Arabyarajani আরব্য রজনী পার্ট ৩ (part 3)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
বাদশাহ শারিয়ার-এর কোনদিকেই বিন্দুমাত্র ভুক্ষেপ নেই। | বেহেস্ত বা দোজাকেরও পরােয়া করেন না। কিন্তু এদিকে যে দেশে কুমারী লেড়কির আকাল পড়ে গেছে সে তাে উজিরের ভালই জানা আছে। তিনি পড়লেন মহাফাঁপরে। কোথায় পাবেন নবাবের বাঞ্ছিত কুমারী! আবার সন্ধ্যায় খালি হাতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে জান নিয়ে ফিরে আসতে হবে না। উজিরের নিজের অবশ্য পরমা সুন্দরী দুটো  মেয়ে রয়েছে। উভয়েই কুমারীও বটে। 

রূপে গুণে একেবারে চৌখস। বড়টির নাম শাহরাজাদ আর ছােটটির নাম দুনিয়াজাদ। বডটির ইতিহাসে অগাধ পাণ্ডিত্য। আবার গান বাজনায়ও বিশেষ পারদর্শিনী। সে আব্বাজানের বিষন্নতা লক্ষ্য করে তার মনের আকস্মিক ভাবান্তরের কারণ জানতে চাইল। | বৃদ্ধ উজির বেটিকে সব কথা খুলে বলেন। আব্বাজানের মুখে সব বৃত্তান্ত শুনে শাহরাজাদ তাকে প্রবােধ দিতে গিয়ে। বলল—আব্বাজান, কেন তুমি সামান্য একটি ব্যাপার নিয়ে একেবারে আসমান-জমিন ভেবে মরছ! আজ রাত্রেই বাদশাহ শারিয়ার-এর সঙ্গে আমার শাদী দিয়ে দাও। আমার নসীবের কথা ভেবে উতলা হয়াে না। আমার দেহে যদি সাচ্চা মুসলমানের খুন থেকে থাকে তবে দেখবে আমি আবার জান নিয়ে তােমার কাছে ফিরে আসবই। আর যদি নেহাৎই বাদশাহের হাতে জান দিতে হয় তবে এমন কোন কাজ করে মরব যেন ভবিষ্যতে তামাম দুনিয়ার কোন লেড়কিকে আর শয়তানটার শিকার হতে বা রাজ্য ছেড়ে ভেগে যেতে না হয়। পুরাে ব্যাপারটা আমার হাতে ছেড়ে দিয়ে তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পার। .


                                   বলদ, গাধা ও গৃহকর্তার কাহিনী

 উজির বলেন—'বেটি আল্লাহর দোয়া থেকে তুমি বঞ্চিত হবে না এটুকু ভরসা আমার আছে। তবে একটা কথা তুমি কিন্তু তােমার  প্রকৃত পরিচয় নবাবের কাছে গােপন রাখবে। তােমাকে এবার বলদ, গাধা আর গৃহকর্তার কিসসা শোনাচ্ছি-

                     ‘কোন এক সময়ে এক নদীর ধারে কুটীর বেঁধে এক পশুপালক বাস করত। তার বাড়ির চারদিকে পশুচারণযােগ্য বিস্তীর্ণ প্রান্তর। তার ঘরের লাগােয়া ছিল বলদ আর গাধাটার থাকার গােয়াল। মাটির দেয়াল আর খড়ের ছাউনি।।

একদিন সন্ধ্যার কিছু আগে বলদটা গােয়ালে ঢুকে দেখে গাধাটা  দানাপানি খেয়ে উজাড় করে, খড়ের বিছানায় শুয়ে নিশ্চিন্ত আরামে বিভাের হয়ে নিদ যাচ্ছে। | গাধাটার কাজ রােজ একবার মনিবকে পিঠে বয়ে খামারের চারদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসা। ব্যস, তারপরই তার ছুটি, অখণ্ড অবসর। খানাপিনা কর আর নাক ডাকিয়ে নিদ যাও।

বলদের উপস্থিতিতে গাধার নিদ ছুটে গেল। বলদটা তাকে আক্ষেপ করে বল—“ভাইয়া, সুখের জীবন বটে তােমার! তুমি যেসব খানা পাও তার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। আর অন্য সব আরামের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। সুখ কিছু ছিল বটে তােমার নসীবে!

তাদের মনিব গােয়ালের পাশ দিয়ে যাবার সময় বলদের কথা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। পরবর্তী উক্তি শােনার জন্য উৎকর্ণ হয়ে রইল।

বলদটা বলে চলল —“আমার মত নসীব তাে আর তােমার নয় যে সকাল-সন্ধ্যা খেটে খেটে হাড় কয়লা হবে। খেটে খেটে আমার জান কেমন কয়লা হয়েছে, চেয়ে দেখ ? আর ভাল ভাল খানাপিনা ও দীর্ঘ বিশ্রামে দিন দিন তােমার গােস্ত কেমন ফুলে ফেঁপে উঠছে,। লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবে। আমাকে ভাের হওয়ার আগেই জোয়াল কাঁধে নিতে হয়। আর রেহাই পাই সন্ধ্যার আন্ধার নেমে এলে। | বলদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে গাধার মন গলে গেল। সে এবার মুখ খুলল—‘ভাইজান, তােমার দুঃখে আমার কলিজাটা বার বার কেঁকিয়ে উঠছে। তােমাকে চমৎকার একটা ফন্দি ফিকির বাৎলে দিতে পারি। কাল ভােরে নােকরটা যখন তােমাকে নিতে আসবে তখন তুমি ঘাপটি মেরে পড়ে থাকবে। কিছুতেই উঠে দাঁড়াবে না। তারপর নচ্ছার নফরটা তােমাকে পিটিয়ে পাটিয়ে যে করেই হােক মাঠে নিয়ে যাবেই। তারপর জোয়াল কাঁধে চাপাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠবে। কিছুতেই জোয়ালটাকে বাড়ে নেবে না। সে তবু বলপ্রয়ােগ করতে থাকবে। জোর করে জোয়ালটাকে তােমার কাঁধে চাপিয়ে দিলেও দু এক কদম গিয়ে জমিনে টান টান হয়ে শুয়ে পড়বে। শত গুতাে গাতাতেও উঠবে না। তবেই দেখবে তােমাকে ছাড়ান দেবে।

মনিব উৎকর্ণ হয়ে সব শুনল। সকাল হলেই তার নজরে পড়ল, গাধা বলদকে যে ফন্দি শিখিয়ে দিয়েছিল সে হুবহু সে সবই অবলম্বন করেছে।

মনিব তখন নােকরকে বলল—এক কাজ কর, বলদটাকে গােয়ালে রেখে গাধাটার কাঁধে জোয়াল চাপিয়ে দে।মনিবের নির্দেশে নােকর এবার গাধার কাঁধে জোয়াল জুড়ে উদয়াস্ত তাকে দিয়ে জমি চাষ করাল। দিনের শেষে গাধা ক্লান্ত অবসন্ন। দেহে গােয়ালে ফিরলে বলদটা বলল—‘ভাইজান, আজ একটু বিশ্রাম পেয়ে হাড় কটা যেন একটু স্বস্তি পেল। আল্লাতাল্লা তােমায় দোয়া করবেন। এসাে, আমরা মনের সুখে একটু গল্প করি।। | গাধা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—গল্প আর আমার মধ্য থেকে বেরােচ্ছে না ভাইজান। তােমার দুঃখের কথা ভেবে ভেবেই আমার কলিজাটা শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে! মনিবের কথায় যা বুঝলাম, তােমাকে বােধ হয় আর রাখবেন না।

বলদটা সচকিত হয়ে বলল—“রাখবেন না! রাখবেন না মানে? তবে কি আমায় জবাই করবে নাকি হে?  না। কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেবে তােমাকে। নফরটাকে বলছিল, বলদটা যদি মরে যায় তবে বহুৎ টাকা লােকসানের দায় ঘাড়ে চাপবে। তার চেয়ে বরং কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দি, তুই কি বলিস?’মনিবের কথা শােনার পর থেকে ভয়ে দুঃখে আমি একেবারে কুঁকড়ে ছিলাম। তােমায় যদি কসাইয়ের হাতে তুলেই দেয় তবে আমি এত বড় গােয়ালে কি করে যে একা একা থাকব ভেবেই অস্থির হচ্ছি! | ব্যস, এবার বলদটা আবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল। গামলা থেকে খড় খেতে লাগল। শরীরে তাগদ না বাড়ালে সে লাঙল টানবে কি করে। খেতে খেতে গাধাকে বলল—“ভাইজান, আগাম খবর দিয়ে তমি আমার কী উপকারই যে করলে তা আর ভাষায় বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়! কাল থেকে এমন আচরণ করব যে, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ।

মনিব গােয়ালের পিছনে, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে উৎকর্ণ হয়ে বলদ আর গাধার কথােপকথন সবই শুনল।।

পরদিন সকালে নােকরটা গােয়ালে ঢুকে দেখে বলদটা একেবারে সুস্থ-স্বাভাবিক। এবার সে গাধাটার পরিবর্তে বলদটাকে নিয়েই মাঠের দিকে হাঁটা জুড়ল। গাধাটা তাদের ফেলে-যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসল। | মনিব তার স্ত্রীকে একটা মজা দেখাবার কথা বলে মাঠে নিয়ে গেল। নােকরটা বলদের কাঁধে জোয়াল তুলে দিতেই সে এমন ভাব দেখাল যেন লাঙল জোড়ার আর তর সইছে না তার। লাঙল জড়তেই সে লম্বা লম্বা পায়ে মাঠময় ঘুরে জমি চষতে শুরু করল।

ব্যাপার দেখে মনিব যেন হাসতে হাসতে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি  খাবার উপক্রম হল। মালিকের স্ত্রী কিছু বুঝতে না পেরে বলল–“কি গাে, কি হ’ল তােমার? এমন করে হাসছ যে বড় ! হয়েছে কি বলবে তাে? আমায় দেখেই কি তবে তােমার এমন হাসি পাচ্ছে ?

-কী যে বল বিবিজান, নিজেই জাননা। তােমায় দেখে হাসতে যাব কেন গাে। তােমায় নিয়ে কি আজ থেকে ঘর করছি যে, এতদিন এত বছর পর তােমাকে দেখে তামাশায় আমার হাসির উদ্রেক ঘটবে? আজ থেকে এক শ’ কুড়ি বছর আগে তােমায় নিয়ে ঘর বেঁধেছি। আজ আমার বয়স কত তা আমার মালুম নেই। একদিন তুমি ছিলে আমার চাচার লেড়কি। তারপর তা থেকে বিবিজান হয়ে পাশে রয়েছ। ঘর করছ, কেন আমি হাসছি সবই খুলে বলব, তবে এখন নয়। তাতে হাসতে হাসতে যদি দম বন্ধ হয়ে আমার মৃত্যু হয় তবু বলব। বাড়ি গিয়ে লেড়কা-লেড়কিদের ডাকবে, মােল্লা-মৌলভীদের সাক্ষ্য রাখবে। বাড়ি, জমি-জিরাত সব লেখাপড়া করে দিয়ে তারপর সব খােলসা করে তােমায় বলব। তখন আমার যদি মৃত্যুও হয় কোনই আক্ষেপ থাকবে না।

মনিবের অনুরােধে লেড়কা বুড়া, মােল্লা-মৌলভী সবাই তার বাড়ি হাজির হলেন। তার মুখে সব কথা শুনে সবাই মনিবাণিকে বােঝাতে চেষ্টা করল—“শােন, তােমার মরদ বুড়াে হয়েছে। একগাদা লেডকা লেড়কি নিয়ে তােমাকে যে পথে বসতে হবে তাই আমরা সবাই বলছি, তােমার জেদ সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।'

মনিবাণি কিন্তু এত সহজে দমবার পাত্রী নয়। তার ওই এক কথা—‘আমাকে নিয়ে আমার মরদ হাসি ঠাট্টা করেছে। কিছুতেই আমি তা বরদাস্ত করব না।

উপায়ন্তর না দেখে মনিব কোদাল নিয়ে গােয়ালের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। বিরাট একটা গর্ত খুঁড়ল। এখানে তাকে গাের দেওয়া হবে। এবার হাসির রহস্য ফাঁস করার প্রস্তুতি নিল। বলদ আর গাধার বৃত্তান্ত সবার সামনে বলার জন্য তৈরি হ’ল।

মনিবের একটা ইয়া তাগড়াই মােরগ রয়েছে। পঞ্চাশটা মুরগীর সঙ্গে সে থাকে। তাকে নিয়ে মুরগীরা সুখে দিনাতিপাত করে। আর একটা তেজী কুকুরও আছে তার। | মনিব হঠাৎ শুনতে পেল কুকুরটা মােরগটার ওপর খুব হম্বিতম্বি শুরু করে দিল—তাের কি বােধগম্যি কিছুই নেই? আমাদের মনিব মরতে বসেছেন আর তুই কিনা আনন্দে লাফালাফি নাচানাচি শুরু করে দিয়েছিস!

মােরগটা নিজের পরিবারের মুরগীদের নিয়ে মহানন্দে দিন

কাটায়। কারাে ঝুটঝামেলায় থাকে না। অন্য কে কি করছে তা নিয়ে তার কিছুমাত্রও মাথাব্যথা নেই। কুকুরটা মােরগকে তার মনিব আর মনিবাণির বৃত্তান্ত সব বলল। সবকিছু শুনে মােরগটা বল—এ কী।

 সর্বনেশে কথা গা! হায় খােদা! আমাদের মনিব মাটির মানুষ। সাদাসিদে। বুদ্ধির লেশমাত্রও নেই। আমি একা পঞ্চাশটা মুরগীকে বশে রেখেছি আর তিনি একটামাত্র বিবিকে হাতের মুঠোয় রাখতে পারেন না! একটা জামের ডাল দিয়ে পিঠে ঘা কতক দিলে বাপ বাপ বলে সােজা হয়ে যায়। বজ্জাত বিবিকে বশ করতে লাঠিই একমাত্র সম্বল। | মনিব পাশে দাঁড়িয়ে মােরগের মুখে সব কিছু শুনে আর এক

মুহূর্তও দেরীকরলনা। বিবির কাছে গিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল—“আমার  শােবার ঘরে চল। গােপন রহস্যের কথা সব বলব তােমাকে।

মনিব এবার বাগানে গিয়ে একটা জামের ডাল ভেঙে আনল। বিবিকে নিয়ে শােবার ঘরে ঢুকল। দরজার খিল বন্ধ করল। বিবির গালে আচমকা এক চড় কষিয়ে দিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। জামের ছড়িটা দিয়ে তাকে বেধড়ক পেটাতে শুরু করল। যত আঁখির পানি ফেলে ততই মারে।

মনিবের বিবি কেঁদেকেটে বলল-“আমি আর হাসিঠাট্টার কারণ জানতে চাই না। আর মেরাে না! মরে যাব! আর মেরাে না আমায়! সে এবার ঘরের বাইরে এসে আত্মীয়-বন্ধু, গ্রামবাসী আর মােল্লামৌলভীদের বলল—“আজ আমি সত্যি খুশি! আমার আর কিছুই জানার নেই।' | মনিবের বিবির কথা শুনে সবাই যে যার বড়ি ফিরল। | মনিব আর তার বিবি এরপর আরও বহুকাল সুখে ঘর-সংসার করল।। | কাহিনী শেষ করে বৃদ্ধ উজির লেড়কির মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।

তার লেড়কি শাহরাজাদ বলল-“আব্বাজান, আমার অভিপ্রায় তাে অনেক আগেই তােমার কাছে ব্যক্ত করেছি।'

বৃদ্ধ উজির আর কথা না বাড়িয়ে বেটিকে শাদীর সাজে সাজতে বলেন।

বৃদ্ধ উজির লাঠি ভর দিয়ে বাদশাহকে খবর দিতে ছুটলেন আজ  রাত্রের জন্য তার বাঞ্ছিতা কুমারী লেড়কি সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

এদিকে শাহরাজাদ তার ছােট বহিন দুনিয়াজাদকে বল্ল-শােন, আমি এক রাত্রের জন্য বাদশাহের বেগম হতে চলেছি। আমি সময়মত তােকে ডেকে পাঠাব। তুই কিন্তু যাবি। শাদী হয়ে গেলে আমাকে নিয়ে বাদশাহ যখন শােবার ঘরে যাবার জন্য উদ্যোগ নেবেন তখন

তুই আব্দার করবি—দিদি কিসসা শােনাও—দিদি কিসসা শােনাও। | নইলে আমার চোখে নিদ আসবে না। প্রয়ােজনে একটু-আধটু কান্নাকাটিও করবি। আমি তখন কিসসা শুরু করব। ব্যস, এতেই বাদশাহকে কুপােকাৎ করতে হবে। দেখবি, চালটা কেমন জব্বর হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃদ্ধ উজির ফিরে এলেন। বধূবেশে সজ্জিতা  বড়মেয়ে শাহরাজাদকে নিয়ে, বিষন্নমনে বাদশাহ শারিয়ার-এর প্রাসাদের দিকে পা বাড়ালেন।

বাদশাহ শারিয়ার তার রাত্রের খােরাক রূপসী যুবতীটিকে দেখে উল্লসিত হলেন। আপন মনে বলে উঠলেন—খুবসুরৎ! জবরদস্ত পাত্রী যােগাড় করেছ উজির! তােমার নজর আছে বলতে হবে!

বাদশাহের মুখের দিকে চোখ পড়তেই শাহরাজাদ-এর মুখ খড়িমাটির মত ফ্যাকাসে হয়ে এল। বুকের মধ্যে ধড়া ধড়াস্ করতে লাগল। মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে জোর করে মুখে হাসির রেখা | ফুটিয়ে তুলল। যথােচিত ভঙ্গিতে বাদশাহকে কুর্নিশ করল।

বাদশাহ শারিয়ার এবার রূপসী শাহরাজাদ’কে আদরে-আহ্বাদে অভিভূত করে তােলার চেষ্টা করলেন। কাঁধে হাত দিয়ে তাকে নিয়ে গেলেন শােবার ঘরে। দরজার খিল বন্ধ করে দিলেন। পাশে বসালেন। শাহরাজাদ ওড়নায় মুখ ঢেকে ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।

বাদশাহ তার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে প্রবােধ দিতে গিয়ে বললেন সুন্দরী, কাঁদছ কেন? আমার বেগম হয়েছ, তােমার কাছে এ-তা সৌভাগ্যের কথা! ভয়ের কি-ই বা আছে, বুঝছি না তাে। তুমি আমার পেয়ারের জান—আমার কলিজা। কি চাও তুমি, নির্দ্বিধায় আমাকে বলতে পার। তােমার কোন আশাই অপূর্ণ রাখব না। মুখফুটে একবারটি শুধু বল, কি চাও তুমি!

শাহরাজাদ চোখ মুছতে মুছতে বল—জাঁহাপনা, আমার একটা ছােট্ট বহিন রয়েছে। আমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও সে থাকতে পারে না । স্বস্তি পায় না। আমাকে ছাড়া সে হয়ত ঘুমােতেই পারবে না।

নিঘুম অবস্থায় রাত্রি কাটাবে। কেঁদেকেটে আকুল হবে। তাকে একবারটি চোখের দেখা দেখবার জন্য আমার কলিজাটা উথালি পাথালি করছে।

বাদশাহ শারিয়ার মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন—ব্যস, এটুকুই তােমার আব্দার। আর এরই জন্য তুমি এমন করে চোখের পানি ফেলছ! আমি নােকরকে পাঠিয়ে তােমার বহিনকে এখানে আনানাের ব্যবস্থা করছি।' | এক কর্মচারীকে পঠিয়ে বাদশাহ শারিয়ার তার বিবির বহিন দুনিয়াজাদকে আনালেন। ঘরে ঢুকেই দুনিয়াজাদ তার দিদিকে জড়িয়ে ধরে, হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। সে কী কান্না। কে বলবে, এর মধ্যে পরিকল্পনা রয়েছে?

শাহরাজাদ তাকে নানাভাবে প্রবােধ দিয়ে, আদরে-আহ্লাদে শান্ত করলেন। এবার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

বাদশাহ শারিয়ার এতক্ষণ পাশ ফিরে শুয়েছিলেন। চোখের পাতায় একটু তন্দ্রা এসেছিল। দুনিয়াজাদ-এর কান্না আর শাহরাজাদএর নানা প্রবােধবাক্যে তার তন্দ্রা টুটে গেল। তারপর হিংস্র জানােয়ারের মত হাত দুটো বাড়িয়ে দিয়ে সাঁড়াশীর মত আঁকড়ে ধরলেন ফুলের মত পবিত্র কুমারী শাহরাজাদকে।।

শাহরাজাদ খােদা তাল্লার কাছে মিনতি জানাল—‘হে খােদা, হিংস্র জানােয়ারটার অত্যাচার সহ্য করার মত শক্তি-সাহস আমায় দাও!

টুকরাে টুকরাে কথা আর ধস্তাধস্তিতে দুনিয়াজাদ-এর ঘুম ভেঙে গেল। দিদিকে জড়িয়ে ধরে বলল—“আজ তুমি আমায় কিসসা শােনাবে না? শােনাও কিসসা। | শাহরাজাদ হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন—‘শোনাব বহিন। নিশ্চয়ই শােনাব।'

–‘রােজ রাতে তুমি যেমন কিসসা বলে ঘুম পাড়াও, তেমনি আজও বল। তােমার মুখের কিসসা কেবল আমি কেন, যেকোন মানুষই মুগ্ধ হয়ে শুনবে। বল, কিসসা বল, শুনি।

‘বহিন, রােজ রাত্রের সঙ্গে আজকের রাত্রের যে ফারাক। তবে অবশ্য, বাদশাহ যদি শুনতে আগ্রহী হন তবে অবশ্যই কিসসা বলব।' | দু’ বােনের কথায় বাদশাহ শারিয়ার-এর কৌতূহল হল। বললেন—বেগম শােনাও তােমার কিসসা। দেখি, তােমার কিসসা আমায় কেমন মুগ্ধ করতে পারে। কিন্তু খেয়াল থাকে যেন, সুবহ হবার আগে কিসসা যেন খতম হয়।................to be continued

Post a Comment

0 Comments