Alif laila bangla Part 61 আলিফ লায়লা পার্ট ৬১

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ 
চোখের আড়ালে চলে গেল। পাখিটি উড়ে যাওয়ায় কামার অল-জামান-এর সব আশায় ছাই পড়ল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে সমুদ্রের ধারে মাটির ওপর বসে পড়ল। তার দু’চোখের কোল বেয়ে পানির ধারা নেমে এল। তার দীর্ঘ তিনদিনের প্রয়াস মুহর্তে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়ে গেল।
ক্লান্ত-অবসন্ন শরীরে জামান কখন যে বসা থেকে শুয়ে পড়েছিল। আর কখন যে দু’চোখের পাতা এক হয়ে ঘুমের কোলে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল কিছুই তার খেয়াল নেই।

কামার অল-জামান এক সময় চোখ মেলে তাকাল। কিছু সময় ঘুমের মধ্যে কাটানাের ফলে অবসাদ কিছুটা কেটে যাওয়ায় একটু সুস্থ বােধ করতে লাগল। জামান এবার যেন সম্বিৎ ফিরে পেল । অজানা-অচেনা জায়গা। বিদেশ—বিভূঁই। এখন সে কোথায় আছে? তাঁবু থেকে কত দূরেই বা অবস্থান করছে—কিছুই অনুমান করতে পারল না।

জামান উঠে দাঁড়াল। হারা উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগল। এক পথচারীকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল অদূরে একটি প্রাচীন নগর রয়েছে।

নগরের কাছে পৌছে জামান মুহুর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। মুহুর্তের জন্য দাঁড়িয়ে তার বিবি বদর-এর কথা ভাবে। আজ চারদিন—চাররাত্রি তার কাছ ছাড়া। তার অদর্শনে বেচারি না জানি কত চোখের পানিই ফেলে চলেছে।

জামান নগরের পথ ধরে এগােতে লাগল। এক সময় প্রাচীরে ঘেরা এক বাগিচায় প্রবেশ করল সে। একটু হাঁটাহাঁটি করেই এক বুড়াে মালীর দেখা পেয়ে গেল। একেবারে থুরথুরে বুড়াে। তাকে আদাব জানিয়ে জামান বলল—‘মালিক, এনগরে পা দিতেই অদ্ভুত একটি ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। পথচারীরা সবাই যেন কেমন গম্ভীর প্রকৃতির। নির্বাক কারাে মুখেই রা নেই। ব্যাপার কি?'  বুড়াে বলল-ইয়া আল্লা! আপনি তাদের সঙ্গে বাৎচিৎ বলার কৈাশিস করেন নি তাে? জোর বাঁচা বেঁচে গেছেন মালিক। ওরা সবাই শত্রু পক্ষের লােক। তারা সব শয়তান কাফের। দরিয়ার ওপার থেকে এসে এখানে মুসলমানদের ওপরে হামলা হুজ্জত করছে। আল্লাহর ওপর তাদের বিশ্বাস নেই। বহু মুসলমানের খুন ঝরিয়েছে। জানে খতম করেছে বহু মুসলমানকে। আর তাদের জনানারা বে-শরম, বে-আব্রু। বােরখা ব্যবহার করে না। নাকাবের ধার ধারে না। এমন বেহায়া জাত আর দেখি নি মালিক। একেবারে অশিক্ষিত জঙ্গলী ভূত। শয়তান তাদের একমাত্র উপাস্য। আল্লাহর নাম পর্যন্ত শুনতে পারে না। পচা গােস্ত আর চর্বি এদের কাছে সুখাদ্য বিবেচিত হয়। এ নগরের সব আদমিকে নির্মমভাবে কোতল করেছে। কেবল আমাকেই খতম করেনি। কিন্তু কেন যে আমার ওপর তাদের মেহেরবানি হ’ল বলতে পারব না মালিক।'! বুড়াে মালী কামার অল-জামানকে তার ঘরে নিয়ে যায়। খানাপিনার ব্যবস্থা করে দেয়। এক বােতল শস্তা দামের সরাবও এনে তার সামনে রাখে।

জামান খানাপিনায় মন দেয়। ক্ষিদেয় পেটের নাড়ীভুড়ি জ্বলে যাচ্ছে। আর চোখে ঘুম শরীর ক্লান্ত-অবসন্ন।

বুড়াে মালী তার সামনে মেঝেতে বসে আপ্যায়ণ করছে। বুড়াে কৌতূহল দমন করতে না পেরে একসময় বলল—‘মালিক, আপনি হঠাৎ এ-সর্বনাশা দেশে কেন জান দিতে এলেন?'

এমন সময় রাত্রি অবসান হ’ল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

                দু’শ আটতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় যামে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তখন পাৎলা ফিনফিনে একটি সেমিজ গায়ে দিয়ে আধশােয়া অবস্থায় পালঙ্কে বসে। মখমলের সেমিজটি এত পাৎলা যে, তার নিটোল স্তন দুটোকে যেন অস্থিরভাবে উকি-ঝুঁকি মারতে দেখা গেল। কাপড়ের আস্তরণের বাঁধা অগ্রাহ্য করে ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এমন কি নাভিকুণ্ডলীটি পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে চোখে ধরা পড়ছে। আর চোখের মনি দুটো আবেগে জড়ানাে। কামনার সুস্পষ্ট ছাপ। কাছে টানার প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত। বাদশাহ শারিয়ার কামরায় পা দিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কয়েক মুহূর্ত নীরবে নিশ্চল-নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নামমাত্র আবরণে আবৃত, নগ্নপ্রায় পূর্ণ যৌবনা বেগমের কামতপ্ত দেহটির দিকে। তার কলিজাটি যেন মুহূর্তে কেমন অস্থির হয়ে পড়ল। শিরা-উপশিরায় খুন চন-মনিয়ে উঠল। মাথার ভেতরে একদল পােকা যেন হঠাৎ খাবলা খাবলি শুরু করে দিল। বাদশাহ আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না। ভুলে গেলেন কিসসার কথা। এমন কি কিশােরী দুনিয়াজাদ-এর উপস্থিতির কথাও তার কিছুমাত্র খেয়াল নেই। আচমকা নগ্নপ্রায় বেগমের যৌবনের জোয়ার লাগা দেহটির ওপর ঝাপিয়ে পড়লেন। উন্মাদের মত তার তুলতুলে নরম শরীরটিকে নিয়ে দলন আর পেষণের খেলায় মেতে গেলেন।

দুনিয়াজাদ তখন কপালে হাত রেখে শুয়ে হাতের ফাক দিয়ে তার কৌতূহলী চোখের মণি দুটো একবার তার বড় বহিন শাহরাজাদ-এর ওপর পর মুহূর্তেই যৌবনদীপ্ত বাদশাহ শারিয়ার এর সুঠাম দেহের ওপর চক্কর মারতে লাগল। বেগম শাহরাজাদ এক সময় দুনিয়াজাদ-এর গালে আলতাে করে এক চাটি মেরে বলল-“মুখপুড়ী, ওদিকে ঘুরে শাে। নইলে চোখ গেলে দেব বলে দিচ্ছি। খুব পাকা হয়ে গেছিস, তাই না?

দুনিয়াজাদ উপায়ান্তর না দেখে ঝটকরে পিছন ফিরল। একটি তাকিয়া টেনে নিল। সেটিকে শরীরের সবুটকু শক্তি নিঙড়ে দিয়ে বুকের সঙ্গে চেপে ধরল। এদিকে শুরু হয়ে গেল প্রবল ধস্তাধস্তি।

বেগম শাহরাজাদ এক সময় চাপা আর্তনাদ করে ওঠেন—আমি আর পারছি না! এত সুখ সহ্য করতে পারছি না! আমি মরে গেলাম। অন্ধকারে তলিয়ে গেলাম--- তারপরই বাদশাহ শারিয়ার দীর্ঘ সময় পালঙ্কে গা এলিয়ে দিয়ে এলিয়ে পড়ে রইলেন। বেগম শাহরাজাদ-এর মুখেও আর কোন কথা নেই। নিঃশব্দে এলিয়ে পড়ে থেকে সম্ভোগ-সুখের শেষ রেশটুকু উপভােগ করতে লাগলেন। এক সময় বেগম শাহরাজাদ উঠে বসলেন। এলােমেলাে পােশাকটুকু গােছগাছ করে নিলেন।

বাদশাহ শারিয়ার বেগমের কোলে মাথা রেখে কিসসা শােনার জন্য তৈরী হলেন।

বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশটুকু শুরু করতে গিয়ে বললেন-‘জাঁহাপনা, কামার অল-জামান বুড়াে মালীর কাছে তার জীবনের দুঃখ-দুর্দশার কথা খুলে বলল। চোখের পানিতে তার বুক ভেসে যেতে লাগল। বুড়াে তাকে নানাভাবে প্রবােধ দিতে চেষ্টা করল। বুড়াে বলল-বেটা’ সবই খােদাতাল্লার মর্জি। তিনি আমাদের দিয়ে যা করান আমরা কাঠের পুতুলের মত তাই করি। যা বলান বলিও তা-ই। নসীবে যা লেখা আছে তাকে খণ্ডন করার ক্ষমতা কারােরই নেই।

—“আমার বিবি বদর

–‘বেটা তােমার বিবি আর সেখানে আছে বলে আমার অন্তত বিশ্বাস হয় না। একদিন অপেক্ষা করার পর নির্ঘাৎ তারা খালিদানের উদ্দেশে যাত্রা করেছে।

-“কিন্তু আমি এখন করি কি?

-“আমি তােমায় খালিদানে যাবার ব্যবস্থা করে দেব। ঘাবড়িয়াে না। এখানের বন্দরে মাঝে মধ্যেই খালিদানের মুলুকের জাহাজ আসে। সওদাগরী জাহাজ। তাতে তােমাকে তুলে দিলেই ল্যাঠা চুকে যাবে।

এদিকে রাজকুমারী বদর মাঝরাত্রে ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে যায়। কোমরে হাত দিয়ে দেখে পাথরটি জায়গা মত নেই। ভাবল, তার স্বামী কৌতূহল বশতঃ পাথরটি খুলে নিয়ে ধারে-কাছে কোথাও গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবে।

সকাল হ’ল। কিন্তু তবু কামার অল-জামান ফিরল না। ক্রমে সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল। বদর এবার আর ধৈর্য ধরতে পারল না। তার পাতানাে ভাই সারজাবন-এর ওপর রাগ হতে থাকে। ওটার জন্যই হয়ত তার স্বামীর এ-হাল হয়েছে।

এদিকে শাহজাদা কামার অল-জামান’ কে তাঁবুতে নেই একথা বদর সঙ্গী সাথীদের মধ্যে গােপন রাখল। সঙ্গী সাথীরা নিজেদের খানাপিনা নিয়েই ব্যস্ত থাকল। তাদের বিশ্বাস, শাহজাদা কামার অল-জামানই তাদের যাত্রার সময় হলে তৈরী হতে বলবেন। আর তিনি ওদিকে সদ্য বিবাহিতা বিবিকে নিয়ে মৌজ করছেন, অতএব তাদের কাছাকাছি গিয়ে বিরক্তির কারণ হওয়া উচিত নয়। এরকম মনে করেও তারা এদিকে নজর দেয় নি। মােদ্দা কথা জামান সে তাঁবুতে নেই কথাটি সতর্কতার সঙ্গে গােপন রাখা হ’ল।

রাজকুমারী বদর এবার জামান-এর পােশাক গায়ে চাপিয়ে নিল। মাথায় পরল টুপি আর কোমরে তরবারি বেঁধে একেবারে জামান বনে গেল। আর নিজের পােশাক আশাক পরিয়ে দিল তার বাঁদীটিকে।

এবার তারা বেরিয়ে এল তাঁবুর বাইরে। দূর থেকে তাদের সঙ্গী সাথীরা ভাবল শাহজাদা জামান আর রাজকুমারী বদর ভ্রমণে বেরিয়েছে। বদর তাদের সবাইকে ডেকে বলল—‘আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই এখান থেকে রওনা হ’ব। তাঁবু গুটিয়ে সবাই যত তাড়াতাড়ি পার তৈরী হও।

উট এগিয়ে চলল দুলকি চালে। প্রায় এক ঘন্টা পথ চলার পর তারা সমুদ্রের ধারে পৌছে গেল। একটি জাহাজ ভাড়া করা হ’ল। দরিয়া পাড়ি দিতে হবে।

এক নাগাড়ে দশদিন জাহাজ চলার পর এবনি দ্বীপে জাহাজ ভিড়ল। তাবু গাড়া হ’ল। স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে জেনে নেওয়া হ’ল, দ্বীপটির নাম এবনি। এখানকার সম্রাট

আরমানুস। সঘাটের একটিমাত্র খুবসুরৎ লেড়কি আছে। হায়াৎ অল নাফুস তার নাম। যুবতী। কিসসার এ পর্যন্ত বলার পর প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় পাখিদের কলতান শুনে বেগম শাহরাজাদ বুঝলেন প্রভাত হয়ে এল বলে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

                 দুশ' নয়তম রজনী

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরের কাছাকাছি বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম সরাবের বােতল ও পেয়ালা এগিয়ে দিয়ে বাদশাহকে আপ্যায়ণ করলেন। তারপর এক সময় কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, কামার অলজামান-এর বেশে সজ্জিতা বদর এবনি দ্বীপের সম্রাটের কাছে একটি চিঠি পাঠাল। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে লিখল, সে খলিদানের সুলতান শাহরিমান-এর লেড়কা কামার অল-জামান । বদর তার সঙ্গী সাথীদের মধ্যে এক প্রবীণের মুখে শুনেছিল সম্রাট আরমানুস-এর সঙ্গে সুলতান শাহরিমান-এর দোস্তি রয়েছে। মধুর সম্পর্ক তাই সে এ-পথ বেছে নিতে উৎসাহী হ’ল। জিগরি দোস্ত শাহরিমান-এর একমাত্র বেটা কামার অল-জামান এসেছে খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য কয়েকজন বিশিষ্ট পারিষদকে পাঠিয়ে দিলেন জাহাজ ঘাটে তাকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে আসার জন্য। অতিথি কামার অল-জামান-এর সৌজন্যে সম্রাট বিরাট এক ভােজসভার আয়ােজন করলেন। সেখানে জামান-এর বেশে সৃজিত বদর-এর সঙ্গে সাম্রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হ’ল। সে সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে সম্বর্ধনা জানানাে হল।

পরে তিনটি দিন আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে কাটল। চতুর্থ দিন সকালে বদর হামামে গিয়ে আচ্ছাকরে গোসল সেরে এল। এবার সম্রাট আরমানুস-এর পাশের আসনে বসল। সম্রাট আরমানুস কথা প্রসঙ্গে বললেন-“বেটা, এবার তুমি কি ভাবছ বল? কোনদিকে যাওয়ার দিল আছে কি?

—“হ্যাঁ। কিন্তু কবে, কোনদিকে যাব সেরকম কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।'

সম্রাট আমতা আমতা করে বললেন—“আমি দোস্তের মুখে তােমার কথা শুনেছিলাম। আবার এর-ওর কাছে শুনেছিলাম তুমি নাকি এক খুবসুর নওজোয়ান। আজ চাক্ষুষ করার পর চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন সম্ভব হল। আমি মনে করছি, আমার একমাত্র লেড়কি হায়াৎ অল নাফুস-কে তােমার হাতে তুলে দেই। অবশ্য তােমার যদি আপত্তি না থাকে। বদর নির্বাক। সম্রাটের কথার কি উত্তর দেবে হঠাৎ করে গুছিয়ে উঠতে না পারায়-ই তাকে মৌনব্রত ধারণ করতে হয়েছে।

সম্রাট আরমানুস বলে চললেন—‘শােন বেটা, আমার একমাত্র বেটির নাম হায়ৎ অল-নাফুস। আমি তার আব্বা, নিজেমুখে লেড়কির সুরৎ আর গুণের কথা কি বলব। তুমি এক নজরে দেখলেই বুঝবে তার মত খুবসুরৎ লেড়কি বড় একটি মেলে না। আর গুণও তার বহুমুখী। তুমি যদি রাজী থাক তবে তােমার সাথে তার শাদী দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে চাই। আর আমার ওমরও নেহাৎ কম হয় নি। রাজকার্য আর বিষয় সম্পত্তির কচকচানিতে আর দিল নেই। তাই ভাবছি, তােমাকে মসনদে বসিয়ে দিয়ে আমি মক্কা মদিনায় গিয়ে আল্লাতাল্লার নামগান করে বাকী দিনগুলি গুজরান করে দেব। এখন বল বেটা, তােমার বক্তব্য কি ?

সম্রাটের কথায় রাজকুমারী বদর-এর কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে আসতে থাকে। এর কি-ই বা জবাব দেবে। তার স্নায়ুগুলাে ক্রমে যেন শিথিল হয়ে আসতে লাগল। এখন তার সামনে রেহাই পাওয়ার মত একটি মাত্রই পথ খােলা—রাজকুমারী বদরকে মাত্র কয়েকদিন আগেই শাদী করেছি বলে কোনক্রমে পাশ কাটিয়ে যাওয়া। কিন্তু পরমুহুর্তেই মনে প্রশ্ন জাগে-—সম্রাট যদি বলে বসেন ইসলাম ধর্মে তাে একাধিক শাদীর নির্দেশ রয়েছে—তখন ? কেবলমাত্র একাধিক বললে ঠিক বলা হ’ল না---একজন পুরুষ একাধারে চার লেড়কিকে শাদী করে বিবির আসনে বসাতে পারে। আমার লেড়কি হায়াৎ অল-নাফুস না হয় তেমার দ্বিতীয় বেগমই হ'ল। আপত্তি কোথায় ?

জামান-এর বেশধারী বদরকে নির্বাক দেখে সম্রাট আরমানুস বার বার অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তাকাতে লাগলেন।

এদিকে বদর নীরবে ভেবে চলেছে--সে যদি কসুর স্বীকার করে, আসল ঘটনা ফাঁস করে দেয় যে, সে কামার অল-জামান নয়। পরিস্থিতির চাপে পড়ে জামান সাজতে হয়েছে। আসলে সে বদর। সম্রাট ঘায়ুর-এর লেড়কি আর জামান-এর বিবি তখন সম্রাট আরমানুস হয়ত বা আসলি রূপ ধারণ করে বসবেন। সরাসরি প্রস্তাব দিয়ে বসবেন, তবে এক কাম কর, আমি তােমাকে শাদী করে পিয়ারের বেগম করে নিচ্ছি এখন। কামনা-বাসনার ব্যাপারকে এক রত্তিও বিশ্বাস করা যায় না। ইসলাম ধর্মে তাে একাধিক বিবি রাখার নির্দেশ দেওয়াই আছে। আবার তার লেড়কিকে শাদী করার অক্ষমতা জানালেও হ্যাপা কম নয়। তখন হয়ত সম্রাট ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশােধ নিতে উঠেপড়ে লেগে যাবে। এ তাে মহাসঙ্কটে পড়া গেল। এদিকে গেলে শেরের পেটে যেতে হবে, ওদিকে গেলেও শেরের লকলকে জিহ্বা! তবে জান বাঁচাবার ফিকির?' বদর নিজের দিলের সঙ্গে বহুৎ বােঝাপড়া করল। শেষ পর্যন্ত ফিকির একটি বের করল বটে। সাব্যস্ত করল—আপাতত জান বাঁচাবার জন্য তার প্রস্তাবে রাজী হয়ে যাওয়া যাক। পরে আল্লাতাল্লা যে-পথে নিয়ে যান পরিস্থিতি অনুযায়ী চিন্তা করা যাবে। নসীবের ওপর নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া এমুহূর্তে গত্যন্তর নেই। বদর এবার সলজ্জ দৃষ্টিতে সম্রাটের দিকে তাকাল। ক্ষীণকণ্ঠে আমতা আমতা করে বলল—“জাঁহাপনা, আপনি আমার আব্বাজীর জিগরি দোস্ত। আপনার ইচ্ছাকে আমি আমার আব্বাজানের ইচ্ছা বলেই মনে করি। আপনার হুকুম তামিল করতে আমি রাজী। আপনি আমাদের শাদীর বন্দোবস্ত করুন।

বদর-এর কথায় সম্রাট আরমানুস-এর দিল আনন্দে নেচে উঠল। তিনি সােল্লাসে বললেন—'এ-ই তাে আমার দোস্ত শাহরিমান-এর বেটার মত বাৎ! বহুৎ আচ্ছা!’

সম্রাট আরমানুস দরবারে উপস্থিত উজির-নাজির ও অন্যান্য পারিষদ আমীর-ওমরাহদের মধ্যে সানন্দে ঘােষণা করে দিলেন, আমার লেড়কি হায়াৎ অল-নাফুস-এর সঙ্গে খালিদান-এর সুলতান শাহরিমান-এর একমাত্র লেড়কা কামার অল-জামান-এর শাদী আজ রাত্রেই সুসম্পন্ন হবে। সম্রাট আরমানুস-এর নির্দেশে সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় চার কাজীকে তলব করা হ’ল। তারা যথা সময়ে হাজির হয়ে শাদীর কবুলনামা বানিয়ে দিয়ে গেলেন।

উপস্থিত গণ্যমান্য আদমিদের সামনে শাদীর কবুলনামায় উভয় পক্ষের স্বাক্ষর নেওয়া হ’ল। সম্রাট আরমানুস সেখানেই সাম্রাজ্যের গণ্যমান্য আদমিদের সামনে উদাত্ত কণ্ঠে ঘােষণা করে দিলেন-“আমি এ-ও সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবার থেকে আমার মসনদের অধিকারী হবে আমার জামাতা কামার অল-জামান।আমি আশা রাখি আপনারা নবনিযুক্ত সম্রাটের প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্য প্রদর্শন করে আমার এবং মসনদের মর্যাদা রক্ষা করবেন।

সাম্রাজ্যের উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তিরা হাসি ও করতালির মাধ্যমে সম্রাটের প্রস্তাবটিকে স্বাগত জানালেন। সে-সন্ধ্যাতেই কামার অল-জামান-এর ছদ্মবেশী রাজকুমারী বদর-এর সম্রাটনন্দিনী হায়াৎ অল-নাফুস-এর শাদী হ’ল।

এবার রাত্রি একটু গভীর হলে বুদ্ধ সম্রাজ্ঞী নিজে বেটি হায়াৎ অল-নাফুস-এর হাত ধরে বদর-এর কামরায় পৌছে দিলেন।

বদর দরওয়াজায় এগিয়ে এসে পাত্রীকে হাত ধরে কামরার ভেতরে নিয়ে গেল, এ-ই এ-দেশের প্রচলিত প্রথা।

বদর এবার বিবির বেশে সজ্জিত হায়াৎ অল-নাফুস’কে পাশে বসাল। নিজেহাতে তার নাকাবটি তুলে শুভদৃষ্টি বিনিময়-পর্ব সম্পন্ন করল।

বদর নাকাবটি তুলে লেড়কিটির মুখের দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকাতেই নজরে পড়ল তার চোখে-মুখে আনন্দের লেশমাত্রও নেই। খুশীর পরিবর্তে তার চোখের তারায় বিষাদের ছাপ সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। সচকিত হয়ে বার বার তার মুখের দিকে তাকাতে লাগল। হ্যা, অনুমান অভ্রান্তই বটে। কিসের যেন এক অশান্তি, না পাওয়ার বেদনা তার ভেতরটি কুরে কুরে খাচ্ছে। বদর সস্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে “কি গাে সুন্দরী, তাকাও, মুখতুলে তাকাও আমার দিকে।

হায়াৎ অল-নাফুস এবার মুখ তুলে তাকাল বদর-এর দিকে। এবার তার মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল।

বদর বুঝে নিল, হায়াৎ অল-ফুস-এর মনে নির্ঘাৎ তার স্বামীর সুরৎ নিয়ে দ্বিধা ছিল। যদি তার স্বামী যথার্থই সুন্দর না হয়। যদি বুড়াে হয়। সাত লেড়কার বাপ হয় তবে তাে জিন্দেগী একদম বরবাদ হয়ে যাবে। কিন্তু বদর-এর মুখের দিকে এক ঝলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই তার দ্বিধা কেটে গেল। স্বামীর সুরৎ দেখে মুগ্ধ হ’ল। প্রথম দর্শনেই তার দিল ভরে গেল। আর কিছুমাত্রও আশঙ্কা রইল না।

কিসসার এ-পর্যন্ত বলতে না বলতেই ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।

                     দুশ দশতম রজনী 

রাত্রি একটু গভীর হতেই বাদশাহ শারিয়ার কিসসা শােনার অত্যুগ্র আগ্রহ নিয়ে ব্যস্ত পায়ে অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদএর কামরায় এলেন।

বেগম শাহরাজাদ মুহর্তমাত্র সময় নষ্ট না করেই কিসসা শুরু করলেন-জাহানা, সম্রাটনন্দিনী হায়াৎ অল-নাফুস এর দিল থেকে তার স্বামীর সুরতের ব্যাপারে দ্বিধা দূর হয়ে গেল।

এদিকে বদরও কৌতূহলী দৃষ্টি দিয়ে বধূবেশে সজ্জিতা হায়াৎ অল-নাফুসকে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। এক সময় সে আপন মনে বলে উঠল—‘খুবসুরৎ লেড়কি বটে! মুহূর্তের জন্য হলেও তার মনে ঈর্ষার উদ্রেক হ'ল—অস্বীকার করার উপায় নেই। বদর সৌজন্য বশতঃ নববধু হায়াৎ অল-নাফুস এর একটি হাত নিজের কোলে তুলে নিয়ে নানাভাবে আদর-সােহাগ করতে লাগল।

হায়াৎ এতক্ষণ যেন ভীত-সন্ত্রস্ত শম্বুকীর মত খােলসের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল। তার স্বামী তাকে দিল থেকে গ্রহণ করতে পেরেছে কিনা এতদিন এ-আশঙ্কাতেই সে জড়ােসড়াে হয়েছিল। এবার তার কলিজায় যেন একটু পানি এল। বদর এবার হায়াৎ'কে কাছে টেনে নিয়ে সশব্দে একটি চুম্বন করল। হায়াৎ-এর দিল এতে ভরে যায়। সর্বাঙ্গে রােমাঞ্চ জাগে। শিরা-উপশিরায় বয়ে যায় এক অনাস্বাদিত শিহরণ, অভূতপূর্ব উত্তেজনা। কোন নওজোয়ানের সােহাগ চুম্বনের স্বাদ যে এমন মধুর হতে পারে এই প্রথম সে উপলব্ধি করল।

হায়াৎ-ও যে আবেগে উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে বদর’কে চুম্বন করতে উৎসাহী হয় নি, একটু-আধটু প্রয়াসী হয় নি তা নয়। কিন্তু দুরন্ত লজ্জা শরম এসে তার কণ্ঠ চেপে ধরল। বার বার বাধা দিল অগ্রসর হতে পারল না। কিছুতেই শরম কাটিয়ে নিজের ঠোট দুটো-কে বদর-এর ঠোঁটের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারল না।

বদর এবার হায়াৎ-এর হাত দুটো ধরে ছােট্ট করে এক হেঁচকা টানে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। ঠোটে, গালে কপালে আর মাথায় বার বার চুম্বন করে তার মধ্যে একের পর এক রােমান্সের সৃষ্টি করল। গায়ের বিশেষ বিশেষ স্থানে হাত বােলাতে উদ্যোগী হ’ল। হায়াৎ শরমে মুখ ঢাকল। হাত বাড়িয়ে বদর-এর হাতটিকে সরিয়ে দেয়ার কোশিসও যে করেনি তা-ও নয়। কিন্তু বদর-এর আগ্রহের কাছে সে হার মানল। এমনি করে দীর্ঘ সময় তার গায়ে মাথায় হাত বােলাতে বােলাতে রাত্রি ক্রমে গভীর হয়ে আসতে লাগল। আর হায়াৎ-এর দিল ও দেহে উত্তেজনার সঞ্চার হ’ল। চোখ দুটোতে অবসাদ মিশ্রিত রােমাঞ্চ ভর করল। শরীর এলিয়ে পড়ল। চোখ দুটোতে নিদ ভর করল। কখন যে সে গভীর নিদে ডুবে গেল নিজেই বুঝতে পারে নি।

পাখীর ডাকে ভাের হ’ল। হায়াৎ নিদ থেকে জেগে সলজ্জ দুরুদুরু বুকে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঘুমন্ত বদর-এর দিকে ভালভাবে তাকাতেও পারল না। যদি সে জেগে থাকে। যদি চোখ দুটো মেলে তার দিকে তাকিয়ে থাকে, তবে? কী শরম কী বাৎ!

একটু বেলা হলে বদর-এর ঘুম ভাঙল। চোখে মুখে পানি দিয়ে এবার তৈরী হয়ে নিল। দরবারে গিয়ে বসতে হবে। তাকেই যে মসনদে বসানাে হয়েছে। সাম্রাজ্যের শাসনভার যে তার হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছে। লক্ষ লক্ষ আদমির দণ্ডমুণ্ডের দায়িত্ব তার ওপর বর্তেছে।

উজির-নাজির, আমির-ওমরাহরা যথা সময়ে দরবারে উপস্থিত হয়ে নতুন সম্রাটের আগমন প্রতীক্ষায় গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে। কারাে মুখেই হাসি নেই! সবার দিলেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, একই ভাবনা—নতুন সম্রাটের মেজাজ মর্জি না জানি কেমন হবে।

বদর সম্রাটের পােশাকে সজ্জিত হয়ে, চোখে-মুখে সম্রাটের গাম্ভীর্যের ছাপ এঁকে দরবার কক্ষে প্রবেশ করলেন। উপস্থিত পারিষদরা নিজ নিজ আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে তাকে অভিনন্দন জানাল। বদর মসনদে উপবেশন করলে উপস্থিত সবাই এক এক করে আসন গ্রহণ করল। বদর প্রথম দিনই কর্মদক্ষতা, বিচক্ষণতা ও উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে বিভিন্ন সমস্যার ঝটপট যথােচিত মীমাংসা করে দিয়ে প্রবীণ ও বিচক্ষণ সভাসদদের মুগ্ধ করল।।

বদর সভাসদদের সবচেয়ে বেশী করে মুগ্ধ করল কিছু কিছু নতুন নতুন শাসন সংস্কার প্রবর্তনের মাধ্যমে। সে বৃদ্ধ উজির ও অন্যান্য পারিষদদের লক্ষ্য করে সহজ-সরল ভাষায় বলল-“দেখুন, আমাদের সাম্রাজ্যে যাতে সুশাসনব্যবস্থা যথাযথভাবে প্রবর্তিত হতে পারে সেদিকে আমাদের সবার আগে নজর দিতে হবে। সবার আগে আমি বলব বিচার পদ্ধতির সংস্কারের কথা। আমি মনে করি আপরাধীকে ধরে তার কৃত অপরাধের জন্য শাস্তি দিলেই বিচারকের কর্তব্য যথাযথভাবে পালিত হয়েছ মনে করে উল্লসিত হওয়ার বিন্দুমাত্রও কারণ নেই।  আমাদের সবার আগে অনুসন্ধান করতে হবে মানুষ কেন অপরাধ করে। তারপর তার প্রতিকারের পথ আমাদের বের করতে হবে। অপরাধ করেছে বলেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কঠোর শাস্তি দানের জন্য উল্লসিত হতে হবে। এ-পথ অবশ্যই সঙ্গত নয়। বিচার করে যে রায় দান করা হয়েছে তাতে যদি কিছুমাত্রও সন্দেহের অবকাশ থাকে তবে তাকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হবে না।

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments