Alif laila Part 55 আলিফ লায়লা পার্ট ৫৫

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
এবার নিজেকে সামলে সুমলে নাও। ফালতু ধান্দা ছাড় ।'
'দোস্ত তােমার সৎ পরামর্শের জন্য বহুৎ সুকরিয়া। কিন্তু সবকিছুর পরও আমাকে বলতেই হচ্ছে, আমার মেহবুবা সামস অল কে ছাড়া আমার জান জিন্দা থাকবে না। জিন্দেগী বরবাদ হয়ে যাবে। তাকে ছাড়া আমার জিন্দা থাকা সম্ভব নয়, থেকে লাভই বা কি?
আবুল হাসান বুঝল আলী ইবন-এর দিল যেখানে পৌঁছেছে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনার কৌশিস বৃথা। আর উপদেশ বিলকুল ভস্মে ঘি ঢালার সামিল। সে মুখে কুলুপ এঁটে তার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এল। পরদিন সন্ধ্যার আগে আলী ইবন-এর অভিন্নহৃদয় দোস্ত আমিন ছুটতে ছুটতে এসে তাকে জানাল আবুল হাসান তার দোকান পাট বন্ধ করে সপরিবারে বসরাতে পালিয়েছে। পরে এক সময় এসে দোকান বন্ধ করে বিলকুল ঝামেলা মিটিয়ে যাবে। আমিন সমবেদনার স্বরে বললে-দোস্ত ঘাবড়াও মাত। আমি তােমার পাশে আছি। আমার তাে কোন পিছুটানই নেই। অতএব খলিফা বা সুলতান যদি আমাকে কোতলও করে তবু আমার জন্য শােক তাপ করার কেউ-ই থাকবে না। তাই খােদাতাল্লার মর্জিতে জিগরী দোস্তের জন্য কিছু করতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য জ্ঞান করব।'

আলী ইবন ম্লান হাসল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল —“তুমি কোশিসের কসুর রাখবে না আমি জানি। তবু আবুল হাসান ছিল খলিফার পেয়ারের আদমি। তার পক্ষে যেটুকু সম্ভব তুমি শত কোশিস করেও তা পারবে কেন, বল তাে? তােমার পক্ষে তাে খলিফার মহলে ঢােকাই সবচেয়ে বড় সমস্যা দোস্ত।

‘ধৎ, এ আবার আমার কাছে সমস্যা নাকি। তােমার হয়ত মালুম নেই, আমি হীরা-জহরত-এর কারবার করি। হারেমের বেগমদের কাছে বহুবার হরকিসিমের পাথর বেচেছি। কখন খােজারা বেগম বাদীদের দ্বারা আদিষ্ট হয়ে ডেকে প্রাসাদে নিয়ে যায়। আবার কখনও বা নতুন কোন পাথর আমদানি হলে আমি নিজেই খলিফার মহলে যাই। আর আমি তাে প্রধান ফটকের রক্ষীর খুব পেয়ারের আদমি বনে গেছি।

তার কথায় আলী ইবন-এর কলিজায় যেন পানি এল।

এমন সময় সদর-দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হ’ল। দরজা খুলতেই এক লেড়কি কামরায় ঢুকে জানায় বেগম সামস অল নাহার খুবই অসুস্থ। আলীর দীর্ঘ অদর্শনে কাতর। তাকে একবারটি চোখের দেখা না দেখে তার পক্ষে জান রক্ষা একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু কি করে তা সম্ভব? কোথায় তাদের মােলাকাৎ হতে পারে। খলিফার প্রাসাদে ? অসম্ভব। তবে? আমিনই মুশকিল আসান করে দিল। তার ছােটখাট এক বাগান বাড়ি আছে। আলী চাইলে সে তাদের ব্যবহারের জন্য বাড়িটির চাবি দিতে পারে।

আলী যেন আশমানের চাদ হাতে পেল। সে এবার সামস অলনাহার-এর প্রেরিত লেড়কিটিকে সব বুঝিয়ে বলল এবং আমিন এর বাগান বাড়ির ঠিকানা বাতলে দিল।

পরদিন লেড়কিটি ফিন এল। মালকিন আমিন’কে তার প্রাসাদে নিয়ে যেতে বলেছে, বলল ।

তার কথায় আমিন যেন আসমান থেকে পড়ল। ফুটা বেলুনের মত অকস্মাৎ চিপসে গেল। মুহূর্তে চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠল। বার কয়েক ঢােক গিলে আমতা আমতা করে বলল —“আমি? প্রাসাদে ? আমি প্রাসাদে যাব? আমাকে দেখলেই তার প্রহরায় নিযুক্ত খোজাদের সন্দেহ হবে। ব্যাপারটি খলিফার নজরে আনবে। তারপর আমার নসীবে কি জুটবে, তােমরা অনুমান করতে না পারলেও আমি তসবির দেখার মত স্পষ্ট দেখতে পচ্ছি। তার চেয়ে বরং তুমি গিয়ে তাকে আবারও সালাম জানিয়ে বল তিনি যেন আমার বাগান বাড়িতে এসে মেহবুব আলী ইবন-এর সঙ্গে মােকাবেলা করে।

লেড়কিটি প্রাসাদে ফিরে বেগম সামস অল-নাহার’কে আমিনএর অভিপ্রায়ের কথা জানাল।

সামস অল-নাহার সন্ধ্যার কিছু আগে গায়ে অতি সাধারণ একটি বােরখা চাপিয়ে বেরােল। যােগাযােগ রক্ষাকারিণী লেড়কিটির সঙ্গে আমিন-এর বাগান বাড়িতে হাজির হল।

আমিন সদর-দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে সামস অল-নাহারকে ভেতরে আসার জন্য অভ্যর্থনা জানাল।

সামস অল-নাহার এর নাকাবের ফাক দিয়ে তার মুচকি হাসির রেখাটুকু দেখতে অসুবিধা হল না। সে সঙ্গে তার রূপের জালুসটুকুও তার নজর এড়াল না। নাকাব-এর মিহি জাল ভেদ করে তার দৃষ্টি সামস অল-নাহার-এর মুখের ওপর স্থির নিবদ্ধ হল।

সামস অল-নাহার প্রথম মুখ খুলল—আচ্ছা, আপনিই কি আমিন?

-হ্যা, এ অধমের নামই আমিন। 

-“কিছু মনে করবেন না, একটি কথা জিজ্ঞেস করছি। আপনি কি শাদী করেছেন? কে কে আছেন আপনার?

–না শাদী করিনি। আর আমার আপনার বলতে তামাম দুনিয়ায় কেউ-ই নেই। আব্বা, আম্মা, ভাইয়া বা বহিন কেউই নেই।

আমিন এবার একটি সুসজ্জিত কামরায় সামস অল-নাহারকে নিয়ে গিয়ে পালঙ্কের ওপর বসতে দিল। তারপর বলল —“আমি আলী ইবন’কে নিয়ে এখনই ফিরে আসছি। যাব আর আসব।' কথা বলতে বলতে আমিন কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

মিনিট দু-তিন বাদে আলী ইবন একা কামরায় ঢুকল। বেশ কিছুদিন বাদে উভয়ের মােলাকাৎ হ’ল। সামস অল-নাহার আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। উন্মাদিনীর মত ঝাপিয়ে পড়ল আলী ইবন-এর বুকের ওপর। রাত্রি একটু গভীর হলে সামস অলনাহার তার রক্ষী লেড়কিকে প্রয়ােজনীয় নির্দেশাদি দিয়ে প্রাসাদে পাঠিয়ে দিল।

খানাপিনার পাট চুকলে আমিনও তার দোস্ত আলী ইবন আর সামস অল-নাহার-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের বাসস্থানে ফিরে গেল।

আমিন-এর বাগান বাড়িটিতে রইল দুই মেহবুব আর মেহবুবা। আলী ইবন সাধ্যমত কম শব্দ করে দরওয়াজাটি বন্ধ করে দিল। নিঝুম-নিস্তব্ধ বাড়িটিতে দু’টি মাত্র প্রাণী মহব্বতের জোয়ারে ভেসে চলল যেন কোন্ অজানা-অচেনা-অদেখা মুলুকের উদ্দেশ্যে। ভাের হ’ল। বাড়িটির সামনে পাড়া ও বে-পাড়ার আদমির ভিড জমে গেল। সবার মুখেই এক বাত। আমিন-এর খালি বাগান বাড়িতে কাল রাত্রে ডাকাতি হয়ে গেছে। এক মাঝবয়সী আদমি চিল্লিয়ে বলতে লাগল—কাল মাঝরাত্রে একদল ডাকু এসে বাড়ির সমানপত্র যা ছিল সব নিয়ে ভেগেছে। সে সঙ্গে আমিন-এর দু’ মেহমান ছিল তাদেরও মুখ বেঁধে নিয়ে কেটে পড়েছে।

অভাবনীয় খবরটি পাওয়ামাত্র বাড়ির মালিক আমিন ছুটে এল। সব কিছু শুনে সে তাে রীতিমত স্তম্ভিত। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। হঠাৎ ভিড় ঠেলে এক মাঝবয়সী লােক এগিয়ে এসে বলল —“তুমি কি তােমার মেহমানদের পাত্তা জানতে চাও? যদি আগ্রহী হও তবে আমার সঙ্গে এসাে, বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি।'

আমিন যেন তামাম আশমানটিকে হঠাৎ হাতের মুঠোয় পেয়ে গেল। মুহর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে অজ্ঞাতপরিচয় আদমিটিকে অনুসরণ করল। সে আদমি তাকে নিয়ে টাইগ্রিস নদী পার হ'ল। এবার গলি-পথে হাঁটতে লাগল। এ-গলি ও-গলি ডিঙিয়ে এক বেশ বড়সড় মকানের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মকানটি ভাঙা চোরা। কেউ থাকে না এখানে।

প্রধান ফটকে আঙুলের সাহায্যে সঙ্কেত-ধ্বনি করতেই ফটক খুলে গেল। আমিনকে নিয়ে ষণ্ডামার্কা আদমিটি ভেতরে ঢুকল। তাকে নিয়ে সে একটি বড়সড় কামরায় গেল। দশ-বারােজন ইয়া দশাসই চেহারার আদমি গােল হয়ে বসে খানাপিনা করছে। আমিন-এর চোখের মণি দুটো চঞ্চল। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে সব কিছু দেখতে লাগল। দেয়ালে বিভিন্ন রকম অস্ত্রপাতি ঝুলছে। সবকিছু দেখে সে নিঃসন্দেহ হ'ল, ডাকুদের আড্ডায় এসে পড়েছে। যে গাট্টাগােট্টা আদমিটি আমিনকে এখানে এনে ফেলেছে সে ইয়া মােটা গোঁফ জোড়ার ফাঁক দিয়ে মৃদু হেসে বল্ল--এবার নিশ্চয়ই তােমার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, আমরাই তােমার মেহমানদের ছিনতাই করে নিয়ে এসেছি।

আমিন চমকে উঠে বলে—“আমার মেহমানরা কি জিন্দা-'

–হ্যা, জিন্দাই আছে। জানে খতম করি নি। আমার কথায় ভরসা রাখতে পার। তারা খলিফার ইমারত থেকেও আচ্ছা বহাল তবিয়তেই আছে।

আমিন-এর চোখ থেকে আতঙ্কের ছাপটুকু তখনও মিলিয়ে যায় নি। সে-ডাকুটি এবার বলল —“আমার দলের আদমিদের খানাপিনা মিটে যাক। তারপর তাদের সঙ্গে তােমার মােলাকাৎ করিয়ে দেব। কিন্তু ইয়াদ থাকে যেন, যা বলবে সাচ বাৎ বলবে, ঝুটা বাতের ধারকাছ দিয়েও যাবে না। যদি ঝুটা কিছু বল তবে আখেরে খারাপ হবে । 

আমিন এবার ডাকুটির কাছে আলী ইবন এবং সামস অল নাহার-এর বৃত্তান্ত খােলসা করে বলল। তিলমাত্রও গােপন করল না।

তার কথা শেষ হতে না হতেই সুলতানের কোতােয়াল সে ঘরে ঢুকল। তার গায়ের পােশাক আশাকই তার প্রমাণ দিচ্ছে।

কোতােয়াল বজ্র গম্ভীর স্বরে উচ্চারণ করল—“আমি এতক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে পাশের ঘরে অবস্থান করছিলাম। তােমার কথাবার্তা সবই শুনেছি। মুখে বিদ্রুপের হাসি ফুটিয়ে তুলে এবার বলল-“আশা করি এবার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, আমরা সুলতানের বেতনভােগী কর্মচারী। একটি বাৎ শুনে রাখ, আল্লাহর চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেও খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর চোখে ধুলাে দেয়া সম্ভব নয়।

আরও খেয়াল রাখবে, খলিফার সঙ্গে বেইমানী করে আজ পর্যন্ত কেউ রেহাই পায় নি, তােমার জিগরী দোস্তও নয়।

ঘটনার নিষ্পত্তি অতি অল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে গেল। খলিফার নির্দেশে সামস অল-নাহারকে প্রাসাদে পাঠিয়ে দেওয়া হল। আর তার মেহবুব আলী ইবন বকর ? তার প্রাপ্যও তাকে চুকিয়ে দেওয়া হ’ল। ঘাতকের হাতে তুলে দেওয়া হ’ল তাকে। এক কোপে তার ধড় থেকে গর্দানটি নামিয়ে দেওয়া হল।

সব ঘটনা শেষ হয়েও যেন শেষ হতে চায় না। যেন শেষ থেকে আবার নতুনতর ঘটনার সূত্রপাত হয়।

সেরাত্রেই খলিফা হারুণ-অল-রসিদ সামস অল-নাহার-এর কামরায় গেলেন। তাকে আদরে-সােহাগে অভিভূত করে দিয়ে বললেন—‘পেয়ারী, তুমি হয়ত আমার মহব্বতের ওপর ঠিক আস্থা রাখতে পারছ না। ভাব, আমার মহব্বতে আসলের চেয়ে খাদই বেশী। আসলে কিন্তু সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা তুমি পােষণ কর। তুমি আমার জান, আমার কলিজার চেয়েও বেশী।  খলিফার কাছ থেকে আশাতীত আদর সােহাগ পেয়ে সামস অল-নাহার যেন আহ্বাদে একেবারে অভিভূত হয়ে পড়ল। তার কোলে নিজেকে সঁপে দিয়ে পরম শান্তিতে খলিফার কোলের ওপর এলিয়ে পড়ল। ক্রমে তার দেহে বিষক্রিয়া শুরু হ’ল। তার মুখ—সর্বাঙ্গ নীল হয়ে এল।

বেগম শাহরাজাদ কিস্সাটি শেষ করতে না করতেই ভাের হয়ে এল। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

          একশ’ সত্তরতম রজনী 

শাহরাজাদ কামার অল-জামান আর শাহজাদী বদরের মহব্বতের কিসসা 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম এবার সম্পূর্ণ নতুন স্বাদের এক কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, এবার শাহজাদা কামার অলজামান আর শাহজাদী বদর-এর মহব্বতের কিসসা শুরু করছি। শুনুন জাহাপনা, কোন এক সময়ে শাহরিমান নামে এক বাদশাহ রাজত্ব করতেন। তার রাজ্যের নাম ছিল খালিদান। তার সমসাময়িক কালে তার মত প্রতাপশালী বাদশাহ তামাম আরব দুনিয়াতে কেউ-ই ছিলেন না। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন ছিল তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বিলাসব্যসনের প্রতিও যে তার প্রবণতা ছিল না এরকম কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। তার হারেম আলাে করেছিল চার চারটি বেগম আর সত্তরটি খুবসুরৎ রক্ষিতা। কামতৃষ্ণা নিবৃত্তির ঢালাও বন্দোবস্ত থাকলেও তার দিলে কিন্তু পুরােদস্তুর সুখ শান্তি ছিল না। তবু যেন শূন্যতা, হতাশা আর হাহাকার তার বুক জুড়ে ছিল। কিসের এ-অভাব? কিসের এশূন্যতা? তার পরিতাপের একমাত্র কারণ, তার কোন বালবাচ্চা হয় নি। নিঃসন্তান। সিংহাসনের উত্তরাধিকারী কে হবে এ ভাবনাতেই তার দিল সর্বদা বিষিয়ে থাকে। বিষাদের প্রতিমূর্তি সুলতান শাহরিমান একদিন তার প্রধান উজিরকে তলব করলেন। সুলতানের তলব পেয়ে বৃদ্ধ উজির হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন।

সুলতান চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—শােন, আমার খ্যাতি প্রতিপত্তি সবই আছে। কিন্তু দিলে সুখ-শান্তি নেই। আল্লাতাল্লা আমাকে কেন বালবাচ্চা থেকে বঞ্চিত করলেন, বলতে পার?'

—জাহাপনা, ব্যাপারটি খুবই পরিতাপের, সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনার সন্তানহীনতার দুঃখ তাে কেবলমাত্র একা আপনাকে ব্যথিত মর্মাহত করছে না, তামাম সুলতানিয়তের অধিবাসীরা আল্লাতাল্লার কাছে প্রার্থনা করছে, যাতে আপনি এক লেড়কা, মসনদের উত্তরাধিকারী লাভ করেন। মুহূর্তকাল নীরবতার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে বৃদ্ধ উজির বললেন-“জাহাপনা, ব্যাপারটি আমাদের কাছে যতই পরিতাপের হােক না কেন এর সুরাহা কিন্তু একমাত্র আল্লাতাল্লার পক্ষেই করা সম্ভব। অতএব তাকে মনে-প্রাণে স্মরণ করুন। তিনি অবশ্যই মুখ তুলে তাকাবেন, আপনাকে দোয়া করবেন।'

—“তােমার কথা আমি অক্ষরে অক্ষরে-” সুলতানের মুখের বাৎ কেড়ে নিয়ে বৃদ্ধ এবার বললেন ‘জাহাপনা আর একটি বাৎ খেয়াল রাখবেন—“আজ রাত্রে যখন হরেমে যাবেন তখন ভাল করে রুজু করে, সশ্রদ্ধ অন্তরে নামাজ পড়বেন। তারপর শান্ত-শুদ্ধ মন নিয়ে হারেমে ঢুকবেন। হারেমে ঢুকে বেগম সাহেবার সঙ্গে সহবাস করার পূর্ব মুহুর্তে আল্লাহকে কাতর মিনতি জানাবেন—আজকের সহবাসের ফলস্বরূপ আপনি যেন একটি পুত্র সন্তান লাভ করেন।

বৃদ্ধ উজিরের পরামর্শটি সুলতান শাহরিমান-এর খুবই দিলে ধরল। তিনি উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বলে উঠলেন—চমৎকার! চমৎকার পরামর্শ দিয়েছ উজির! তিনি পুরস্কারস্বরূপ উজিরকে মুল্যবান পােশাক পরিচ্ছদ উপহার দিয়ে খুশী করলেন। সন্ধ্যার কিছু পরেই সুলতান হারেমে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলেন।

সুলতান একজন মনের মত খুবসুরৎ রক্ষিতাকে নির্বাচন করলেন। খোজাকে দিয়ে খবর পাঠালেন, তার ঘরেই আজ তিনি রাত্রি যাপন করবেন।

বাদশাহ সহবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন সংবাদ পেয়ে সৌভাগ্যবতী সে-রক্ষিতাটি মনমৌজী সাজগােজ করার জন্য উঠে পড়ে লেগে গেল।

সুলতান এবার বৃদ্ধ উজিরের পরামর্শ মাফিক নিজে ভাল করে রুজু সেরে শুদ্ধ পােশাক আশাক পরলেন। পবিত্র মন নিয়ে নামাজ পড়লেন। নামাজান্তে করজোড়ে আল্লাতাল্লার কাছে প্রার্থনা জানালেন, আজকের সহবাসের ফল স্বরূপ তিনি যেন এক পুত্র সন্তান লাভ করেন।

এবার পবিত্র দিল নিয়ে সুলতান পূর্বনির্ধারিত রক্ষিতার কামরায় প্রবেশ করলেন। দশ মাস পরে তার এক খুবসুরৎ লেড়কা পয়দা হ'ল। সুলতান শাহরিমানের-মুখে হাসি ফুটে উঠল। তার সুলতানিয়তের প্রজারা একমাস ধরে বাজী পােড়াল, নাচা-গানা করল আরও বহুভাবে উল্লাস প্রকাশ করল।

সুলতান শাহরিমান লেড়কার নামকরণ করলেন কামার অল জামান। আর তার দীর্ঘায়ু কামনা করে আল্লাহর কাছে মােনাজাত করলেন। তার এতদিনের বাসনা আজ পূর্ণ হল কম কথা। সুলতান শাহরিমান লেড়কাকে পেয়ে দুনিয়ার আর সব কিছু ভুলে গেলেন। তার দিনের একটি বড় ভগ্নাংশই কাটে শিশুকে নিয়ে।

দেখতে দেখতে কামার অল-জামান নওজোয়ান হয়ে উঠল। সুলতান শাহরিমান লেড়কার শাদীর কথা ভাবলেন। বৃদ্ধ উজিরকে ডেকে পরামর্শ করলেন।

সুলতান শাহরিমান এবার লেড়কাকে তলব করলেন। কামার অল-জামান এসে আব্বাজীকে কুর্ণিশ করে নতমুখে সামনে দাঁড়াল। মিষ্টি-মধুর স্বরে উচ্চারণ করল–আব্বাজী, আমাকে তলব করেছেন? বলুন, আমার প্রতি আপনার কি নির্দেশ ?

কিসসার এ পর্যন্ত বলার পর বেগম শাহরাজাদ বুঝলেন, ভাের হতে আর দেরী নেই। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

        একশ একাত্তরতম রজনী

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর পড়তে না পড়তেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কোনরকম ভূমিকার অবতারণা না করেই কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, শাহজাদা কামার অল-জামান তার আব্বাজানের আদেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল। সুলতান শাহরিমান বললেন—“বেটা, আমার ওমর ক্রমে বেড়েই চলেছে। আর বেশী দিন নেই। আল্লাতাল্লা কাছে টেনে নিলেন বলে। আমার দিল চাইছে, তােমাকে শাদী দিয়ে সংসারী করে দিয়ে যাই।

শাহজাদা কামার অল-জামান সবিস্ময়ে সুলতানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—“আব্বাজান, এখনই শাদী করতে আমার দিল চাইছে না। স্বীকার করছি, শাদীর প্রয়ােজন আছে জীবনে আউরতও চাই-ই। কিন্তু এখনও তাে আমি আউরতের অভাব বােধ করছি না। তাদের সম্বন্ধে আমার কোনই আকর্ষণ নেই, কোনরকম কৌতুহলও আমার মধ্যে মুহুর্তের জন্য উঁকি দেয় নি।

-শাদী হলে বিলকুল ঠিক হয়ে যাবে বেটা।

–না আব্বাজী। এ অবস্থায় শাদী করলে বিবির সঙ্গে আমার সম্পর্ক মধুর না-ও হতে পারে। অতএব আপনার দরবারে আমার একটিই আর্জি, শাদী করার আগে আমার দিলকে বিলকুল তৈরি করে নেওয়ার সুযােগ দিন।

সুলতান শাহরিমান এত সহজে দমবার পাত্র নন। তিনি লেড়কার দিলকে নরম করতে গিয়ে বললেন—“বেটা, তােমার লিখা পড়া সাঙ্গ হয়েছে। গায়ে গতরেও তুমি নওজোয়ান হয়ে উঠেছ। অতএব তােমার শাদীর ওমর হয়েছে বলেই আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু তুমি একী তাজ্জব বাৎ শােনালে—লেড়কিদের সম্বন্ধে তােমার ভেতরে কোন আকর্ষণ বা কৌতুহল কিছুই পায়দা হয় নি? তবে কি—তবে কি তােমার শরীরে এমন কোন খুঁত রয়েছে! সুলতান কথাটি আর শেষ করতে পারলেন না। শরমে বাধল। কোন অদৃশ্য শক্তি যেন সজোরে তার মুখ চেপে ধরল।

শাহজাদা তার আব্বার কথা বুঝতে পেরে মাথা নীচু করে নিশ্চল-নিথর পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইল।

প্রবীণ-অভিজ্ঞ সুলতানের বুঝতে অসুবিধা হ’লনা, শাহজাদা কি যেন বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছুতেই তা মুখফুটে আব্বাজানের কাছে বলতে পারছে না। এক সময় জামান অনন্যোপায় হয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হ'ল। সে আমতা আমতা করে বলল—“আব্বাজান, আপনার অনুমান অভ্রান্ত। কিন্তু কদিন ধরেই একটি বাৎ বলব বলব করে আপনাকে বলতে মুখে বাঁধছে। আমি নানা শাস্ত্র পাঠ করেছি। হরেক কিসিমের কিতাবেও লেড়কিদের বিশ্বাসঘাতকতার কিসসা পড়েছি। তারা পুরুষদের সঙ্গে নানা ছল চাতুরির মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতকতা করে থাকে। যৌবনের জোয়ার লাগা দেহ, আর সুরতকে মুলধন করে তারা পুরুষের জিন্দেগী বরবাদ করে দেয়। তাই কোন লেড়কিকেই কেউ সুনজরে দেখে না। আর যদি কোন লেড়কি নষ্টামি করবে মন করে তবে তাকে খাঁচায় আটক করে রাখলেও পরপুরুষকে দেহদান করবেই। আব্বাজান আমার কসুর নেবেন না। যে বাৎ আপনাকে বললাম তা কিন্তু আমি বানিয়ে বলছি না। আমাদের পীর-পয়গম্বরদের বাণীই আমার মুখ দিয়ে প্রকাশ করলাম। তাই আপনার দরবারে আমার একমাত্র আর্জি, শাদীর জন্য আমার ওপর জুলুম করবেন না। তারপরও যদি শাদীর নাম করে কোন লেড়কিকে আমার গলায় লটকে দেন তবে তার পরিণাম অবশ্যই বাঞ্ছনীয় হবে না। চিরদিনের জন্য আমাকে হারাতে হবে, মনে রাখবেন।'

লেড়কার বাৎ শুনে সুলতান শাহরিমান চমকে যান।–“ছিঃ ছিঃ ! বেটা, এরকম কোন কিছু তাে আমি করতে চাইছিনা। তােমার যখন আপত্তি তখন আমি তাে জুলুম করছি না। কেনই বা জুলুম করব? যাকে তুমি শাদী করবে সে তােমার জিন্দেগীভরের জন্য সঙ্গী হবে। তােমার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সুখ-দুঃখের ভাগীদার হবে। আর সেখানে যদি কারাে বিশ্বাসে ফাঁক থাকে তবে তাতে মধু নিঃসরণ না ঘটে জহরই পয়দা হবে।

মুহূর্তকাল নীরবে ভেবে নিয়ে সুলতান শাহরিমান এবার বললেন—“বেটা, তুমি বহু কিতাবে পড়েছ লেড়কিরা বেইমান হয়। পরপুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে দেহদান করতেও দ্বিধা করে না। সাচ্চা বাৎ। কিন্তু তুমি আরও কিতাব পাঠ কর, তল্লাশী চালাও দেখবে লেডকিদের পক্ষেও বহু জ্ঞানী-গুণীজন আচ্ছা বাৎ বহুৎ বলেছেন। আর তােমার বাস্তব অভিজ্ঞতার ভাণ্ড শূন্য। কিতাবের কালির অক্ষরই তােমার একমাত্র সম্বল। বাস্তবের মুখখামুখি দাঁড়িয়ে দেখবে তােমার কিতাবের বাণীর সঙ্গে বাস্তবতার মিল যেমন আছে তেমনি অমিলও রয়েছে যথেষ্টই। চলার পথে যে জ্ঞান আহরণ করা যায় তা-ই প্রকৃত জ্ঞান। তােমার মধ্যে যতদিন না লেড়কিদের সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা জন্মায় ততদিন আমিও তােমাকে শাদী করতে মানা করছি ভবিষ্যতে যদি কোনদিন তােমার বদ্ধমূল ধারণার পরিবর্তন ঘটে তবে নির্দ্বিধায় আমার কাছে ব্যক্ত করবে।'

দেখতে দেখতে আরও এক সাল কেটে গেল। সুলতান শাহরিমান মুখফুটে বেটাকে শাদীর প্রসঙ্গে কোন বাৎচিই করেন না । আর শাহজাদা কামার অল-জামানও আব্বাজানের কাছে এ ব্যাপারে আর মুখ খােলে না।।

সুলতান শাহরিমান বড়ই মর্মবেদনার মধ্যে দিন গুজরান করতে লাগলেন। জীবনের শেষ সাধের চেয়েও পুত্রস্নেহ তার কাছে অনেক অনেক গুণ বড়। প্রাসাদের একান্তে এক নিরালা কামরায় তিনি সর্বক্ষণ গােমড়ামুখে বসে থাকেন। তিনি মাঝে-মধ্যে ভাবেন, লেড়কাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করবেন, তার বিচার বিবেচনা ও জ্ঞানবুদ্ধি বদলেছে কি না। শাদী করে ঘর-সংসার করার দিকে তার মন ঝুঁকেছে কি না জিজ্ঞাসা করার মন হয়।

এক সকালে সুলতান শাহরিমান শাহজাদা জামানকে নিজের কামরায় তলব করলেন।

শাহজাদা আব্বাজানকে কুর্ণিশ করে নিতান্ত অনুগত লেড়কার মত আদেশের অপেক্ষায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সুলতান শাহরিমান জিজ্ঞাসা করলেন—“বেটা, তােমার সিদ্ধান্তের কোন পরিবর্তন ঘটল কি? নাকি পূর্বের সে মত ই এখনও আঁকড়ে ধরে রয়েছ?’ 

শাহজাদা জামান নিতান্ত অপরাধীর মত বিষগ্ন ও বিবর্ণ মুখে আগের মতই মাথা নত করে আব্বাজীর সামনে দাঁড়িয়ে রইল। যে লেড়কা আব্বাজানের সামান্য একটি সাধ পূর্ণ করতে সক্ষম নয় তাকে অপরাধী তাে বলতেই হয়।

এক সময় জামান মুখ খুলল—“আব্বাজী, আপনার পরামর্শ অনুযায়ী আমি বহুৎ কিতাব পাঠ করেছি। কিন্তু কোন কিতাবেই কোন গুণীজন লেড়কিদের পক্ষে বলেন নি। বরং সবার উক্তি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই—দুনিয়াতে এমন কোন খারাপ কাম, এমন কোন গুণাহই নেই যা লেড়কিরা করতে পিছপা হয়।

লেড়কার মেজাজ-মর্জি এখনও শােধরায় নি, সুলতান শাহরিমান বুঝতে পারলেন। অতএব আরও ধৈর্য ধরতে হবে। এ জোর জুলুমের কাজ নয়। ভাল করতে গিয়ে শেষে হয়ত দেখা যাবে পরিণাম ভয়ঙ্কর রূপ ধারণা করেছে।

উপায়ান্তর না দেখে সুলতান বৃদ্ধ উজিরকে তলব করলেন। উজির এসে কুর্ণিশ করে বলল—‘জাহাপনা, আমাকে তলব করেছেন?

-হ্যা। শোন উজির, তােমার পরামর্শেই আজ আমি আব্বা হতে পেরেছি। আমার বহু আকাঙ্ক্ষিত লেড়কা পয়দা করা সম্ভব হয়েছে।

—সবই খােদার মর্জি। আমরা তাে নামান্তর মাত্র জাহাপনা।

–‘তারপর কি বলছি শােন, দুনিয়ায় আদমিদের চাওয়ার শেষ নেই। একটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে না হতেই অন্য একটি এসে মাথায় চড়ে।

—এ তাে আদমিদের সহজাত প্রবৃত্তি জাঁহাপনা।

--‘আমার ক্ষেত্রেও একই বাৎ প্রযােজ্য। আমার লেড়কার অভাব ছিল, খােদাতাল্লা পূরণ করেছেন। এখন আবার নতুনতর বাসনা, গােরে যাওয়ার আগে নাতির মুখ দেখব। লেকিন লেড়কা আমার শাদীর নাম শুনলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। এখন যা হােক কিছু একটি ফিকির বের কর যাতে আমার সাধ পূর্ণ হতে পারে।

কয়েক মুহুর্ত নীরবে ভেবে উজির মুখ খুলল—‘জাঁহাপনা, এব্যাপারে ঝটপট কিছু করা ঠিক হবে না। ধৈর্য ধরুন। আরও এক সাল ধৈর্য ধরতে হবে। তারপর একদিন হঠাৎ করে তাকে দরবারে ডেকে পাঠাবেন। পারিষদদের সামনে আচমকা প্রচার করে দেবেন যে, শাহজাদার শাদীর দিনক্ষণ সবই পাকা হয়ে গেছে।

ম্লান হেসে সুলতান বললেন-উজির, আমার লেড়কা যেমন একরােখা, তােমরা এ দাওয়াইয়ে কাজ তেমন হবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।

—জাহাপনা, আপনার ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হবে-ই! মােক্ষম দাওয়াই। কারণ, আপনার বুদ্ধিমান লেড়কা দশজনের সামনে আপনার কথা খিলাপের কথা, আপনার অসম্মানের কথা ভেবে শেষে শাদীর পিড়িতে বসতে রাজী হবেই। গুরুজনের প্রতি এমন আউট শ্রদ্ধা ভক্তি অন্য কোন লেড়কার মধ্যে দেখাই যায় না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। কামার অল-জামান শাদীর মত দেবেই দেবে।

Post a Comment

0 Comments