Alif Laila Part 26 আরব্য রজনী পার্ট ২৬ ( Part 26 )

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
সুলতান অত্যুগ্র আগ্রহ প্রকাশ করে আমাকে বললেন-“আচ্ছা। মিঞা, তুমি একটু আগে তােমার ছয় ভাইয়ার কথা বলেছ। তারা কি তােমার মতই বিদ্যান, বুদ্ধিমান, সর্ব বিষয়ে অভিজ্ঞ ?

আমি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলাম—না জাঁহাপনা, মােটেই না । আমার সঙ্গে আমার ভাইয়াদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ আলাদা। আশমান-জমিন ফারাক যাকে বলে। তাদের সঙ্গে আমার তুলনা করে আমাকে কিন্তু ছােটই করলেন। তারা সব ব্যাপারেই একেবারে আনাড়ী। নিরেট মূখ, একেবারে হদ্দবােকা। অপরের ছিদ্রান্বেষী, পরশ্রীকাতর, আর হীন মনের ধারক আমার ভাইয়াগুলাে। তাদের চেহারার মধ্যেও যথেষ্ট খুঁত দেখতে পাবেন। একজন কানা, একজন ল্যাংড়া, একজন অন্ধ—দু চোখই খুইয়েছে, কারাে মুখ পােড়া, কেউ কালা কানে একেবারেই শােনে না, আর একজনের তাে নাকই নাই।'

নাপিত এবার বলল—জাহাপনা, আমার গুণবান ভাইয়াদের কথা এক এক করে বলছি। আশা করি আমার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য থেকে তাদের সম্বন্ধে আপনি সম্যক ধারণা করে নিতে পারবেন। জাহাপনা, আমার বড় ভাইয়ার নাম বাকবুক। সে ল্যাংড়া। তার এরকম নামকরণের কারণ, সে সর্বদা মুখে এমন এক আওয়াজ করে যা বাস্তবিকই অদ্ভুত। কানায় কানায় ভর্তি কলসি থেকে জল ঢালার সময় যে আওয়াজের উদ্ভব হয় ঠিক সে রকম আওয়াজ সে সর্বদা মুখ দিয়ে করে থাকে।

নাপিতের প্রথম ভাইয়া বাকবুকের কিসসা 

আমার বড় ভাইয়া বাকবুক বাগদাদ নগরের এক নামকরা দর্জি ছিল। এক লব্ধ প্রতিষ্ঠ বণিকের কাছ থেকে সে দোকান ঘরটি ভাড়া নিয়েছিল। সে ছিল নিচতলায় আর ওপরতলায় থাকত বাড়িওয়ালা। নিচতলার একধারে একটি কলুর ঘানি ছিল।

একদিন আমার বড় ভাইয়া কাপড় সেলাই করছিল। কাজের ফাঁকে তাকিয়ে দেখে ওপরতলার বারান্দায় এক খুবসুরৎ বিবি দাঁড়িয়ে রাস্তার আদমি দেখছে। পরে অবশ্য সে জেনেছিল, বাড়িওলার বিবি। তার সুরৎ দেখে আমার বড় ভাইয়া মনে মনে তাকে মহব্বত করে ফেলে। মহব্বতে একেবারে মাতােয়ারা। তার সেলাইয়ের কাজ শিকেয় উঠল।

একদিন দোকান খুলেই আমার বড় ভাইয়া কাপড় আর সঁচ সুতাে নিয়ে বসল। কাজে মন নেই। ওপর তলার বারান্দার দিকে চোখ। কিন্তু তার মেহবুবা, সে-বিবি আর এল না। কাপড় সেলাই করতে গিয়ে সূচের ডগা দিয়ে সে আঙুলে হাজার ছিদ্র করে ফেলল । কিন্তু তার মনময়ুরীর দেখা মিলল না মুহূর্তের জন্যও। রুজি রােজগার বন্ধ। বাজার-হাট করবে কি দিয়ে? সংসারের হাল সসমিরা হয়ে দাঁড়াল। | ব্যাপারটি অবশ্য পরে খােলসা হয়ে গিয়েছিল। ইচ্ছে করেই বাড়িওয়ালার বিবি আমার বড় ভাইয়াকে নাচানাের মতলব নিয়েছিল। দুটো উদ্দেশ্য ছিল তার—প্রথমতঃ তার রােজগারপাতি বন্ধ করা আর দ্বিতীয়তঃ তার কলিজায় মহব্বতের আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া। সে নাকি এর আগেও তার ডাগর ডাগর চোখের বাণে বহুত লেড়কাকে সর্বনাশের শেষ সীমায় পৌছে দিয়েছে।  পরদিন সুবহে বাড়িওয়ালা একটি রেশমী কাপড় নিয়ে আমার বড় ভাইয়ার দোকানে হাজির হ’ল। তার বায়না, কাপড়টি দিয়ে কয়েকটি কোর্তা সেলাই করে দিতে হবে।

আমার বড় ভাইয়া তাে মহাখুশী। সারাদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কুড়িটা কোর্তা বানিয়ে ফেলল । কোর্তা পেয়ে বাড়িওয়ালা তার ওপর খুবই সন্তুষ্ট হ’ল।  কোর্তা বুঝে নিয়ে বাড়িওয়ালা মজুরি দিতে গেল। আমার বড় ভাইয়া কিছুতেই মজুরি নিতে চাইল না। নেবেই বা কি করে ? ঠিক তখনই যে তার মেহবুবা, বাড়িওয়ালার বিবি ওপর তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাতে ইশারা করেছে যেন মজুরি না নেয়। বাড়িওয়ালা শত পীড়াপীড়ি করা সত্ত্বেও সে মজুরি নিল না।

এদিকে আমার বড় ভাইয়ার অবস্থা খুবই সঙ্গীন। কোর্তার জেবে একটি কানাকড়িও নেই। বাড়িতে চুলা পর্যন্ত জ্বলে নি। তার ধারণা হ’ল স্বামীকে বিনা মজুরিতে পােশাক বানিয়ে দিলে তার বিবি তার দিকে ঝুঁকবে।

হায়রে আহাম্মক কঁহাকার! মাথায় গােবর পােরা। না হলে ধরতে পারল না যে, তারা স্বামী-স্ত্রীতে যুক্তি করে তাকে দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে কাজটি হাসিল করে নিয়েছে।

পরদিন দোকান খুলতে না খুলতেই একগাদা কাপড় নিয়ে বাড়িওয়ালা ফিন হাজির হ’ল। কতগুলি পাতলুন বানিয়ে দিতে বলল। শুরু হ’ল অমানুষিক পরিশ্রম। তৈরি করে ফেল্ল তার ফরমাস অনুযায়ী কতকগুলাে পাতলুন।

পাতলুনগুলাে বুঝে পেয়ে বাড়িওয়ালা কোর্তার জেবে হাত ঢােকাতে ঢােকাতে মজুরির কথা জিজ্ঞাসা করল। ঠিক সে মুহূর্তেই দরজার ছিদ্র দিয়ে একটি চোখ দেখতে পেল। তার বুঝতে দেরী হ’ল না চোখের মালিকটি কে। আমার বড় ভাইয়া তাে তখন ধরতে গেলে পৌনে মরা। এক চোখেই ইশারা করে বাড়িওয়ালার বিবি তাকে মজুরি নিতে বারণ করল, এবারও ফোকটে এতগুলাে পাতলুন তাকে করে দিতে হ’ল।।

জেব এখনও ফাঁকা। বাড়ির সবাই উপােষ করে কাটাচ্ছে। আমার বােকা বড় ভাইটি এবারও বুঝতে পারল না বাড়িওয়ালা ও তার বিবি ফন্দি করে তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। বােকা গাধা কোথাকার।

বাড়িওয়ালা এবার বলল—“তুমি আমার জন্য অনেক স্বার্থত্যাগ| করেছ। তার প্রতিদান স্বরূপ আমার বিবি তােমার জন্য কিছু করতে অত্যুগ্র আগ্রহী। আমাদের বাড়িতে এক ঝি কাজ করে। খুবসুরত না হলেও তাকে কুৎসিত বলা যায় না। তাকে শাদী করে সুখে ঘর সংসার কর।

আমার বােকা অপদার্থ বড় ভাইয়া এক কথাতেই তাদের পাতা ফাদে মাথা গলিয়ে দিল। শাদীর প্রস্তাবটিকে পায়ে ঠেলতে পারল না । তাদের শাদী হয়ে গেল। নিচতলার ঘানির ঘরে তাদের বাসর সাজানাে হ’ল। রাত একটু বেশী হলে আমার আহম্মক বড় ভাইয়া বাসর ঘরে গেল।

আমার বড় ভাইয়া তার সদ্য শাদী করা বিবির মধ্যে ঔদাসিন্য লক্ষ্য করল। সে গােড়াতেই সাফাই গাইল—“আজ কিছু হবে না। তােমার সাধ পূরণ করার সাধ্য আজ আমার নেই। আজ আমি অশুচি হয়েছি। এ অবস্থায় সহবাস তাে দূরের কথা এক বিছানায় বসাও বারণ। আজকের রাতটুকু তুমি এখানে একাই থাক মেহবুব। আমি ওপর তলায় গিয়ে শুয়ে পড়ছি। কথা বলতে বলতে তার বিবি - গটমট করে ওপর তলায় চলে গেল।  এদিকে আমার বড় ভাইয়া ঘানির ঘরে সজ্জিত বাসরে একা রয়ে গেল। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আমার বড় ভাইয়ার নিদ টুটে গেল। মালিক কলু এবার বলদের পরিবর্তে দিল তাকে জোয়ালের সঙ্গে জুড়ে। সে কর্কশ গলায় গর্জে উঠে বসে ঘানি টানবে না। ব্যস, আর যাবে কোথায় সপাং-সপাং করে তার পিঠে চাবুক পড়তে লাগল। ফলে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে সারাটি দিন অমানুষিক পরিশ্রম করে সে ঘানি টেনে চল্ল।

হতচ্ছাড়া বাড়িওয়ালা দোতলার বারান্দা থেকে আমার বড় ভাইয়ার তকলিফ দেখে নীরবে ঠোট টিপে টিপে হাসতে লাগল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হওয়ার ঠিক আগে আমার বড় ভাইয়ার কাধ থেকে ঘানির জোয়াল নামানাে হ’ল। তার মুখ দিয়ে তখন ফেনা বেরােবার উপক্রম হ’ল। চাবুকের ঘায়ে তার পিঠ ছড়ে গিয়ে বেশ কয়েক জায়গা দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে খুন বেরােচ্ছে। বাড়িওয়ালা এসে নাকে কান্না জুড়ে দিল। সমবেদনা প্রকাশ করল নানাভাবে। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—মনে কর বড় রকমের একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। আমি যদি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারতাম তবে কি আর এতবড় অঘটন ঘটতে পারত?

বাড়িওয়ালা চোখে-মুখে কৃত্রিম বিষাদের ছাপ এঁকে বিদায় নিলে চাকরানীটি এল। তার মুখেও কৃত্রিম বিষাদের ছায়া। বলল —“আহা রে! আমার মেহবুবকে এমন করে গরুপেটা করেছে! কলু বেটা এমন অমানুষ আগে জানা ছিল না তাে! ওদিকে আমার মালকিন তােমার নসীবের কথা শুনে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন। এমন মারাত্মক ভূলের কথা উল্লেখ করে তিনি স্বামীর সঙ্গে রীতিমত কোমরবেঁধে ঝগড়া জুড়ে দিয়েছেন।

চাকরানী বিদায় নিলে আমার বড় ভাইয়ার কাছে এল তার বিয়ের সাক্ষী। তদের বিয়ের কবুলনামায় যে একমাত্র সাক্ষী হিসাবে স্বাক্ষর করেছিল, সে লােকটি এল। তার সঙ্গীন অবস্থা দেখে সে বহুভাবে অনুশােচনা প্রকাশ করল। তারপর বলল—-“তুমি এক কাজ কর দোস্ত, নচ্ছার লেড়কিটিকে তালাক দাও। তারই জন্যই তােমার ওপর যত নির্যাতন নিপীড়ন হয়েছে।'

–‘তালাক? তালাক দিতে হলে অর্থ ব্যয় হবে তা জোগাড় করাই আমার পক্ষে কঠিন সমস্যা।

সাক্ষীটি চলে যাবার পর সে-চাকরানী আবার ভাল মানুষের মত মুখ করে আমার বড় ভাইয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে বল—“আমার মালকিন তােমার জন্য পাগল হয়ে যাবার জোগাড়। তােমার মহব্বতে সে একেবারে পাগল হয়ে গেছে গাে! তার কলিজাটি তােমার জন্য আকুপাকু করছে! আমার সবচেয়ে বড় ভয় তুমি যদি তাকে পিয়ার-মহব্বৎ করতে অস্বীকার কর তবে সে হয়ত আত্মহত্যাই করে বসবে। একটি বার তােমাকে কাছে না পেলে, তার যৌবনভরা দেহটির মূল্য যে এক কানাকড়িও নেই। একটিবার তােমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, চুম্বন করে মানবজীবন ধন্য করতে নিতান্ত আগ্রহী। আর আজ রাত্রে তােমাকে শয্যাসঙ্গী করে মজা লুঠতে চায়। আমার কথা বিশ্বাস করতে বলছি না, ওপরের বারান্দার দিকে তাকালেই চোখ-কানের বিবাদ ভঞ্জন হয়ে যাবে।

আমার বড় ভাইয়া বাকবুক যেন আহ্লাদে একেবারে গলে গেল। ওপরের বারান্দার দিকে চোখ ফেরাতেই বাড়িওয়ালার বিবি আচমকা সুরমা আঁকা চোখের বাণ মারল। আর করজোড়ে কাতর মিনতি জানাল। ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল, রাত্রে বাড়িওয়ালা থাকবে না। আর বুঝাল আমার এ-জান এ-কলিজা কেবলমাত্র তােমার ভােগের জন্যই সযত্নে রক্ষা করছি। তােমাকে আমার যৌবন-সুধা দান করতে না পারলে বেবাক মূল্যহীন হয়ে পড়বে।

তার ক্ষোভ নিমেষে উবে গেল। চোখের ভাষায় জানিয়ে দিল যাবে—অবশ্যই যাবে। আজ রাত্রিই হবে জীবনের প্রথম মধুরাত্রি। দেয়া-নেয়া পর্ব।

সারাদিন অফুরন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে আমার বড় ভাইয়া কাটাল। তার খুনে মাতন লাগল। কিন্তু বাড়িওয়ালা ও তার বিবি যে নতুন ফাঁদ পাতার পরিকল্পনা করে চলেছে বােকা হাঁদাটি জানতেও পারল না। রাত্রি গভীর হলে চাকরানীটি গুটিগুটি এসে তার দরওয়াজায় কড়া নাড়ল। সে দরওয়াজা খুলে বেরিয়ে গেল। চাকরানীর সঙ্গে পা টিপে টিপে ওপর তলায় গেল। বিবি তাকে বসতে দিয়ে বলল-মেহবুব আমার! তােমার জন্য আমার কলিজা উথালি পাথালি করছে। তুমি আমার জান। আমার দিলটি জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি শান্তিপানি ছিটিয়ে জ্বালা জুড়াও। নাও, সম্ভোগের মাধ্যমে আমাকে তৃপ্তি দাও, নিজে তৃপ্ত হও।' আমার আহম্মক বড় ভাইয়া তাে ভাবে একেবারে গদগদ হয়ে ওঠে। তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ার জন্য ছটফট করতে থাকে।  বাড়িওয়ালার বিবি আবেগ মিশ্রিত স্বরে বলে—“মেহবুব আমার! একটু অপেক্ষা কর। আগে খানাপিনা কর। তারপর সারারাত ধরে চলবে আমাদের পিয়ার মহব্বতের নেশা।আমার বড় ভাইয়া আচমকা পায়ে কাঁটা ফুটে আহত ব্যক্তির মত আবার কুরশিতে বসে পড়ল। নিজের আচরণের জন্য যারপরনাই লজ্জিত হয়। সারারাত যাকে দলন, পেষণ আর সম্ভোগ করবে তাকে সামান্য আলিঙ্গন-চুম্বনের জন্য এমন উতলা হয়ে পড়েছে! তার মেহবুবা নিশ্চয়ই তাকে বুভুক্ষু ভিখারীর মত জ্ঞান করছে। ছিঃ তার কাছে কত ছােট হতে হ’ল!

এমন সময় বাড়িওয়ালা আচমকা ঘরে ঢুকল। তার পিছন পিছন ঢুকল দু’জন নিগ্রো গুণ্ডা। কোন কথা নেই, তারা ঘরে ঢুকেই আমার বড় ভাইয়াকে এলােপাথাড়ি কিল-চড়-লাথি মারতে লাগল। তারপর শুরু হ’ল চাবুকের কেরামতি। পিঠ কেটে খুন বেরােতে লাগল। সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল। সংজ্ঞা একটু ফিরতেই এবার তাকে নিয়ে কোতােয়ালের সামনে হাজির করল। তিনি সবকিছু শুনে দু'শঘা বেত লাগাবার হুকুম দিলেন। বেতের আঘাতে সারা গা দিয়ে খুন ঝরতে লাগল। এবার তার হুকুমে উটের পিছনে বেঁধে সারা নগর ঘােরানাে হল তার ক্ষত বিক্ষত দেহটিকে। উটটি এক সময় আচমকা লাফিয়ে ওঠায় সে কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ে। তখনই তার পায়ের হাড় ভেঙে যায়। সে ল্যাংড়া হয়ে পড়ে। কোতােয়াল কিছুদিনের জন্য তাকে নগর থেকে বের করেও দিয়েছিল। এখন আমার সঙ্গেই বাস করছে।

আমার বড় ভাইয়া বাকবুক-এর কিসসা শুনে খলিফা অল মুসতানসির বিল্লাহ তাে হেসে মাটিতে গড়াগড়ি যাবার উপক্রম হলেন।

                 নাপিতের দ্বিতীয় ভাইয়া অলহাদ্দারের কিসসা 

খলিফা অল-মুসতানসির বিল্লাহ যখন আমার বড় ভাইয়ার বােকামির কথা শুনে হেসে মাটিতে গড়াগড়ি যাবার উপক্রম হলেন তখন আমি হাত কচলে নিবেদন করলাম—জাঁহাপনা, আমার দ্বিতীয় ভাইয়া অল-হাদ্দার-এর কিসসা শুনলে তাে আপনি বােধ হয় মূচ্ছাই যাবেন। তার কাণ্ডকারখানার কথা সংক্ষেপে বলছি শুনুন—তার অল-হাদ্দার নামকরণের কারণ হচ্ছে, সে উটের গলার মত নিজের গলাটিকে একবার সামনের দিকে লম্বা করে বাড়িয়ে দিত আবার পরক্ষণেই টেনে পিছনের দিকে নিয়ে যেত। তার ভঙ্গিটি বাস্তবিকই ছিল খুবই বিচিত্র। সব মিলিয়ে তার চেহারা ছবি ছিল একেবারেই কদর্য। অকারণে সে লেড়কিদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে কত যে বিশ্রী কাণ্ড বাধিয়ে বসত তার ইয়ত্তা নেই। | একদিন পথে এক বুড়ি তার পথ আগলে দাঁড়িয়ে বল—‘বাছা, তােমাকে একটি বাৎ বলার জন্য কদিন ধরেই কলিজা উথালি পাথালি করছে। তবে আমার কথা রাখবে কিনা তা তােমার মর্জি। | মুচকি হেসে হাদ্দার বলল—“ঠিক আছে, বলই না শুনি কি বাৎ বলতে চাইছ? সব শুনে বলব, তােমার কথা রাখতে পারব কিনা।

-বাছা, তবে একটি শর্ত আছে। আমার বাৎ শুনে আনাড়ীর মত কোন বাৎ বলবে না বা কোন প্রশ্ন করে বসবে না। শােন, তােমাকে আমি চমৎকার একটি জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি একবার সেখানে গেলে তােমার দিল আর সেখান থেকে আসতে চাইবে না। পাহাড়ী নদী কুলকুল করে বয়ে চলেছে। ডাবের পানির মত স্বচ্ছ তার পানি। চারদিকে ফুল আর ফলের বাহার—বিচিত্র সমারােহ। সরাব বেরিয়ে আসছে ঝর্ণা দিয়ে। আর বেহেস্তের পরীর মত খুবসুরৎ যুবতীদের মেলা। দেখামাত্র তারা তােমাকে ঘিরে ধরবে। তােমাকে চুম্বন করবে, জড়িয়ে ধরবে আর সােহাগে সােহাগে তােমার দিল্ ভরিয়ে তুলবে। হুরী পরীদের দেশে তােমাকে আমি নিয়ে যেতে চাই। কিন্তু বাছা, একটি শর্ত। তােমাকে পালন করতেই হবে।

—“দুনিয়ায় এত আদমি থাকতে তুমি আমাকেই বা বাছলে কেন?

-বেটা, আগেই তাে সাফাই গেয়ে রেখেছি অকারণে প্রশ্নের অবতারণা করবে না। কৌতূহল জাগলে তাকে জোর করে দমন কর। কোন প্রশ্ন নয়।

আর কোন কথা না বলে বুড়ি হাদ্দার’কে নিয়ে গেল সুরম্য এক অট্টালিকায়। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠেই হাদ্দার থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল, চারটি খুবসুরৎ যুবতী বিভাের হয়ে গান গাইছে।

নবাগত হাদ্দার’কে দেখে চারজনের মধ্যে যার সুরৎ সবচেয়ে বেশী সে উঠে এসে ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে তাকে সাদর সম্ভাষণ জানাল। গালিচা পেতে বসতে দিল। সরাব এনে দিল। হাদ্দার পান করল। আর এক পেয়ালা নিয়ে এসে দিল। হাদ্দার সরাবের পেয়ালাটি ঠোটের কাছে নিতেই লেড়কিটি তার গালে আচমকা এক চড় বসিয়ে দিল। হাদ্দার রেগেমেগে চলে আসার উদ্যোগ নেয়। বুড়ি চোখের ভাষায় তাকে উঠতে বারণ করে।

হাদ্দার শপথ করেছিল, তাই বাধ্য হয়ে বসে পড়ল। যুবতীটি আবার তাকে বার বার কিল-চড়-থাপ্পড় মারতে লাগল।

হাদ্দার মুখ বুজে সব বরদাস্ত করল। টু-শব্দটিও করল না। কারণ, সে যে বুড়ির কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

এবার যুবতীটি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। হাদ্দার-এর কোর্তা পাতলুন সব খুলে ফেল্ল। এবার সে একেবারে উলঙ্গ। এবার আর একটি যুবতী উঠে এসে তার দাড়ি ধরে মৃদু এক টান দিয়ে বলল–মেহবুব, আমি দাড়ির খোঁচা সহ্য করতে পারি । দাড়ি কামিয়ে এসাে। পাশের ঘরে সব ব্যবস্থা রয়েছে। হাদ্দার বুড়িটির সঙ্গে পাশের ঘরে গিয়ে দাড়ি-গোঁফ এমন কি ভুরু পর্যন্ত কামিয়ে এল। যুবতীদের একজন তার সর্বাঙ্গে লাল আর সাদা রঙ দিয়ে ভােরা কেটে দিল। মুখও বাদ দিল না। এবার তার দিকে তাকিয়ে যুবতীরা সবাই সমস্বরে হাে হাে করে হেসে উঠল। | প্রথম যুবতীটি আবেগ-মধুর স্বরে বলল—তােমার রূপে আমি মুগ্ধ। একটু নাচো তাে দেখি কেমন পারাে।

হাদ্দার বুঝতে পারল—তার সঙ্গে রসিকতা করছে। মুখ ব্যাজার করে সে পিছন ফিরে দাঁড়াল। যুবতীটি তার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে এবার বলল মেহবুব আমার, বিশ্বাস কর, তামাশা করছি না।তােমার রূপ-যৌবন আমার দিকে রীতিমত নাড়া দিয়েছে। বিশ্বাস রাখ, আমি মুগ্ধ। একটু নাচ মেহেবুব। তারপর আমরা মহব্বতের খেলায় মাতব।

হাদ্দার এবার উদ্দাম নৃত্য জুড়ে দিল। অনভ্যস্থ হাত-পা ছােড়ার ফলে ফুলদানি, আতরদানি, সরাবের পেয়ালা সব দুমদাম পড়ে গুড়িয়ে যেতে লাগল। যুবতীরা তাে একে অন্যের গলা জড়িয়ে ধরে হেসেই অস্থির।

এবার প্রথম যুবতীটি নিজের গায়ের পােশাক এক এক করে খুলে ঘরের কোণে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল, আর হাদ্দার-এর মধ্যে কামােন্মাদনা জাগিয়ে তােলার বিচিত্র সব অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল।

হাদ্দার-এর সর্বাঙ্গে শিহরণ জাগল। শিরায় শিরায় খুনের গতি বৃদ্ধি পেল। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। না, আর পারছে না সে। খুনে তার মাতন লেগে গেছে। | বুড়ি বলল–বাছা, এখানকার প্রচলিত এক রীতির কথা তােমাকে বলছি। লেড়কিটি ছুটে পালাতে চাইবে, তােমাকে ধরে ফেলতে হবে তাকে। তােমার একমাত্র উদ্দেশ্য থাকবে তাকে ধরে ফেলা। যদি ধরতে পার তবেই সে তােমার শয্যা-সঙ্গিনী হবে।” |

কিন্তু লেড়কিটি যখন এঘর-ওঘর দৌড়ে বেড়াতে লাগল তখন বহু চেষ্টা করেও হাদ্দার তাকে ধরতে পারল না।।

ভােরের পূর্বাভাস পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন।

                                            একত্রিশতম রজনী 

বাদশাহ শারিয়ার যথা সময়ে অন্দরমহলে বেগমের ঘরে এলেন। বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করলেন—“জাহাপনা, সে-দর্জি চীনদেশের সুলতানের কাছে তার কিসসা বলে চলল—জাঁহাপনা, বাগদাদের সুলতানের কাছে নাপিতটি তার দ্বিতীয় ভাইয়া অলহাদ্দার-এর বােকামির কথা বলতে লাগল। হাদ্দার তখন লেড়কিটির পিছন পিছন হন্যে হয়ে ছুটোছুটি করতে লাগল। বৃথা চেষ্টা। কিছুতেই সে তাকে ধরতে পারছে না। ছুটতে ছুটতে লেড়কিটি এক সময় একটি ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়। হাদ্দার ভাবে, এবার আর তাকে আটকায় কে? লেড়কিটিকে অবশ্যই ধরে ফেলবে। কিন্তু নসীবের ফের! ঘরের ভেতরটি ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিজের হাতটিকেও ভাল করে দেখা যায় না, লেড়কিটিকে ধরবে কি করে? বাধ্য হয়ে সে অন্ধের মত হাতাতে লাগল। অন্ধকারে কখন যে সে বারান্দায় এসে পড়েছে, বুঝতেই পারে নি। তখনই ঘটল বিশ্রী ব্যাপারটি। বারান্দার কার্ণিশে পা পড়ামাত্র একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়ল নিচে রাস্তার ওপরে। পাশেই একটি মুচি তাবুর তলায় বসে জুতাে সেলাই করে। মুচিটি দেখল, বিচিত্র এক লােক, দাড়ি-গোঁফ কামানাে। এমন কি ভুরু পর্যন্ত তার নেই। আর মুখ ভর্তি লাল-সাদা ডােরাকাটা। আচমকা এসে পড়েছে তার দেকানের একেবারে সামনে। ভাবল, কোন না কোন অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। মুচির দশাসই চেহারা। সে আমার ভাইয়া হাদ্দারকে পিঠ মােড়া করে বেঁধে কোতােয়ালের কাছে নিয়ে গেল।

কোতােয়ালের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে মুচি এবার বলল‘হুজুর, শয়তানটি বােধ হয় চুপি চুপি উজির সাহেবের বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল। ব্যস, বেশ করে উত্তম মধ্যম দেওয়া হ’ল তাকে। একেবারে হাড়গােড় ভেঙে দেবার জোগাড় করল।  কোতােয়ালের নির্দেশে হাদ্দারকে নগর থেকে বের করে দেওয়া হল। আমি লােকমুখে তার দুরবস্থা ও বহুভাবে হেনস্থা হওয়ার খবর পেয়ে ছুটে যাই। গােপনে তাকে আমার কাছে নিয়ে আসি। লুকিয়ে রাখি যাতে কাক পক্ষীও টের না পায়। বরাত গুণে আজ সে পঙ্গু। আমার ওপরে নিজের দায়িত্ব সঁপে দিয়ে কোনরকমে দিন গুজরান করছে।

জাঁহাপনা, আমার দ্বিতীয় ভাইয়ার জীবনকথা তাে শুনলেন এবার আমার তৃতীয় ভাইয়ার কথা বলছি।

বাকবকের কিসসা। 

নাপিত এবার তার তৃতীয় ভাইয়া বাকবক-এর কিসসা শুরু করল—“জাঁহাপনা, আমার তৃতীয় ভাইয়া বাগদাদ নগরের ভিখারীদের দলের সর্দার। সে একেবারেই অন্ধ। মােটেই চোখে দেখে না। একদিন সে এক আমীরের বাড়ির দরজায় ভিক্ষার জন্য হাজির হল। তার ভিক্ষা চাওয়ার কৌশল ভারি চমৎকার। মুখে বলবে না, “ভিক্ষা দাও গাে। বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র বলবে—“কই গাে, কেউ আছে নাকি?

বাড়ির লােক দরজা খােলার আগে জিজ্ঞেস করে-'কে?' সে নির্বাক। কারণ দরজা খােলার আগেই অনেকে বলে—এখন হবে না গাে, হাত খালি নেই। অন্য জায়গায় দেখ’। দরজা খুলে অন্ধ লােককে চোখের সামনে দেখলে মায়া হতে বাধ্য। আর অন্য কেউ হলে যা দিত তার চেয়ে বেশীই তাকে দেয়। যাকে বলে করুণার ব্যাপার-স্যাপার।

একদিন হ'ল কি, সে এক বাড়ির দরজায় গিয়ে হাঁক দিল ‘কই গাে, কেউ আছে নাকি?

পরমুহর্তেই ওপরতলা থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে এল-কে? কে গাে ?”

আমার ভাইয়া বাকবক মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে রইল।

একটু বাদে একজন কাশতে কাশতে দরজা খুলতে এল—কে ? দরজায় কে ? কথা বলছে না কেন? কে গাে?' দরজা খুলে দিল।

দরওয়াজা খােলার শব্দ শুনে বাকবক কাতর স্বরে বল —“আমি অন্ধ মালিক। এক মুঠো ভিক্ষা দিয়ে জানটা বাঁচান।

বাড়ির লােকটি বিচিত্র এক কাণ্ড করল। তার হাত ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গিয়ে সােজা তিন তলার ছাদের ওপর তুলল। অন্ধ বাক ভাবল, লােকটি খুবই দয়ালু। সামান্য কিছু ভিক্ষা না দিয়ে পেট পুরে খাইয়ে দেবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজের ভুল বুঝতে পারল। লােকটি রীতিমত ধমকাতে লাগল—“আমি চিৎকার করে গলা ফাটালাম কে ? কে ওখানে? তখন সাড়া দিলে না কেন? আমাকে মিছে তিন তলা থেকে নিচে নামালে কেন? হারামি কঁাহিকার! তােমাকে আমি তিন তলা থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেব!’ পরমুহুর্তে বলল—“ঠিক আছে, আজ ছেড়ে দিলাম। ভুলেও আর কোনদিন এরকম করবে না, খেয়াল থাকে যেন। যাও পালাও।

বাকবক সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় লাঠি হড়কে পড়ে গেল। গড়িয়ে একেবারে নীচে চলে এল। চোট পেয়েছে। কয়েক জায়গা ছড়েও গেছে। অসহ্য যন্ত্রণা।

যন্ত্রণাকাতর শরীরে পথে নামল। দু’জন অন্ধ সঙ্গী জুটে গেল। তারা জিজ্ঞাসা করল—“কি গাে সর্দার, গােঙাচ্ছ মনে হচ্ছে ! কি ব্যাপার, কেউ মারধাের করল নাকি ? তার কথার উত্তরে বাকবক নিজের নসীবের কথা বলল। তারা তাকে সেদিনের মত ঘরে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিল। তাদের একজন তাকে সঙ্গে করে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসতে রাজি

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments