আরব্য রজনী পার্ট ৪৪ ( arabyarajani Part 44 ) alif laila

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
তবে ত্রিশ দিনের দিন ফিন নিয়ে এসো মনে থাকে যেন।

‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন জাহাপনা। আমার জবান এক, হেরফের হবে না। তবে যদি আপনার মনে কোনরকম দ্বিধার সঞ্চার হয় তবে এক কাজ করুন। আপনার বিশ্বস্ত কোন আউরত আমাদের সঙ্গে দিয়ে দিতে পারেন। তার হেফাজতেই পাঁচ লেড়কি থাকবে। আর তাদের আব্বাদেরও বাদশাহের হুকুমের কথা বুঝিয়ে বলতে পারবে।'

—বহুৎ আচ্ছা বাৎ! সে বুঝিয়ে বলতে পারবে দেরী করলে বাদশাহ গোঁসসা, করবেন। আমার পেয়ারী বাদী সােফিয়া তােমাদের সঙ্গে যাবে। আমার দুটো সন্তানের গর্ভধারিণী। কনস্তানতিনােপলের সম্রাট আফ্রিদুন-এর বেটি লিখাপড়াও আছে। জ্ঞান-বুদ্ধিও যথেষ্টই আছে। তােমার ভাইয়াদের পরিস্থিতিটি বুঝিয়ে বলতে পারবেই।

‘বহুৎ আচ্ছা।

-“কিন্তু ত্রিশদিনের দিন আমি কি খানাপিনা' করব তার নির্দেশ দিয়ে যাবে তাে।

—সে খেয়াল আমার মাথায় আছে। এক গ্লাস সরবৎ দিয়ে যাব আপনার জন্য। ত্রিশ দিনের দিন হামামে গিয়ে আচ্ছা করে গােসল করবেন। শরীরের ক্লেদ ও গ্লানি দূর হবে। তারপর নামাজ সেরে সরাবটুকু পান করবেন। ব্যস, তারপরই আপনি সুস্থস্বাভাবিক হয়ে উঠবেন। | বুড়িটি এবার লেড়কি পাঁচটি এবং সােফিয়াকে নিয়ে প্রাসাদ থেকে যাত্রা করল। ত্রিশ দিনের দিন ভােরে বাদশাহ গােসল সেরে এলেন। দেহের গ্লানি ও ক্লেদ কেটে গিয়ে শরীর দিল অনেকাংশে সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে এল। এবার নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর উদ্দেশে নামাজ পড়লেন। সিন্দুক থেকে সরবতের গ্লাসটি বের করে নিঃশেষে পান করে গ্লাসটিকে রেখে পালঙ্কে এসে বসলেন। নফর-নােকরদের ডেকে বললেন—“আমি এখন নিদ যাব। কেউ যেন আমাকে বিরক্ত না করে।'

ক্রমে সারাটা দিন কেটে গেল। আমি বাদশাহের কামরার দরজায় কুরশি পেতে ঠায় বসে। কখন তার নির্দু ভাঙবে, কখন তলব করে বসবেন বলা তাে যায় না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হ’ল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যের আন্ধার নেমে এল। প্রাসাদের ঘরে ঘরে মােমের বাতি জ্বালিয়ে দিল নফররা। তবু বাদশাহের নিদ আর টুটে না। তারপর ক্রমে রাত্রি গভীর হতে থাকে। বাদশাহ কিন্তু গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়েই রইলেন। তখন কি আর বুঝেছিলাম, তার নিদ আর কোনদিনই টুটবে না?

সকাল হ’ল। তবু বাদশাহের ঘরের দরওয়াজা খুলল না।

কলিজাটি কেমন মােচড় মেরে উঠল। শোচলাম কি, আর নয়, এবার ডাকতেই হয়। বহুৎ ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি করলাম। ভেতর থেকে কোন আওয়াজই ভেসে এল না।।

নফরদের দিয়ে দরওয়াজা ভাঙালাম। ভেতরে উঁকি দিতেই আমার চক্ষু স্থির। দেখলাম, বাদশাহের মৃতদেহ পালঙ্কের ওপর এলিয়ে পড়ে রয়েছে। বিছানা অগােছাল। বুঝলাম, মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে গিয়ে বহুৎ ধস্তাধস্তি করেছেন।

কথা বলতে বলতে উজির দান্দান-এর চোখের কোল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। নুজাৎ আর দু-অল-মাকান ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। আমীর-ওমরাহ যারা ছিল সবার চোখেই পানি দেখা দিল। নুজাৎ-এর স্বামী নুজাৎ ও মাকানকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। চোখের পানি মুছতে মুছতে উজির দান্দান এবার বললেন‘আমি হেকিম ডেকে সরবতের গ্লাসটি পরীক্ষা করালাম। তার বালিশের তলায় এক চিলতে কাগজ পাওয়া গেল। তাতে দু’ ছত্র লেখা—‘লম্পটের জন্য শােক-তাপের কিছু নেই। এ লেখা তােমরা যারা পড়বে—মনে রেখাে ব্যভিচারের এই উপযুক্ত শাস্তি। ভেবে দেখ তাে এ-আদমি কত সুলতানবাদশাহের আদরের লেড়কির জীবন বরবাদ করেছে। নৃশংস বল্গাহীন অত্যাচার চালিয়ে কত সাম্রাজ্যকে ধূলিসাৎ করেছে। এ লম্পটটি তার লেড়কা সারকানকে সিসিরিয়ায় পাঠিয়েছিল। সে সম্রাট হারদুব-এর কলিজার সমান লেড়কি ইরবিজাকে ছলাকলার মাধ্যমে ভুলিয়ে নিয়ে এসেছিল। হিংস্র নেকড়ের মত আচরণ করেছিল তার ওপর। তারপর তাকে এক নিগ্রো শয়তানের হাতে তুলে দেয়। সে নির্মম নিষ্ঠুর আচরণ করে তার সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত হত্যা করে তার ধনদৌলত গায়েব করে। এক সময় চম্পট দেয়। সে লম্পট, অত্যাচারী, নারী খাদক বাদশাহ উমর অল-নুমানকে আমি আজ হত্যা করলাম। তাকে খতম করে তামাম আরব দুনিয়ায় শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে প্রয়াসী হলাম। এ জন্য খােদাতাল্লা আমার ওপর করুণা করবেন। এবার আমার পরিচয় তােমাদের দরবারে পেশ করছি। আমি হারদুব-এর বাদীদের সর্দারনী। সােফিয়াকে আমি তার আব্বাজান আফ্রিদুন-এর হাতে তুলে দিচ্ছি। তােমরা কিন্তু ভেবাে না এখানেই ঘটনা প্রবাহ থেমে যাবে। আমরা এবার সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাগদাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ছি। তার বহু গুনাহের সাক্ষী প্রাসাটিকে ধুলােয় লুটিয়ে দিতে না পারা পর্যন্ত আমাদের শান্তি নেই। বাদশাহের বংশ নির্মূল করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। বাদশাহ উমর অলনুমান দুনিয়া ছেড়ে বেহেস্তে যাত্রা করেছেন। পুরাে একটি মাস বাগদাদে শােক পালন করা হল। প্রজারা জিগিরি তুলল, বাগদাদের মসনদে উত্তরাধিকারী বসানাে হােক। কাজীদের তলব করলাম। দীর্ঘ সময় তাদের সঙ্গে বাতচিত হ’ল। সবার মুখেই এক বাত—শাহজাদা সারকানকে নিয়ে এসে মসনদে বসিয়ে রাজ্যের ভার অর্পণ করা হােক। দেশের প্রজারা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন জিগির তুলল—দু-অল-মাকানকে মসনদ দেওয়া হােক, তিনিই আমাদের বাদশাহ। কিন্তু কোথায় সে? কোথায় পাওয়া যাবে তাকে। তামাম আরব দুনিয়া চষে ফেলা হল। কোথাও তার হদিস মিলল না। তাজ্জব বনে গেলাম। তাই অনন্যোপায় হয়ে কাজীদের পরামর্শকেই আঁকড়ে ধরতে হ’ল। দামাস্কাসের দিকে সদলবলে যাত্রা করলাম। শাহজাদা সারকানকে সেখান থেকে বাদশাহের পদে অভিষিক্ত করে বাগদাদে নিয়ে আসব। তারপরই খােদাতাল্লার অপার মহিমা তার মর্জিতেই শাহজাদা দু-অল-মাকান-এর সঙ্গে মােলাকাত হয়ে গেল।

দু’-অল-মাকান-এর অভিষেক-পর্ব সুসম্পন্ন হয়ে গেল। দুঅল-মাকান এবার বৃদ্ধ উজির দানদানকে বললেন-“আপনি জ্ঞানবৃদ্ধ, বয়সেও প্রবীণ। সবচেয়ে বড় কথা আপনি আমার আব্বাজীর উজির ছিলেন। অতএব আশা করব আমারও উজিরের পদে অভিষিক্ত থেকে পরামর্শ দান থেকে আমাকে বঞ্চিত করবেন না । 

উজির দানদান মুচকি হেসে বাদশাহ মাকান-এর কথায় সম্মতি দিলেন। এবার শেরিওয়ানের জেব থেকে একটি লম্বা ফর্দ বের করে বাদশাহ মাকান-এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন-বাদশাহের মৃত্যুর পর তার বিষয় সম্পত্তি ধনদৌলতের একটি ফর্দ আমি আগেভাগেই তৈরি করে রেখেছি, নিন। তাবু গােটানাে হ’ল। আর মিছে সময় নষ্ট নয় সােজা বাগদাদের উদ্দেশ্যে নব নিযুক্ত বাদশাহ মাকান তার দলবল নিয়ে যাত্রা করলেন।

বাদশাহ দু-অল-মাকান কোনদিকে ভূক্ষেপমাত্র না করে বড় ভাইয়া সারকানকে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে চিঠি লিখলেন। আর বিশেষভাবে অনুরােধ করলেন, তিনি যেন যত শীঘ্র সম্ভব বাগদাদে ফিরে এসে সিসিরিয়া সম্রাটের হুমকীর মােকাবেলা করেন।

চিঠিটি প্রবীণ ও বিচক্ষণ উজির দান্দান-এর হাতে দিয়ে বললেন-“আপনি বিচক্ষণ আদমি। আপনি নিজে গিয়ে তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাগদাদে নিয়ে আসবেন। তিনি যদি চান, আমি মসনদ ছেড়ে তার অধীনে দামাসকাস-এর সুবেদার হয়ে থাকব। আজ আমাদের মাথার ওপরে কালােমেঘ, আমাদের মিলে ঝুলে থাকতে হবে। শক্ত হাতে শত্রুর মােকাবেলা করতে হবে। তারপর আপন আপন স্বার্থের কথা ভাবা যাবে।'

তরুণ বাদশাহ মাকান-এর বুদ্ধির তারিফ করে উজির দানদান দামাসকাস-এর উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন।বৃদ্ধ উজির বিদায় নিলে মাকান এবার জেরুজালেম-এর সেই বুডােকে তলব করলেন। তার কাজের ইনামস্বরূপ তাকে এনে প্রাসাদ তৈরি করে দিলেন। আর ব্যবসা করার জন্য প্রয়ােজন অনুযায়ী নগদ অর্থও কিছু দিলেন। বেগম শাহরাজাদ কিসসার এ পর্যন্ত বলার পর ভাের হয়ে আসছে দেখে তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

                      সাতাত্তরতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কক্ষে এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, বাগদাদে-এর তরুণ বাদশাহ মাকান-এর চিঠি নিয়ে বৃদ্ধ উজির দানদান দামাসকাস-এ সুবেদার সারকান-এর সঙ্গে ভেট করলেন। সব বৃত্তান্ত খুলে বললেন। তাকে নিয়ে ফিরে এলেন বাগদাদ-এ। সঙ্গে আনলেন বিশাল সেনাবাহিনী ও প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। দু’ ভাইয়ার প্রথম মােলাকাত। এর আগে কেউ, কাউকে চোখেও দেখে নি। শত্রুর মােকাবেলা করতে সারকান ও মাকান কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে সুবিশাল সেনাবাহিনী ও প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জেরুজালেমএর দিকে অগ্রসর হতে লাগল। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, এ-লড়াই কেবলমাত্র বাগদাদ আর জেরুজালেম-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। সমগ্র আরবের মুসলমান শাসিত দেশগুলি একজোট হয়ে খ্রীস্টান শাসিত জেরুজালেম-এর আক্রমণের মােকাবেলা করতে উদ্যোগী হল। এক মাস বাদে মুসলমান বাহিনী শত্রুর মুলুকের কাছে পৌছায়। সম্রাট আফ্রিদুন খবর পেয়ে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি ব্যস্ত হয়ে সিসিরিয়ার খ্রীস্টান সম্রাট হারদুবকে খবর পাঠান।

এবার আফ্রিদুন ও হারবুদ-এর সেনাবাহিনী প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সিসিরিয়ার সীমান্ত ঘিরে দাঁড়ায়।

এদিকে বুড়ি সে বাঁদী সর্দারনী খবর পেয়ে ছুটে আসে। হারদুবকে অভয় দেয়। গর্বের সঙ্গে হারদুবকে বলে, কুছ পরােয়া নেই। আমি আপনার সহায়। বাগদাদ-এর সম্রাটকে এমন শিক্ষা দেব যাতে জিন্দেগীতে আর লড়াইয়ের কথা উচ্চারণও না করে। বাঁদী সর্দারনী এবার কাগজ কলম নিয়ে বসে গেল লড়াইয়ের ফাদ তৈরি করতে, কোন্ পথে, কখন এবং কিভাবে আক্রমণ করে সহজেই বাগদাদ-এর সৈন্যদের ঘায়েল করা যাবে। বাঁদী সর্দারনী অনেক মাথা খাটিয়ে চমৎকার একটি মতলব বের করল। হারদুব আর আফ্রিদুনকে বলল—এক কাজ করুন, যত শীঘ্র সম্ভব নৌকা বােঝাই করে পঞ্চাশ হাজার সৈন্য পাহাড়ের দিকে পাঠিয়ে দিন। আর বাকী সবাই থাকবে এপারে। পাহাড়ের গায়ে মুসলমান সৈন্যরা অবস্থান করছে। ফলে দু’ দিক থেকে সাঁড়াশি  আক্রমণ চালাতে পারলে মুসলমান সৈন্যদের অনায়াসে ঘায়েল করা যাবে।

বুড়ীসর্দারনীর ফন্দিকেই কাজে লাগানাে হল। মতলব মাফিক হচ্ছে দেখে বুড়ি বাঁদী সর্দারনী তাে নিঃসন্দেহ আফ্রিদুন ও সম্রাট হারদুব-এর জয় সুনিশ্চিত। সে সেনাবাহিনীকে উৎসাহিত করার জন্য চমৎকার এক ভাষণ দিল। তার ভাষণের মূল বক্তব্য —যেন তেন প্রকারেণ সারকানকে ঘায়েল করার জন্য দঢ় হতে হবে। তার মত দুধর্ষ বীর যােদ্ধাকে কুপােকাৎ করতে পারলে বাকী সবাইকে তাে নস্যির মত উড়িয়ে দেওয়া যাবে। খ্রীস্টান দলের প্রধান সেনাপতিও কম বীরযােদ্ধা নয়। তার মত দুধর্ষ বীর তামাম ইওরােপ মহাদেশ ছুঁড়ে বেড়ালেও দ্বিতীয় একজন মিলবে না। নাম তার লুকা। বহুৎ বড় বড় যুদ্ধে সে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছে। বুড়ি বাঁদী সর্দারনী তাকে বলল —“যুদ্ধ জয়ের চিন্তা পরে করা যাবে। তােমার প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য থাকবে যেকোন উপায়ে মুসলমান যােদ্ধা সারকানকে পরাজিত করা। তাকে খতম না করা পর্যন্ত তােমার বিরতি নেই।

এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় ভােরের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। বেগম শাহরাজাদ তাঁর কিসসা বন্ধ করলেন।

                             আটাত্তরতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, সে-বুড়ি বাঁদী সর্দারনী খ্রীস্টান সেনাপতি লুকাকে সারকান-এর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তুলল । অকুতােভয় লুকা সম্রাট হারদুব’কে অভিবাদন সেরে তার বাহন জাঁদরেল ঘােড়াটির পিঠে চেপে বসল। বীরদর্পে সৈন্য সামন্ত নিয়ে এগিয়ে চলল সারকানকে ঢিট করার জন্য। সারকান-এর ঘােড়া ধীর-পায়ে এগিয়ে আসে। হাতে তার সুতীক্ষ তরবারি। এমন সময় আচমকা লুকা পিছন থেকে তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। ব্যস, শুরু হয়ে গেল দুই বীরযােদ্ধার তরবারির লড়াই। লুকার যতগুলাে কায়দা-কৌশল জানা ছিল এক এক করে সবগুলি প্রয়ােগ করেও সারকানকে কবজা করতে পারল না।

সারকান এতক্ষণ নীরবে লুকার আক্রমণ প্রতিহত করেছে। এবার সে সক্রিয় হ’ল। অগ্রণী ভূমিকা নিতে লাগল। নিজের যতগুলি যুদ্ধকৌশল জানা রয়েছে সেগুলাে এক এক করে লুকার ওপর প্রয়ােগ করতে লাগল। বেশী তকলিফ তাকে করতে হ’ল না।

সারকান সুযােগ বুঝে এক কোপে লুকার ধড় থেকে মুণ্ডটি নামিয়ে দিল। ফিনকি দিয়ে খুন বেরিয়ে এল। বীভৎস দৃশ্যটি দেখেই তার সৈন্যরা অস্ত্রপাতি ফেলে পিছন ফিরে লম্বা দিল।

সম্রাট হারদুব আর আফ্রিদূন-এর কানে বীরযােদ্ধা লুকার শােচনীয় পরিণতির কথা পৌছতে দেরী হ’ল না। তাদের তাে মাথায় বজ্রাঘাত হবার উপক্রম হল। আফ্রিদুন কপাল চাপড়ে বল্ল –“আমার সাম্রাজ্যের ভিতই আজ নড়বড়ে হয়ে গেল। বুড়ী বাঁদী সর্দারনী এগিয়ে আসে। আফ্রিদুন ও হারদুব-এর ভিতরে সাহস সঞ্চার করতে গিয়ে বলল —‘বিপদের সময় মনমরা হয়ে কপাল চাপড়ানাে মূর্খের কাজ। আপনারা সাহস অবলম্বন করুন। আমি বিচার করে দেখলাম মুখােমুখি লড়াই করে আমরা সারকানকে জব্দ করতে পারব না। লুকাই যখন পারল না তখন সমগ্র খ্রীস্টান সাম্রাজ্যে এমন কোন বীর নেই যে সারকান-এর আক্রমণ প্রতিহত করতে পারবে। তার গায়ে কাঁটার আঁচড় দেওয়াও কল্পনাতীত ব্যাপার।

হারদুব অসহায় দৃষ্টি মেলে তার দিকে তাকিয়ে বল্ল-তবে? কিভাবে আমরা সারকানকে পরাজিত করতে পারব বলে তুমি মনে করছ, বল তাে খােলাখুলি।

—বুদ্ধি। কায়দা-কৌশল প্রয়ােগ করতে হবে। এ মুহূর্তে বুদ্ধি বলকেই আমাদের একমাত্র অবলম্বন মনে করতে হবে। ফাদ তৈরির সঠিক দায়িত্ব আমার ওপর ছেড়ে দিন।

–“কিন্তু কি সে ফাদ ? কিভাবেই বা তুমি ফাঁদ পাততে চাইছ, শুনিই না।' 

‘আমি আপনাদের সৈন্য দল থেকে গােটা পঞ্চাশেক বাছাই করা সৈন্য নেব। তবে তারা সবাই যেন আরবী ভাষায় কথা বলতে পারে।

—‘এ কোন সমস্যার ব্যাপারই নয়। আমার সৈন্যদলে খাস সব আরবের লােকই রয়েছে। কিন্তু তাদের কোন কাজে লাগাবে?’

—“আমি আরব সওদাগরের বেশ ধারণ করব। আর পঞ্চাশজন সৈন্যকে আরবীয় পােশাক পরিয়ে দেব। তারপর হাজির হ’ব সারকান-এর সামনে। আমি তার সামনে গিয়ে কান্নাকাটি জুড়ে দেব —কস্তাতিনােপলে আমি ব্যবসা-বাণিজ্য করি। আরবের সওদা নিয়ে খ্রীস্টান-ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করি। খ্রীস্টানদের সঙ্গে মুসলমানদের যুদ্ধ শুরু করায় আমাদের বেদম প্রহার দিয়ে তাদের দেশ থেকে ভাগিয়ে দিয়েছে। আর আমাদের যথাসর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়েছে। দেশে ফেরার উপায় পর্যন্ত নেই। তাই আপনার সাহায্য সহযােগিতা প্রত্যাশা করছি। ব্যস, এতেই দেখবেন বাজীমাৎ করে দিয়েছি। বুড়ি এবার বল্ল-মুসলমানরা খুবই স্বজাতিপ্রিয়। এদের এ দুর্বলতাটুকুকে কাজে লাগিয়ে আমি সদলবলে তাদের দলে ঢুকে পড়ব। তারপর কি করে তাকে খাঁচাকলে ফেলি দেখবেন। ইদুরের মত ফাঁদে ফেলা যাকে বলে।

হারদুব ও আফ্রিদুন ভেবে দেখল, বুড়ি কৌশলটি মন্দ করে নি। ঠিকমত প্রয়ােগ করতে পারলে কাজ হাসিল হবেই। তাই তারা সােল্লাসে বুড়ির ফন্দিটির তারিফ করে পঞ্চাশ জন আরবীয় সৈন্য দিতে সম্মত হ'ল।

এ পর্যন্ত বলার পর বেগম শাহরাজাদ দেখলেন ভাের হয়ে এল বলে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

ঊনআশিতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় প্রবেশ করলেন। বেগম তার কিসসার অকথিত অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাঁহাপনা, এক সকালে সারকান ও মাকান তাবু থেকে বেরিয়ে দেখে জনা পঞ্চাশেক আরবীয় সওদাগর সামনে দাঁড়িয়ে। কাঁদো কাঁদো মুখ। চোখে পানি না বেরলেও বেরােতে বেশী দেরীও নেই। গায়ের পাতলুন, শেরওয়ানী প্রভৃতি ছেড়া ফাটা ফাটা । দু'-চার জায়গায় রক্তের ছােপ। চোখের তারায় বিষাদ, ভীতি ও হতাশার ছাপ।

সারকান এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল—কে গাে তােমরা? এখানে যুদ্ধ-শিবিরে কি মনে করে?

বুড়িটি মুসলমানী কায়দায় কুর্নিশ জানিয়ে বিষাদপূর্ণ কণ্ঠে বলল – “আমাদের মুলুক ইস্পাহান। বিশ সাল ধরে কসতানতিনােপলে বাণিজ্য করছি। আরব মুলুকের সমানপত্র সেখানে বেচি। তাদের দেশের পয়সা রােজগার করে দেশে গুঁড়া বাচ্চাদের খানাপিনা করিয়ে জিন্দা রেখেছি। কিন্তু এখন মহামুশকিলে পড়া গেল। মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ বাধায় তারা। আমাদের ওপর চড়াও হয়। জুলুম করে, সমানপত্র কেড়ে নেয়। জেভ একেবারে ফাকা করে দেয়। তারপর শুরু করে মারধাের। আমাদের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন, আমাদের কী হাল করে ছেড়েছে। একমাত্র মুসলমান বলেই খ্রীস্টানরা আমাদের এ হামলা হুজ্জতি চালায়। দেশে ফিরে খাওয়ার মত রেস্তও আমাদের নেই। তাই উপায়ান্তর না দেখে আপনাদের বিরক্ত করতেই হল।।

সারকান সহানুভূতির দৃষ্টিতে বুড়ির দিকে তাকায়।

বুড়ি হরদম কেঁদেই চলেছে। এবার চোখ মুছতে মুছতে বলল। –হুজুর, মেহেরবানি করে আমাদের দেশে ফেরার মত একটি ফিকির করে দিন। সারকান এবার মুখ খুলল —তােমরা আপাতত আমাদের মেহমান হয়ে তাবুতেই থেকে যাও। পরে ভেবে দেখব, ফিকির কিছু করা যায় কি না।

সওদাগরের বেশধারিনী বুড়ি আর তার পঞ্চাশজন সৈন্য সারকান আর তার ভাইয়া মাকান-এর মেহমান হয়ে মুসলমানী তাবুতে মাথা গুজল। খানাপিনার কোন ত্রুটি রাখল না। সরাবও দেওয়া হ’ল বেশ কিছু বােতল। বুড়ি মনে মনে উল্লসিতা হ’ল। বুড়ি নিজে কিন্তু কিছুই মুখে দিল না। কেবল কোরাণ পাঠ আর নামাজ নিয়েই মেতে রইল। বুড়ির নিরন্থ উপবাস এবং ঈশ্বরীয় কামকাজের কথা শুনে সারকান তার সঙ্গে ভেট করতে গেল। বুড়ির সঙ্গে কথা বলে বুঝল, বুড়ি তাদেরই হয়ে আল্লাতাল্লার কাছে যুদ্ধ জয়ের প্রার্থনায় লিপ্ত। এবার স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে নিঃসন্দেহ হ’ল। বুড়িরও শ্রদ্ধা-ভক্তিতে সারকান মুগ্ধ হল।

সারকান বলল -বুড়ী তুমি এরকম কৃচ্ছসাধনে লিপ্ত হয়েছ কেন?”

—সে কী গা! আপনারা এত কষ্ট করে মুসলমান শক্তি বৃদ্ধির জন্য লড়াই করে চলেছেন। আমি তাে একে ধর্মযুদ্ধ বলেই জ্ঞান করি। এ যুদ্ধের মাধ্যমেই মুসলমান সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় হবে। তাই প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দোয়া মাঙছিলাম যাতে মুসলমান সাম্রাজ্যের কোন ক্ষতিই খ্রীস্টানরা করতে না পারে।

সারকান আর মাকান-এর শির সওদাগরবেশী বুড়ির প্রতি শ্রদ্ধাভক্তিতে নত হয়ে গেল। তারা ভাবল, মুসলমান দুনিয়ার এরকম সঙ্কট মুহূর্তে আল্লাহই বুড়িকে তাদের কাছে পাঠিয়েছেন।

বুড়ির সঙ্গী এক সৈন্য সারকানকে বলল—‘হুজুর, এর ওপর মাঝে মাঝে আল্লাহর ভর হয়। তখন একে যা জিজ্ঞাসা করবেন। ঠিক ঠিক জবাব পেয়ে যাবেন। আল্লাহ-ই এর মাধ্যমে কথা বলেন।

সারকান ও মাকান সবিস্ময়ে সৈন্যটির কথা শুনল। তারা আরও নিঃসন্দেহ হ’ল যে, আল্লাহ নির্ঘাৎ মুসলমান দুনিয়াকে রক্ষার জন্য একে পাঠিয়েছেন। নইলে এমন অদ্ভুত যােগাযােগ হ'ল কি ক

পরদিন সকালে বুড়ি যখন আল্লাহর প্রার্থনায় লিপ্ত তখন তার ভর’ উঠল।

সারকান ও মাকান বুড়ির সামনে হাঁটু গেড়ে করজোড়ে বসল। রোমাঞ্চ দিল নিয়ে সারকান বল্ল-ধর্মযুদ্ধে কি আমাদের জয় হবে ? আমরা কি খ্রীস্টানদের যুদ্ধে হারিয়ে আরব দুনিয়ায় মুসলমানেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি অক্ষুন্ন রাখতে পারব?

পারবি অবশ্যই পারবি। কিন্তু সবার আগে শত্রুপক্ষের এটির তল্লাশ করতে হবে। গুপ্তঘাটির খবর না মিললে লড়াইয়ে জেতা যায় না। আমার সঙ্গের সওদাগরদের এসব জায়গা নখদর্পণে। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী আগুয়ান হলে অবশ্যই শত্রুকে ঘায়েল করতে পারবি।

বডির সঙ্গীদের একজন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল-সাচ বাৎ। একেবারে হক বাৎ বলেছে। আমরা বিশ-পঁচিশ সাল এখানে সওদাগরী কারবার করছি। এখানকার রাস্তা ঘাট আমাদের ভাল চেনা জানা আছে। খ্রীস্টান দুনিয়ার কোথায় কি আছে কিছুই আমাদের অজানা নয়। তাদের গুপ্তঘাঁটির হদিস দেওয়া আমাদের কাছে কোন সমস্যাই নয়।

সারকান ও মাকান যেন আসমানের চান্দ হাতের মুঠোয় পেয়ে গেল। খ্রীস্টান জাতটিকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করা তাদের কাছে আর কোন সমস্যাই নয়।।

সারকান তাদের সৈন্যদের পঞ্চাশটি ভাগে বিভক্ত করল। ঠিক হ'ল বুড়ির পঞ্চাশজন সহযাত্রীদের প্রত্যেকের সঙ্গে এক একটি দল অগ্রসর হবে। ভিন্ন ভিন্ন পথে তারা শত্রু পক্ষের ঘাটির দিকে অগ্রসর হবে। আর সওদাগররা গুপ্ত পথের নিশানা দেখিয়ে দেবে | যাতে শীঘ্রই খ্রীস্টানদের সাবাড় করে দেওয়া সম্ভব হয়। - মাকান আর বৃদ্ধ উজীর ছাউনিতেই রয়ে গেল। আর সারকান স্বয়ং বুড়ির সঙ্গে যাত্রা করল। বুড়ি বলেছে, তাকে একেবারে সিসিরিয়ার দুর্গে পৌছে দেবে। আর বুড়ি তাকে বলেছে, শত্রুসৈন্য এখন দুর্গের বাইরে। হারদুব-এর দুর্গ প্রায় শূন্য। বুড়ি এ-ও বলেছে, দুর্গটির দখল নিতে পারলে খ্রীস্টানদের সাবাড় করে দেওয়া কোন সমস্যাই নয়। হায় নসীব! শয়তানের সাক্ষাৎ চর বাঁদী সর্দারনী বুড়ির পাতা ফাঁদে স্বেচ্ছায় শিরগলিয়ে দিয়ে সারকান-এর জান খতম হ’ল। বাদশাহী তাজ শিরে পরার অপূর্ণ সাধ নিয়েই সে দুনিয়া ছেড়ে বেহেস্তের পথে রওনা হল।।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।

আশিতম রজনী রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার অসম্পূর্ণ কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, বুড়ি সর্দারনীর পাতা ফাদে শির গলিয়ে দিয়ে সারকান জান হারাল। বুড়ি তাকে ধাল্লা দিয়ে সিসিরিয়ার দুর্গে প্রবেশ করে দেখল সত্যিই দুর্গটি ফাকা। ভাবল কিনা লড়াইয়ে, এক ফোটাও খুন না ঝরিয়ে সে দুর্গের দখল নিয়ে নিল, এমন নসীব সচরাচর হয় না। উল্লসিত হয়ে সারকান যখন বুড়ির সঙ্গে নিজের সুপ্রসন্ন নসীবের কথা বলছে ঠিক সে মুহুর্তেই পিছন থেকে বিড়ালের মত পা টিপে টিপে এগিয়ে এসে এক গুপ্তঘাতক অতর্কিতে সারকান-এর পিঠে হাতের ছুরিটি আমূল গেঁথে দিল। ঝট করে তরবারি খুলে সারকান পিছন ফিরে রুখে দাঁড়ালও বটে কিন্তু ক্ষতস্থান দিয়ে গল গল করে খুন ঝরতে লাগল। আছাড় খেয়ে পড়ে গেল। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল। পরমুহুর্তেই সব খতম।

এদিকে বুড়ির পাতা ফাদের খেল পুরােদস্তুর শুরু হয়ে গেছে। রাত্রি যত গভীর হয় চারদিক থেকে দুঃসংবাদ আসতে লাগল। বুড়ি চারদিকে যে-ফাদ ছড়িয়ে রেখেছে তাতেই মুসলমান সৈন্যরা ঝাকে ঝাকে খতম হতে লাগল। বৃদ্ধ উজির দানদান-এর পরামর্শে মাকান রাত্রির আন্ধারেই  বাগদাদের পথে ঘােড়া ছুটিয়ে দিল।

মাকান বাগদাদে পৌছে তার ভাইজান সারকান-এর স্মৃতির উদ্দেশে এক শােক-মঞ্জিল বানাল। বাদশাহ, উজির, পারিষদবর্গ ও প্রজারা পরলােকগত সারকান-এর আত্মার সদগতি কামনা করে প্রার্থনা করল।

আজিজ, আজিজা ও তাজ অল-মুলুকের কিসসা 

বেগম শাহরাজাদ সারকান, মাকান ও নুজাৎ-এর কিসসা শেষ করে কয়েক মুহূর্তের জন্য মৌন হলেন। এক সময় মুখ খুললেন ‘জাহাপনা, এবার শুরু করছি আজিজ, আজিজা ও শাহজাদা তাজ অল-মুলুক-এর কিসসা।

পারস্যের ইস্পাহান পর্বতের পিছনে ছবির মত এক মুলুকের সুলতান সুলেমান শাহ মহাধার্মিক। দিনের অধিকাংশ সময় তিনি নামাজ কোরাণ আর ধর্মীয় আলাপ আলােচনা নিয়ে মগ্ন থাকেন। রাত্রির অন্ধকারে ছদ্মবেশ ধারণ করে তামাম সুলতানিয়তে ঢুড়ে বেড়ান। প্রজারা কিভাবে দিন গুজরান করছেন তা দেখার জন্যই তার এরকম কর্ম তৎপরতা। তার চোখে আমীর-ভিখমাঙা সবাই সমান। সবাই যখন তার প্রজা তখন তাদের মধ্যে ফারাক তাে থাকতেই পারে না। এতকিছু সত্ত্বেও সুলতান সুলেমান শাহ-র একটিমাত্র সাধ অপূর্ণ রয়ে গেল। বেগম আর লেড়কা লেড়কির সাধ। জীবনের শেষ সিঁড়ির দিকে যতই ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে থাকেন ততই তার মধ্যে এ-বিশেষ না-পাওয়ার বেদনাটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। হাহাকার আর হাহুতাশ সম্বল করে তিনি দিন গুজরান করতে থাকেন। জিন্দেগী মরুভূমির মত শুখাই কাটল।

সুলতান সুলেমান শাহ একদিন তার উজিরকে ডেকে বললেন -শােন, আমার কেবলই মনে হচ্ছে, দিন বুঝি ফুরিয়ে এল। এরকম ওমরে একেলা থাকা সম্ভব নয়। উচিতও নয়। আর সিংহাসনের উত্তরাধিকারীও কেউ রইল না। তাছাড়া আমাদের পয়গম্বর তাে বলেছেনই শাদী কর আর সংখ্যা বৃদ্ধি কর। তুমি এ ব্যাপারে কি পরামর্শ আমাকে দিচ্ছ, বল।

বৃদ্ধ উজির বার কয়েক ঢােক গিলে আমতা আমতা করে বললেন—জাঁহাপনা, বড়ই কঠিন প্রশ্ন আমার সামনে রেখেছেন। এক কথায় এর জবাব দেওয়া সম্ভব নয়। তবে সাধ্যমত সংক্ষেপেই আপনার সওয়ালের জবাব দেয়ার কোশিস করছি। আমি বলব, যদি কোন একেবারেই অপরিচিত বাদীকে শাদী করে আপনি বেগমের মর্যাদা দেন তবে পরিণামে দুঃখই কিনে নেওয়া হবে। এমন হওয়াও বিচিত্র নয় যে, যাকে শাদী করে প্রাসাদে তুলেছেন তার আব্বা একটি, অসৎ, বজ্জাত আর সাক্ষাৎ শয়তান। আব্বার খুন তাে! লেড়কির দেহেও প্রবাহমান। | জাঁহাপনা, আপনার ঔরসে আর আপনার শাদী করা বেগমের গর্ভে যে সন্তান পয়দা হবে সে হয়ত কালে কালে বজ্জাত আর শয়তানই হয়ে উঠবে। আপনার কোন গুণই তার মধ্যে প্রকাশ পেল না, তখন? পরিতাপের সীমা থাকবে না। তখন না পারবেন গিলতে

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments