আরব্য রজনী পার্ট ৯২(Arabya Rajani Part 92)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
এক ব্যাপারী সবার আগে পাঁচ শ’ দিনার দর হাঁকল। সঙ্গে সঙ্গে পাশ থেকে অন্য এক ব্যাপারী বলে উঠল পাঁচ শ’ দশ দিনার।
রসিদ আল-দিন নামে এক মাঝবয়সী কদাকার আদমী ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েছিল। ঠোটের কোণ বেয়ে তার পানের পিক গড়াচ্ছে, চোখের কোণে ডেলা পাকানাে পিচুটি। ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে ফাস ফ্যাসে গলায় হাকল –“আমার দর ছয় শ’ দিনার।

পাশ থেকে একজন সঙ্গে সঙ্গে বলল—ছয় শ’ দশ দিনার। মাঝ বয়সী কদাকার আদমিটির ইজ্জতে লাগল, সে কোমরের লুঙ্গিটিকে গােছগাছ করতে করতে হেঁকে বলল—“বহুৎ আচ্ছা, আমার দর তবে পুরাে এক হাজার দিনার রইল। ব্যস আর কেউ সাহস করে এগিয়ে এল না। নিলাম এখানেই খতম হয়ে গেল।
দালালটি এবার ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লেড়কিটির মালিককে বলল—‘জী, এক হাজারের বেশী দর যে উঠছে না। কি করবেন? মাল খালাস করে দেবেন, নাকি
-হ্যা, এক হাজারেই ছেড়ে দেব। লেকিন তার আগে এক কাম করতে হবে, সে লেড়কিটিকে আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, ওর পছন্দ মাফিক আদমির কাছেই ওকে বেচব। তুমি একবার ওর মতামত জেনে নাও তাে।
জুমুরদ একবার রসিদ অল-দিন-এর দিকে চোখ ফিরিয়েই আঁৎকে উঠে বলে—এ কোন হতচ্ছাড়া বাঁদরমুখাের হাতে আমাকে তুলে দিতে চাইছ? দোজখের কীটও বুঝি এর চেয়ে সাফ সুতরা! আমার মুখের দিকে লালসা-মাখানাে দৃষ্টিতে ঢ্যাবা ঢ্যাবা চোখ মেলে কেমন তাকিয়ে রয়েছে একবারটি চেয়ে দেখ। এর সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে রাত্রি কাটাতে হবে ভাবলেই আমার গা ঘিন ঘিন করছে! রক্ষে কর ওটি আমার দ্বারা সম্ভব নয়।
দালালটি ফিন সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভিড়ের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে এবার হাঁক দিল—এক হাজার দিনারের বিনিময়ে বেহেস্তের এ হুরীটিকে আর কে খরিদ করতে রাজী আছেন, বলুন?
এবার অন্য আর এক মাঝবয়সী চিল্লিয়ে উঠল—“আমি, আমি খরিদ করতে চাই। আমি দেব এক হাজার দিনার।
জুমুরদ এবার তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, এ-আদমিও মাঝবয়সী বটে। তবে রসিদ আল-দিন-এর মত এতটা কদাকার নয়। ঠোঁটের কোণে পানের পিক বা চোখের ধারে পিচুটির চিহ্ন মাত্রও নেই। তবে মােটামুটি বুড়াে। কিন্তু আদৎ বয়সকে লুকোবার ধান্দা করেছে। চুল আর দাড়িতে আচ্ছা করে কলপ মেখে জোয়ান মরদ সাজার কোশিস করেছে।
আদমিটির দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিয়ে জুমুর্যদ নাক শিটকে, মুখ বাঁকিয়ে বলে ওঠে—ছ্যাঃ ছ্যাঃ ছ্যাঃ! এর সঙ্গে! কী শরমের ব্যাপার! ছােড়া সাজার কোশিস করেছে বটে! কিন্তু আদতে তাে
বুড়ােই বটে।
জুমুরদ চরম বিতৃষ্ণার সঙ্গে দ্বিতীয় জনকেও বাতিল করে দিল। পরিস্থিতি অনুকুল বুঝে অন্য একজন এগিয়ে এসে গম্ভীর স্বরে বলল--আমি—আমি দিচ্ছি এক হাজার দিনার। এই নিন দিনারের থলি আর আমার মাল আমাকে বুঝিয়ে দিন।
জুমুরদ এবার নতুন আদমিটির দিকে তাকিয়েই ফিক করে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হেসে ওঠে। 
এবারের আদমিটি কানা। একটি চোখ খােয়া গেছে। 
জুমুর্যদ হাসি থামিয়ে এবার বলল—“তােমরা কি আর খরিদ্দার পেলে না, শেষ পর্যন্ত যতসব কানা-খােড়া ধরে নিয়ে আসছ। জানা নেই, কানারা মিথ্যাবাদী হয়। ফিন মিথ্যাবাদীরাও কানা হয়। কানা আর মিথ্যাবাদীর মধ্যে ফারাক কিছু নেই। কানা খদ্দেরটি বাতিল হয়ে যাবার পর আর একজন এগিয়ে এল। বেটেখাটো, রীতিমত গাট্টাগােট্টা। গায়ে গােস্তর পরিমাণ একটু বেশীই বটে। সংক্ষেপে বললে, বাতাবী লেবুর মত গােলগাল চেহারা। মুখে ইয়া লম্বা এক গােছা দাড়ি। নামতে নামতে একেবারে তলপেট পর্যন্ত চলে গেছে।
জুমুরদ নতুন নাগরটিকে এক ঝলক দেখে নিয়ে বিদ্রুপের স্বরে বলল-“কী আমার নাগর বাছাই করেছে রে। গায়ে একগাদা লােম। যেন জঙ্গল থেকে বেরিয়েই সােজা বাজারে হাজির হয়েছে।
জুমুরূদ এক এক করে চারজনকেই বাতিল করে দিয়েছে।
ব্যাপারটি দালালের মােটেই মনঃপূত হ’ল না। সে রেগে একেবারে কাই হয়ে গেল। লেড়কির মালিককে বলল—“আমি হার মানছি ভাইজান! মালুম হচ্ছে আমার দ্বারা এ কম্ম হবার নয়। এবার
জুমুর্যদ’কে লক্ষ্য করে বলল তােমার মরদ তুমি বেছেটেছে নাও। আমার দ্বারা হবার নয়। তুমি এদের মধ্য থেকে তােমার পছন্দমাফিক—সবাই নগরের গণ্যমান্য ব্যাপারী, বেছে নাও।
লেড়কিটি এবার সক্রিয় হ’ল। ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকের মুখের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে লাগল। চঞ্চল তার দৃষ্টি। চোখের তারায় হতাশার ছাপ।
চোখের মণি দুটোকে এর-ওর মুখের ওপর থেকে তুলে নিয়ে এসে লেড়কিটি এক জায়গায় এনে স্থির করল। আলী শার-এর মুখের ওপর তার দৃষ্টি আটকে গেল। বিভিন্ন উমরের যত আদমি দাঁড়িয়ে রয়েছে তাদের মধ্যে আলী শার বাস্তবিকই অনন্য। কী তার সুরৎ! কী মনমৌজী চোখ-মুখ।
জুমুর্যদ এবার মুখ খুলল। দালালকে লক্ষ্য করে বলল—“আমি একেই এতক্ষণ তাল্লাশ করছিলাম। এবার মিলল। আমি এর সঙ্গেই যেতে চাই, এর সঙ্গেই ঘর করতে উৎসাহী। এ-ই আমাকে খরিদ করে নিক। এর সুরৎ আমার কলিজায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
আর আমার চোখে ধরেছে রঙ। কী সুরৎ! কী তার মুখ-চোখ-নাক। সাচ্চা নওজোয়ান। নিটোল তার দেহের গড়ন। ফিন শক্তিমত্তার পরিচায়কও বটে। একে এক ঝলক দেখেই আমার দিল উতলা হয়ে উঠেছে মাত্র একটিবার আলিঙ্গন করার জন্য। আমার খুনে মাতন লাগছে। একে চাই-ই চাই। কথাটি বলেই সে ভাবে বিভাের হয়ে কবিতা আওড়াতে লাগল।
লেড়কিটির ব্যাপার স্যাপার দেখে দালালটি রীতিমত তাজ্জব বনে গেল। তাজ্জব বলার মতই তাে বাৎ। বাজারে যে লেড়কিকে বেচার জন্য আনা হয়েছে সে যদি কথায় কথায় এমন কবিতা আওড়ায় তবে তাজ্জব না বনে পারা যায় ?
দালালটি এবার লেড়কিটির মালিকের দিকে ঝুঁকে, চোখ দুটো কপালে তুলে বলল—“জী, এ কেমন লেড়কিকে বাজারে বেচতে নিয়ে এলেন? কবিতা টবিতা ছাড়া কোন বাৎ-ই এর জানা নেই?
‘আরে ভাইয়া, লেড়কিটির কারবার দেখে তােমার তাজ্জব বনাই স্বাভাবিক বটে। এর সুরৎ তাে চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছ। এ খালি কবিতা বলেই না, কবিতা লেখেও। নামজাদা কবি। এক সঙ্গে সাতটি কলম চালিয়ে সাতটি কবিতা লিখে ফেলতে পারে। ফিন রেশমী কাপড়ে মনলােভা নক্সা বানাতে পারে। আর পারে চমকদার কার্পেট বানাতে যার দাম পঞ্চাশ দিনার হবেই। আমি কবুল করতে পারি, একে যে আদমি খরিদ করে নিয়ে যাবে সে কয়েক মাসের মধ্যে দিনার বুঝে পেয়ে যাবে।'
দালালটি বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টি মেলে একবারটি জুমুর্যদ-এর মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে দু’পা এগিয়ে আলী শার-এর মুখােমুখি দাঁড়াল। মুচকি হেসে বলল—নওজোয়ান, নসীবে না থাকলে এরকম ধন ঘরে নেয়া যায় না। আলী শার-এর হাত টেনে নিয়ে চুম্বন করে বলল—দেখবেন সাহাব; বিবিকে সর্বদা চোখে চোখে রাখবেন। এরকম ধন ঘরে রাখাও বড্ড ঝকমারি।
বেগম শাহরাজাদ কিসসাটির এপর্যন্ত বলার পরই ভাের হয়ে এল। তিনি কিসসা বন্ধ করেলন।
তিন শ’ উনিশতম রজনী 
রাত্রি গভীর হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাহাপনা, দালালটি আলী শারকে বলে চলল—‘সাহাব, তােমার নসীবের কথা ভেবে আমার হিংসা হচ্ছে। নিজের চোখেই তাে দেখলে, বেহেস্তের হুরীটিকে কত আদমিই তাে খরিদ করার কোশিস করল—পাগল হ’ল, পেল কি? সুরৎ ছাড়াও এর মধ্যে যে সম্পদ রয়েছে তাকে সামান্য দিনারের বিনিময়ে খরিদ করা সম্ভব নয়। লেড়কি যখন তােমাকে তার নাগর হিসাবে বেছে নিয়েছে তখন তােমার বরাত খুলে গেছে ধরে নিতে পার। তার মালিক অবশ্যই তােমার হাতে ডাঁশা মালটি তুলে দিচ্ছে। একে খরিদ করে, ঘরে নিয়ে যাও সাহাব, এ তােমায় সুখ শান্তি আর অর্থ দুই দেবে।'
ব্যাপার দেখে আলীশার-এর গলা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। সে খুবই বিব্রত বােধ করে, অপ্রস্তুত হয়ে যায়। সে ভাবে তাকে নিয়ে লেড়কিটি, লেড়কির দালাল প্রভৃতি রঙ্গ তামাশায় মেতেছে। হায় আল্লাহ। এ কী দায়ে ফেললে আমাকে। সামান্য রুটির দাম জানতে চাওয়ার হিম্মত যার নেই সে কিনা এরকম খুবসুরৎ একটি লেড়কির দাম জিজ্ঞাসা করবে। তারা তাে ধরেই নিয়েছে লেড়কিটিকে খরিদ করার মত যথেষ্ট অর্থ আমার সঙ্গে অবশ্যই রয়েছে। নইলে লেড়কি কেনা-বেচার সময় হাজির হতে যাবই বা কেন? আগু পিছু বিবেচনা করে আমার মুখে কলুপ এটে দাঁড়িয়ে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। আগ বাড়িয়ে ইজ্জত খােয়াতে না যাওয়াই উচিত। আলী শার দালালটির কথার জবাব দিল না।।
জুমুরদ কিন্তু আপন সিদ্ধান্তে অটল। সে তার পেয়ারের নাগর আলী শার'কে আচমকা চোখের বাণ মেরে বসল। তার দিকে তাকিয়ে ঠোট টিপে টিপে হাসতে লাগল।
জুমুরথ এবার দালালটির কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে বলল—“আমাকে একবারটি ওর কাছে নিয়ে চল। আমি তাকে অনুরােধ করব যে করেই হােক আমাকে যেন সে খরিদ করে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। সে, যা-ই বলুক, আমি ওর সঙ্গেই যাচ্ছি। তুমি আমাকে ওর সামনে হাজির কর, সব ফয়সালা হয়ে যাবে।
উপায়ান্তর না দেখে দালাল এবার জুমুরদ’কে নিয়ে আলী শার এর মুখােমুখি দাঁড় করিয়ে দিল।
উপস্থিত সবাই দেখল, আলী শার-এর সামনে গিয়ে বেহেস্তের হুরী দাঁড়িয়েছে। জুমুরদ আলী শার-এর হাতদুটো জড়িয়ে ধরে ভাবাপ্লুত কণ্ঠে বলতে লাগল—“ওগাে আমার মেহবুব, আমার দিল, তােমাকে দেখেই যে আমার কলিজায় জ্বালা ধরে গেছে। শিরায় শিরায় খুনে মাতন লেগেছে! তুমি কি বুঝছ না, তােমাকে একটিবার আমার যৌবনভরা বুকে পাবার জন্য কেমন উতলা হয়ে উঠেছি? কেন তুমি এমন বিষন্ন মুখে তাকিয়ে রয়েছ? তুমি কি ভাবছ, যে দর আমার উঠেছে আমি তার চেয়ে বেশী দরে খরিদ হওয়ার যােগ্য। বহুৎ আচ্ছা! তুমি না হয় যে-দর ন্যায্য মনে করছ সে-দরই হাঁক। আর যদি ভাব দর বেশী বােধ হচ্ছে, তবে তােমার যা খুশী তা-ই বল না কেন। এতে শরমের কি আছে, বুঝছি না তাে? মেহবুব আমার, মুখ খােল। কিছু তাে বল। তবে আমার বাৎ শুনে রাখ, আমি তােমার সঙ্গে যাব যখন মন করেছি—যাবও তােমার সঙ্গে।
আলী শার-এর চোখ দুটো ছল ছল করতে থাকে।
জুমুর্যদ বলল-“হাজার দিনার কি তােমার কাছে বেশী মনে হচ্ছে? তা-ই যদি হয় বলেই ফেলনা। ঠিক আছে তুমি আটশ’ দিনার দিয়ে ঝামেলা চুকিয়ে ফেল।
আলী শার ঘাড় ঝাকায়।
জুমুরদ মুচকি হেঁসে বলে—তবে সাতশ’ দাও। তাতে রাজী নও? যাক আর দাম দস্তুরের দরকার নেই। তুমি একশ’ দিনার গুণে দিয়ে আমাকে তােমার মকানে নিয়ে চল। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমার বুকের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। দেরী করছ কেন, বের কর একশ’ দিনার।
-আমার সঙ্গে একশ’ দিনারও নেই। আমার জেব একেবারেই খালি।
–‘নেই? একশ’ নেই? কত কম পড়ছে, বলই না। শরম কিসের ?’কথা বলতে বলতে জুমুরদ খিল খিল করে হেসে আলী শার-এর গায়ের ওপর এলিয়ে পড়ে। এমন এক ভাব দেখায়, দেরী করলে যেন বাজারে, একগাদা আদমীর সামনেই সে তাকে জড়িয়ে ধরবে। শরম টরমের তােয়াক্কা সে করে না।
ব্যাপার দেখে আলী শার শক্ত কাঠ হয়ে যায়। তার অক্ষমতা তাে কেবলমাত্র অর্থকড়ির দিক থেকে। যৌবন আর পৌরুষত্বের তাে আর ঘাটতি নেই। তাই উদ্ভিন্ন যৌবনা খুবসুরৎ এক লেড়কির কামদীপ্ত দেহের ছোঁয়া পেয়ে তার কলিজা লাফালাফি দাপাদাপি শুরু করে দেয়। অতি কষ্টে সে নিজেকে সংযত রেখে শুষ্ক কণ্ঠে কোনরকমে উচ্চারণ করল-“বিলকুল ভুল জায়গায় হাত বাড়িয়েছ সুন্দরী। একশ’ দিনারের ব্যাপার তাে আমি চিন্তাও করতে পারি না।। আমার জেবে একটি দিনারও খুঁজে পাবে না। খামকা সময় ও ধৈর্য নষ্ট না করে তুমি বরং অন্য জায়গায় ধান্দা কর। এখানে দাঁড়িয়ে, থাকলে তােমার কোনই ফয়দা হবে না। জুমুর্যদ মুহূর্তের জন্য গম্ভীর হয়ে যায়। তবে এটুকু বুঝতে তার বাকী নেই, এর কাছে একটি কানাকড়িও নেই।
জুমুরদ এবার চট করে একটি মতলব এঁটে ফেলল। প্রায় ফিসফিসিয়ে আলী শার’কে বলল—বহুৎ আচ্ছা, তােমাকে দিনারও দিতে হবে না। ফিকির আমিই করে দিচ্ছি। আমি যা-যা বলছি কর, তবেই হিল্লে হয়ে যাবে। তুমি আমাকে একামিজটি পরিয়ে দাও, আর দ্বিতীয় হাত দিয়ে আমার কোমরটি ধর। ব্যস, দেখবে সমস্যা মিটে গেছে।
আলী শার তার কথা মত কাজ করতে গিয়ে দেখল, হঠাৎ তার কোমরের কাছে ধরে রাখা হাতটিতে একটি থলি এসে পড়ল।
জুমুর্যদ বলল—এতে এক হাজার দিনার আছে, দালালের হাতে নয়শ’ দিয়ে আমার দাম চুকিয়ে দাও। বাকী এক শ’ নিজের জেবে রেখে দাও। আখেরে কাজ দেবে।
আলী শার থলিটি থেকে নয় শ’ দিনার দালালের হাতে গুজে দিয়ে জুমূর্যদ কে নিয়ে ঘরে ফিরে গেল।
আলী শার লেড়কিটিকে তার ভাঙাচোরা ঘরে নিয়ে আসতে খুবই সঙ্কোচ বােধ করছিল। জুমুরদ কিন্তু তার ঘরদোরের দৈন্যদশা দেখে বিস্মিত বা বিমর্ষ কিছুই হল না। একটি ছেড়া মাদুর ছাড়া আলী শার-এর বিছানা বলতে কিছুই নেই। কোথায় বা নবাগতাকে বসতে দেবে তা-ই তার কাছে সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। জুমুর্যদ তার কামিজের তলা থেকে একটি থলি বের করে তা থেকে এক হাজার দিনার আলী শার-এর হাতে দিয়ে বলল—“ছুটে বাজারে যাও। আচ্ছা কিছু খানা, একটি কার্পেট আর আসবাবপত্র যা-যা দরকার খরিদ করে জলদি নিয়ে এসাে।
আলী শার বাজার থেকে সওদা সেরে সমানপত্রের গাঁটারি নিয়ে ঘরে ফিরল।
জুমুরদ নিজে হাতে কার্পেট বিছাল। বিছানা গােছগাছ করল বালিশ-তাকিয়া জায়গামত রাখল। দরজায় ঝুলিয়ে দিল বাহারী এক পর্দা।
কামরা গােছগাছ করে দু’জনে খানাপিনা সারতে বসল। সরাব খেল পেয়ালা ভরে ভরে। সরাবের নেশা দু’জনকেই একটু-একটু করে ধরতে শুরু করেছে। ক্লান্ত শরীর এলিয়ে পড়তে চাইছে।
নতুন কামরা, নতুন বিছানায় জুমূর্যদ নিজেকে তার বহু বাঞ্ছিতের হাতে তুলে দিল। তার জীবনের প্রথম পুরুষ। দেহসুখ কি জিনিস সে এই প্রথম অনুভব করল। একে, অন্যের কাছে নিজেকে উজাড় করে ঢেলে দিল। সারারাত্রি ধরে তারা সম্ভোগের মাধ্যমে কামজ্বালা নিবৃত্ত করল। তৃপ্ত করল দিলকে আর অশান্ত কলিজাকে করল শান্ত। তারপর ? উভয়ে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে অবশ-অলস ভাবে অবশিষ্ট রাত্রিটুকু কাটিয়ে দিল।
জিন্দেগীর প্রথম সুখের রাত্রির অবসান হ’ল পাখির ডাকের মধ্য দিয়ে।
জানালা দিয়ে এক টুকরাে রােদ চুপি-চুপি এসে জুমূর্যদ-এর কামতৃপ্ত চোখের ওপর পড়ল। সে বিছানা ছেড়ে নেমে এল। রাত্রের তৃপ্তিটুকু এখনও তার চোখের তারায় জড়িয়ে রয়েছে। বুকে প্রথম বসন্তের খুশীর জোয়ার।
জুমুরদ সকাল হতে না হতেই কাজে লেগে গেল। শুরু করল জীবন-সংগ্রাম। দামাদম সিল্কের গায়ে চমৎকার নকসাযুক্ত একটি মনলােভা পর্দা বানিয়ে ফেলল। মাত্র আট দিনের মধ্যে এমন দিলবাহার নকসা বানানাে যায় এ যেন আলী শার-এর কাছে খােয়াব দেখার সামিল। সে কেবল ভূয়সী প্রশংসাই নয়, বহুভাবে জুমুরদ’কে কৃতজ্ঞতা জানাল।।
পর্দাটি তৈরী হয়ে গেলে জুমুর্যদ সেটিকে আলী শার-এর হাতে দিয়ে বলল—বাজারে গিয়ে বেচে এসাে। ইয়াদ রেখাে পঞ্চাশ দিনারের কমে কিছুতেই বেচবে না, ফিন বেশীও নেবে না।
–“কিন্তু একেবারে পঞ্চাশ দিনার কম বা বেশী নয় কেন? আলী শার সবিস্ময়ে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিল।
–হ্যা, ঠিক পঞ্চাশ দিনারেই বেচতে হবে। ইয়াদ রেখাে, কম বা বেশীতে বেচলে কিন্তু তােমার আর আমার মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে। আর এ-ও ভুলাে না, আমাদের শত্রু চারদিকে ছুঁড়ে বেড়াচ্ছে। তাই পর্দাটি অজানা অচেনা কোন খরিদ্দারের কাছে বেচো না যেন। এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments