আলিফ লায়লা পর্ব ৬৫ ( Alif Laila Part 65 ) Arabyarajani bangla

হাজার এক রাতের আলিফ লায়লা সহস্র এক আরব্য রজনী সম্পূর্ণ বাংলাতে পড়ুন । 

পরবর্তী অংশ ঃ 
–হুজুর, আমার হাতযশের বলে কাজ আমি ঠিকই হাসিল করব। কিন্তু ঝট করে এরকম কঠিন এক কাজ হাসিল করা সম্ভব নয়। মাস খানেক সময় আমাকে দিতেই হবে।
কয়েকদিন পর শয়তানী বুড়িটি আবার খুশ বাহার-এর বাড়ির দরওয়াজায় গিয়ে হাঁক দিল—“খােদা হাফেজ! খােদা মেহেরবান!’  খুশ বাহার এক গাল হেসে শয়তানী বুড়িকে অভ্যর্থনা করে ভেতরে নিয়ে গেল। আবার শুরু হ’ল তার ভণ্ডামী। নামাজ পড়া আর কোরাণ পাঠ শুরু হ’ল। আর সে সঙ্গে গুরুগম্ভীর ভাষণের মাধ্যমে উপদেশ তাে আছেই। বুড়ি প্রায় একমাস ধরে মাঝে-মধ্যেই এখানে হাজির হয়। দু'একদিন করে থেকে ভড়ং ভাড়ং করে বিদায় নেয়। একদিন শয়তানী বুড়ি তার কুমতলব সিদ্ধ করতে গিয়ে খুশ নাহার’কে একা পেয়ে বলল—‘বেটি, কুফা নগরীর সুবাদারের কথা কিছু শুনেছ? খুশ নাহার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

বুড়ি বলে চলল—‘বেটি, একী কথা। তােমার মত ধর্মপ্রাণা লেড়কি কুফার সুবাদারের কথা কিছুই শােনে নি? আরে তিনি যে আল্লাহর পয়গম্বর! এমন পুণ্যাত্মা সজ্জন তামাম দুনিয়ায় দ্বিতীয় আর একজন মিলবে না। আহা বড়ই পুণ্যাত্মা মহাপুরুষ। তাকে একবারটি চোখে দেখার জন্য কত মুলুক থেকে যে আদমিরা আসে তার ইয়ত্তা নেই। আর তােমরা কিনা তার নামই শােন নি। তাজ্জব ব্যাপার তাে!'
-তাই নাকি! আমরা এমনই পাপাত্মা যে এত কাছে থেকেও তার দর্শন পেলাম না! বড়ই শরমের ব্যাপার! ‘বেটি, তােমার দিল যদি চায় তবে আমি তার সঙ্গে তােমার ভেট করিয়ে দিতে পারি। যদি দিল চায় তবে চল, আজই। শয়তানী বুড়ির মুখের কথা শেষ হবার আগেই খুশ নাহার বলল—এমন সুযােগ হাতের মুঠোয় পেয়েও আমি কাজে লাগাতে পারছি না!'
–‘কেন বেটি ? তােমার দিল চাচ্ছে, অথচ যাবে না, কেন? —“আমার স্বামী এখন ঘরে নেই। তার মত বিনা তাে-’ 
—“তাতে কি আছে বেটি, তােমার শাশুড়ীকে বলে আমার সঙ্গে চল। তােমার স্বামী ঘরে ফেরার আগেই আমরা ফিরে আসতে পারব। যাবে, তাকে দর্শন করে ফিরে আসবে। মামুলি ব্যাপার। কতক্ষণ আর লাগবে বেটি।
খুশ নাহার শাশুড়ীর কাছে গিয়ে তার অভিলাষ ব্যক্ত করল।
তার শাশুড়ী আক্ষেপ করে বলল—‘বেটি এমন অপূর্ব সুযােগ পাওয়া সত্ত্বেও আমি তােমাকে পয়গম্বর দর্শনের অনুমতি দিতে পারছি না বলে কিছু মনে কোরাে না। খুশ বাহার ঘরে নেই। তাকে না বলে গেলে সে শুধু গােসসাই করবে না, দুঃখও পাবে। সে ফিরলে তার অনুমতি নিয়ে গিয়ে পয়গম্বর দর্শন করে এসাে। আর সে-ও যদি যেতে চায় তবে তাে কথাই নেই।
বুড়ি বলে-'সে কী, এমন সুযােগ সামান্য কারণে হাতছাড়া করবে। তােমার বেটা ঘরে ফেরার অনেক আগেই আমরা তাে ফিরেই আসছি।'
খুশ নাহার-এর অত্যুগ্র আগ্রহ ও বুডির কথার ওপর বিশ্বাস করে তার শাশুড়ী মত না দিয়ে পারল না।
বুড়ি খুশ নাহারকে সঙ্গে নিয়ে সুবাদারের বাগানবাড়িতে হাজির হয়। সুবাদার খুশ নাহারকে দেখে প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হয়ে যায়। আপন মনে বলে ওঠে, বেহেস্তের হুরীই বটে। ইয়া আল্লা! এমন সুরৎ কোন জনানার হতে পারে কল্পনাও যে করা যায় না! খােদা মেহেরবান!
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন।
                          দুশ’ একচল্লিশতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-‘জাহাপনা, খুশ নাহার কদর্য চেহারার সুবাদারকে দেখেই ব্যস্ত-হাতে নাকাবটি টেনে নিয়ে ভালভাবে মুখ ঢাকল।
খুশ নাহার অবাক হ’ল। বুড়িটি তার সঙ্গে নেই দেখেই তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। সে বুঝল হতচ্ছাড়ি বুড়িটি তাকে ধোঁকা দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। দু'চোখ বেয়ে পানির ধারা নেমে এল।
শয়তান সুবাদার-এর কলিজা ইতিমধ্যেই খুশীতে নাচানাচি দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে। চোখ দুটো হিংস্র শেরের মত জ্বলজ্বল করতে লাগল।
সুবাদার তাকে কিছু বলল না। কাগজ-কলম নিয়ে চিঠি লিখতে বসে গেল। খসখস্ করে খলিফা আবদ-অল মালিক ইবন সারবান’কে কয়েক ছত্রের একটি চিঠি লিখে ফেলল।।
সুবাদার এবার প্রহরীদের সর্দারকে ডেকে বলল—“আমি চিঠি লিখে দিয়েছি। এই নাও। এ-জনানাকে দামাস্কাসে খলিফার কাছে নিয়ে যাও। তাকে আমার চিঠিটি দিয়ে বলবে আমি তাকে এ ভেট পাঠিয়েছি।'
খলিফার প্রধান উজিরের হাতে চিঠি ও খুশ নাহার’কে জমা দিয়ে প্রহরীদের সর্দার কুফায় ফিরে এল।
খুশ নাহারকে খলিফার প্রাসাদের হারেমে পাঠিয়ে দেয়া হল।
খুশ নাহার কপালে হাত দিয়ে বসে নিরবচ্ছিন্নভাবে চোখের পানি ফেলে চলল
এক সময় খলিফা খােশ মেজাজে হারেমে এলেন। খলিফা আগে তার বহিন দাহিয়ার কাছে খুবসুরৎ লেড়কি খুশ নাহার সম্বন্ধে খবরাখবর নিলেন।
দাহিয়া খলিফাকে নিয়ে হারেমে খুশ নাহার-এর কামরায় এলেন। নাহার দেয়ালে হেলান দিয়ে হরদম চোখের পানি ফেলে চলেছে। দাহিয়া তার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বলল—‘বহিন, কাঁদছ কেন? পথে বুঝি খুব ধকল গেছে? তবিয়ৎ খারাপ?
খুশ নাহার ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলে, তার তবিয়ৎ খারাপ নয়। নসীবের কথা ভেবেই তার চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছে।
–নসীব? খুব খুশীতে মাঝে-মধ্যে চোখ দিয়ে পানি গড়ায়। তােমারও কি তা-ই। এত খুশী সহ্য করতে পারছ না?’
–না, তার ঠিক বিপরীত? আমার ঘর, আমার স্বামীর জন্য দুঃখে আমার কলিজা ফেঁটে যাচ্ছে।
–‘দুর পাগলী কাঁহিকার! কোথায় ছিলে আর এখন কোথায় এসেছ, জান? অবশ্যই জান না। জানলে বরং চোখের পানির পরিবর্তে খুশীতে ডগমগ হয়ে যেতে।
খুশ নাহার এবার অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতে চায়। সে বলল–বহিনজী, এনগরের নাম কি, বলুন তাে! ‘সে কী হে, এর নামও জান না? এ জায়গাটির নাম দামাসকাস। কেন হে, সওদাগর তােমাকে বলে দেয় নি, কোথায়, কার বাদী করে তােমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ? একী তাজ্জব কাণ্ড! তােমাকে তাে কিনে আনা হয়েছে খলিফার ভােগ-বিলাসের জন্য, জান না? এখন তােমার প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে, কি করে খলিফার মুখে হাসি ফোটাতে পারবে তার কোশিস করা। ভাল কথা, তােমার নামটিই শােনা হ’ল না। কি নাম তােমার ?
–‘খুশ নাহার।
তার কথা শেষ হতে না হতেই খলিফা অতর্কিতে ঘরে ঢােকেন। তাকে দেখেই নাহার ব্যস্ত হাতে নাকাবটি টেনে মুখ ঢাকল।
খলিফা সবিস্ময়ে বললেন –‘সে কী, আমি এলাম তােমার খুবসুরৎ মুখটি দেখতে। আর তুমি কি না নাকাব টেনে মুখ ঢাকছ ! একী তাজ্জব কাণ্ড? খুশ নাহার কিন্তু নাকাবটি সরাল না। উপরন্তু নাকাবটি টানাটানি করে সাধ্যমত আরও ভাল করে মুখ ঢাকল। শম্বুকের মত নিজেকে গুটিয়ে জড়ােসড়াে হয়ে দাঁড়াল।
খলিফা সরবে হেসে উঠলেন। দাহিয়া’কে বললেন-“তাজ্জব কাণ্ড দেখেছ দাহিয়া! এ তােমার হেফাজতে ক'দিন থাক। খুব করে তালিম দাও। কাজের যােগ্য করে তোল। এমন জড়ােসড়াে হয়ে সওদাগরের পুটুলি হয়ে থাকলে কাম কাজ কি করে চলবে, বল। 
খলিফা আর একটিবার বােরখায় ঢাকা নাহার-এর দিকে তাকালেন। লােলুপ তার দৃষ্টি। কিন্তু ধবধবে সাদা ও বেলনের মত নিটোল কবজি পর্যন্ত হাত দুটো ছাড়া কিছুই দেখতে পেলেন না। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। দাহিয়া হামামে গােসল করাতে নিয়ে নাহার-এর উলঙ্গ প্রায় দেহটি দেখে সচকিত হয়। আপন মনে বলে ওঠে—‘শােভন আল্লাহ! এ যে কলিজা কাপানাে সুরৎ! আশমানের বিজলী যেন জমিনে নেমে এসেছে। বেহেস্তের হুরী বুঝি আমার সামনে দাঁড়িয়ে। হায় আল্লা! কোন আদমির দেহে এমন সুরতের জৌলুষ থাকতে পারে চাক্ষুষ না করলে মালুম হবার নয়।
— হামাম থেকে ভাল করে গােসল করিয়ে সােনার জরি দেওয়া বহুমূল্য সাজ পােশাক নাহার কে পরিয়ে দেওয়া হ’ল। আর মণি মুক্তা খচিত গহনাপত্র পরানাে হল।
দাহিয়া যারপরনাই বিস্মিত হয়। একী তাজ্জব লেড়কি! এত দামী দামী গহনাপত্র পরেও মুখে হাসি ফুটল না। সেই আসার পর থেকে হাঁড়ির মত মুখ ব্যাজার করে বসে! নসীব ফিরলে সবাই খুশী। হয়। মুখে হাসির ঝিলিক ফোটে। আর এ-লেড়কির কিনা সে বােধটুকুও নেই! হায় খােদা! একী আজব লেড়কিকে পাঠালে! বহু মূল্য পােশাক ও অলঙ্কারাদি গায়ে চাপিয়ে খুশ নাহার ঘরের কোণে, দেওয়ালে পিঠ দিয়ে বসে বিড়ম্বিত নসীবের কথা ভাবতে থাকে। তার দিল থেকে এক মুহুর্তের জন্যও তার স্বামী খুশ বাহার’কে মুছে ফেলতে পারে না। সে খানাপিনাও বন্ধ করে দিল।
কয়েকদিন যেতে না যেতেই খুশ নাহার-এর রূপ-যৌবন শুকিয়ে পােড়া কাঠ হয়ে গেল। হাড্ডি সার! এবার এল জ্বর। বেদম জ্বর। দামাসকাস নগরের সেরা সেরা হেকিমদের তলব করা হল। তারা দাওয়াই দিল। ইলাজ করল কিন্তু হায় বিমারি সারল না।
এদিকে খুশ বাহার সন্ধ্যার কিছু পরে কাম কাজ সেরে ঘরে ফিরে এল। নাহারকে দেখতে না পেয়ে উতলা হ’ল। নাহার-এর নাম ধরে ডাকাডাকি করল। কিন্তু কোথাও পেল না।
শেষ পর্যন্ত উপায়ান্তর না দেখে খুশ বাহার তার আম্মার কাছে যায়। সে ঘরের কোণে বসে হরদম চোখের পানি ফেলে চলেছে। বেটাকে দেখে সে গলা ছেড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে বলল-“বেটা, নাহার সেবুড়ির সঙ্গে সুবাদার-এর কাছে গেছে। অনেক আগেই ফেরার কথা ছিল। কিন্তু এখনও ফিরছে না। বুড়ি ওয়াদা করে ছিল, তুই ঘরে ফেরার আগেই দিয়ে যাবে। কিন্তু এখনও ফিরছে না। তাজ্জব মানছি বেটা! যা, পাত্তা লাগা। খুশ বাহার উদ্ভ্রান্তের মত ছুটতে ছুটতে সুবাদারের মকানে হাজির হয়। তাকে সরাসরি প্রশ্ন করে—“আমার নাহার কোথায়, বলুন? এক বুড়ি তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আপনার কাছে নিয়ে এসেছে। কোথায় সে, জলদি বের করে দিন।
সুবাদার যেন একেবারে আশমান থেকে পড়ল। চোখ দুটো কপালে তুলে বলল—বুড়ি! নাহার? কে বুড়ি ? কে-ই বা তােমার নাহার? তাদের এখানে আসার কি দরকার?'
-ন্যাকামি ছাড়ুন মশাই। নাহার আমার বিবি। তাকে কোথায় রেখেছেন জলদি করে বলুন? আর বুড়িটিকে ভেবেছিলাম, ফকিরের ভাব নিয়ে আল্লাতাল্লার নাম করে দিন গুজরান করে। ইয়া মােটা কাপড়ের আলখাল্লা গায়ে, হাড্ডির মালা গলায় আর হাতে ইয়া পেল্লাই একটি চিমটা—সবদেখে আমরা মজে গিয়েছিলাম। শয়তানী বুড়ির ভণ্ডামী ধরতে না পারায় আমার নসীবে আগ লাগল। ভুলিয়ে ভালিয়ে আমার বিবিকে নিয়ে এল।
-শােন বেটা, তােমার আব্বা আমার জিগরী দোস্ত। আমি তােমার জন্য সাধ্যাতীত কোশিস করব, আমার ওপর আস্থা রাখতে পার। তােমার সঙ্গে ওই বুড়ির দেখা হলে আমার সামনে হাজির করবে, দেখবে কেমন আডং ধােলাই দেই। আর বেটা, তােমার বিবির জন্য ঘাবড়াবে না, আমি তাকে খুঁজে বের করার কোশিস অবশ্যই করব।
খুশ বাহার সুবাদারের কাছ থেকে মিথ্যা আশ্বাস পেয়ে কোতােয়ালের কাছে যায়। তার কাছে নালিশ করে, এক ভণ্ড বুড়ি আমার বিবিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে।
কোতােয়াল গোঁফে তা দিতে দিতে বলল— আচ্ছা পুরুষ মানুষ তাে তুমি! তােমার স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে আর তুমি তার কিছু করতে পারলে না? আমার কাছে নাকে কাঁদতে এসেছ? ঠিক আছে, বল তাে, কোন পথে নিয়ে গেছে!’ 
–আমি ঘরে ছিলাম না। বুড়ি আমার আম্মাকে বলে গেছে সুবাদারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি। এ ছাড়া নিশানা বলা তাে আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
– বহুৎ আচ্ছা বাৎ! তুমি যদি না জান তবে আমিই বা কি করে জানব। যত্তসব! বাজে ঝামেলা কোরাে না। আমার কাজ আছে পাতলা হও দেখি। খুশ বাহার আবার সুবাদারের কাছে ফিরে আসে। কোতােয়ালের বিরুদ্ধে অভিযােগ করে।
সুবাদার কৃত্রিম উষ্মা প্রকাশ করে খুব হম্বিতম্বি জুড়ে দিল। কোতােয়ালকে হাতের কাছে পেলে যেন এক্ষণি কোতল করবে, নয় তাে শূলে চড়াবে। এক সিপাহীকে পাঠিয়ে কোতােয়ালকে তলব দিল। কোতােয়াল এবার হন্তদন্ত হয়ে পড়ি কি মরি অবস্থায় সুবাদারের দরবারে হাজির হ’ল। কুর্নিশ সেরে জড়ােসড়াে হয়ে দাঁড়াল।
সুবাদার বাজখাই গলায় গর্জে উঠল—“তুমি ভেবেছ কি হে! আমার এলাকায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বা রাহাজানি যা-ই হােক কেন সব দায়িত্ব তােমার ওপর বর্তাবে। আর বেচারার বিবিকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে, তােমার কাছে নালিশ করতে গেছে। আর তুমি কিনা তাকে ভাগিয়ে দিলে! তাজ্জব ব্যাপার! যেখান থেকে পার, যেমন করে হোক এর বিবির তল্লাস করে বের করে দিতে হবে। আমার তল্লাটে এরকম শয়তানী বরদাস্ত করব না। তবে যদি ইতিমধ্যে নগর ছেড়ে চলে যায় তবে অবশ্য তােমার কোন কসুর হবে না। নইলে তােমার গর্দান যাবে, বলে রাখছি। 
সুবাদারের কথায় কোতােয়াল একেবারে আশমান থেকে পড়ল। – কুঁচকে, কপালের চামড়ায় ভাঁজ এঁকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল। এমন সময় সুবাদার তাকে চোখ মারল।
তাকে বুঝাতে চাইল, বিচার প্রার্থীর সামনে একটু হম্বিতম্বি না করলে নিজেরও সম্মান থাকে না। আর বিচার প্রার্থীও আস্থা হারিয়ে ফেলে। কোতােয়ালের সঙ্গে সাঁট করেই তাে সুবাদার বুড়ি আর খশ নাহার'কে দামাস্কাসে চালান করেছে। আর তাকেই যদি শলে চড়াতে যাওয়া হয় বিভ্রাটের সৃষ্টি তাে হবেই। কোতােয়াল এবার গা-ঝাড়া দিয়ে বলে-“হুজুর, আপনি আমার ওপর আস্থা রাখতে পারেন। এর বিবি যদি এ তল্লাটে থাকে তবে খুঁজে তাকে বের করবই। আর যদি অন্য মুলুকে চালান হয়ে যায় তবে তাে-'
তাকে কথাটি শেষ করতে না দিয়েই সুবাদার বলতে লাগল—“অন্য মুলুকে, আমাদের সীমানার বাইরে চলে গেলে তােমার কসুর মাফ করে দেয়া হবে। এবার খুশ বাহার-এর উদ্দেশ্যে বলল—‘বেটা, ঘরে যাও। আমরা দেখছি তােমার বিবিকে কি করে খুঁজে বের করা যায়। তােমার নসীব ভাল থাকলে বিবিকে ফিন তােমার বুকে পাবেই।
এমন সময় রাত্রি অবসান হ’ল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
                      দুশ’ বিয়াল্লিশতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন –জাঁহাপনা, খুশ বাহার সুবাদার ও কোতােয়ালের কাছ থেকে মিথ্যা আশ্বাস পেয়ে নসীব সম্বল করে ঘরে ফিরে এল। কিছুতেই অশান্ত দিলকে সে শান্ত করতে পারল না । বিষন্ন মনে বিছানা আশ্রয় করল। দুদিন বাদে তার জ্বর এল। হাড্ডি কাঁপানাে জ্বর। হেকিম ডাকা হ’ল। দাওয়াই দিল বটে, কিন্তু হেকিম ফিরে যাবার সময় চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে গেল-এর বিবি ঘরে না ফিরলে বিমারি কিছুতেই সারবে না। কোন হেকিমবদ্যি এর ইলাজ করে বিমারি সারাতে পারবে না।
এক দিন এক পারসী-বুড়াে কুফা নগরে এল। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র ও রসায়ন বিদ্যায় পারদর্শী। বণিক খবর পেয়ে লেড়কার ইলাজ করাতে তাকে নিয়ে এল। বণিক পারসী-বুড়াের হাত দুটো ধরে অনুরােধ করল ভাল করে ইলাজ করে লেড়কাকে সারিয়ে তোেলার জন্য। তাকে ইনাম দিয়ে খুশী করে দেবে আল্লাহর নামে কসম খেল। প্রয়ােজনে তার বাড়িঘর—যথাসর্বস্ব তাকে দিয়ে দিতেও কুণ্ঠিত হবে না। আয়ুর্বেদশাস্ত্রজ্ঞ পারসী-বুড়াে কিছুই বলল না। কেবল ঠোঁট টিপে হাসল। রােগীর নাড়ী পরীক্ষা করল। জিভ দেখল, চোখ দেখে শরীরের খুনের পরিমাণ নির্ধারণ করার চেষ্টা করল। তারপর এক সময় ম্লান হেসে বলল-“সওদাগর সাহাব, এর বিমারি তাে শরীরে নয়, বিমারি ধরেছে দিলে। বহুৎ আচ্ছা, আমি গণনা করে জেনে নিচ্ছি এর আপনজন কোথায় আছে।
পারসী-বুড়াে এবার মেঝেতে কিছু সাদা বালি ছড়িয়ে দিল। তার ওপর সাজিয়ে দিল পাঁচটি শ্বেত পাথরের নুড়ি, তিনটি কালাে পাথরের নুড়ি, দু’খানি কাঠি আর মাঝখানে একটি শেরের মুণ্ডু। এবার বিড়বিড় করে কি সব মন্ত্র আওড়াল। তারপর বলল—শুনুন, সওদাগর সাহাব, আপনার লেড়কা যার শােকে কাতর তাকে দামাস্কাস-এ সুলতানের হারেমে মিলবে। তার হালৎ-ও ভাল নয়। দীর্ঘদিন বিমারিতে বিছানা নিয়েছে। সওদাগর কান্নায় ভেঙে পড়ে। পারসী বুড়াের হাতে-পায়ে ধরে বহুৎ চোখের পানি ঝরাল। পারসী-বুড়াে তাকে প্রবােধ দিতে গিয়ে বলল—“ধৈর্য ধরতেই হবে। তবে আমি আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলছি, এদের মােলাকাৎ আমি করে দিতে পারবই। আপনাকে যথাসর্বস্ব দিতে হবে না। আমাকে এখন খরচ খরচা বাবদ মাত্র পাঁচ হাজার সােনার দিনার দিন। বিমারি সারলে আপনার বেটা বিবিকে ফিরে পেলে আপনার দিল্ যা চায় আমাকে ইনাম দেবেন।” পারসী-বুড়াে বণিকের কাছ থেকে পাঁচ হাজার সােনার দিনার বুঝে পেয়ে খুশ বাহার’কে বলল—‘বেটা, তােমাকে যে আমার সঙ্গে দামাস্কাসে যেতে হচ্ছে। কদিন বাদে একেবারে তােমার বিবিকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসবে।
খুশ বাহার পারসী বুড়াের দাওয়াই খেয়ে ক’দিনের মধ্যেই শরীরটিকে একটু চাঙা করে নিল। পারসী বুড়াে এবার খুশ বাহার’কে নিয়ে দামাস্কাসের পথে পা বাড়াল।
দামাস্কাসে পৌছে পারসী-বুড়াে একটি ছােট কামরা ভাড়া করল। সেখানে একটি মনােহারী দোকান সাজাল। কামরার আর একদিকে কিছু হেকিমি দাওয়াই পত্রও রাখল।

পারসী-বুড়াে নিজেকে বিশেষ সাজে সাজিয়ে নিল। মাথায় আজব কায়দায় একটি পাগড়ীও বেঁধে নিল। আর খুশ বাহারকে ( চলবে ) ...। 

Post a Comment

0 Comments