আরব্য রজনী পার্ট ৯৩(Arabya Rajani Part 93)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ  গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

আর এ-ও ভুলাে না, আমাদের শত্রু চারদিকে ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছে। তাই পর্দাটি অজানা অচেনা কোন খরিদ্দারের কাছে বেচো না যেন। এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।


           তিন শ’ কুড়িতম রজনী 
প্রায় মাঝ রাত্রে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগমের কোলে মাথা রেখে পালঙ্কের ওপর শরীর এলিয়ে কিসসা শােনার জন্য তৈরী হলেন। বেগম কিসসার পরবর্তি অংশ শুরু করলেন—“জাহাপনা, আলী শার তার বিবি জুমুর্যদ-এর বাৎ ইয়াদ করতে করতে পর্দাটি নিয়ে বাজারে গেল। ঠিক পঞ্চাশ দিনারের বিনিময়েই পর্দাটি বেচে দিল। এবার প্রাপ্ত অর্থের বিনিময়ে সিল্কের কাপড় আর সােনালি আর রূপালী সূতাে সওদা করে ঘরে ফিরল।
জুমুর্যদ অহেতুক সময় নষ্ট না করে ফিন পর্দা ও কার্পেট বানানাের কাজে মেতে গেল। আট দিনে বাহারী একটি কার্পেট বানিয়ে ফেলল। আলী শার এটিও পঞ্চাশ দিনারে বেচে এল।
একদিকে পর্দা-কার্পেট বানানাে ও বিক্রি আর অন্য দিকে সম্ভোগ সুখ পুরােদমে উপভােগ করে পুলকানন্দে তারা ভেসে চলল।
একদিন আলীশার কার্পেটের ছােট্ট একটি গাঁটরি নিয়ে বাজারে গেল। বাজারে ঢােকার মুখেই নচ্ছার এক খ্রীষ্টান ক্রেতার মুখােমুখি হয়ে গেল। এক রকম জোর করেই তার কার্পেট দেখল। নিজে থেকেই সে ষাট দিনার দাম দিতে চাইল। ঠিক সে-মুহুর্তেই জুমুর্যদ-এর সতর্কবাণী আলী শার-এর ইয়াদে এল। আবার ক্রেতাটিও একেবারেই অপরিচিত। খ্রীষ্টান, তাই সে তার কাছে কার্পেট বেচতে সরাসরি অস্বীকার করল। এদিকে খ্রীষ্টানটিও নাছােড়বান্দা। কার্পেট তাকে দেয়ার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে দিল। ষাট দিনার থেকে এক লাফে এক শ’ দিনারে উঠে গেল।
আলী শার যাতে তার কাছে কার্পেটটি বিক্রি করে তার জন্য খ্রীষ্টান ক্রেতাটি এক দালালকে দু’শ দিনার ঘুষ দিয়ে হাত করে রেখেছিল।
আলী শার যখন খ্রীষ্টান খরিদ্দারটির কাছে কিছুতেই কার্পেটটি বেচতে চাইল না তখন বেকায়দা দেখে দালালটি এগিয়ে এল। সে আলী শার-এর খুবই পরিচিত। মুচকি হেসে সে আলী শার-এর কাধে আলতাে করে একটি ঝাঁকুনি দিয়ে বলল—“আরে দোস্ত, তুমি করছ কী? ষাট দিনার থেকে এক লাফে একেবারে এক শ’তে পৌছে গেছে, ভাবতে পারছ! সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেলাে না। পরে পস্তাতে হবে বলে দিচ্ছি।
খ্রীষ্টান ও দালালটি এমন পীড়াপীড়ি শুরু করে দিল যে, শেষ পর্যন্ত খ্রীষ্টান খরিদ্দারটির কাছে বেচতে বাধ্য হ’ল।
ঘরে ফেরার পথে কিছু দূর এসে আলী শার আচমকা ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, খ্রীষ্টান খরিদ্দারটি তার পিছু নিয়েছে। সে দাঁড়িয়ে পড়ল। খ্রীষ্টানটি কাছে আসতেই সে বলল—“কি হে, চললে কোথায়? কই, এর আগে তাে তােমাকে এ-পথে দেখিনি।
-“জী, মাফ করবেন। রাস্তার বাঁকের কাছে এক জরুরী কাজ রয়েছে কিনা তাই ব্যস্ত পায়ে চলেছি
কাজ আছে। কাজ তাে থাকতেই পারে। অতএব বলার তাে কিছই থাকতে পারে না। বাধ্য হয়ে সে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। কয়েক পা গিয়ে ফিন সে ঘাড় ঘােরায়। এবারও দেখল, খ্রীষ্টানটি তার পিছন পিছনই আসছে। খুবই গােসসা হ’ল তার। রীতিমত খেকিয়ে উঠে বলল—“কি হে, হতচ্ছাড়া পাজী কোথাকার, ফিন আমার পিছু নিয়েছ।
—“বিশ্বাস করুন, একান্ত প্রয়ােজনের তাগিদেই আমাকে এপথে আসতে হয়েছে হুজুর। এখন আমাকে একটু জল দিতে পারেন? তেষ্টায় গলা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ।
আলী শার ভাবল, হতচ্ছাড়া খ্রীষ্টানটি যতই খারাপ আদমি হােক না কেন, পানি চেয়েছে। তৃষ্ণার্ত। কোন মুসলমান পিপাসিতকে পানি না দিলে আল্লাতাল্লা তাকে কিছুতেই মাফ করবেন না।
আলী শার খ্রীষ্টানটিকে ঘরে নিয়ে গেল। বাইরের দিককার রোয়াকে বসতে দিয়ে পানি আনতে কামরার ভেতরে ঢুকে গেল, কামরার ভেতরে ঢুকতেই জুমুরদ-এর সঙ্গে মুখােমুখি হতে হ’ল।
জুমুর্যদ বলল—কার্পেটটি বেচলে? কত দিনার দাম নিয়েছ? কার কাছে বেচলে?
আলী শার বার কয়েক ঢােক গিলে আমতা আমতা করে বলল—“আমার খুব চেনাশুনা এক খরিদ্দারের কাছেই বেচেছি।
জুমুরদ বিমর্ষ মুখে বলল—“আজ আমার দিল কেমন আনচান করছে। স্বস্তি পাচ্ছিনা কিছুতেই। কিন্তু তুমি পানির বদনা নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?
–‘আমার এক দালাল তেষ্টায় বড় কাতর হয়ে পড়েছে। থাকতে না পেরে আমার সঙ্গে বাড়ি পর্যন্ত ধাওয়া করেছে।
জুমুর্যদ-এর ফ্যাকাসে মুখ আরও বিবর্ণ হয়ে গেল। নিজের অজান্তে ফুসফুস নিঙড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
আলী শার পানির বদনা নিয়ে কামরা ছেড়ে রােয়াকের দিকে পা বাড়াল। ভেতরের রােয়াকে পা দিয়েই সে দেখল, খ্রীষ্টানটি এরই মধ্যে বাইরের রােয়াক থেকে একেবারে তার শােবার ঘরের রােয়াকে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে খ্রীষ্টানটিকে লক্ষ্য করে চেঁচিয়ে উঠল—“হারামী কাহাকার! হতচ্ছাড়া কুত্তার বাচ্চা! তাের সাহস তাে কমনয়! আমার অনুমতি না নিয়েই তুই বাইরের রােয়াক থেকে একেবারে আমারই শােবার ঘরের রােয়াকে চলে এসেছিস!' ।
খ্রীষ্টান খরিদ্দারটি নিতান্ত অপরাধীর মত মুখ কাচুমাচু করে বলল—অপরাধ নেবেন না হুজুর। হেঁটে হেঁটে পায়ের শিরায় টান ধরেছিল। তাই আর একটু হাঁটাহাঁটির মাধ্যমে ব্যাপারটিকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করছিলাম। তা ছাড়া আপনার বাইরের রােয়াক আর শােবার ঘরের বােয়াকের মধ্যে ফারাকও তত বেশী নয়। পানি খেয়ে, এখানে বসেই একটু জিরিয়ে নিয়ে বিদায় নেব।'  
খ্রীষ্টান খরিদ্দারটি কথা বলতে বলতে আলী শার-এর হাত থেকে পানি ভর্তি বদনাটি নিয়ে গলায় ঢেলে দিল। খালি বদনাটি ফিরিয়ে দিল । 
আলী শার কিন্তু সেখান থেকে এক চুলও নড়ল না। শয়তান খ্রীষ্টানটি বিদায় না নেয়া পর্যন্ত পিছন ফিরতে দিল সরল না। এক ঘন্টা পেরিয়ে গেল। খ্রীষ্টানটি তবু ওঠার নামটি করে না। উপায়ান্তর না দেখে আলী শার চিল্লিয়ে উঠল—“তাের ধান্দা কি, শুনি ? নিজে থেকে বাড়ি ছেড়ে যাবি, নাকি আমাকেই বন্দোবস্ত করতে হবে?
-হুজুর দুনিয়ায় এমন কিছু লােক রয়েছে যারা ভাল কাজ করে সবার প্রিয় পাত্র হতে চায়। লােকের মনে চিরকাল জীবিত থাকতে চায়। আপনি দেখছি ঈশ্বরের খাতায় নিজের নামটি লেখাতে একেবারেই অনাগ্রহী! জল দিয়ে আমার তেষ্টা মিটিয়েছেন। খুব ভাল কাজই করেছেন। এখন খিদের জ্বালায় আমি কষ্ট পাচ্ছি। যদি ঘরে একটু-আধটু খাবার টাবার থাকে তাই দিয়ে আমার খিদে মেটাবার ব্যবস্থা করে দিলে বড়ই আনন্দিত হই। একটু বাসি-পােড়া রুটি আর পিয়াজ হলেও আমার দিব্যি চলে যাবে।
তার বাৎ শুনে আলী শার-এর শিরে খুন চাপার জোগাড় হ’ল। সে বাজখাই গলায় চিল্লিয়ে উঠল—না, এখানে আর কোন ধান্দাই চলবে না। বেরাে এখান থেকে! নইলে তাের জান নিয়ে ছাড়ব, বলে দিচ্ছি। খ্রীষ্টানটি একেবারেই নাছােড়বান্দা। এক পা তাে নড়লই না। এমন কি তার মধ্যে কোন ভাবান্তরই লক্ষিত হ’ল না। নির্বিকার ভাবেই এবার বলল—‘ভাল কথা, ঘরে কিছু না-ও থাকতে পারে। তবে কার্পেট বিক্রি করে তাে অনেক দিনারই পেয়েছেন। বাজার থেকে কিছু খাবার টাবার এনে দিন। আমি সেটুকু খেয়ে একটু সুস্থ হলেই বিদায় নেব। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করবেন।
আলী শার দেখল, হতচ্ছাড়াটি নেহাৎ-ই পাগল। কুকুর লেলিয়ে না দিলে কিছুতেই কাঁধ থেকে নামবে না।
আলী শার এবার একটি লাঠি বের করা মাত্র খ্রীষ্টানটি বলে উঠল—এ করছেন কী মশাই! আমি আপনার কাছে এক টুকরাে রুটি, সামান্য নুন আর একটি পিয়াজ ছাড়া তাে কিছুই চাই নি। তার বদলে আপনি এরকম আচরণ করছেন।
আলী শার দেখল শয়তানটি একবার যখন ঘাড়ে চেপেছে তখন কিছু অন্ততঃ না খেয়ে নামবে না। উপায়ান্তর না দেখে সে যারপর নাই বিরক্ত হয়ে খাবার কেনার জন্য গােসসায় গস গস করতে করতে বাজারের দিকে হাঁটা জুড়ল। বাড়ি ছেড়ে যাবার আগে তাকে বলে গেল, যেন এক পা-ও নড়াচড়া না করে। তারপরও বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে গিয়ে কামরায় ইয়া পেল্লাই এক তালা লটকে দিয়ে গেল।
আলী শার হন হন করে বাজারে গেল। তাড়াতাড়ি কিছু খানা কিনেই উধ্বশ্বাসে ঘরে ফিরে এল।
উঠোনে পা দিয়েই দেখে হতচ্ছাড়া খ্রীষ্টানটি দিব্যি রােয়াকে বসে রয়েছে। সে খানার ঠোঙ্গাটি দুম করে তার সামনে রেখে বলল—নাও গেল! তারপর আমাকে রেহাই দাও। এমন শয়তান কুত্তা দ্বিতীয় আর একটি আছে বলে মনে হয় না।'
খ্রীষ্টানটি কিন্তু তার এত অশ্রদ্ধা, যাচ্ছেতাই ভাষায় এত গালাগালি-ভূক্ষেপই করল না। মুখ দেখে মালুমই হ’ল না, এসব বাৎ তার কানে গেছে। উপরন্তু স্বাভাবিক স্বরেই বলল—“আমি একাই খাব? এ কি করে হয়? আপনিও বসুন—'
—“যাক, খুব হয়েছে। তুমি একাই গেল। আমি শুধু চাই তুমি মেহেরবানি করে আমার কাঁধ থেকে নাম।
খ্রীষ্টানটি একেবারেই বেহায়ার চূড়ান্ত। এবার সে মুচকি হেসে বলল—তা-ও কি কখনও হয়? পৃথিবীর সব জাতির মধ্যে প্রচলিত প্রথা রয়েছে, অতিথির সঙ্গে গৃহস্বামীকেও আহার করতে হয়। যে এর অন্যথা করে সে নাকি বেজন্মা। তাই বলছি কি, বসুন আমার সঙ্গে। যা হােক কিছু মুখে দিন।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
       তিন শ' একুশতম রজনী 
বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন। জাহাপনা, আলী শার নাছােড়বান্দা খ্রীষ্টানটিকে কিছুতেই কা করে উঠতে পারছেনা। বাধ্য হয়ে তার পাশে ধ করে বসে পড়ল। বাজার থেকে কিনে আনা খানার ভাগ নিতেই হল।
আলী শার নিজের কৃতকর্মের বাৎ ভাবতে ভাবতে বিভাের হয়ে গেল। খ্রীষ্টানটি সে সুযােগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়ল না। সে একটি কলার খােসা ছাড়িয়ে তাকে দু'খণ্ড করে ফেলল। একটি টুকরাের মধ্যে আফিঙে সিদ্ধ করা একটি ভাঙের গুলি পুরে দিল। ভাঙের গুলিটির তেজ এমনই উগ্র যে, একটি গােদা হাতিকে খাইয়ে দিলে এক সালের মধ্যে তার নিদ টুটবে না। কলার টুকরাটি এবার আলী শার-এর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল “হুজুর, কলার আধা আপনি খান। আর বাকীটুকু আমি খাচ্ছি।'
আলী শার ব্যাপারটি নিয়ে তিলমাত্রও ভাবনা চিন্তা করল না। কলার টুকরাটি নিয়ে সােজা মুখে চালান করে দিল। তারপর কপ করে গিলে ফেলল।
কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই আফিং আর ভাঙের খেল শুরু হয়ে গেল। আলী শার দুম করে মাটিতে পড়ে গেল। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল। ব্যস শয়তান খ্রীষ্টানটি এবার নিজমূর্তি ধারণ করল। নেকড়ের মত তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পড়ল। পা টিপে টিপে সদর-দরজার বাইরে চলে গেল। সেখানে তার কয়েকজন সাকরেদ খচ্চর নিয়ে অপেক্ষা করছে। আর ? সেই বাদরমুখাে কদাকার রসিদ অল-দিন তাদের সঙ্গেই রয়েছে। জুমূর্যদ যাকে নাক শিটকে, মুখ বাঁকিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিল। | খ্রীষ্টানটিকে বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখেই রসিদ অল-দিনএর কলিজা খুশীতে নাচানাচি শুরু করে দিল। তার জিদ ছিল, যে কোন মূল্য দিয়েই হােক জুমুর্যদ’কে তার চাই-ই চাই। সে আদতে খ্রীষ্টান। মুসলমান প্রধান অঞ্চলে বাড়তি কিছু সুবিধা ভােগ করার জন্য মুসলমানের নাম ও পােশাক আশাক ধারণ করেছে। আর এ খ্রীষ্টানটি রসিদ-এরই সহােদর। তার নাম বরনুম।
আলী শার'কে পরিকল্পনা মাফিক অচৈতন্য করে এসেছে শুনে রসিদ খুশীতে ডগমগ হয়ে নাচতে নাচতে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। সাকরেদদের নিয়ে জোর জবরদস্তি করে জুমূর্যদ’কে ধরে ফেলল। তার মুখে কাপড় বেঁধে দিল। এবার হাত-পা রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে তাকে নিয়ে তুলল শয়তানের সাক্ষাৎ চর রসিদ অলদিন-এর মকানে।
জুমুরদ'কে সােজা রসিদ অল-দিন-এর শােবার ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। হাত-পায়ের রশি খুলে দিল। মুখের বাঁধনও আলগা করে দিল।জুমুরদ গুলিবিদ্ধ বাঘিনীর মত এক হেঁচকা টানে মুখের কাপড়টিকে খুলে ঘরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। ঠিক তখনই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে হতচ্ছাড়া শয়তান বাঁদরমুখাে রসিদ দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে ফিক ফিক করে হাসছে। লালসায় তার চোখ দুটো চিকচিক করছে।
রসিদ চোখের কোণের পিঁচুটির ডেলা আঙুল দিয়ে মুছতে মুছতে ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বলে উঠল—‘মেহবুবা, তুমি এখন আমার হাতে বন্দী। ঝুটমুট বেগড়বাই করে ফয়দা কিছুই হবে না। তুমি আমাকে ঘেন্না কর, জানি। দিল থেকে মহব্বত তুমি আমাকে দেবে না, দিতে পারবেনা তা-ও বিলকুল বুঝি। তাই তােমাকে জবরদস্তি ভােগ করে আমাকে লালসা মেটাবার ফিকির বের করতে হয়েছে। তােমাকে আমি বুকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছি। তােমার যৌবন-সুধা পান করার জন্য আমার কলিজা অস্থির। তুমি আমাকে পেয়ার কর চাই না কর, তােমার শরীরটিকে আমার চাই-ই। আমার বাৎ যদি না শােন, যদি বেগড়বাই কর তবে তােমার ওপর অত্যাচারের স্টিম রােলার চালাতে আমি বাধ্য হব।
জুমুর্যদ ফোঁস করে ওঠে—শয়তান কাঁহিকার! আমাকে টুকরাে টুকরাে করে কেটে ফেললেও আমার ধর্ম থেকে আমি এক পা-ও নড়ছিনা। খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, আমার ওপর যত অত্যাচারই করিস না কেন আমার দিলের নাগাল কোনদিন এক মুহূর্তের জন্যও মিলবে না। তুই যদি বােকা পাঁঠার মত জবরদস্তি আমার ঘাড়ে চেপে বসিস তবু আমার দিল্ তাের কাজে সায় দেবে না।
—“কি বললি হতচ্ছাডি! আমাকে তুই এখনও ঘেন্না করিস।
-করি। ভবিষ্যতেও করব। আমার সাফ কথা শুনে রাখ শয়তান, তাের পাপ মুহুর্তের জন্যও আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।
আর এ-ও শুনে রাখ তুই কোনদিনই খােদাতাল্লার ক্ষমা পাবি না। কৃতকর্মের জন্য তােকে তিলে তিলে দগ্ধে মরতে হবে।
-খােদাতাল্লার ডর দেখাচ্ছিস আমাকে! বহুৎ আচ্ছা, দেখি তাের খােদাতাল্লা কি করে রক্ষা করে, ইজ্জৎ বাঁচায়।'
রসিদ এবার ক্রোধােন্মত্ত শেরের মত গর্জে উঠল। দুই ক্রীতদাসীকে তলব করল। তারা ছুটে এলে বলল- হারামজাদীকে পিঠমােড়া করে বেঁধে উপুড় করে শুইয়ে দে। ক্রীতদাসীরা এবার রশি নিয়ে এসে জুমুরদ’কে পিঠমােড়া করে বেঁধে মেঝেতে ফেলে দিল।
রসিদ এবার তার ওপর উন্মাদের মত চাবুক চালাতে শুরু করল। জুমুরদ আল্লাহর নাম স্মরণ করতে লাগল। আর থেকে থেকে যন্ত্রণায় কাৎরাতে কাৎরাতে ঘরময় চক্কর মারতে থাকল।
জুমুরদ চাবুকের ঘা বেশীক্ষণ সহ্য করতে পারল না। মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল।
রসিদ এবার ক্রীতদাসীদের বলল—একে রসুইখানায় নিয়ে যা। সেখানে তােদের সঙ্গে থাকবে। রাস্তার ওপর শুয়ে রাত্রি কাটাবে। খবরদার কিছুতেই খানা আর সরাব দিবি না শয়তানীর বাচ্চাকে।
জুমুরদ ক্রীতদাসীদের সঙ্গে রসুইখানায় দিন গুজরান করতে লাগল। এদিকে নসীববিড়ম্বিত বেচারা আলী শার পরের দিন পর্যন্ত বেহুঁস হয়ে পড়ে রইল। রাত্রির দিকে তার নেশা টুটল। উঠে দাঁড়াল। বিবি জুমুরদ’কে খুঁজল পাতিপাতি করে। কোথাও তার দেখা পেল না । দু’চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগল। তার বিবি কোথায় গেছে, কি হয়েছে, কে তাকে জবাব দেবে? সবই ঠিকঠাক রয়েছে; কেবল তার দিল, তার কলিজা জুমুর্যদ-ই নেই। আলী শার রােয়াকে বসে চোখের পানি ঝরিয়ে ভাবতে লাগল। এবার এক এক করে তার সব মনে পড়তে লাগল। মনে পড়ল, শয়তান খ্রীষ্টানটির কাণ্ডকারখানা। তার বুঝতে বাকী রইল না শয়তানটি-ই তার বিবিকে গায়েব করেছে। সে এবার বিলাপ পেড়ে কাঁদতে কাঁদতে উন্মাদের মত মাথা ঠুকতে লাগল, নিজের চুল ছিড়তে লাগল; ফিন মাটিতে গড়াগড়ি দিতে শুরু করল। আলী শার কিছুই বুঝতে পারছেনা, কোনদিকে যাবে, কার কাছে যাবে, কাকেই বা জিজ্ঞাসা করবে তার মেহবুবা জুমুর্যদ-এর কথা। কে তাকে দেবে তার প্রাণপ্রতিমা, তার কলিজার হদিস?
আলীশার কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে পড়েছে। সে উন্মাদের মত বিলাপ পেড়ে পেড়ে পথ দিয়ে ছুটতে লাগল। কিছু দূর যেতেই এক বুড়ির মুখােমুখি হ’ল। তার হালৎ দেখে বুড়িটির মায়া হ’ল। বুড়ি বলল—“বেটা, খােদাতাল্লা তােমার সহায় হােন। তােমার এ-হাল কেন? কি হয়েছে, আমাকে বাতাও।
আলী শার চোখের পানি মুছতে মুছতে নিজের নসীবের |

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments