুঝি ? তােমাকে এত করে বলে দিলাম, ঘুমিয়াে না, সেই কালঘুমের হাতে নিজেকে সঁপে দিলে ! তাজ্জব ব্যাপার-স্যাপার তােমার!
আমি আজও তার কাছে কিছু গােপন করতে পারলাম না। গত রাত্রের ঘটনা সবই এক এক করে আজিজার কাছে বললাম। সে কপাল চাপড়ে বলে উঠল- হায় খােদা! তুমি আমার কথাটিকে পাত্তাই দিলে না। বলেছিলাম খানা খাবে না, সরাব খাবেনা, ঘুমােবে না ।
করলে ঠিক তার বিপরীত! তােমাকে নিয়ে আর পারার জো নেই দেখছি! আমি উন্মাদের মতাে চেঁচিয়ে উঠলাম—‘মিছে কপাল চাপড়ে হায় হায় করলে কি হবে? এখন কি করব, বল? যা হবার তাে হয়েই গেছে। তাকে না পেলে আমার জিন্দেগী বরবাদ হয়ে যাবে, বলেছিই তাে।
উননব্বইতম রজনী
বেগম আবার কিসসা শুরু করলেন। আজিজা এবার বলল —“যে বলটি তােমার বুকের ওপর রাখা ছিল তার অর্থ হচ্ছে—তুমি অন্তঃসারশূন্য। ফাঁপা বেলুনের মত তােমার ভেতরটি। কামনা-বাসনা কিছুই নেই তােমার মধ্যে। শুধুই হাওয়ায় ভরা তােমার বুক। আর ছুরিটি? এর অর্থ কিন্তু ভয়ঙ্কর। আর দিরহাম দুটোর মারফতে তার চোখের কথা বুঝাতে চাইছে। সজীর খােসাগুলির কথা বলা হয় নি। শােন, ওগুলাে দিয়ে তােমাকে নিষ্কর্মা বলতে চাইছে। আর হাড়ের টুকরােগুলাের কথা ভেবে ভয়ে আমার গলা পর্যন্ত শুকিয়ে আসছে। কয়েক মুহূর্ত নীরবে কাটিয়ে সে আবার বলতে শুরু করল–শােন, আজও আবার তােমাকে ওই মহলে যেতে হবে। দুপুরে সকাল সকাল খানাপিনা সেরে লম্বা ঘুম দেবে যাতে সারারাত্রি জেগে থাকতে পার। ঘুমিয়ে পড়লে কিন্তু কেলেঙ্কারী করে বসবে। সন্ধ্যার আগে গলা পর্যন্ত ঠেসে খানা খাবে। পেটভর্তি থাকলে রাত্রে খানাপিনার জন্য দিল ছটফট করবে না।।
সন্ধ্যার আগে আজিজা আমাকে পােশাক-আশাক পরিয়ে দিল। তারপর আতর ছিটিয়ে খুসবুর ব্যবস্থাও করল। আমি নিজের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে বললাম—এ কী করলে আজিজা, এ পােশাক তাে আমার আব্বা আমার শাদীর জন্য কিনে এনেছিলেন। আজ হঠাৎ এ পােশাকে আমাকে সাজালে কেন আজিজা?’
‘হা, শাদীর পােশাকই বটে। কিন্তু শাদী তাে আর হল না। ‘হ’ল না ঠিকই। কিন্তু কোনদিন কি আমার শাদী হবে না? চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আজিজা বললে—“হবে, অবশ্যই হবে। কিন্তু সে-শাদী তাে হবে শাহজাদী বাদশাহের লেড়কির সঙ্গে। তখন এ-পােশাক নয়, জরি দেওয়া ঝলমলে পােশাক তােমার গায়ে উঠবে।
–কেন আজিজা, তােমার সঙ্গে আমার শাদী হবে না?
‘অন্য পাত্রের সঙ্গে তােমার আব্বা, আমার চাচাজী আমার শাদী ঠিক করেছেন। তুমি অমত করায় উপায়ান্তর না দেখে তিনি এপথই বেছে নিয়েছেন। শরমে আমার মাথা নীচু হয়ে গেল। কি বলব, চট করে গুছিয়ে উঠতে পারলাম না।
আজিজা চোখের পানি মুছতে মুছতে এবার বলল —আজিজা, আমার শাদী যার সঙ্গে হােক, সুলতান বাদশাহের লেড়কার সঙ্গে হলেও আমি আজ যেমন তােমার আছি ভবিষ্যতেও তােমারই থাকব। তুমি যাকে নিয়েই ঘর বাঁধ না কেন তার জন্য আমি বিন্দুমাত্রও পরােয়া করি না। এ দুনিয়ায় তােমাকে আমি কাছে না পেলেও শেষ-বিচারের দিন আমাদের মিলন তাে হবেই হবে আজিজ। আজিজা কথা ক’টি আমার উদ্দেশ্যে জুড়ে দিয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল।
নব্বইতম রজনী
বেগম আবার তার কিসসা শুরু করলেন। জাঁহাপনা, কয়েক মুহূর্ত পরে চোখের পানি মুছতে মুছতে আজিজা আবার মুখ খুল্ল–আজিজ, আজ তােমার পরম লগ্নের দিন। তােমাকে আমি নিজের হাতে, মনের মত করে সাজিয়ে দেব না, বলছ কি! মন খারাপ কোরাে না মেহবুব, তােমার এতদিনের সাধ আজ পূর্ণ হবে। আমি আল্লাতাল্লার কাছে প্রার্থনা করছি, তােমরা যেন জিন্দেগী ভর একে অন্যের কাছাকাছি একাত্ম হয়ে থাকতে পার। মেহবুবার কণ্ঠলগ্ন হয়ে সুখে শান্তিতে—ভাল কথা, যে গানা তােমাকে শিখিয়ে দিয়েছি, তাকে শােনাতে ভুলাে না যেন।'
আজিজার আচরণ আমাকে বিস্মিত করল। নিজের মেহবুবকে নিজের কলিজাকে নিজের হাতে সাজিয়ে তার মনের মানুষের কাছে পাঠাচ্ছে, কম কথা ! এমন ত্যাগ, এমন আত্মসম্বরণ আর এমন আত্মপীড়ন সচরাচর দেখা যায় না। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে না আসতেই আমি তার মহলের বৈঠকখানায় পৌছে গেলাম। একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখলাম। কামরাটি শূন্য—ফাঁকা । খানা আর সরাবের বােতল আগের মতই সাজানাে রয়েছে।
রাত্রির প্রথম প্রহর কেটে গিয়ে দ্বিতীয় প্রহরে পড়ল। আমি ঠায় বসে রইলাম। খানা বা সরাব কিছুই স্পর্শ করলাম না। ঘুমের তাে প্রশ্নই ওঠে না। বিনিদ্র অবস্থায়ই রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরও আমি কাটিয়ে দিলাম। আমার মনের কোণে হতাশা আর হাহাকার গাঢ় হতে থাকে। তার আশা আজও ছেড়েই দিলাম।
এমন সময় একদল লেড়কির গলা আমার কানে এল। সচকিত হয়ে সােজা হয়ে বসলাম। উৎকর্ণ হয়ে লেড়কিদের গলার স্বর কিনা বোঝার চেষ্টা করলাম। হ্যা, আমার ধারণা অভ্রান্ত। কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই একদল খুবসুরৎ লেড়কি পরিবেষ্টিত হয়ে আমার মনময়ূরী, আমার খােয়াবের হুরী-পরী, আমার কলিজা সে লেড়কিটি হাসিমাখা মুখে কামরায় ঢুকল। ভেতরে ঢুকেই ঠোটে হাসির রেখাটুকু অক্ষুন্ন রেখেই আমার পেয়ারী, আমার মেহবুবা বলল—“কি গাে, আজকে এখনও জেগে রয়েছ, ঘুমােলে না?
-না, তুমি আসবে জানতে পেরে ঘুম আর এগােতে সাহস পায় নি রূপসী।
একানব্বইতম রজনী
বেগম কিসসা শুরু করলেন। জাহাপনা, লেড়কিটি তার সঙ্গী সাথীদের কামরা ছেড়ে যেতে ইশারা করল। তারা এক এক করে কামরা ছেড়ে গেল। এবার এত বড় কামরাটিতে কেবল আমরা দু'জন রইলাম। আমি আর আমার ভাল লাগা লেড়কিটি। সে ঠোটের কোণে দুষ্টুমি ভরা হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে আমার পাশে, একেবারে গা ঘেঁষে বসল। তার নিটোল তুলতুলে আর ধবধবে সাদা হাত দুটো দিয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। আঃ কি শান্তি! কি স্বস্তি! আমি আমার ঠোট দুটোকে তার আপেল রাঙা ঠোট দুটোর কাছে নিয়ে গেলাম। চুম্বন করলাম। এক-দুই-তিন–পরপর কতবার যে তাকে চুম্বন করেছিলাম তার হিসাব রাখার মত অবস্থা তখন আমার ছিল না।
আর বসে থাকা সম্ভব হ’ল না। কার্পেটের ওপর আমরা শুয়ে পড়লাম। সে আমাকে বাকি রাত্রিটুকু সােহাগে সােহাগে ভরিয়ে তুলল আমার এতদিনের হতাশা আর হাহাকারে আমার মনময়ূরী পানি ছিটিয়ে শান্ত করে দিল।
আমরা জড়াজড়ি করে কখন যে কার্পেটের ওপরেই ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছিলাম দু'জনের কেউ-ই বলতে পারব না।
ঘরের মেঝেতে সােনালী রােদ এসে কখন যে লুটোপুটি খেতে শুরু করেছে বুঝতেই পারি নি। চোখের ওপরে রােদ এসে পড়ায় আমাদের সুখ-নিদ্রা টুটে গেল।
আমি তার কাছ থেকে বিদায় নেবার জন্য তৈরী হলাম। আমি তাকে আমার নাম বললাম। সে তার নাম বলল—দুনিয়া। বিদায় মুহূর্তে সে তার নিজের হাতে তৈরী একটি রেশমী রুমাল আমাকে উপহার দিল।
বাড়ি ফিরে আজিজার কামরায় যেতেই আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম সে খাটের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমার উপস্থিতির কথা বুঝতে পেরে আজিজা উঠে বসল। ওড়না দিয়ে চোখের পানি মুছে বলল—‘আমার জন্য ভেবাে না আজিজ। তারপর বলল তােমার মহব্বতের অগ্রগতি কতদূর কি হ’ল ?” আমি সারারাত্রির ঘটনাবলী তাকে বললাম। সব শেষে আমার মেহবুবার উপহৃত রুমালটি তার চোখের সামনে মেলে ধরলাম। সে মুখে বিষাদের ছাপ ফুটিয়ে তুলল না, আবার উল্লসিতও হ’ল না। ক্ষীণকণ্ঠে উচ্চারণ করল ‘তুমি সুখী তাে, তােমার সুখেই আমার সুখ। তােমাদের ভবিষ্যৎ-জীবন উজ্জ্বলতম হয়ে উঠুক। আমি দূর থেকে তােমাদের সুখ শান্তি দেখে তৃপ্ত হ'ব।
আমি সচকিত হয়ে বললাম—এ কী কথা বলছ আজিজা! তুমি কোথায় যাবে? দূর থেকে মানে আমার মুখের কথা শেষ হতে না হতেই সে বলতে শুরু করল—“আমি যেখানে যাব তার হদিস তােমাদের পাওয়ার উপায় নেই, আজিজ। বহু দূরে, তােমাদের একেবারে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যাব।
আমার মন থেকে তখনও গত রাত্রের আবেগ-উচ্ছ্বাস মুছে যায় নি। তাই তার হেঁয়ালিপূর্ণ কথা ধরা আমার পক্ষে সম্ভব হয় নি। তা নিয়ে ভাববার মত মানসিকতা আমার ছিলও না। আজিজা এবার বলল ‘ভাল কথা, সে-গানাটি তােমার মেহবুবাকে শুনিয়েছিলে ? আমি জিভ কেটে বল্লাম—এই রে, একদম ভুলে গিয়েছিলাম।
–‘তাকে দেখেই আবেগে অভিভূত হয়ে সব গুলিয়ে ফেলেছিলে বুঝি ? যাক, যা হবার হয়ে গেছে। আজ কিন্তু শােনাতে ভুলবে না। মহব্বতের মন্ত্র দিয়ে গাঁথা গানটির প্রতিটি শব্দ। আজ কিন্তু শােনাতে ভুলাে না যেন।
বিরানব্বইতম রজনী
বেগম আবার কিসসা শুরু করলেন। আজিজ বলল— আজিজা আমার ভুলের জন্য মর্মাহত হয়েছে, বুঝতে বাকি রইল না। এটাই তাে স্বাভাবিক। যাকে মনপ্রাণ সঁপে দিয়ে সে দেউলিয়া সে যদি তার অনুরােধ উপেক্ষা করে। তাতে তাে মর্মাহত হবারই কথা। আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম “কিছু মনে কোরাে না। তােমার গানা আজ আমি তাকে ততা শোনাবোই–শােনাব।
আবার গেলাম। আজিজার কথা মত, অবশ্য নিজের আগ্রহ ছিল না একথা বললে মিথ্যাই বলা হবে। আমি ঠিক সন্ধ্যায় সে বাগিচায় গিয়ে হাজির হলাম। বাগানে পা দিতেই বাঞ্ছিতা দুনিয়ার মুখােমুখি হলাম। সে আমার হাত ধরে নিয়ে গিয়ে তার কামরায় বসাল। দু'চারটি মামুলি কথার পর আমরা পাশাপাশি বসে খানাপিনা সারলাম। সে সরাবের বােতল নিয়ে এল, সে পেয়ালা ভরে ভরে নিজে সরাব পান করলাে আমাকেও দিল। দুনিয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে কতভাবে যে সােহাগ করল তা বলে শেষ করা যাবে না। তার সর্বাঙ্গে যৌবনের ঢল নেমেছে। আমার যৌবনও উথালি-পাথালি করতে লাগল। যৌবনের উন্মাদনা যে কী জিনিস তা সেদিন রাত্রেই আমি প্রথম পুরােপুরি উপলব্ধি করলাম। যৌবনের বাঁধনহারা জোয়ারের তাণ্ডবে আমরা উভয়েই যেন ভেসে চললাম অজানা-অচেনা এক রূপকথার দেশে। সারা রাত্রি আমরা কেউ-ই দু’চোখের পাতা আর এক করতে পারলাম না । সংক্ষেপে বলতে গেলে আমরা একে অন্যের যৌবনচিহ্নগুলাে নিয়ে মেতে রইলাম।
সকাল হ'ল। এবার বিদায় নেবার পালা। অকস্মাৎ আমার চোখের সামনে যেন আজিজার পানিভরা চোখ দুটো ভেসে উঠল। সে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেছিল—“আমার গানটি তাকে শুনিও। এ-ই আমার স্মৃতি-উপহার। গানটি আমার তাকে গেয়ে শােনাতে কিন্তু ভুলাে না।
( চলবে )

0 Comments