আরব্য রজনী পার্ট ৪৫ ( Arabyarajani Part 45 ) alif laila

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
তখন না পারবেন গিলতে আর না পারবেন ওগরাতে। তাই জাহাপনার কাছে আমার একটি মাত্রই আর্জি, বান্দাকে যেন বাজার থেকে বাঁদী কিনে আনতে হুকুম করবেন না। দুনিয়ার সবসেরা সুরৎ-ও যদি তার থাকে তবু আমি তা করতে নারাজ। তবে হ্যা, লেডকা-লেড়কি পয়দা করাই যদি আপনার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে থাকে তবে কোন সুলতান বাদশাহের লেড়কিকে শাদী করে প্রাসাদে নিয়ে আসুন। আপনি যদি হুকুম করেন তবে শাহ বংশেরও খুবসুরৎ লেড়কি জোগাড় করা সম্ভব।


-হ্যা, আমি শাদী করব। তুমি শাহ বংশের পাত্রীর পাত্তা লাগাও। কেবলমাত্র সন্তান পয়দা করার উদ্দেশ্যেই আমি শাদী করতে উৎসাহী।

—“জাহাপনা, পাত্রী আমার হাতের মুঠোতেই রয়েছে। আমার বিবির কাছে খবর আছে সফেদ নগরের সুলতান জহর শাহ-র এক খুবসুরৎ লেড়কি রয়েছে। এমন সুরৎ নাকি তামাম আরব দুনিয়ার কোন লেড়কির মধ্যে নাই।।
ব্যস, আর দেরী নয়। বৃদ্ধ উজিরের পরামর্শে সুলতান এক প্রবীণ ও বিচক্ষণ আমীরকে সুলতান জহর শাহর দরবারের উদ্দেশে যাত্রা করতে বললেন। পর মুহূর্তেই ভাবলেন, যে-সে লােক দিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবার নয়। উপায়ান্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধ উজিরকেই সুলতান জহর শাহর দরবারে ভেজলেন।


প্রচুর সােনাদানা, হীরে-জহরৎ, মণি-মুক্তা এবং হরকিসিমের সমানপত্র উট আর খচ্চরের পিঠে বােঝাই করে বৃদ্ধ উজির সুলতান জহর শাহর দরবারের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। সুলতান জহর শাহর দরবারে উজির উপস্থিত হয়ে তাকে কুর্নিশ করে নজরানা স্বরূপ দ্রব্য সামগ্রী তার সামনে রাখলেন।


সুলতান মহা খুশী। আগন্তুক উজিরকে বললেন—“আপনি পথশ্রমে ক্লান্ত। আগে খানাপিনা সেরে সুস্থ হােন। পরে ধীরে সুস্থে আপনার বক্তব্য শােনা যাবে।


বিকালে উজির সুলতানের সঙ্গে ভেট করলেন। মসনদে সুলতান জহর শাহ উপবিষ্ট। তারই সামনে সুদৃশ্য একটি কুরশিতে উজিরকে বসতে দেওয়া হল।

 এমন সময় প্রভাত হয়ে আসছে দেখে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

                      একাশিতম রজনী 

প্রায় মাঝরাত্রে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাহাপনা, সুলতান জহর শাহ আগন্তুক সুলতান সুলেমান-এর বৃদ্ধ উজিরকে যথােচিত খাতির করে বসালেন।

সুলেমান-এর উজির দু'-চারটি সৌজন্যমূলক কথা সেরে নিজের আগমনের উদ্দেশ্যের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, আমার মহামান্য সুলতানের পক্ষ থেকে আপনার দরবারে দুটো আর্জি পেশ করার জন্যই আমাকে ছুটে আসতে হল। সুলতান জহর শাহ ঠোটের কোণে চমৎকার হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললেন—আপনার সুলতানের অভিপ্রায় কি, মেহেরবানি করে বলুন।

–আমার সুলতান, শাহজাদী—আপনার লেড়কির পাণিপ্রার্থী। আমার সুলতান যেসব উপঢৌকন পাঠিয়ে আপনাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন তা গ্রহণ করে ধন্য করুন। আমাদের সুলতান' উজিরকে তার কথা শেষ করতে না দিয়েই সুলতান জহর শাহ অবিশ্বাস্য, একেবারেই অপ্রত্যাশিত এক কাজ করে বসলেন। মসনদ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আগন্তুক বৃদ্ধ উজিরকে কুর্নিশ জানালেন।

ব্যাপারটি দরবারে উপস্থিত সুলতান জহর শাহ-র উজির থেকে শুরু করে আমীর-ওমরাহ প্রভৃতির মধ্যে বিস্ময়ের সঞ্চার করল। সামান্য এক উজিরকে সুলতান মসনদ ছেড়ে উঠে কুর্নিশ জানালে অবাক তাে হতেই হয়।।

সুলতান জহর শাহ শ্রদ্ধার সঙ্গে নিবেদন করলেন—আপনি। প্রবীণ, বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান। আমার পরম শ্রদ্ধার পাত্র। আপনি সুলতান সুলেমান-এর যে-প্রস্তাব আমার দরবারে পেশ করলেন তার জন্য আমি যারপর নাই খুশী। আপনি সুলতান সুলেমান-এর যে-অভিমত বহন করে নিয়ে এসেছেন তা আমার কাছে পরম আনন্দের ব্যাপার বলেই মনে করছি। নসীব নিতান্তই আচ্ছা না হলে আমার লেড়কির দিকে সুলতানের নজর অবশ্যই যেত না। আমার লেড়কি তার প্রাসাদে কেনা বাদী হয়ে তার সেবায় নিজেকে লিপ্ত রাখবে।

সুলতান জহর শাহ-র তলব পেয়ে কাজীরা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। তারা সুলতানের লেড়কি ও সুলতান সুলেমান-এর শাদীর কবুলনামা তৈরি করল।

সুলতান জহর শাহর দিল খুশীতে টগবগিয়ে উঠল। তিনি লেড়কির সহচরী যারা যাবে, সব নফর বাদীদের নিজে বাছাই করলেন। দশটি খচ্চরের পিঠে সাদীর দানসামগ্রী বােঝাই করা হ’ল।।

সুলতান সুলেমান-এর উজির সুলতান জহর শাহ-র লেড়কিকে নিয়ে শুভমুহূর্তে নিজের মুলুকের উদ্দেশে যাত্রা করলেন।

প্রাসাদ-দরজায় পৌছে এক নফরকে দিয়ে সুলতান সুলেমানএর কাছে তার ভাবী বেগমের আগমনবার্তা পাঠালেন।

খবর পেয়ে সুলতান আনন্দ-উচ্ছাসে আত্মহারা হয়ে পড়ার জোগাড় হলেন।

                      বিরাশিতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করলেন—প্রজাদের মধ্যেও খবরটি কম সাড়া জাগাল না। সুলতান-এর এতদিন পর সুমতি হয়েছে, শাদী করে ঘর-সংসার পাতবেন, কম কথা ! সমগ্র নগর জুড়ে শুরু হয়ে যায় আনন্দ-লহরী।

সে রাত্রেই সুলতান ও বেগম মধুযামিনী যাপন করলেন। আর প্রথম রাত্রেই বেগম অন্তঃসত্ত্বা হলেন। সুলতান-এর মধ্যে নতুন করে আনন্দের জোয়ার বয়ে চলল। তার দীর্ঘদিনের আশা-আকাঙক্ষা আজ বাস্তব রূপ নিতে চলেছে। তার মসনদের উত্তরাধিকারী আসছে। তার মৃত্যুর পর সুলতানিয়তের কি গতি হবে, কে মসনদে বসে প্রজাপালন করবে এ ব্যাপারে যে অনিশ্চয়তা ছিল আজ তা ঘুচে যাওয়ার ইঙ্গিত দেখা দিয়েছে। দশমাস গর্ভ ধারণ করে বেগম এক লেড়কা পয়দা করলেন। চাদের কলার মত ফুটফুটে টুকটুকে নবজাতকের নামকরণ করা হ’ল তাজ অল-মুলুক। লেড়কার ওমর যখন সাত সাল তখন এক প্রবীণ ও বিচক্ষণ মৌলভীর ওপর তার বিদ্যা শিক্ষার ভার দেয়া হল।

নওজোয়ান তাজ অল-মুলুক-এর ওমর যখন আঠার সাল তখন সে সব বিদ্যায় বিশারদ হয়ে উঠল। সে যেমন সুদর্শন নওজোয়ান তেমনি তার বিদ্যা-বুদ্ধি।

এক সকালে তাজ অল-মুলুক এক নদীর ধারের জঙ্গলে পাখি শিকার করতে বেরল। শিকারের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে সে নদীর ধারে এসে পড়ল। দেখল, এক সওদাগর তার নৌকা নােঙর করে তাবু ফেলেছে। তার নির্দেশে এক নফর ছুটল সওদাগরের খবরাখবর নিতে।

সওদাগর তখন তাজ অল-মুলুক-এর জন্যেই ভেট পাঠাবার বন্দোবস্ত করছে।

এদিকে তাজ-এর প্রেরিত নফর ফিরে আসতে দেরী করায় তাজ নিজেই এক পা দু’পা করে সওদাগরের তাঁবুর উদ্দেশে এগােতে লাগল। পথেই উট ও খচ্চরের পিঠে উপহার সামগ্রী চাপিয়ে তার কাছে পৌছে দেওয়ার জন্য সওদাগরকে অগ্রসর হতে দেখে তাজ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

সওদাগর তাজ’কে উপহার সামগ্রী পৌছে দেওয়ার জন্য কিছুদূর অগ্রসর হতে না হতেই হঠাৎ তাকে দেখতে পেয়ে কুর্নিশ করে দ্রব্যসামগ্রী তার পায়ের কাছে রাখল। তাজ তাকে সমানপত্রগুলির দাম জিজ্ঞাসা করল।

সওদাগর জিভকেটে বলল-তােবা! তােবা! এমন কথা মুখেও আনবেন না হুজুর! আমরা আপনার নফরের নফর। এই তাে কটি মাত্র সমানপত্র আপনাকে নজরানা স্বরূপ দিতে আসলাম। আপনার পছন্দ হলেই আমি খুশী। এর বিনিময়ে দাম!  তাজ সমানপত্র সব এক নফরের হাতে দিয়ে তাঁবুতে নিয়ে যেতে হুকুম করল। এবার সওদাগরকে সুকরিয়া জানিয়ে ঘােড়ার রেকাবিতে পা দিয়ে তাজ থমকে গেল। বিষাদক্লিষ্ট মুখে এক নওজোয়ানকে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। কাছে এগিয়ে গেল।

সমবেদনার স্বরে জিজ্ঞাসা করল-“ভাইয়া, তােমার চোখে পানি কেন? কে তুমি? কি নাম তােমার? থাকই বা কোথায় ?

“আমার নাম আজিজ। কথাটি কোনরকমে ছুঁড়ে দিয়েই ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল।

                     তিরাশিতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদী আবার কিসসা শুরু করলেন। তাজ তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলল —‘দুঃখ বেদনা কম-বেশী সব আদমির জীবনেই তাে আসে। তাই বলে দুঃখের হাতে নিজেকে সঁপে দিলে তাে দুঃখ-দুর্দশার কাছে পরাজিত হওয়াই হয়। তুমি নির্দ্বিধায় আমার কাছে তােমার তকলিফের কথা বলতে পার। কথা দিচ্ছি, তােমার মুশকিল আসান করতে আমি চেষ্টার কসুর করব না।

–‘আমার দুঃখময় জীবনের কথা শুনে আপনার ফয়দা কি ? 

‘কৌসিস করব তােমার নসীবের ভাগ যাতে আমি নিতে পারি।

–‘বহুৎ আচ্ছা! তবে বলব, কথা দিচ্ছি। কিন্তু এখানে, এত লােকের মাঝে আমি বলতে পারব না।'

তাজ ম্লান হেসে বলল —“ঠিক আছে, আমার তাবুতে চল। নওজোয়ানটিকে নিয়ে তাজ তাঁবুতে ফিরে এল। খানাপিনার পর দু'জনে মুখােমুখি বসল।

নওজোয়ান আজিজ এবার তার দুঃখের কিসসা বলতে শুরু করল—“আমি আমার আব্বাজীর একমাত্র লেড়কা। তার কোন লেড়কি নেই। একেবারেই একলা আমি, আমার চাচা মারা যাবার সময় তার একমাত্র মা-মরা লেড়কিকে আমার আব্বার হাতে তুলে দেন। তার পক্ষে দেখভাল করা সম্ভব নয় বলেই তাকে এপথ বেছে নিতে হয়। আমরা ভাইয়া আর বহিন মিলেঝুলে দিন গুজরান করি। লিখাপড়া, খানাপিনা,' খেলকুদ সবই একসাথে করি। আমার নাম আজিজ আর আমার চাচাতাে বহিনের নাম আজিজা। নামের মধ্যেও সুন্দর একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়, ঠিক কিনা?

দেখতে দেখতে আজিজার শাদীর ওমর হয়ে গেল। আমার আব্বা বললেন—“বেটা, আমার ভাইয়া গােরে যাবার আগে আমাকে বলে গিয়েছিল—আজিজ-এর সঙ্গে আজিজার শাদী দিও। তােমাকে তাে তাকে শাদী করতে হবে।

আব্বার বাৎ শুনে আমি তাে আশমান থেকে পড়লাম। হঠাৎ শাদী! সে কী এখনই শাদী করব কী। সত্যি বলতে কি সেদিন পর্যন্ত আমার দিলে কোনদিন শাদীর কথা জাগে নি। ঘরেই পাত্রী রয়েছে,

যখন তখন যাকে শাদী করা যায় তার দিকে তাকিয়েও কোনদিন | শাদীর কথা ভাবি নি।

সত্যি বলছি, আজিজা আর আমার মধ্যে পেয়ার কম ছিল না, কেউ, কাউকে ছেড়ে একরাত্রিও কোথাও থাকতে দিল চাইত না। ভাল কিছু কাউকে খেতে দিলে অন্য জনকে না দিয়ে মুখে তুলতে পারতাম না। আবার আজিজার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযােজ্য। আমাদের পেয়ারে তিলমাত্রও খাদ ছিল না। এমন মধুর একটি সম্পর্ক যে মহব্বতের রূপ নেবে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে তুলবে তা আজিজা কোনদিন ভেবেছিল কিনা জানি না, আমি অন্ততঃ ভাবিনি।

আমি আব্বার কথার কোন জবাব না দিয়ে থালি থেকে খানা তুলে মুখে পুরতে লাগলাম। হা-না বা ভাল মন্দ কোন কথাই বললাম না। আব্বা বার বার আড়চোখে তাকিয়ে আমার মানসিক পরিবর্তনটুকু বােঝার চেষ্টা করতে লাগলাে। আমি নির্বিকার ভাবে খানা খতম করে উঠে পড়লাম। আব্বার মুখের ওপর প্রতিবাদ করার মত বুকের পাটা আমার ছিল না। তাই মুখে কুলুপ এঁটেই থাকতে হ’ল।

এক সন্ধ্যায় আব্বার ঘরে আমার তলব পড়ল। কাপতে কাপতে হাজির হলাম। ভাবলাম, আজ তিনি আমার ওপর কোন্ ফরমান জারি করবেন, কে জানে। আমি দরওজায় পা দিতেই তিনি গুরুগম্ভীর গলায় উচ্চারণ করলেন-' কামরায় এসাে। আমি গুটি গুটি এগিয়ে তাঁর মুখােমুখি অথচ মুখ নিচু করে দাঁড়ালাম।

তিনি পূর্বস্বর অনুকরণ করে বললেন—“আগামী জুম্মাবার তােমার শাদীর দিন ধার্য করেছি। আজিজা-র সঙ্গেই তােমার শাদী হবে। তােমার ইয়ার-দোস্তদের মধ্যে যাদের নিমন্ত্রণ করতে চাও তাড়াতাড়ি সেরে ফেল।

এবারও মুখবুজে তার কথা শােনলাম। শাদীর জন্য দিলকে তৈরী করে নিলাম। 

                     চুরাশিতম রজনী 

জুম্মাবারে নামাজ সারার পর হঠাৎ আজিজ-এর খেয়াল হল, এক দোস্তকে নিমন্ত্রণ করা হয় নি। শেরওয়ানিটি গায়ে চাপিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। গরমির দিন। পথে যেন লু বইছে। গা দিয়ে সমানে পানি ঝরছে। ঘাম পড়ে চোখ দুটো পর্যন্ত জ্বালা করছে। অনন্যোপায় হয়ে সামনে ছােট্ট বাগিচা দেখে ঢুকে পরলাম । একটি ঝাকড়া গাছের তলায় বসে জিরােতে লাগলাম । ভাবলাম রােদের তেজ একটু কমলে হাঁটবো। গাছের গায়ে হেলান দিয়ে গা এলিয়ে দিলাম । আজিজ বলছে…  ফুরফুরে বাতাসে সবে আমার চোখ দুটোতে একটু তন্দ্রাভাব এল। আচমকা খুট করে এক আওয়াজ হ’ল। তন্দ্রা টুটে গেল। সােজা হয়ে বসে পড়লাম। চোখ ফেরাতেই একটি ছােট্ট পুটলি আমার সামনে পড়ে থাকতে দেখলাম। লাল একটি রুমালে কি যেন বাঁধা। আমার সামনে হঠাৎ পড়ল।

আমি কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে হাত বাড়িয়ে রুমালে বাঁধা বস্তুটি তুলে নিলাম। গিট খুলেই অবাক হলাম। আপন মনে বলে ওঠলাম ‘হায় খােদা ; সামান্য এক টুকরাে পাথর এত যত্ন করে বাঁধা হয়েছে।

বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে এদিক-ওদিক চাইতে লাগলাম। হঠাৎ একটি খােলা-জানালা নজরে পড়ল। দেখি, এক খুবসুরৎ লেড়কি দাঁড়িয়ে। ষােড়শী, কি অষ্টাদশী হবে বােধ হয়। বুঝতে দেরী হ’ল না এ তারই কাম। পাথরটিকে রুমালে বেঁধে নির্ঘাৎ সে-ই ছুঁড়ে দিয়েছে আমাকে লক্ষ্য করে।

আমার কলিজাটি সে-মুহূর্তে যে কেমন নেচে উঠল তা বলে বুঝাতে পারব না হুজুর। তবে ধরে নিতে পারেন কলিজাটি অকস্মাৎ অস্বাভাবিক চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। আমি প্রথম অনুভব করলাম, একটি লেড়কি এক নওজোয়ানের ভেতরে কী অবর্ণনীয় চাঞ্চল্য জাগাতে পারে।

আউরৎ আমার শৈশবের সর্বক্ষণের সঙ্গী। বাল্য কৈশাের আর যৌবনের প্রারম্ভ জুড়ে থাকলেও আউরৎ কি জিনিস সেদিন, সে মুহূর্তেই প্রথম অনুভব করতে পারলাম। এই প্রথম আমার কলিজায় উন্মাদনা জাগিয়ে তুলল ।

রুমালটির এক কোণে একটি গিট নজরে পড়ল। কৌতূহলাপন্ন হয়ে ব্যস্ত-হাতে গিটটি খুলতেই এক চিলতে কাগজ বেরিয়ে এল। তার গায়ে দু’ ছত্র লেখা—“ওগাে, পথিকবর, তুমি কি পথ হারাতে চাচ্ছ না? যে-পথ ধরে তুমি এগােবে মনস্থ করেছ তা ছাড়াও তাে বহুৎ দুর্গম অজানা-অচেনা পথ রয়েছে। সেরকম পথ পাড়ি দেবার স্বাদ কোনদিন পেয়েছ কি ? ভাব—ভেবে দেখ তাে?” ব্যস। আর দেরী নয়, তখনই অজানা-অচেনা খুবসুরত লেড়কিটির পেয়ার মহব্বতের জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলাম। সে রাত্রেই যে আমার শাদী হবার কথা তা নিঃশেষে আমার দিল থেকে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল।

আমি নিষ্পলক চোখে সে-লেড়কিটির দিকে চেয়ে রইলাম। চোখের পলক পড়ছে না। আমার পেয়ারী ইঙ্গিতে আমাকে কি যেন সব বুঝাতে চাইল। সবার আগে তর্জনীটি ঠোটের কাছে নিল। তারপর মুহূর্তেই হাত দুটো দিয়ে নিজের বুকটিকে চেপে ধরল। ফিক করে নিঃশব্দে হাসল। হায় খােদা! আমি তার ইশারা ইঙ্গিতের বিন্দুমাত্রও অনুধাবন করতে পারলাম না।

ব্যস, খনিক বাদেই ধীরে ধীরে জানলাটি বন্ধ করে গেল। আমার কলিজা উথালি-পাথালি করতে লাগল। সাগরের ঢেউ বয়ে চলল আমার বুক জুড়ে, আনাচে কানাচে—সর্বত্র।

আমার পা দুটোকে যেন কোন্ দৈত্য তার অদৃশ্য হাত দিয়ে পেরেক গেঁথে দিল! নিশ্চল-নিথরভাবে সেখানে বসেই রইলাম। আমার দিল বলল—আবার জানালা খুলবে, আবারও আমার মেহবুবা কিছু বলবে। আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ রইল বন্ধ জানালাটির দিকে। ক্রমে সূর্য পশ্চিম-আকাশের গায়ে হেলে পড়ল। আকাশের গায়ে শুরু হয়ে গেল রঙের খেলা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে ক্রমে সন্ধ্যার প্রস্তুতি শুরু হল। তারপর প্রকৃতির কোলে শুরু হয়ে গেল আলাে-আধাঁরের খেলা। না আমার বহু আকাঙিক্ষত জানালাটি আর খুলল-ই না।।

বুকভরা হতাশা আর হাহাকার নিয়ে সন্ধ্যার কিছু পরে ঘরে ফিরে এলাম।

আমাকে দরওয়াজায় দেখেই আব্বা বাজখাই গলায় বলে উঠলেন—“তােমার জ্ঞান গম্যির বলিহারি! কাণ্ডজ্ঞান বলতে যদি কিছুমাত্রও থাকে! আজ যার শাদী সে কী করে রাত দুপুরে ঘরে ফেরে ভেবে পাচ্ছি নে! এমন যার কর্তব্যজ্ঞান তার হাতে একটি লেড়কিকে তুলে দেওয়া কেবলমাত্র বােকামিই নয়, অবিবেচকের কাজও বটে। এ শাদী আমি হতে দিচ্ছি না। তােমার আক্কেলই আমাকে এ শাদী বাতিল করতে বাধ্য করল। এ শাদী বাতিল। আমার আম্মা বহুৎ চোখের পানি ঝরালেন। তিনি তাে ভালই জানেন, আব্বা একগুয়ে। একবার যখন না’ বলে ফেলেছেন তখন তাকে দিয়ে ‘হ্যা’ বলানাে স্বয়ং খােদাতাল্লার পক্ষেও সম্ভব না।

পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে আমার চাচাতাে বহিন আজিজা পাশে এসে দাঁড়াল। আলতাে করে আমার পিঠে হাত রেখে সে বলল ——‘ভাইজান। কি ব্যাপার, খুলে বল তাে?

আজিজা আমার শৈশবের সাথী। তার কাছে কোনদিন কোন কথা লুকোই নি। সেদিনও পারলাম না। খুবসুরৎ সে লেড়কির কথা তাকে বললাম। কিছুমাত্র গােপন না করে পুরাে ঘটনাটি তার কাছে খােলাখুলি তুলে ধরলাম। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক সময় বললাম—‘আজিজা, তুমি বিশ্বাস কর, তাকে এক নজর দেখার পর থেকেই আমার বুকের মধ্যে কালবৈশাখীর তুফান বইতে শুরু করেছে। কলিজাটি কেবলই উথালি পাথালি করে চলেছে। শত চেষ্টা করে তার মুখটাকে আমার দিল থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারছি না। কেন? কেন আমার এমনটা হ’ল, বল তাে?

                   পঁচাশিতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করলেন। জাঁহাপনা, আজিজা বিষন্নমুখে বললাে—একেই বলে’ পেয়ার, একেই বলে মহবৎ। তুমি যে ওকে পেয়ারের রশিতে বেঁধে ফেলেছ ভাইজান। তুমি ঘাবড়িও না। আমি তােমার পাশে পাশে থেকে তােমাকে সর্বতােভাবে সাহায্য-সহযােগিতা করব। সে-লেড়কিটিকে পাকড়ে নাও, লটকে নাও, তাকে তােমার পেয়ার জানাও। তােমার মুখে এক টুকরাে হাসি দেখার জন্য আমিবুক থেকে কলিজাটিকে উপড়ে নিয়ে আসতেও দ্বিধা করব না। মুহূর্তকাল নীরবে ভেবে সে আবার বলতে শুরু করল—ঠোঁটের কাছে তর্জনি নিয়ে গিয়ে সে তােমাকে চুম্বনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। আর হাত দিয়ে নিজের বুকটি জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন করার কথা, আর তােমাকে দিল অর্পণের কথা বুঝাতে চেয়েছিল। ঠিক আছে তােমাকে আমি আবার সে-বাগিচায় পাঠাব। আজিজা আমার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে সােহাগ জানাতে জানাতে কথাগুলি বলল।

দু'দিন বাদে আজিজা নিজে হাতে আমাকে ঝলমলে পােশাক পরিয়ে দিল। খুব খুসবুওয়ালা আতর শেরওয়ানিতে ছিটিয়ে দিল। এবার মুচকি হেসে বলল—“যাও, এবার সে বাগিচায় গিয়ে বােস । কাজ মিটে গেলেই ঘরে ফিরে আসা চাই। আমি তােমার পথ-চেয়ে বসে থাকব। কোথাও দাঁড়াবে না। আমি সােজা বাগিচায় গিয়ে সে-গাছটির ছায়ায় বসলাম। একটু বাদেই আমার বহুবাঞ্ছিত জানালাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।। জানালাপথে ভেসে উঠল আমার বেহেস্তের সে-হুরী। বুকভরা যৌবন নিয়ে জানালাটির গরাদ ধরে দাঁড়াল। মুখে দুষ্টমিভরা হাসির ছােপ। তার এক হাতে একটি রুমাল অন্য হাতে ছােট্ট একটি আয়না। পরপর তিনবার হাতের রুমালটি ভাজ করল। তিনবারই ভাজ খুলে ফেলল। তারপর মুহুর্তেই রুমালটিকে ওপরে নিচে নাড়াতে থাকে। আয়নাটি দিয়ে পর পর তিনবার আমার মুখে প্রতিফলিত আলােকরশ্মি ফেলল। আরপর আচমকা কামিজের হাতা গুটিয়ে তার ধবধবে হাত দুটোর দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এবার নতুনতর এক ইঙ্গিতে মেতে উঠল। ডান-হাতের আঙুলগুলাে ছড়িয়ে দিয়ে তার বুকটিকে চেপে ধরল। ফিক্‌ করে হেসে জানালাটি বন্ধ করে দিল। ব্যস, সেদিনের মত খেল খতম।

আমি এবারেও হতভম্ব হয়ে গেলাম। তার ব্যাপার-স্যাপার কিছুতেই ধরতে পারলাম না। হতাশমন নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। আজিজার কাছে তার ইশারা-ইঙ্গিতগুলাের কথা বললাম।

আমার কথা শুনে সে মুহূর্তকাল নীরবে ভাবল। তারপর বলল’ –আরে ভাইজান, বুঝতে পারলে না? সে বলতে চাইছে পাঁচদিন পরে সে তার মনের কথা তােমার কাছে ব্যক্ত করবে। তাদের বাড়ির লাগােয়া একটি কাপড় রঙ করার ঘাঁটি আছে, সেখানে তােমাকে অপেক্ষা করতে বলেছে।

                      ছিয়াশিতম রজনী 

বেগম আবার কিসসা শুরু করেন। আজিজ বলল —আজিজার ব্যাখ্যা শুনে আমার কলিজাটি তাে আনন্দে লাফালাফি শুরু করে দিল। আমি আবেগ-উচ্ছাস একটু সামলে নিয়ে বল্লাম-“হ্যা, কাপড় রঙ করার একটি ঘাঁটি আছে বটে কিন্তু সমস্যা হচ্ছে- 

‘সমস্যা? কিসের সমস্যা?

—সমস্যা হচ্ছে, পাঁচ-পাঁচটি দিন তাকে না দেখে আমি থাকব কি করে, বলতাে? আমার কলিজা তাে শুকিয়ে আমসি হয়ে যাবে।

–‘মহব্বৎ বড় দায়। এমন উতলা হলে কি চলে? এমনও হয় একের পর এক সাল ধৈর্যে বুক বেঁধে অপেক্ষা করতে হয়। তবে যদি বাঞ্ছিতাকে পাওয়া যায়। আর তােমার তাে মাত্র পাঁচটি দিন।

আমার গােসল আর খানাপিনা সব শিকেয় উঠল। সে খুবসুরৎ লেড়কি আমার দিল কেড়ে নিয়েছে। তার ধ্যান-জ্ঞান আমার সর্বক্ষণের সাধনা হয়ে দাঁড়াল। চোখের নিদ পর্যন্ত সে কেড়ে নিয়েছে।

আজিজা আমার কাছাকাছি পাশাপাশি থেকে আমাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে। আমার প্রতি তার সহানুভূতির সে-ঋণ আমি কোনদিনই শোধ করতে পারব না। এখন আর তার প্রশ্নই ওঠে না।

পাঁচ-পাঁচটি দুঃখের দিন, আমার ধৈর্য পরীক্ষার কাল অতিকষ্টে কেটে গেল।

আজিজা আমাকে আবার সাজিয়ে-গুছিয়ে আমার মেহবুবার কাছে পাঠাল শনিবার। কাপড় রঙ করার ঘাঁটি বন্ধ। আমি বন্ধ দোকানটির সামনে দাঁড়িয়ে সেরূপসীর প্রতিক্ষায় ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে লাগলাম। না, আমার বাঞ্ছিতার দেখা পেলাম না। ক্রমে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা। তারপর রাত্রির অন্ধকার নেমে এল। তবু আসার নামটি নেই। খুবই অবাক হলাম। কিন্তু হাল ছাড়লাম না। ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। রাত্রি ক্রমেই বেড়ে চল। ভাবলাম, আর নয়, এবার ঘরে ফেরা যাক। বিষন্ন মনে ঘরে গিয়ে আজিজাকে আমার হতাশার কথা বল্লম।।

রাত্রে কখন, কোথায় ঘুমিয়েছিলাম আমার হুঁসও ছিল না। সকালে চোখ মেলেই দেখি, আজিজা-র কোলে মাথা রেখে আমি শুয়ে।

আমি চোখে মুখে বিস্ময়ের ছাপ এঁকে বললাম—সে কী আজিজা, তুমি সারারাত্রি নির্ঘুম অবস্থায় কাটিয়ে দিয়েছ!’ 

–কি করে নিদ যাই বলতাে! সারাটি রাত তুমি যে কাণ্ড করেছ শুনলে তােমারই হাসি পাবে। বেহুঁস হয়ে পড়েছিলে। আর থেকে থেকে কি যেন প্রলাপ বকছিলে যার কোন মাথামুণ্ডু নেই। তােমাকে এ-অবস্থায় ফেলে কারাে চোখ বন্ধ করতে দিল চায়, তুমিই বল ?

আমি হতাশ দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম—‘আজিজা, আমি ভেবে পাচ্ছি নে, কেন সে এল না। সে ঠোটের কোণে দুষ্টুমিভরা হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল—‘পরীক্ষা। এ-ও এক পরীক্ষা। মহব্বতের পরীক্ষা। তােমার মহব্বতের গভীরতার পরিমাপ সে করতে চাইছে। সে সঙ্গে তােমার আগ্রহ ও ধৈর্যের পরীক্ষাও করে দেখল।

মুহূর্তকাল নীরবে কাটিয়ে আজিজা বলল—“আজ বিকেলে আবার সে-বাগিচায় যাও। নতুন কোন ইশারা ইঙ্গিত সে দেবে। আজিজা-র কথামত আমি আবার বাগিচার সে-গাছটির তলায় গিয়ে বসলাম। বহু পরিচিত জানালাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলাম। বেশীক্ষণ ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হ’ল না। জানালাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল। এবার তার হাতে একটি ছােট্ট আয়না আর বটুয়া। অন্যহাতে একটি ফুলদানী আর লণ্ঠন। তাজ্জব ব্যাপার মনে হল।  সে আয়নাটিকে বটুয়ার মধ্যে ভরে নিল। এবার আয়না সমেত

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments